মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯ Tuesday 4th October 2022

মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯

Tuesday 4th October 2022

বহুস্বর মতামত

গুম বিষয়ে দুটি প্রশ্নের উত্তর

২০২২-০৮-৩০

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান

আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলা একটি প্রবণতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে নিজস্ব নিশানা রাখছে- তা হলো গুম। স্বাধীনতার আগে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলো ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে, যখন দেশীয় দোসরদের সঙ্গে যোগসাজশে পাকিস্তান মিলিটারি বুদ্ধিজীবীদের গুম এবং হত্যা করে। যশস্বী লেখক, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্র-নির্মাতা জহির রায়হানেরও ১৯৭২ এর জানুয়ারিতে একই পরিণতি হয়।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে নথিভুক্ত প্রথম গুমের ঘটনাটি অধিকারকর্মী কল্পনা চাকমার নিখোঁজ হওয়া, যা ঘটে ১৯৯৬ সালে। গত সাত থেকে আট বছরে বাংলাদেশে গুমের ঘটনা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ঢাকাভিত্তিক অধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ৫২৪ জন মানুষ গুম হয়েছেন।

 

 

আন্তর্জাতিক গুম দিবসে ঢাকার শাহবাগে গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনেরা। ছবি:  জয়ন্তী রায়না

 

 

এই ৫২৪ জনের মধ্যে ১৯০জন ফিরে এসেছেন, অথবা তাঁদেরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং বাকিদের কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি। দৃশ্যত গুমের সর্বশেষ ভুক্তভোগী কাতার ও ভিয়েতনামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। এর আগে একই ঘটনা ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুবাশ্বের হাসান, বই আমদানিকারক তানভীর ইয়াসিন করিম এবং সাংবাদিক উৎপল দাসের ক্ষেত্রে।

 

জার্মান নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার ১৯৪১ সালে নাইট অ্যান্ড ফগ ডিক্রি চালু করার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো গুমকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। এই ডিক্রির উদ্দেশ্য ছিলো অধিকৃত এলাকায় যেসব মানুষকে ‘জার্মান নিরাপত্তা’র জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করা হবে তাদেরকে আটক করা। ডিক্রির অংশ হিসেবে কর্মকর্তারা ধৃত ব্যক্তিদের সম্বন্ধে কোনো তথ্য দিতেন না, যাতে জার্মানির শত্রুরা ভীত হয়। উপনিবেশিত জনগণকে দমিয়ে রাখতে এ ধরনের জঘন্য পন্থা খাটানোর উদাহরণ ব্রিটেন ও স্পেনের মতো ইউরোপিয়ান সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ঔপনিবেশিক নীতিতেও আছে।

 

গুমের যেসব ঘটনা বাংলাদেশ এখন প্রায় নিয়মিত বিরতিতে প্রত্যক্ষ করছে, তা একটা সময়ে লাতিন আমেরিকায় একটি ঘরোয়া ব্যাপার হয়ে উঠেছিলো। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে- মূলত চিলি, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা এবং কলম্বিয়ায় ১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশকে একনায়ক ও সামরিক শাসকেরা গুমকে বিরোধিতা দমনের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। এই নোংরা রাজনৈতিক হাতিয়ারের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনায় গড়ে ওঠা মাদার অফ প্লাজা দে মায়ো আন্দোলন এই বিষয়টি সম্বন্ধে বিশ্বজনীন সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।  

 

যাই হোক, এটা শুধু লাতিন আমেরিকার জন্য বিশেষায়িত কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়। যুক্তরাষ্ট্রেও এটি ঘটতে দেখা যায় যখন দেশটি কাউন্টার ইনটেলিজেন্স প্রোগ্রাম (COINTELPRO) হাতে নেয়। এর লক্ষ্য ছিলো মূলত ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপক্ষে থাকা, নাগরিক অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া এবং নারীবাদী আন্দোলনে অংশ নেওয়া জনতা ও গোষ্ঠীগুলো। যেমনটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, আগেও এই পন্থা ব্যবহৃত হয়েছে, এবং ইউএন ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিজএপিয়ারেন্সেস এর ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, এখনও এটি শতাধিক দেশে চালু আছে। প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, এই তালিকার শীর্ষে আছে ইরাক, ১৯৮০ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত যার এ ধরনের নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা ১৬,৪১৬। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে শ্রীলঙ্কায়, প্রায় ৬,০০০। এরপরেই আছে পাকিস্তান, যেখানে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ৭২৩, ৪৭০টি ঘটনা নিয়ে নেপাল, ৩৬৮টি ঘটনা নিয়ে ভারত এবং ৪৯টি ঘটনাসহ বাংলাদেশ।

 

এ ধরনের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন চলে আসে- রাষ্ট্রগুলো মানবতা পরিপন্থী এই অপরাধটা করে যায় কেন? এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাস থাকা গুমের এই নোংরা পদ্ধতি, যা এখন একটি বিশ্বজনীন ঘটনা হিসেবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে- একে কি আমাদের সহ্য করতে হবে, বা দেখেও না দেখার ভান করতে হবে?

