মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯ Tuesday 4th October 2022

মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯

Tuesday 4th October 2022

বহুস্বর মতামত

আত্মহত্যার মহামারী: কেন, কখন, কোথায়, কীভাবে?

২০২২-০৯-১১

দীপান্বিতা কিংশুক ঋতি

১০ সেপ্টেম্বর ছিল আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস।

 

দেশে দেশে আত্মহত্যা একটি ক্রমবর্ধমান ঘটনা এবং আত্মহত্যা বিষয়ে মানুষের ধারণাও বিভিন্ন ধরনের। অনেকে মনে করেন আত্মহত্যার জন্য নানান ধরনের মানসিক রোগ দায়ী। কেউ কেউ আত্মহত্যাকারীর দায়িত্বজ্ঞানহীনতাকে দোষী মনে করেন। আবার কারো মতে এটি একটি সামাজিক সংকট। যে যেভাবেই দেখুন না কেন, এই বিপর্যয়টি বিশ্বজুড়েই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আজকে আত্মহত্যার প্রপঞ্চটিকে নানান দিক দিয়ে দেখার চেষ্টা করবো।

 

 

আত্মহত্যা প্রতিরোধের মাস সেপ্টেম্বর। ছবি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ওয়েবসাইট

 

 

বিখ্যাত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম (১৮৫৮-১৯১৭)। এ বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত কাজ ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বই সুইসাইড: এ স্টাডি ইন সোশিওলজি। এ গ্রন্থে বিষয়ে সমাজতাত্ত্বিক আলোচনার ভিত্তি তৈরি করেন তিনি। ডুর্খেইম চার ধরনের আত্মহত্যার কথা বলেছেন। সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধরন এই শ্রেণিবিভাগের ক্ষেত্রে বারবার এসেছে, যা থেকে বোঝা যায় ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক, সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক এবং সমাজের প্রথা ও নিয়ন্ত্রণের ধরনের সঙ্গে আত্মহত্যার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাছাড়া, কোনো কোনো আত্মহত্যার ক্ষেত্রে একাধিক ধরনের সমাবেশ দেখা যায়, যখন ব্যক্তি ব্যক্তিগত ও সামাজিক বাস্তবতার সমন্বিত চাপে আত্মহত্যাকে বেছে নেন।

 

 

জাপানে আত্মহত্যার হার বরাবরই বেশি হলেও সেটি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে অতিমারীর সময়ে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সাধারণত জাপানে পুরুষদের আত্মহত্যার হার বেশি হলেও করোনার সময়ে নারীদের আত্মহত্যার হার অনেক বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বিশের কোঠায় থাকা নারীদের আত্মহত্যা, তবে উনিশের কম বয়সী মেয়েদের আত্মহত্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

 

 

ডুর্খেইমের তত্ত্বে উল্লিখিত চার ধরনের আত্মহত্যার মধ্যে প্রথমটি ইগোয়িস্টিক সুইসাইড। এ ধরনের আত্মহত্যার পেছনে কাজ করে সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে না পারা বা মিশে যেতে ব্যর্থতা। এর ফলে একজন মানুষের নিজেকে বহিরাগত, কোণঠাসা এবং সমাজবর্জিত মনে হতে পারে। এর ফলে মানুষটি সমাজ এবং চারপাশের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন। এই চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতার বোধই এ ধরনের আত্মহত্যার প্ররোচণা দেয়। 

 

ডুর্খেইমের তত্ত্ব অনুযায়ী, আত্মহত্যার দ্বিতীয় ধরনটি হলো অল্ট্রুয়িস্টিক আত্মহত্যা। অলট্রুয়িস্টিক আত্মহত্যা যাঁরা করেন তাঁদের কাছে ‘নিজ’ এর ধারণাই অস্পষ্ট। মৃত্যুকে কর্তব্য মনে করে স্বজন বা সমাজের মঙ্গলের জন্য এক্ষেত্রে ব্যক্তি আত্মহত্যা করেন।

 

তৃতীয় ধরনের আত্মহত্যার কারণের সঙ্গে সমাজের সার্বিক অবস্থা জড়িত। যেমন, অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে আত্মহত্যার হার বাড়তে দেখা যায়। সমাজের যোগানক্ষমতার তুলনায় চাহিদা বেশি হলে, বা অন্য কথায়, সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হলে আত্মহত্যার হার বাড়তে পারে। যেমনটা জাপানসহ সারা বিশ্বের ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অতিমারীর সময়ে অচলাবস্থা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আত্মহত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এছাড়া, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় উপনিবেশবাদের ইতিহাস কীভাবে তাদের আত্মহত্যার একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। কানাডার আর্কটিক অঞ্চলে ইনুইট জাতিগোষ্ঠীর মাঝে সত্তরের দশক থেকে ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার সঙ্গেও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। 

 

ডুর্খেইমের আত্মহত্যার সর্বশেষ ধরনটি হলো ফেটালিস্টিক আত্মহত্যা। এটি ঘটে যখন একজন মানুষকে চূড়ান্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাঁর ভবিষ্যতের পথ রুদ্ধ করা হয় এবং তাঁর স্বপ্ন বা ইচ্ছার কণ্ঠরোধ করা হয়। বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। 


 

সভ্যকরণ এবংআদিবাসী সমাজে ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যা

১৯৭০ সালে কানাডিয়ান ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডিয়ান অ্যান্ড নর্দার্ন অ্যাফেয়ার্সের একটি কাজের জন্য আর্কটিকে পৌঁছান ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী, লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিউ ব্রডি। তাঁর কাজের এলাকাটি দুর্গম, আর্কটিক কুইবেকের উপকূল থেকে ৯০ মাইল দূরে বেলচার দ্বীপে। এর কিছুকাল আগে ১৯৬০ সালে কানাডা সরকার বসতিটি স্থাপন করেছেন। সানিকিলুয়াক নামের জায়গাটির বাসিন্দারা সম্পূর্ণভাবে কানাডার অন্তর্ভুক্ত হলেও স্থানীয় ইনুইট জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং প্রথা সেখানে সবলভাবে বিরাজ করছিল। তাঁর সেই গবেষণার অভিজ্ঞতা ব্রডি দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে লিখেছেন।

 

