সোমবার ১৭ই মাঘ ১৪২৯ Monday 30th January 2023

সোমবার ১৭ই মাঘ ১৪২৯

Monday 30th January 2023

প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ভয়ংকর যে কারসাজির কারণে সড়কে মৃত্যুর মহামারি

২০২৩-০১-০৪

আবু রায়হান খান

    

অন্য কোন কিছুর সাথে কোন সংঘর্ষ ছাড়া একা একাই বাস ও ট্রাক উলটে দুর্ঘটনার দৃশ্য 


বাংলাদেশে রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনো কখনো এসব যানবাহন সেতুর রেলিং ভেঙ্গে কিংবা সড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। কী কারণে এই রহস্যময় দূর্ঘটনাগুলো ঘটছে? 

 

সড়কে লোক চক্ষুর আড়ালে ভয়ংকর অপরাধমূলক কিছু কাজ চলছে। যার ফলে ঘটছে এসব দূর্ঘটনা। সড়কে চলমান এসব অপরাধমূলক কাজ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দৃক নিউজের হাতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। 
 

সড়কে চলমান যেকোন মোটর যানের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে চেসিস। এই চেসিসের সাথে গাড়ির মূল ইঞ্জিন, চাকা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ যুক্ত থাকে। তার ওপর মূল শরীর বা বডি সংযুক্ত করা হয়। এরপর সিট, গ্লাসসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়াদি বসানো হয়। অর্থ্যাৎ একটি মোটর যান পরিপূর্ণ আকার পায় তার ভিত্তি বা চেসিসের ওপর দাঁড়িয়ে। 

 

সাধারণত মোটরযান প্রস্তুতকারী কোম্পানি চেসিস তৈরি করে থাকে। সেই প্রতিষ্ঠানই চেসিসের সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য যন্ত্রাংশের ব্যবহার ও সংস্কার করার মানদণ্ড নির্ধারন করে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে অনেক রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যালোচনার মাধ্যমেই এই মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ কর্তৃপক্ষ- বিআরটিএর অনুমতি সাপেক্ষে গণপরিবহনের বিভিন্ন অংশ সংস্কার বা মোডিফাই করা গেলেও চেসিস মোডিফাই করার কোন সুযোগ নেই। 

 

তবে নিয়ম না থাকলেও অবৈধভাবে প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে চেসিসে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন করে যাচ্ছে বিভিন্ন ভারী যানবাহনের মালিক পক্ষ। 


তবে বিষয়টি একেবারেই অজানা তা নয়। ২০১৩ সালে ঢাকার বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক যানবাহন মোডিফিকেশন কারখানার তথ্যের ওপর ভিত্তি করা ‘অ্যানালাইসিস অব ভেহিকেল মোডিফিকেশন প্র্যাকটিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা অনুযায়ী,

 

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দেয়া পরিমাপের চেয়,
বড় বাসগুলোর চেসিস অন্তত ০.৬১ – ০.৯১ মিটার, 
মাঝারি আকারের বাসের চেসিস প্রায় ০.৭৬ – ১.০৭ মিটার পর্যন্ত বড় করে 
বাসগুলোতে সিটের সংখ্যা বাড়ানো হয়।

 

ট্রাকের ক্ষেত্রেও সেসব মোডিফিকেশন কারখানায়,
বড় ভারী মালামাল বহন করার ট্রাকের চেসিস ০.৭৬ – ১.২২ মিটার, 
মাঝারি মানের ট্রাকে ০.৩ – ০.৯১ মিটার এবং 
ছোট পিকআপের ০.৪৭ – ০.৯১ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। 


এই আশংকাজনক তথ্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পরেও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। প্রশাসনের সামনেই এখনও অনুমোদনহীনভাবে দিনের পর দিন এভাবে বিভিন্ন বাস ও ট্রাকের চেসিস মোডিফাই করা হচ্ছে। মোডিফাইকৃত চেসিসের ওপর অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বোঝাই করে মুনাফা লাভের আশায় এ ধরনের কাজ করছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। 

