মঙ্গলবার ১৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৯ Tuesday 29th November 2022

মঙ্গলবার ১৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৯

Tuesday 29th November 2022

বহুস্বর মতামত

কর্তৃত্ববাদ ও মুক্তিযুদ্ধের একক 'মহান' বয়ান নির্মাণ

২০২২-০৭-৩০

সাইমুম পারভেজ

এই লেখাটি "সাম্প্রতিক বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী বয়ান: নির্মাণ ও প্রচারণা প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ" প্রবন্ধের প্রথম পর্ব। বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনীতি সম্পর্কিত বয়ান নির্মাণ ও প্রচারণা একটি জটিল প্রক্রিয়া। এই প্রবন্ধে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী সরকারের টিকে থাকার পেছনে কিভাবে তিনটি বয়ান কাজ করছে সেই জটিল প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রীক একটি মহান বয়ান তৈরি করেছে, যাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, নেতৃত্ব ও ঘটনাবলীর উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মহান বয়ানে স্বাধীনতা সংশ্লিষ্ট অবদানের জন্য বাংলাদেশকে শাসন করার অধিকার তাদের রয়েছে বলে এই দলের নেতারা মনে করেন। একই সূত্র ধরে দলটির সমালোচনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমালোচনার সমর্থক হিসেবে পরিণত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বহুবিধ মানুষের ভিন্ন ভিন্ন অবদানকে ছাপিয়ে একটি দলের একক বয়ান তৈরি করে। 

 

 

গণহত্যার প্রতিবাদে ১৯৭১ যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই মুক্তিযুদ্ধের বয়ানকে ব্যবহার করেই জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন একটি সরকার টিকে থাকছে, ইতিহাসে এর চেয়ে বড় হতাশার ঘটনা আর কী হতে পারে? 

 

 

পরপর দুইটি বিতর্কিত নির্বাচনের পরেও বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশে,বিদেশে সমালোচিত হয়েছে। এই নির্বাচনের দিনে সাধারণ জনগণ যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, বরং নির্বাচনের আগের রাতে অনেক ভোটকেন্দ্রে সরকারি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে ভোট দেওয়া হয়েছে, তা এখন প্রায় সবারই জানা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারীরাও এই নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য, "উত্তর কোরিয়ার মত নির্বাচন", "গণতন্ত্রের মৃত্যুর নির্বাচন" ইত্যাদি নানা নামে ভূষিত করেছে। [১]

 

 

নির্বাচন পরবর্তী সরকারের কর্তৃত্ববাদী কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধী মত দমনের কারণে এই সরকার আন্তর্জাতিক মহলে এখন কর্তৃত্ববাদী সরকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং গণতন্ত্রের বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী গণতন্ত্রহীন অথবা নাজুক গণতন্ত্রের দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ উঠে এসেছে। ২০২১ সালে সুইডেনকেন্দ্রিক গবেষণা সংস্থা ভি-ডেম ইন্সটিটিউট বাংলাদেশকে "নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদী (ইলেকটোরাল অটোক্রেসি)" দেশ হিসেবে সূচিত করে।[২] 

 

 

বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে দুইজন প্রখ্যাত গবেষক, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টিনা ফেয়ার ও ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক আলী রীয়াজ সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সরকারকে যথাক্রমে "এক-নারী শাসিত সরকার" ও "কর্তৃত্ববাদী সরকার" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।[৩] 

 

 

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি অফিস মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে বাংলাদেশের এলিট বাহিনী র‍্যাবের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা (sanction) জারি করে।[৪] 

 

 

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর ২০২২ এ প্রকাশিত এক রিপোর্টে:

 

 

 “ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০২১ সালে এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, যেমন বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম নিরসনে ব্যবস্থা নেবার কোনো সদিচ্ছা তাদের নেই। সরকার সমালোচক, সাংবাদিক এমনকি শিশু-কিশোর যারা সরকারের সমালোচনা করছে অথবা কোভিড-১৯ সংক্রান্ত সরকারি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্ন করছে তাদের উপর দমনপীড়ন চালাচ্ছে।[৫]

 

 