১৯৮১ সাল পর্যন্ত সানিকিলুয়াকে ছিলেন ব্রডি, এবং এ সময়ে তিনি ও তাঁর বান্ধবী ক্রিস্টাইন একটি বাড়ি ছাড়া এলাকার প্রায় সব বাড়িতেই গিয়েছেন। না যাওয়া বাড়িটি ছিলো কানাডা থেকে পাঠানো স্কুলশিক্ষক এড হর্নের। সে সময়ে সানিকিলুয়াকে তিনজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। এড হর্ন ছাড়া একটি শিক্ষক দম্পতি ছিলেন সেখানে। এড হর্নের ওপর ছিল অপেক্ষাকৃত কমবয়সী শিশুদের ভার। এটা ছিলো এমন একটা সময়, যখন কানাডা সরকার চাইছে ইনুইটরা তাদের লৌকিক ধর্ম ত্যাগ করে নতুন একটা ধর্ম, অর্থাৎ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করুক এবং বাইরের দুনিয়া বিষয়ে তাদের জানাশোনা বাড়ুক। সে কারণে সানিকিলুয়াকে তখন শিক্ষক এবং যাজকদের আনাগোনা বাড়ছে। তাঁদেরই একজন, শিক্ষক এড হর্নের বাড়ির জানালা সবসময়ই ভারী পর্দায় ঢাকা থাকতো, আলো থাকতো নেভানো। মানে, ঘরের ভেতরে কী হচ্ছে বাইরে থেকে তা দেখা সম্ভব নয়।

 

হর্নের বাড়িটি কেন এভাবে লুকোছাপায় রাখা, এ নিয়ে ব্রডি তেমন ভাবেননি। এরপর একদিন ব্রডি বাইরে থাকা অবস্থায় একটি ঘটনা ঘটে। হর্নের বাড়িতে থেকে তার জিনিসপত্র তছনছ করে একজন কিশোর, এরপর স্কিডুতে (তুষারের ওপর দ্রুত চলার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রচালিত স্কি) চেপে বেরিয়ে যায়। সেই কিশোরকে আর কখনো দেখা যায়নি। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়, কিশোরটি আত্মহত্যা করেছিল।

 

ঘটনাটি ব্রডির মনে বিশেষভাবে ছাপ ফেলে, কারণ যে দশ-এগারো বছর তিনি জায়গাটিতে ছিলেন, সেই সময়ের মাঝে ঘটা তিনটি আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা এই প্রথমবার উচ্চারিত হয়েছিল।

 

 

ঘটনাটি ব্রডির মনে বিশেষভাবে ছাপ ফেলে, কারণ যে দশ-এগারো বছর তিনি জায়গাটিতে ছিলেন, সেই সময়ের মাঝে ঘটা তিনটি আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা এই প্রথমবার উচ্চারিত হয়েছিল।

 

 

১৯৯০ এর দশকে উত্তরাঞ্চলসহ কানাডার অন্যান্য অঞ্চলের যৌন হয়রানির বিভিন্ন ঘটনা সামনে আসতে থাকে, কিন্তু সত্তরের দশকে বিষয়টা এমন ছিলো না। ১৯৮০র দশকে প্রথম নিউফাউন্ডল্যান্ডের যাজকদের বিরুদ্ধে করা শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের মামলা আদালতে ওঠে। সত্তরের দশকের গোড়ায় মানুষজন আঁচ করতে পারেনি যে, সভ্যতার ধ্বজাধারী হয়ে আসা স্কুলশিক্ষক বা যাজকেরা এমন ভয়াবহ যৌন নির্যাতক হতে পারেন। যাজকদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখলেও ব্রডির সন্দেহের কারণের মধ্যে পেডোফিলিয়া বা শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন ছিলো না।

 

পরবর্তী সময়ে বহু ইনুইট প্রবীণ এবং অঞ্চলটি সম্বন্ধে ভালো ধারণা রাখেন এমন ব্যক্তিরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, কানাডার আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোতে তরুণদের আত্মহত্যা বেড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ ছিলো শৈশব ও কৈশোরে যৌন নিপীড়ন। হর্নের সাজা হওয়ার কয়েক বছর পরে হর্ন যেখানে পড়াতেন সেই ভবনটি ইনুইটরা পুড়িয়ে দেন। ভবনটি তাঁদের সন্তানদের সাথে হওয়া অন্যায়ের কথা মনে করিয়ে দিতো। বহু তরুণের আত্মহত্যার জন্য হর্নকে সরাসরি দায়ী মনে করতেন তাঁরা।

 

 

কানাডার আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোতে তরুণদের আত্মহত্যা বেড়ে যাওয়ার একটা বড় কারণ ছিলো শৈশব ও কৈশোরে যৌন নিপীড়ন। হর্নের সাজা হওয়ার কয়েক বছর পরে হর্ন যেখানে পড়াতেন সেই ভবনটি ইনুইটরা পুড়িয়ে দেন। ভবনটি তাঁদের সন্তানদের সাথে হওয়া অন্যায়ের কথা মনে করিয়ে দিতো। বহু তরুণের আত্মহত্যার জন্য হর্নকে সরাসরি দায়ী মনে করতেন তাঁরা।

 

 

১৫ বছর কানাডিয়ান আর্কটিকে শিক্ষকতা করার সময়ে ১৫২ জন ছাত্রকে যৌন নিপীড়ন করেছিলেন হর্ন, যাদের বয়স ছিলো ৬ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। একইভাবে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে এরিক ডিজেগার নামে একজন ক্যাথলিক যাজক আর্কটিক সম্প্রদায়ের ৩২ জন শিশুকে যৌন নির্যাতন করেন। এসব ঘটনা আর্কটিকে আত্মহত্যাকে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া অঞ্চলটি কানাডার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর নতুন নিয়মকানুন, শিক্ষা এবং ধর্ম গ্রহণ করতে হওয়ার ফলে অনেকেই উদ্যম হারিয়ে ফেলেন। নিজেদের জাতিগত মর্যাদাহীনতা তাঁদের পীড়া দেয়। তাছাড়া, নবীন ও প্রবীণদের মধ্যে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। একেও আত্মহত্যার প্রভাবক মনে করেন অনেকে।

 