 

প্রথম প্রশ্নের উত্তরে মেক্সিকান অধ্যাপক হেইনজ দিয়েতেরিক ১৯৮৬ সালে জার্নাল অফ ক্রাইম অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিস এ প্রকাশিত তাঁর এক লেখায় লাতিন আমেরিকার প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। 

 

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গুম আদতে সংবিধান, বিদ্যমান আইনী শাসন, বিচার ব্যবস্থার মতো ‘প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা’ থেকে ‘রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের ক্ষমতাকে একচ্ছত্র’ করার জন্য শাসকগোষ্ঠীর ‘হস্তক্ষেপের নতুন পন্থা সৃষ্টির’ একটি উপায়।

 

তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গুম আদতে সংবিধান, বিদ্যমান আইনী শাসন, বিচার ব্যবস্থার মতো ‘প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা’ থেকে ‘রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের ক্ষমতাকে একচ্ছত্র’ করার জন্য শাসকগোষ্ঠীর ‘হস্তক্ষেপের নতুন পন্থা সৃষ্টির’ একটি উপায়।

 

সহিংস ক্ষমতা চর্চার একচ্ছত্র অধিকার রাষ্ট্রকে ‘পুলিশ বাহিনীর বিচারিক নিয়ন্ত্রণ’ এর মতো ‘রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণকে’ এড়িয়ে যাওয়ার, নাগরিক সমাজের ভূমিকা হ্রাস করার এবং ‘রাষ্ট্রীয় আতঙ্ককে সফলতার সাথে জনমানসের সর্বোচ্চ গভীরে প্রোথিত করার’ সুযোগ দেয়। ক্রমবর্ধমান গুমের ঘটনাকে বিবেচনা করলে, দিয়েতেরিক যেমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তেমনটাই যদি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে, তাহলে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক বা আসুক না কেন, ভবিষ্যত বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত ক্রূর চিত্র পাওয়া যায়। ভুলে গেলে চলবে না, রাজনৈতিক অঙ্গনে গুমের বর্তমান ঘটনাগুলোর সূত্রপাত মূলত ২০০২ সালের অপারেশন ক্লিনহার্ট এবং ২০০৪ সালে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিণাম হিসেবে, যখন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় ছিলো না। ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় থাকবে না, কে জানে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করে আছে?

 

গুমের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হবে- যা সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ উত্তর: মানবতার পরিপন্থী এই অপরাধকে আমাদেরকে মেনে নেওয়া বা ন্যায্যতা দেওয়া উচিৎ নয়, এবং বলা উচিৎ যে, এক দিক থেকে খুন বরং বেশি কাম্য কারণ খুনের ক্ষেত্রে অন্তত লাশটা পাওয়া যায়, যাতে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সত্ত্বার জন্য পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা শোক করতে পারেন। অন্যদিকে, গুমের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য আর বন্ধুরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করেন, মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিদিনই হারানো মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার আশা করেন। খুনের চাইতে গুম আরো যন্ত্রণাদায়ক, কারণ যে মুহূর্তে ঘটনাটা ঘটে, সে মুহূর্ত থেকেই ভুক্তভোগী ‘বেঁচে থাকা বন্ধ করে দেন… অথবা বলা যায় বেঁচে থাকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন’, যেমনটা হান্নাহ আরেন্ডট তাঁর বই অরিজিন অফ টোটালিটারিয়ানিজমে (১৯৬৬) বলেন।

 

মানবতার পরিপন্থী এই অপরাধকে আমাদেরকে মেনে নেওয়া বা ন্যায্যতা দেওয়া উচিৎ নয়, এবং বলা উচিৎ যে, এক দিক থেকে খুন বরং বেশি কাম্য কারণ খুনের ক্ষেত্রে অন্তত লাশটা পাওয়া যায়, যাতে একজন মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সত্ত্বার জন্য পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা শোক করতে পারেন। অন্যদিকে, গুমের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য আর বন্ধুরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করেন, মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিদিনই হারানো মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার আশা করেন। খুনের চাইতে গুম আরো যন্ত্রণাদায়ক, কারণ যে মুহূর্তে ঘটনাটা ঘটে, সে মুহূর্ত থেকেই ভুক্তভোগী ‘বেঁচে থাকা বন্ধ করে দেন… অথবা বলা যায় বেঁচে থাকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন’

 

গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, অথবা যে নামেই একে ডাকা হোক না কেন এবং যেখানেই এটা ঘটুক না কেন, যদি একে ইতোমধ্যেই অকার্যকর বা বীভৎস রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা না-ও দেওয়া হয় তবু এটা নিঃসন্দেহে একটি সংকীর্ণ, পক্ষপাতমূলক রাষ্ট্রের লক্ষণ। এটি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র চালিত হচ্ছে একটি ক্ষুদ্র শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক, যারা ক্ষমতা ও  আধিপত্যকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে একচ্ছত্রভাবে কাজে লাগায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান গুম পরিস্থিতি আদতে ক্ষমতায় থাকা সকল দল ও তাদের মিত্রদের পঙ্কিল একাত্মতা এবং কায়েমী স্বার্থের ফল, যা উল্লেখ্য ব্যক্তি ও দল কর্তৃক দেশটির স্বাধীনতার পর থেকে গত ৪৬ বছর ধরেই চর্চিত হয়ে আসছে।

 

ভাষান্তর: দীপান্বিতা কিংশুক ঋতি

(লেখাটি প্রথমে দ্য ডেইলি নিউ এইজ ও কথকথা ব্লগে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছিলো।)

 

 

আরো পড়ুন

আয়নাঘরের আয়নাবাজি ও নিশ্চুপ গণমাধ্যম: https://www.driknews.com/article/1660892450

কোথায় আছেন তাঁরা: গুম হওয়া মানুষদের নিয়ে সিজিএসের প্রতিবেদন: https://www.driknews.com/article/1661790537

রক্ষীবাহিনীর হাতে গুমের শিকার অরুণা সেনের বিবৃতি: https://www.driknews.com/article/1661793655

দেশে দেশে গুমের বিরুদ্ধে নারীর প্রতিরোধ: https://www.driknews.com/article/1661782061