স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা “অধিকার” এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত ২৭৫৭ জন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার।[৬] র‌্যাবের (৭৮১) পাশাপাশি পুলিশও (১৪৯৬) বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অভিযুক্ত। এমনকি সংখ্যার দিক দিয়ে পুলিশ র‌্যাবের চেয়ে এগিয়ে। “অধিকার” এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ শাসনে ৬০৫ জন গুমের শিকার হয়েছেন, এর মধ্যে অনেককে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে আদালতে হাজির করা হয়েছে, অনেককে মৃত পাওয়া গেছে আর অনেকে এখনো নিখোঁজ। এসব গুম ও নিখোঁজের ঘটনা বিশ্লেষণ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কমপক্ষে ৮৬ জনের গুমের কথা নিশ্চিত করেছে।[৭]

 

 

২০০৯-২০২১ এর মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জমিদখল, হত্যা, আহত করা ও অপহরণের ৩৮৭৬টি ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকার এসব ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা শুধু অস্বীকারই করেনি, বরং অতি সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন "অধিকার" এর নিবন্ধন নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়।[৮]

 

 

প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে বিজ্ঞাপন ও কাগজের উপর ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ করে এই সরকার। সমালোচক ও ভিন্নমতের সাংবাদিকদের অনেককে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয় অথবা জেলের ঘানি টানানো হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটভিত্তিক মিডিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রবর্তন করা হয় নতুন আইন। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আইসিটি অ্যাক্ট এর অধীনে ৫৯৩টি মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৮ সালের অক্টোবরে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) প্রবর্তন করা হয়। একটি সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ১৫ জানুয়ারি এর মধ্যে, মাত্র কয়েকমাসেই ডিএসএ’র আওতায় গ্রেফতার করা হয় ৬৩ জনকে।[৯] গ্রেফতারের শিকার বেশিরভাগের "অপরাধ" ছিল, ফেসবুকে এবং ইউটিউবে প্রধানমন্ত্রী শেখহাসিনা, তার পিতা, বর্তমান সরকার বা সরকারি কর্মকর্তা ও ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের সমালোচনা করা। “ডিএসএ” সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র জানুয়ারি ১, ২০২০ থেকে মার্চ ২৫, ২০২১ এ সংঘটিত গ্রেফতারের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে দেখতে পায়, ৯১৩ জনকে ডিএসএ'র আওতায় অভিযুক্ত করা হয় এবং মামলা দায়ের করা হয় ৪২৬ টি।[১০] এই গবেষণা অনুযায়ী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী, এই দুই শ্রেণীর মানুষ সবচেয়ে বেশি “ডিএসএ” দ্বারা হয়রানির শিকার। বিরোধী দল বিএনপি’র দাবি অনুযায়ী, তাদের লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা চলছে।

 

 

এমন নিপীড়ন সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন সরকার গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশ শাসন করে যাচ্ছে। সরকারের নিবর্তনমূলক নীতির বিরোধীতা করে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বেশ কিছু সাময়িক আন্দোলন গড়ে উঠলেও তা সরকারকে কখনো বড় ধরনের বেকায়দায় ফেলতে পারেনি। নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রে জনমতকে যে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা অগ্রাহ্য করেই আওয়ামী সরকার ক্ষমতা ধরে রাখছে। সামনের জাতীয় নির্বাচনেও যে জনমতের প্রতিফলন ঘটবে, বা জনগণ তাদের ভোটাধিকার ফিরে পাবেন, তার বিশেষ কোনো লক্ষণ আমরা দেখতে পাচ্ছিনা। জনমতকে অগ্রাহ্য করে ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে আওয়ামী সরকারের সহায়ক শক্তি কারা, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ( বিশেষ করে পুলিশ, র‌্যাব ও মিলিটারি) এবং আমলাদের এই ক্ষমতা রক্ষায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়ে জনমানস ও বিদ্যায়তনিক আলোচনাও লক্ষ্য করা যায়। এমনকী রাজনৈতিক সরকারের সাথে সাথে সমান্তরাল নিরাপত্তা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রভিত্তিক সরকারের উপস্থিতির কথাও শোনা যায়। এই গবেষণা প্রবন্ধ ক্ষমতা দখল ও টিকিয়ে রাখার এসব নিয়ামককে অস্বীকার করে না, তবে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনবিহীন এই সরকারের ক্ষমতার ভিত্তিকে শক্তিশালী করার পেছনে আরেকটি নিয়ামকের ভূমিকা আছে বলে দাবি করে।

 

 