পরবর্তী সময়ে ব্রডির হাতে ১৯৯৯-২০০১ সালের মধ্যে ঘটা ইনুইট আত্মহত্যার পরিসংখ্যান আসে। সেটি অনুযায়ী, প্রতি এক লক্ষ মানুষের মধ্যে ৫০ জন সে সময়ে আত্মহত্যা করেছেন। পুরো কানাডাতে প্রতি এক লক্ষ মানুষে আত্মহত্যা করেছেন বারো জন। অনুপাতটা আদিবাসী সমাজে কতটা বিপুল ছিল, তা এ থেকেই বোঝা যায়। বিপুল পরিমাণ মানুষের আত্মহত্যার পরিসংখ্যান ভয়াবহ বাস্তবতাটিকে সামনে নিয়ে আসে। ইনুইটদের প্রতিটি গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তত একজন আত্মঘাতী হয়েছেন। 

 

অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের অভিন্ন পরিণতি হয়েছে।

 

কানাডাই একমাত্র দেশ নয়, যেখানে আদিবাসীদের আত্মহত্যা শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতেও এই পরিসংখ্যান আশঙ্কাজনক। ২০০১-২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যদের আত্মহত্যার হার আদিবাসী নন এমন নাগরিকদের চাইতে ১.৪ থেকে ২.৪ গুণ বেশি। ২০০৮ সালে প্রতি এক লাখে গড়ে ২৫.১ জন আদিবাসী আত্মহত্যা করেছেন, ২০২০ সালে যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি এক লক্ষে ৪২.৯ জন। ২০২০ সালে আদিবাসী জনগোষ্ঠীতে মোট মৃত্যুর ৫.৫ শতাংশের কারণ ছিলো আত্মহত্যা, যেখানে আদিবাসী নন এমন অস্ট্রেলিয়ানদের ক্ষেত্রে তা ১.৯ শতাংশ। আত্মহত্যা করা আদিবাসীদের ২৫ শতাংশই ছিলেন নারী। আদিবাসী নন, এমন জনগোষ্ঠীতে আত্মহত্যায় মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ২৩ শতাংশ।

 

অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনক। বিশেষত, তরুণদের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান আরো ভীতিপ্রদ। ন্যাশনাল মর্টালিটি ডেটাবেজ এবং অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক কজেস অব ডেথ-এর ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, আদিবাসী মানুষদের মধ্যে ০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রতি এক লক্ষে আত্মহত্যা করেন ১৬.৭ জন, যা অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তুলনায় ৩.২ গুণ বেশি।

 

 

অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনক। বিশেষত, তরুণদের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান আরো ভীতিপ্রদ। ন্যাশনাল মর্টালিটি ডেটাবেজ এবং অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক কজেস অব ডেথ-এর ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, আদিবাসী মানুষদের মধ্যে ০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রতি এক লক্ষে আত্মহত্যা করেন ১৬.৭ জন, যা অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তুলনায় ৩.২ গুণ বেশি।

 

 

২৫-৪৪ বছর বয়সী আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা প্রতি এক লক্ষে ৪৫.৭ জন, অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তুলনায় যা ২.৮ গুণ বেশি। ৪৫-৬৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই পার্থক্যটা কিছুটা কম। যেখানে এ বয়সের আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের ক্ষেত্রে প্রতি লাখে আত্মহত্যা করেন ২০.৪ জন, অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বেলায় তা লাখে ১৭.২ জন। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী অস্ট্রেলিয়ানদের ক্ষেত্রে অবশ্য আদিবাসীদের আত্মহত্যার হার অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম (আদিবাসীদের লাখে ৭.৭জন, অ-আদিবাসীদের লাখে ১২.৮ জন)।  এ সময়ে ০-২৪ বছর বয়সী আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের ২৪ শতাংশ মৃত্যুই ঘটেছে আত্মহত্যার ফলে, অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে যা ১৭ শতাংশ। তবে অন্যান্য বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে আত্মহত্যায় মৃত্যুর হার আদিবাসী নন এমন মানুষদের ক্ষেত্রেই বেশি ছিলো।

 

আদিবাসী তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি থাকার কারণ কী? মনোবিদ, অধ্যাপক এবং অস্ট্রেলিয়ার সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির ফেলো প্যাট ডাজন বলেন:

 

“প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনেই ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা ও সমস্যার সমন্বয় রয়েছে। আমাদের ধারণা, আদিবাসীদের আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে তাদের উপনিবেশবাদের মধ্যে বেঁচে থাকার ইতিহাস। তাঁদের ভূমি দখল করা হয়েছিলো, গণহত্যা ঘটেছিলো, মানুষ নিজের ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় ছিলো। এমন একটা সময় ছিলো, যখন আমরা বলতাম চুরি যাওয়া প্রজন্ম, কারণ তাদেরকে জোরপূর্বক পরিবারের কাছ থেকে এনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো। এখনকার সময়ের কথা বললে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই সময়ের ট্রমা তো আদিবাসীরা বহন করে আসছেই, সেই সঙ্গে আরো অনেক সামাজিক বিধিবিধান আদিবাসীদের ওপর প্রভাব ফেলছে। দারিদ্র্য, কারাবাস এবং বর্ণবাদ বেড়েই চলেছে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই প্রশ্নের কোনো সোজাসাপ্টা পরিষ্কার উত্তর নেই। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক শোক, অনেক ক্ষত আছে। তাছাড়া মাদক, যৌন হয়রানির মতো বিষয়ও আছে। কিন্তু আদিবাসীদের জন্য উপনিবেশবাদ এবং চলমান বর্ণবাদ অবশ্যই বিরাট ভূমিকা রাখে।”

 

ডুর্খেইমের শ্রেণিবিভাগে চার ধরনের আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে তৃতীয়টি এনোমিক আত্মহত্যা। এ ধরনের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তি সামাজিক, আর্থিক ইত্যাদি পরিস্থিতির প্রতিকূলতার কারণে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের আত্মহত্যার পেছনে স্পষ্টতই তাঁদের সমাজ পরিস্থিতি এবং ইতিহাস ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এনোমিক আত্মহত্যার সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটা রূপ দেখা যায় সঙ্কটে পড়া শক্তিশালী আধুনিক অর্থনীতির সমাজগুলোতেও। সেখানেও ব্যক্তি সঙ্কটে পড়া সমাজে নিজেকে চরম অসহায় হিসেবে আবিষ্কার করেন।

 

 