 

এছাড়া ট্রাকের ড্রাইভিং সিটের পেছনে মাল নেয়ার অংশটা চওড়া করা হচ্ছে। এতে করে বাহনের প্রত্যেকটি যন্ত্রাংশের মধ্যে যে সমন্বয় থাকার কথা সেটি আর থাকছে না। যার ফলে সড়কে ঘটছে দূর্ঘটনা।

 

অনুমোদনবিহীনভাবে এ ধরনের মোডিফিকেশন করার কারণেই প্রায়ই কোন সংঘর্ষ ছাড়া একা একাই উলটে যাচ্ছে এসব যানবাহন। 

 

বাংলাদেশের যেকোন যানবাহনকে ফিটনেসের ছাড়পত্র দেয় বাংলাদেশ সড়ক যোগাযোগ কর্তৃপক্ষ- বিআরটিএ। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩র ৪৭ নং সেকশন অনুযায়ী, প্রতিটি বাহনকে প্রতিবছর বাধ্যতামূলকভাবে বাহন প্রদর্শন করে বি আর টি এ’র কাছ থেকে ফিটনেস ছাড়পত্র নবায়ন করতে হবে। ফলে চেসিস মোডিফাই করা বাহনের ফিটনেস ছাড়পত্র পাওয়ার কোন সুযোগ আইনসঙ্গতভাবে থাকার কথা না। কিন্তু তারপরেও চেসিস পরিবর্তন করে, ফিটনেস সনদ নিয়েই দিব্যি সড়কে ঘুরে বেড়াচ্ছে এসব যানবাহনগুলো।

 

সরেজমিনে বিআরটিএ’র কেন্দ্র ঘুরে ফিটনেস ছাড়পত্র নবায়নের জন্য ‘আনসিন’ নামক এক অভিনব পন্থার দেখা পেয়েছে দৃকনিউজ। 

 

বিআরটিএ’র কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারি ও দালালের মাধ্যমে বিআরটিতে গাড়ি প্রদর্শণ না করে শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে ফিটনেস ছাড়পত্র পাওয়ার উপায়কে আনসিন পদ্ধতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের কোন নিয়ম নেই বলে জানায় বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ।

 

কিন্তু দেশে অনেক যানবাহনই আনসিন পদ্ধতিতে ফিটনেস ছাড়পত্র নিয়ে সড়কে চলাচল করছে। বিআরটিএ’র কেন্দ্রের সামনেই সশরীরে এরকম অনেককে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়; যারা গাড়ি প্রদর্শন ছাড়াই ফিটনেস ছাড়পত্র এনে দিতে সক্ষম বলে দাবি করেন। 


সড়কে ফিটনেসবিহীন বাহন চলাচলের কারণে দূর্ঘটনা ঘটলে দায় কার এমন প্রশ্নে বাহন মালিক ও চালকই দায়ী বলে মনে করেন বিআরটিএ কর্মকর্তা। 

 

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে মৃত্যু কোন দৈব ঘটনা নয়। এসব মৃত্যুর পেছনে প্রধানত দায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ।

 

এভাবে বিআরটিএ’র দায় এড়িয়ে যাওয়া ও মালিক পক্ষের অধিক মুনাফার লোভে সড়কে দূর্ঘটনার আয়োজন করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মতে, গত দশ বছরে সড়ক দূর্ঘটনায় প্রায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। মহামারি আকার ধারণ করা এসব দূর্ঘটনায় প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ১৪ জন। যেকোন দূর্ঘটনা ঘটলে প্রথমেই দায়ী করা হচ্ছে চালককে। চালক সর্বস্ব বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আড়ালে থেকে যাচ্ছে দূর্ঘটনা তৈরির আয়োজনকারী মূল কালপ্রিটরা। এভাবে বাংলাদেশে দূর্ঘটনা ধীরে ধীরে মহামারী আকার ধারণ করছে।