আমি এই গবেষণা প্রবন্ধে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব যে, সাম্প্রতিক বাংলাদেশে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট, সমন্বিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বয়ান উৎপাদন ও প্রচারণার মাধ্যমে তা বিতরণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। 

 

 

এই নিয়ামকটি হচ্ছে ন্যারেটিভ বা বয়ান। আমি এই গবেষণা প্রবন্ধে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব যে, সাম্প্রতিক বাংলাদেশে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট, সমন্বিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বয়ান উৎপাদন ও প্রচারণার মাধ্যমে তা বিতরণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

 

এই প্রবন্ধের পরবর্তী ধাপগুলোতে আমি সাম্প্রতিক বাংলাদেশে আওয়ামী বয়ান নির্মাণ ও বয়ান প্রচারণার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করবো। আওয়ামী বয়ানের মূল তিনটি বিষয়, মুক্তিযুদ্ধ, উন্নয়ন ও সেকুলারিজম আলোচনা করব। প্রথম পর্বে মুক্তিযুদ্ধের মহান ও একক বয়ান, দ্বিতীয় পর্বে সেকুলারিজম ও উন্নয়নের বয়ান কীভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে তার বর্ণনা থাকবে। তৃতীয় ও শেষ পর্বে আলোচনা করবো কিভাবে এই নির্মিত বয়ান প্রচারণা ও রটনা করা হচ্ছে এবং কি প্রক্রিয়ায় তা টার্গেট অডিয়েন্স বা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই পর্বে বয়ান নির্মাণ ও প্রচারণাকে ঠেকাতে বিদ্যমান কোনো ব্যবস্থা রয়েছে কি-না তা বিশ্লেষণ করে এই প্রবন্ধের প্রধান বিষয়গুলোও সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হবে।

 

 

বয়ান নির্মাণ

রাজনীতিতে ন্যারেটিভ বা বয়ানের গুরুত্ব নতুন কোনো বিষয় নয়। প্লেটোর সেই উক্তি  “Those who tell the stories rule society” অর্থাৎ "যারা গল্প বলে তারাই সমাজকে শাসন করে" স্পষ্টতই গল্প বা বয়ান শাসনপ্রক্রিয়ার সাথে কীভাবে জড়িত তা বুঝিয়ে দেয়। তাই ন্যারেটিভ বা বয়ান হচ্ছে এমন একটি গল্প যা ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও সামাজিক রীতি-নীতিকে জায়েজ করার চেষ্টা করে। বয়ান নির্মাণ তাই রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য একটি জরুরি বিষয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতাকে সমন্নুত রাখতে প্রয়োজন একই ধরনের ব্যাখ্যা। যেহেতু বয়ান অনেকাংশে ইতিহাস নির্ভর, তাই ইতিহাসের ঘটনাসমূহ নিজেদের সুবিধামত ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে। জঁ ফ্রাসোঁয়া লিওটার্ড মেটা ন্যারেটিভ বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ কে বর্ণনা করেন এমন একটি তত্ত্ব হিসেবে যা ইতিহাসের ঘটনাবলী, অভিজ্ঞতা, এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটমান বিষয়কে সর্বজনীন নিয়মের মাধ্যমে একটি সর্বাত্মক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করে।[১১] তাই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ বা মহান বয়ান ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে, বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ভিন্ন ঘটনাকে সর্বজনীন নিয়মের মাধ্যমে একই সূত্রে ফেলে এক ধরনের বয়ান তৈরি করে।

 

 

গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ এর সমস্যা হচ্ছে এটি কেবল ইতিহাসের একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে, একই ধারার ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসে এবং কেবল এক ব্যক্তি অথবা একটি দলের অবদানকে একক বানিয়ে দেয়। লিওটার্ড থেকে শুরু করে হালের নাইজেরিয়ান লেখিকা চিমামান্ডা আডিচে "সিঙ্গেল স্টোরি" বা একক গল্প সমাজে কী বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে তা ব্যাখা করেছেন।[১২]

 

 

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত মহান বয়ান

 বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত মহান বয়ান তৈরির প্রক্রিয়া আমরা দেখতে পাই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবদান অনস্বীকার্য পাক হানাদার বাহিনীর হামলার পর বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষই সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারে। গ্রাম থেকে, শহর থেকে, বিভিন্ন বয়সের নানা শ্রেণীর মানুষের সংমিশ্রণেই তৈরি হয় এই বাহিনী। তবে যুদ্ধে শেষে মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা আস্তে আস্তে সাধারণ জনগণের হাত থেকে হাতছাড়া হয়ে যায়।