মার্কিন সেনাদের আত্মহত্যা

যৌন নিপীড়নসহ অন্যান্য ট্রমার ঘটনা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেললেও, এর বাইরেও আত্মহত্যার বহু কারণ রয়েছে। ২০২১ সালে পেন্টাগন প্রধান যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকদের আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান হার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০২০ সালে ডিউটিতে থাকা ৩৮৫ জন সৈনিক আত্মহত্যা করেন। এর মধ্যে বেশিরভাগই কর্তব্যরত ছিলেন আলাস্কায়। প্রতিরক্ষা বিভাগের মতে, সেনাদের মানসিক চাপের বিভিন্ন কারণের মধ্যে প্রধান হলো সৈনিক জীবনের অনিশ্চয়তা। তাছাড়া আলাস্কায় কর্তব্যরত সৈনিকদের প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতি, ভৌগোলিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ঘনঘন প্রশিক্ষণ ও স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া, সৈনিকদের মধ্যে অতিরিক্ত মদ্যপান, ঘুমের সমস্যা রয়েছে। এর বাইরে অন্য সব মানুষের মতো জীবনধারণের ব্যয় বেড়ে যাওয়া সৈনিকদের মানসিক চাপের কারণ।

 

 

যুদ্ধের ভয়াবহতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সৈনিকদের আত্মহত্যার কারণ। ছবি: স্টুটগার্ট সিটিজেন

 

 

মার্কিন সেনাদের আত্মহত্যার সবচাইতে বড় নজির ভিয়েতনাম যুদ্ধফেরতদের মাঝে। কোন কোন হিসেবে এটা ৫০ হাজার, কোন কোন হিসেবে তা ১ লাখকেও ছাপিয়ে যায়। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে ফেরা মার্কিন সেনাদের মাঝেও ৩০ হাজারের বেশি সৈনিক আত্মহত্যা করেছেন।

 

 

মার্কিন সেনাদের আত্মহত্যার সবচাইতে বড় নজির ভিয়েতনাম যুদ্ধফেরতদের মাঝে। কোন কোন হিসেবে এটা ৫০ হাজার, কোন কোন হিসেবে তা ১ লাখকেও ছাপিয়ে যায়। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে ফেরা মার্কিন সেনাদের মাঝেও ৩০ হাজারের বেশি সৈনিক আত্মহত্যা করেছেন।

 

 

যুদ্ধের ভয়াবহতার সাথে সংশ্লিষ্টতা, ভীতি, উদ্বেগ এগুলো এই সৈনিকদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল, এগুলোকেই তাদের আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়। তেমনি যুদ্ধফেরত সেনাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক বাস্তবতাও তাদের অনেকের আত্মহত্যার জন্য দায়ী।

 

 

জাপান নানা রকমের আত্মহত্যা

আত্মহত্যার কথায় যে দেশটির নাম সবার আগে মাথায় আসে, সেটি হলো জাপান। জাপানে আত্মহত্যার হার বরাবরই বেশি হলেও সেটি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে অতিমারীর সময়ে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সাধারণত জাপানে পুরুষদের আত্মহত্যার হার বেশি হলেও করোনার সময়ে নারীদের আত্মহত্যার হার অনেক বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বিশের কোঠায় থাকা নারীদের আত্মহত্যা, তবে উনিশের কম বয়সী মেয়েদের আত্মহত্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

 

২০২০ সালের মার্চ এবং ২০২২ সালের জুনের মধ্যে যে পরিমাণ আত্মহত্যার ঘটনার কথা ধারণা করা হয়েছিলো, তার চেয়ে ৮০৮৮টি ঘটনা বেশি ঘটেছে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তাইসুকে নাকাতা বলেন, “পুরুষদের তুলনায় নারীরা ধরাবাঁধা চাকরির বাইরে অন্যান্য কাজ বেশি করেন। এ ধরনের পেশার মানুষেরাই অতিমারীতে সবচেয়ে বেশি কাজ হারিয়েছেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাছাড়া, চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ থাকার ফলে তরুণেরাই সবচেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন বোধ করতে বাধ্য হয়েছেন।” জাপানি নাগরিক এরিকো কোবায়াশি (৪৩) তরুণ বয়সে আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলেন। তিনি কোভিডকালীন ছাঁটাই সম্বন্ধে বলেন, “জাপান আমাদের নারীদের বরাবরই অবহেলা করে আসছে। জাপানের সমাজ হলো এমন একটি সমাজ, যা খারাপ সময়ে সবচেয়ে দুর্বলদেরকেই আগে ছেঁটে ফেলবে।”

 

২০২০ ও ২০২১, এই দুই বছরেই সালে জাপানে মোট আত্মহত্যার সংখ্যা ছিলো ২১০০০, যা আগের দুই বছরের চেয়ে বেশি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিলো প্রতি বছরে ২০০০০। করোনা অতিমারীতে আত্মহত্যার হার স্পষ্টত বাড়লেও, অতিমারী কীভাবে আত্মহত্যায়, বিশেষত নারীদের আত্মহত্যায় প্রভাব ফেলছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি অতিমারীর সময়ে জাপানে বহু শিশুও আত্মহত্যা করেছে। ২০২০ সালে জাপানে ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৪১৫ জন শিশু আত্মহত্যা করেন, যা ১৯৭৪ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি। শিশুদের আত্মহত্যার পেছনে থাকা বিভিন্ন কারণের মধ্যে রয়েছে পারিবারিক সমস্যা, খারাপ ফলাফল, অন্য শিশুদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অসুস্থতা। ব্যক্তিমানুষের আত্মহত্যা ছাড়াও জাপানে সন্তানসহ মায়ের, প্রেমিক যুগলের এবং পুরো পরিবারের একসঙ্গে আত্মহত্যা করার বেশ কয়েকটি ঘটনা জানা যায়।

 

অতিমারীতে আত্মহত্যার একটি কারণ হলো আর্থিক দৈন্য। দেখা গেছে, বেকারত্বের হার বাড়লে আত্মহত্যার হারও বাড়ে জাপানে। করোনায় জাপানে বিশের কোঠায় থাকা ১৮৩৭ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন, যাঁদের মধ্যে ১০৯২ জনই নারী। যার অর্থ, এ বয়সের মানুষদের আত্মহত্যার হার বেড়েছে ৩০ শতাংশ। ১৯ বছরের কম বয়সী ৩৭৭ জন আত্মহত্যা করেছেন করোনায়, যাঁদের মধ্যে ২৮২ জন নারী। শুধু ২০২০ সালের অক্টোবর মাসেই ৮৭৯ জন নারী আত্মহত্যা করেন। এ বছর এগারো বছরের মধ্যে প্রথমবার জাপানে আত্মহত্যার বার্ষিক হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, যা ২০২১ সালেও একইরকম থাকে। পুরুষদের আত্মহত্যার হার এর মধ্যেও কমেছে, যেখানে নারীর আত্মহত্যার হার বেড়েই চলেছে। এমনও দেখা গেছে, আত্মহত্যার চেষ্টায় বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর হতাশ হয়ে আর চেষ্টা করছেন না কেউ কেউ।

 

 


মহামারীতে জাপানে নারীদের আত্মহত্যার হার বেড়েছে। ছবি: বিবিসি

 

 

জাপানের শীর্ষ আত্মহত্যা বিশেষজ্ঞদের একজন টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিশিকো উয়েদা মনে করেন, নারীদের আত্মহত্যার হার এভাবে বেড়ে যাওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক। বিবিসি নিউজকে উয়েদা বলেন, “এই বিষয়ে আমার গবেষণা ক্যারিয়ারে আমি আত্মহত্যা এতো বেড়ে যাওয়ার ঘটনা কখনো দেখিনি। করোনার ফলে যেসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব খাতে নারীরাই বেশি কাজ করেন। যেমন, পর্যটন, রিটেইল এবং খাদ্য ব্যবসা।”

 

 

অধ্যাপক মিশিকো উয়েদা মনে করেন, নারীদের আত্মহত্যার হার এভাবে বেড়ে যাওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক। বিবিসি নিউজকে উয়েদা বলেন, “এই বিষয়ে আমার গবেষণা ক্যারিয়ারে আমি আত্মহত্যা এতো বেড়ে যাওয়ার ঘটনা কখনো দেখিনি। করোনার ফলে যেসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব খাতে নারীরাই বেশি কাজ করেন। যেমন, পর্যটন, রিটেইল এবং খাদ্য ব্যবসা।”

 

 

এছাড়া, জাপানে বিয়ে না করে একা থাকা নারীর সংখ্যাও ক্রমশ বাড়ছে। অধ্যাপক উয়েদার মতে, ধরাবাঁধা পেশার বাইরে কাজ করা এসব নারীর আত্মহত্যার ঝুঁকিও বেশি।

 

নারীদের আত্মহত্যার পেছনে আর্থিক দৈন্য, কাজ হারানো, বেকারত্ব ছাড়াও আরেকটি কারণ মনে করা হয় সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়াকে। দুই কিশোরীর মা আয়াকো সাতো (৪০) দ্য গার্ডিয়ানকে জানান, করোনা আসার পর থেকে তাঁকে নিয়মিত অভুক্ত থাকতে হতো, যাতে তিনি মেয়েদের খেতে দিতে পারেন। মেয়েদের পড়ার খরচও তিনি চালিয়ে যেতে পারেননি। এ বিষয়টি তাঁকে সারাক্ষণ মানসিক চাপে রাখতো। এ সময়ে তিনি এমনও ভেবেছেন যে, তিনি মারা গেলে তা তাঁর মেয়েদের জন্য অর্থনৈতিক দিক থেকে মঙ্গলজনক হবে। এ বিষয়ে টোকিওর টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিদ ওয়াতারু নিশিদা বিবিসি নিউজকে জানান, “আত্মহত্যার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জাপানের বীমা ব্যবস্থা বেশ শিথিল। কাজেই, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় অনেকেই আত্মহত্যা করেন, যাতে তাঁর বীমার টাকাটা পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের ওপর এমন অর্থনৈতিক চাপ থাকে যে, পরিবারের জন্য অর্থের যোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করাটাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হয়ে দাঁড়ায়।”  জাপানে পরিবারের সদস্যদের জীবনবীমার টাকা পাওয়ার সুবিধার্থে করা আত্মহত্যা ডুর্খেইমের তত্ত্ব অনুযায়ী অল্ট্রুয়িস্টিক আত্মহত্যার মধ্যে পড়ে। 

 

প্রশ্ন উঠতে পারে, জাপানে আত্মহত্যার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন শিথিল কেন? এর কারণ সম্ভবত এই যে, আত্মহত্যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি। জাপানে মানসিক স্বাস্থ্য, মানসিক রোগ, বিষণ্ণতা ইত্যাদি বিষয় এখনও ট্যাবু। তাছাড়া, জাপানের অভিযোগ না করার সংস্কৃতিও এখানে ভূমিকা রাখে। ওয়াতারু নিশিদা বলেন, “জাপানে ক্ষোভ বা হতাশা প্রকাশের তেমন সুযোগ নেই। জাপানের সমাজ নিয়মকেন্দ্রিক সমাজ, যেখানে তরুণদের শেখানো হয় নিজেদের বাক্সবন্দী করে রাখতে। নিজেদের সত্যিকারের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ নেই তাঁদের। কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপের মুখোমুখি হলে তাই অনেকের কাছেই আত্মহত্যাকে সহজ সমাধান মনে হয়।” নিশিদা আরো বলেন, “জাপানি তরুণদের অনেক কিছু নিয়েই জানাশোনা আছে, কিন্তু তাদের কোনো জীবন সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা নেই। নিজেদের আবেগ কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, সে সম্বন্ধে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। তারা ভুলে গেছে কাউকে স্পর্শ করতে কেমন লাগে। যৌনমিলন সম্বন্ধে ভাবতে গেলে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে এবং কী করবে তা বুঝতে পারে না।” 

 

বিচ্ছিন্ন ও বিষণ্ণ হয়ে পড়া তরুণদের পরামর্শ দেওয়ার তেমন কোনো জায়গা নেই। বিষণ্ণতা রোগের বিষয়টি জাপানে তেমন পরিচিত নয়, এবং মানসিক রোগ এখানে ট্যাবু হওয়ায় অনেকেই এর লক্ষণ নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। জাপানের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। দেশটিতে মনোবিদের চূড়ান্ত অভাব তো রয়েছেই, পাশাপাশি মনোচিকিৎসক ও মনোবিদদের একসঙ্গে কাজ করার চলও নেই। মানসিক রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে শক্তিশালী সাইকোট্রপিক ঔষধ দেওয়া হয়, কিন্তু অন্য দেশগুলোর মতো জাপানে মনোচিকিৎসক রোগীকে কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেন না। এমনকি, কাউন্সেলিং সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই, সরকার কোন অনুমোদন দেয় না বা মান নিয়ন্ত্রণও করে না। ইউরোপ বা আমেরিকার মতো জাপানে মনোবিদদের প্রশিক্ষণ ও সনদের কোনো সরকার পরিচালিত ব্যবস্থা নেই। যে কেউই কাউন্সিলর বা মনোবিদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন, এবং সেবাগ্রহীতার জানার কোনো উপায় নেই, যাঁর কাছে তিনি এসেছেন তিনি আদৌ সেবাদানের উপযুক্ত কিনা।