 

 

আজকের সাম্প্রতিক বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে বয়ান তৈরি হয়েছে তা এক ব্যক্তি ও একটি দলের অধিকৃত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সঠিক গবেষণা নির্ভর না করে, মহান বয়ান নির্ভর করা হচ্ছে। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধ কোনো ইতিহাসের ঘটনা না হয়ে ধর্মের মত অলঙ্ঘনীয় হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের একক বয়ানকে প্রশ্নবিহীন, অলঙ্ঘনীয় করে তোলার সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা ও তার পরিবারের প্রতিও প্রশ্নবিহীন আনুগত্য আশা করা হচ্ছে।

 

 

আজকের সাম্প্রতিক বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে বয়ান তৈরি হয়েছে তা এক ব্যক্তি ও একটি দলের অধিকৃত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সঠিক গবেষণা নির্ভর না করে, মহান বয়ান নির্ভর করা হচ্ছে। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধ কোনো ইতিহাসের ঘটনা না হয়ে ধর্মের মত অলঙ্ঘনীয় হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের একক বয়ানকে প্রশ্নবিহীন, অলঙ্ঘনীয় করে তোলার সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের মহান নেতা ও তার পরিবারের প্রতিও প্রশ্নবিহীন আনুগত্য আশা করা হচ্ছে।

 

 

প্রশ্নের উর্ধ্বে উঠে অলঙ্ঘনীয় হবার যে প্রবণতা, সেটি সংক্রমিত হয়ে ক্ষমতাসীন মধ্যম ও নিম্নসারির রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও খেয়াল করা যায়। যে কারণে শুধু ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন আঁকার জন্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করার জন্য, অথবা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সরকারের সমালোচনা করার "অপরাধে" গ্রেফতার, নির্যাতন থেকে শুরু করে প্রাণও হারাতে হচ্ছে।

 

 

মানুষের নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং পরবর্তীতে পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে ১৯৭১ যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, সেই মুক্তিযুদ্ধের বয়ানকে ব্যবহার করেই জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন একটি সরকার টিকে থাকছে, ইতিহাসে এর চেয়ে বড় হতাশার ঘটনা আর কী হতে পারে!

 

 

মহান বয়ান তৈরির এই প্রকল্পে ইতিহাসকে আবার নির্মাণ করা হচ্ছে; এখানে কী ঘটেছিল সেটা নয়, বরং কী ঘটলে বয়ানের সাথে যায় সেটাই বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়। সত্য কী তার চেয়ে কোন সত্যটি বয়ানের জন্য "আরামদায়ক", "স্বস্তিকর" তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় মুসলিম লীগের কর্মী হিসেবে শেখ মুজিবের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরবর্তীতে স্বপ্নভঙ্গ, এসব আলোচনা ব্রাত্য। এই অস্বস্তির জন্যই ১৯৪৭ এর ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ থেকে হঠাৎ করেই ১৯৭১ এ আলোচনা চলে আসে। অন্যদিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ মুক্তিযোদ্ধা থাকা এই বয়ানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই জিয়াউর রহমানের মতো মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অন্যতম সেনাপতিকে হয়ে যেতে হয় "পাকিস্তানের এজেন্ট"। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের, গ্রাম্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর, এমনকি বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকেও এড়িয়ে যাওয়া হয়। কারণ 'প্রকৃত' মুক্তিযোদ্ধা কারা, বা কাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বা উচিত না, এটা এই মহান বয়ান নির্ধারণ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আসলে কি ঘটেছিল, কারা প্রকৃতই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তা অনেক সময় কম গুরুত্ব পায়। এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় কারা একক বয়ানে নির্দেশিত ইতিহাসকে মেনে নেন, সমর্থন করেন, এবং সেই অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীকে বিশ্লেষণ করেন। 

 

 