 

 

অন্য দেশগুলোর মতো জাপানে মনোচিকিৎসক রোগীকে কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেন না। এমনকি, কাউন্সেলিং সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই, সরকার কোন অনুমোদন দেয় না বা মান নিয়ন্ত্রণও করে না। ইউরোপ বা আমেরিকার মতো জাপানে মনোবিদদের প্রশিক্ষণ ও সনদের কোনো সরকার পরিচালিত ব্যবস্থা নেই। যে কেউই কাউন্সিলর বা মনোবিদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন, এবং সেবাগ্রহীতার জানার কোনো উপায় নেই, যাঁর কাছে তিনি এসেছেন তিনি আদৌ সেবাদানের উপযুক্ত কিনা।

 

 

জাপানি তরুণদের “হিকিকোমোরি” দশা বহু ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার পূর্বলক্ষণ হিসেবে কাজ করতে পারে। জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতে, হিকিকোমোরি হচ্ছেন এমন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ যাঁরা সমাজ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখেন এবং অন্তত ছয় মাস বাড়ি থেকে বের হন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সময়কাল এক দশককেও ছাড়িয়ে যায়। এ বিষয়টি জাপানেই মূলত দেখা গেলেও, যুক্তরাষ্ট্র, ওমান, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি এবং ফ্রান্সেও এ ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। হিকিকোমোরি দশা ডুর্খেইমের তত্ত্বে উল্লিখিত চার ধরনের আত্মহত্যার মধ্যে ইগোয়িস্টিক আত্মহত্যার পূর্বাভাসের ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

 

দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেটালিস্টিক আত্মহত্যা

জাপান ছাড়া এশিয়ার আরো একটি দেশে আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনক। দেশটি দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ায় মৃত্যুর চতুর্থ বৃহত্তম কারণ আত্মহত্যা। গড়ে প্রতিদিন প্রায় চল্লিশজন মানুষ আত্মহত্যা করেন দক্ষিণ কোরিয়ায়। দেশটিতে ১০-৩৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা, আবার ৪০-৫৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। ২০২০ সালে ৯-২৪ বছর বয়সী মোট ৯৫৭ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। তরুণদের আত্মহত্যার এই হার নিঃসন্দেহে আশঙ্কাজনক।

 

 

দক্ষিণ কোরিয়ায় মৃত্যুর চতুর্থ বৃহত্তম কারণ আত্মহত্যা। গড়ে প্রতিদিন প্রায় চল্লিশজন মানুষ আত্মহত্যা করেন দক্ষিণ কোরিয়ায়। দেশটিতে ১০-৩৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ আত্মহত্যা, আবার ৪০-৫৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। ২০২০ সালে ৯-২৪ বছর বয়সী মোট ৯৫৭ জন মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। তরুণদের আত্মহত্যার এই হার নিঃসন্দেহে আশঙ্কাজনক।

 

 

কেন দক্ষিণ এশিয়ার এতো তরুণ আত্মহত্যা করেন? সবগুলো কারণ নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা থেকে কিছু কারণ সম্বন্ধে জানা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতে, ২০১৬ সালে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের মধ্যে ৯০ শতাংশ বিষণ্ণতা, উদ্বেগের মতো কোনো না কোনো নির্ণয়যোগ্য মানসিক রোগে ভুগছিলেন। শিক্ষা ও পেশাগত পরিবেশের ফলে সৃষ্ট মানসিক চাপও আত্মহত্যার জন্য দায়ী। দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষা ও পেশার ক্ষেত্রের মানসিক চাপের বিষয়টি অনেকেরই জানা, যেখানে প্রায়শই মধ্যরাত পর্যন্ত খাটতে হয়। ধারণা করা হয়, কোরিয়ার ১৯৯৭ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে আবারও মন্দার মুখোমুখি হওয়ার ভয় এই চাপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দায়ী বলে মনে করেন কেউ কেউ। অর্থনৈতিক চাপ এবং শারীরিক-মানসিক সুস্থতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন হলেও, দক্ষিণ কোরিয়া তার নাগরিকদের পেশা ও শিক্ষার পরিবেশ চাপমুক্ত রাখার বিষয়ে সচেতন নয়। অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা এবং পেশার ফলে তৈরি ব্যাপক মানসিক চাপের পরিণামে দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের এ ধরনের আত্মহত্যা ডুর্খেইমের তত্ত্বে বলা ফেটালিস্টিক আত্মহত্যার সঙ্গে মিলে যায়।

 

মানসিক চাপ ছাড়াও কোরিয়ার সংস্কৃতির প্রভাবও রয়েছে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে। কোরিয়ার প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস হলো বৌদ্ধধর্ম এবং কনফুসীয়বাদ, যা পরিবারের প্রয়োজনীয়তার ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেয়। পরিবারের মর্যাদা অটুট রাখার পাশাপাশি অধ্যবসায়, বিনয় এবং সংযমের মতো বিষয়গুলো কোরিয়ার সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ। এসব কারণে বহু কোরিয়ান নাগরিক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বোধ করলেও মনোচিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না বলে ধারণা করা হয়। তাছাড়া, মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা সম্বন্ধে সামাজিক সংস্কারও এর জন্য দায়ী। অনেকে মনে করেন, মানসিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসা নেওয়ার অর্থ মানুষটি মানসিকভাবে যথেষ্ট সবল নন। যে ৯০ শতাংশ মানুষের আত্মহত্যার কারণ মানসিক অসুস্থতা, তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ চিকিৎসা নিয়েছিলেন বলে জানায় দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

 

 

ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যা 

সিএনএনের ২০২০ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন ভারতে কৃষির সঙ্গে যুক্ত ৩০ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন। এর মূল কারণ ঋণের বোঝা। সরকারি তথ্যানুযায়ী শুধু ২০২০ সালেই কৃষি খাতে কর্মরত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মঘাতী হন। শুধু ঋণের বোঝাই নয়, পরিবেশ বিপর্যয় এবং অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ক্যান্সারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়াও কৃষকদের বেঁচে থাকা দুরূহ করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বিরূপ আবহাওয়া পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এবং পানি সংকটের কারণে সেচের জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে শস্যের ক্ষতি হচ্ছে।

 

 

সবুজ বিপ্লবের ফলে শুরু হওয়া অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, মাটির মানের অবনতি এবং ঋণের বোঝা ভারতে কৃষককে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ছবি: দ্য লজিক্যাল ইন্ডিয়ান

 

 

পাঞ্জাবের বিষয়টি ভাবা যাক। ভারতের রুটির ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত এই প্রদেশটিতে দেশটির চাষযোগ্য জমির মাত্র ৩% থাকলেও, ভারতের মোট গমের ২০% এবং মোট ধানের ১৩% এখানে ফলে। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালে পাঞ্জাবের গ্রামাঞ্চলে আত্মহত্যার হার বেড়েছে ১২ গুণ। ধারণা করা, এর সঙ্গে সবুজ বিপ্লবের ফলে তৈরি হওয়া নতুন সামাজিক বিন্যাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

 

বিশ্বজুড়েই কৃষি অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল একটি খাত। ভারতের কৃষি শুধু নয়, কৃষকের জীবনও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। তাঁদের সংকট একটি নয়, নানামুখী। বহু কৃষকই ১৯৬০ এর দশকে শুরু হওয়া সবুজ বিপ্লবের ফল ভুগছেন।

 

সবুজ বিপ্লবের ফলে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহার শুরু হয়, যা কৃষকদের নানা ধরনের রোগবালাইয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে কৃষকদের প্রতিনিয়ত নানা বহুজাতিক কর্পোরেশনের সঙ্গেও তাঁদের লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া, প্রতি বছর ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে এবং একটা সময়ে কৃষকেরা ব্যাঙ্ক থেকে আর ঋণ পান না। তখন তাঁদেরকে চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। এই ঋণ প্রায় কখনোই শোধ করা সম্ভব হয় না। এসব ঘটনার সমন্বিত চাপে অনেক কৃষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। তাঁদের এই আত্মহত্যার কারণ সামাজিক, কোনোভাবেই ব্যক্তিগত নয়। 

 

 

সবুজ বিপ্লবের ফলে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহার শুরু হয়, যা কৃষকদের নানা ধরনের রোগবালাইয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে কৃষকদের প্রতিনিয়ত নানা বহুজাতিক কর্পোরেশনের সঙ্গেও তাঁদের লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া, প্রতি বছর ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে এবং একটা সময়ে কৃষকেরা ব্যাঙ্ক থেকে আর ঋণ পান না। তখন তাঁদেরকে চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। এই ঋণ প্রায় কখনোই শোধ করা সম্ভব হয় না। এসব ঘটনার সমন্বিত চাপে অনেক কৃষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। তাঁদের এই আত্মহত্যার কারণ সামাজিক, কোনোভাবেই ব্যক্তিগত নয়। 

 

 

ডুর্খেইমের তত্ত্বে বলা তৃতীয় ধরনের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে দেখা যায়, আর্থসামাজিক ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা ব্যক্তিকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। ভারতের কৃষকরা এই অ্যানোমিক আত্মহত্যারই শিকার।

 

 

বাংলাদেশে আত্মহত্যা

বাংলাদেশে ২০২১ সালে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এ বছরও বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ যে দুটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোড়ন তুলেছে, তা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং হলিক্রস স্কুলের দুজন ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা। দুজন শিক্ষার্থীই ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন, যদিও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সানজানার বন্ধুরা মনে করেন, সানজানাকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের এ ধারণার কারণ, সানজানার শরীরে কোনো আঘাত বা থেঁতলে যাওয়ার মতো চিহ্ন ছিলো না, লাফ দেওয়ার পরে যা থাকা স্বাভাবিক। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সানজানার মরদেহের পাশে একটি চিরকুট পাওয়া গেছে, যেখানে সানজানা তাঁর মৃত্যুর জন্য তাঁর বাবাকে দায়ী করেছেন।

 

 

বিষণ্ণতা ছাড়াও বিচ্ছিন্নতার বোধ এবং পারিপার্শ্বিক নানা জটিলতা আত্মহত্যার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

 

 

হলিক্রস ছাত্রী পারপিতার মৃত্যুর কারণ হিসেবে তাঁর পারিপার্শ্ব দায়ী বলে মনে করা হয়। পারপিতার বাবা-মা মনে করছেন, পরীক্ষায় ফেলের কারণে গণিত শিক্ষকের তিরস্কার আত্মহত্যার কারণ। তাঁদের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে সানজানাকে কম নাম্বার দেওয়া হয়েছে। পারপিতার বন্ধুদের মতে, খারাপ ফলের কারণে তিনি পারিবারিকভাবে চাপের মধ্যে ছিলেন, যদিও পারপিতার বাবা-মা তা অস্বীকার করেন। পারিবারিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই সম্ভাব্য চাপের ফলে সৃষ্ট মানসিক টানাপোড়েনের পরিণামে ঘটা এই আত্মহত্যা ডুর্খেইমের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী ফেটালিস্টিক আত্মহত্যার উদাহরণ।

 

এ বছর মার্চে পরপর দুইদিন দুই আদিবাসী কৃষক আত্মহত্যা করেন। সম্পর্কে তাঁরা চাচাতো ভাই ছিলেন। ধারণা করা হয়, চাষের জন্য সেচের পানি না পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন এই দুই কৃষক ভাই। রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার নিমঘাটু গ্রামের রবি মারান্ডি এবং অভিনাথ মারান্ডি বিষপানে আত্মহত্যা করার পর তাঁদের মৃত্যুর প্রতিবাদে হওয়া এক মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শুধু আদিবাসীদের জমিগুলোতে গভীর নলকূপের পানি পেতে  সমস্যা হয়। এমনকি গভীর নলকূপের আশপাশে থাকা আদিবাসীদে জমিতেও সঠিকভাবে পানি দেওয়া হয় না।

 

 