মুক্তিযুদ্ধের মহান বয়ানের অংশ হিসেবে যে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কে তার সীমারেখা তৈরি করা হয় তাই নয়, এর সাথে বিভিন্ন প্রজন্মে রাজাকার কারা সেটাও ঠিক করা হয়। এই বয়ানে দল হিসেবে যেহেতু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের 'অভিভাবক', তাই এই দলের ও দলের নেতাদের কার্যক্রমের বিরোধিতাকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা হিসেবে সরলীকরণ করা হয় । তাই ক্ষমতাসীন দলের ও দলের নেতৃবৃন্দের বিরোধিতা করলে "রাজাকার, জামায়াত-শিবির, রাজাকার-শাবক" ইত্যাদি তকমা মেলে খুব সহজেই।

 

 

২০১৩ সালে দেশে দুইটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠে, একটি শাহবাগ আন্দোলন ও আরেকটি হেফাজত আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের নব্য বয়ান তৈরি ও সেই বয়ান অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক লাভ তুলে আনতে সহযোগিতা করে। এটি একটি চমকপ্রদ বিষয় যে যদিও শাহবাগ আন্দোলনের শুরু হয়েছিল সরকার বিরোধী আন্দোলন হিসেবে, এটি শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয় আওয়ামী লীগের স্বার্থরক্ষার আন্দোলন হিসেবে। এই আন্দোলনের শুরুই হয় আওয়ামী সরকারের সাথে জামায়াতে ইসলামী দলের কোনো আঁতাত হচ্ছে এই সন্দেহে। যখন মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করা ও গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার অপরাধে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে কারাদণ্ড দেওয়া হয় তখন এই সন্দেহের সূত্রপাত হয়।

 

 

কীভাবে একটি সরকার বিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের মদদপুষ্ট আন্দোলনে পরিণত হলো তা বুঝতে হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান বয়ান ও শত্রু নির্মাণের কাঠামোটি বুঝতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের বয়ান অনুযায়ী আওয়ামী লীগই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র অভিভাবক বা দেখভাল করার কর্তৃত্বের অধিকারী, তাই শেষ পর্যন্ত আন্দোলন তাদের পকেটস্থ হয়। দীর্ঘসময় ধরে যে সাংস্কৃতিক শক্তি ও লোকবল দিয়ে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে নিজেদের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, তার ফলে এমনকি তাদের বিরোধীদেরও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আওয়ামী লীগের মালিকানা মেনে নেবার প্রবণতা দেখা যায়।

 

 

কীভাবে একটি সরকার বিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের মদদপুষ্ট আন্দোলনে পরিণত হলো তা বুঝতে হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান বয়ান ও শত্রু নির্মাণের কাঠামোটি বুঝতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের বয়ান অনুযায়ী আওয়ামী লীগই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র অভিভাবক বা দেখভাল করার কর্তৃত্বের অধিকারী, তাই শেষ পর্যন্ত আন্দোলন তাদের পকেটস্থ হয়। দীর্ঘসময় ধরে যে সাংস্কৃতিক শক্তি ও লোকবল দিয়ে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে নিজেদের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, তার ফলে এমনকি তাদের বিরোধীদেরও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে আওয়ামী লীগের মালিকানা মেনে নেবার প্রবণতা দেখা যায়।

 

 

 শাহবাগ আন্দোলনে সরকার কীভাবে মিত্রে পরিণত হলো, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে যখন আলোচনা ও প্রতিবাদের দরকার ছিল, তখন তীব্র ইসলামিস্ট গোষ্ঠী হেফাজতের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হলো। হেফাজতের অপ্রয়োজনীয় আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক মূল বিষয় থেকে নজর সরিয়ে দিলো। আওয়ামী লীগ সরকার শক্তিপ্রয়োগ করে হেফাজতের ঢাকায় অবস্থানকেও বানচাল করলেও কিছুদিনের মধ্যেই কাছে টেনে নিলো। প্রথম দিকে স্বঘোষিত নাস্তিক ব্লগারদের পাশে থাকলেও পরের দিকে তাদের গ্রেফতার ও মামলা দায়ের করে হেফাজতকে কোলে তুলে নিলো।

 

 