এ বছর মার্চে পরপর দুইদিন দুই আদিবাসী কৃষক আত্মহত্যা করেন। সম্পর্কে তাঁরা চাচাতো ভাই ছিলেন। ধারণা করা হয়, চাষের জন্য সেচের পানি না পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন এই দুই কৃষক ভাই। রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলার নিমঘাটু গ্রামের রবি মারান্ডি এবং অভিনাথ মারান্ডি বিষপানে আত্মহত্যা করার পর তাঁদের মৃত্যুর প্রতিবাদে হওয়া এক মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শুধু আদিবাসীদের জমিগুলোতে গভীর নলকূপের পানি পেতে  সমস্যা হয়। এমনকি গভীর নলকূপের আশপাশে থাকা আদিবাসীদে জমিতেও সঠিকভাবে পানি দেওয়া হয় না।

 

 

পানির অভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক আদিবাসী তাদের জমিতে চাষাবাদ করতে না পেরে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। আদিবাসী কৃষকদের ওপর এই বৈষম্য, অত্যাচার ও নির্যাতন বন্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

আদিবাসী কৃষকের আত্মহত্যার এই ঘটনার পেছনে মূল কারণ কোনো ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা। ডুর্খেইম বর্ণিত আত্মহত্যার তৃতীয় ধরন এনোমিক আত্মহত্যার সঙ্গে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে সমাজ ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য মানুষকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে। 

 

বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলায় আত্মহত্যার প্রকোপ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি। যেখানে সারা বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখে ছয়জন মানুষ আত্মহত্যা করেন, ঝিনাইদহের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা লাখে বাইশ জন। সারা দেশে প্রতি বছর ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন, কিন্তু ঝিনাইদহে প্রতিদিনই কেউ না কেউ আত্মঘাতী হচ্ছেন।

 

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জার্নাল অফ সোশ্যাল হেলথে প্রকাশিত প্রবন্ধ সিজনালিটি অব সুইসাইড ইন ঝিনাইদহ ডিস্ট্রিক্ট, বাংলাদেশ: ২০১১-২০১৮ থেকে জানা যায়, জেলাটিতে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরে। অক্টোবর থেকে মার্চে আত্মহত্যার সংখ্যা কমে যায়। এর পেছনে কারণ বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর একইসঙ্গে গরম ও বর্ষার সময়। এ সময়ে টানা বৃষ্টিতে প্রায়শই খাদ্যাভাব দেখা দেয় এবং পুরুষেরা ঘরের বাইরে কাজে যেতে পারেন না। পুরুষদের ঘরে থাকার সময় বেড়ে যাওয়ার ফলে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাও বেড়ে যায়। বৃষ্টির ফলে নারীরা অন্য কোথাও যেতে পারেন না। তাছাড়া, প্রথাগতভাবে রুজির দায়িত্ব পুরুষের ঘাড়ে থাকলেও, আশা করা হয়, নারীরা যেভাবেই হোক খাবার জোগাড় করবেন। এতে ভাটা পড়লেও নারীর ওপর অত্যাচার বাড়ে। এর ফলে নারীরা প্রায়শই আত্মঘাতী হন। পুরুষদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে যথেষ্ট উপার্জন করতে না পারা।

 

 

এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর একইসঙ্গে গরম ও বর্ষার সময়। এ সময়ে টানা বৃষ্টিতে প্রায়শই খাদ্যাভাব দেখা দেয় এবং পুরুষেরা ঘরের বাইরে কাজে যেতে পারেন না। পুরুষদের ঘরে থাকার সময় বেড়ে যাওয়ার ফলে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাও বেড়ে যায়। বৃষ্টির ফলে নারীরা অন্য কোথাও যেতে পারেন না। তাছাড়া, প্রথাগতভাবে রুজির দায়িত্ব পুরুষের ঘাড়ে থাকলেও, আশা করা হয়, নারীরা যেভাবেই হোক খাবার জোগাড় করবেন। এতে ভাটা পড়লেও নারীর ওপর অত্যাচার বাড়ে। এর ফলে নারীরা প্রায়শই আত্মঘাতী হন। পুরুষদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে যথেষ্ট উপার্জন করতে না পারা।

 

 

বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৩ হাজার মানুষ। গড়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন ৩৫ জন। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর  গড়ে ১০ হাজার মানুষ শুধু ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের ৩১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় আত্মহত্যাজনিত অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে দুই হাজার ১৬৬টি। এছাড়া, অতিমারীর সময়ে আত্মহত্যার হার অনেক বেড়েছে। বিবিএস বলছে, করোনার প্রথম বছর আত্মহত্যা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। মোট আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৪ হাজার ৪৩৬টি। করোনার সময় নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে বাংলাদেশে, যেমনটা জাপানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর বিশ্বে আট লাখ লোক আত্মহত্যা করেন। দৈনিক আত্মহত্যা করেন দুই হাজার ১৯১ জন, অর্থাৎ প্রতি লাখে ১৬ জন।

 

আত্মহত্যাকে অনেকেই সম্পূর্ণভাবে মানসিক রোগের পরিণাম মনে করলেও সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিদরা মনে করেন, আত্মহত্যা কেবলই মানসিক রোগ বা জিনগত বৈশিষ্ট্যের পরিণাম নয়, বরং ব্যক্তিমানুষের ওপর সমাজের যে প্রভাব রয়েছে সেটিও আত্মহত্যার জন্য দায়ী। এই লেখায় উল্লেখিত নানা উদাহরণেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক মতামতে মনোবিদ সানা আহসান একই ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, মানসিক বিপর্যস্ততার দায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তির ওপর চাপানো হলেও সার্বিক সামাজিক অবস্থার ভূমিকা এখানে বিরাট। অর্থনৈতিক মন্দা, দারিদ্র্য, অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশের ভুক্তভোগী যে ব্যক্তি, তাঁর মানসিক বিপর্যস্ততার মূল কারণ তিনি নিজে নন, এবং কাউন্সেলিং এর স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করেন সানা। ক্রমশ আত্মহত্যার হার বাড়তে থাকা দেশগুলোকে কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর জোর না দিয়ে নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো অটুট রাখার জন্য যা যা নিশ্চিত করা জরুরি, তা নিয়ে ভাবতে হবে।

 

 

[সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, এনডিটিভি, বিবিসি নিউজ, সিএনএন, ইউএন একাডেমি, বার্কলে পলিটিক্যাল রিভিউ, ডয়শে ভেলে, ওয়াশিংটন পোস্ট, জাপান টাইমস, কোরিয়া হেরাল্ড, ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস, দৈনিক যুগান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার]

 

আরো পড়ুন

একটি আত্মহত্যা মামলার তদন্ত