এভাবে শাহবাগ ও হেফাজত দুই আপাত: পরস্পরবিরোধী ব্লক তীব্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের সমাজে ঘৃণার চর্চা বাড়ায়, বাইনারি বিভাজন তৈরি করে, এবং দুইটি মেরু তৈরি করে। সমাজের এই অসহিষ্ণু বিভাজন "সেক্যুলার" হিসেবে পরিচয় দেওয়া  আওয়ামী লীগের ইসলামিস্টদের প্রতিরোধের নামে ক্ষমতায় যেকোন মূল্যে বিকল্পহীন হিসেবে টিকে থাকা জায়েজ করে দেয়। সেকুলারিজম ও ধর্মের এই বয়ান নিয়েই আলোচনা করব এর পরের পর্বে।

 

 

সাইমুম পারভেজ

লেখক পরিচিতি: বেলজিয়ামের ফ্রাই ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলস-এর রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের পোস্ট-ডক্টরাল গবেষক। 

ইমেইল এড্রেস: [email protected]

 

 

 

তথ্যসূত্র :

 

 


 

[১] Slater, J. & Majumder, A. Why Bangladesh’s landslide election result is bad for its democracy. The Washington Post. December 31, 2018. Available at https://www.washingtonpost.com/world/2018/12/31/why-bangladeshs-landslide-election-result-is-bad-its-democracy/?utm_term=.e3b005102aa3; Choudhury, T. The Bell Tolls on Bangladesh’s Democracy The promise of economic stability at the cost of democracy continues. The Diplomat. December 31, 2018. Available at https://thediplomat.com/2019/01/the-bell-tolls-on-bangladeshs-democracy/ ; Rabbee, S. A deeper look at the Bangladesh election. Aljazeera. 2 Jan 2019. Available at

 

https://www.aljazeera.com/indepth/opinion/deeper-bangladesh-election-190101225409342.html; Ahmed, I. In Bangladesh, Sheikh Hasina’s landslide victory confirms that democracy is dead. Scroll.in. Jan 02, 2019. Available at https://scroll.in/article/907841/sheikh-hasinas-landslide-victory-confirms-that-democracy-is-dead-in-bangladesh; The Economist. Bangladesh’s prime minister wins a fourth term, in ruthless fashion. Dec 31, 2018. Available at https://www.economist.com/asia/2018/12/31/bangladeshs-prime-minister-wins-a-fourth-term-in-ruthless-fashion?fsrc=FacebookInstant 

 

[২] V-Dem. Autocratization Turns Viral. Democracy Report 2021. Available at https://www.vdem.net/static/website/files/dr/dr_2021.pdf   

 

[৩] Riaz, A & Parvez, S. (2021). Anatomy of a rigged election in a hybrid regime: the lessons from Bangladesh. Democratization, https://doi.org/10.1080/13510347.2020.1867110; Fair, C. (2019). Bangladesh in 2018: Careening toward One-Woman Rule. Asian Survey 59 (1): pp.124–132. 

 

[৪] US Department of the Treasury. Treasury Sanctions Perpetrators of Serious Human Rights Abuse on International Human Rights Day. December 10, 2021. Available at https://home.treasury.gov/news/press-releases/jy0526?fbclid=IwAR2f271gIns5ixoWb6T9nBEaI4xy4uquuaXPLtoCt6Em7XhtbGgXXhhDiKE  

 

[৫] Human Rights Watch. Bangladesh Events of 2021. World Report 2022. Available at https://www.hrw.org/world-report/2022/country-chapters/bangladesh   

 

[৬] Odhikar. Statistics. Available at http://odhikar.org/#

 

[৭] Human Rights Watch. “Where No Sun Can Enter” A Decade of Enforced Disappearances in Bangladesh. August 16, 2021. Available at https://www.hrw.org/report/2021/08/16/where-no-sun-can-enter/decade-enforced-disappearances-bangladesh

 

[৮] Faisal Mahmud. Bangladesh scrapping rights group’s licence a ‘chilling message’. Aljazeera.

 

 Jun 8, 2022. Available at https://www.aljazeera.com/news/2022/6/8/bangladesh-scrapping-rights-groups-licence-a-chilling-message

 

[৯] Muktadir. R. 63 People Held Since October. New Age. January 18, 2019. Available at https://www.

newagebd.net/article/61819/63-people-held-since-october     

 

[১০] Riaz, A. Digital Security Act, 2018. How Is It Being Enforced, April 2021, Centre for Governance Studies (CGS), https://cgs-bd.com/article/2374/Policy-Paper-1----English---Digital-Security-Act-2018%2C-How-Is-It-Being-Enforced   

 

[১১] Lyotard, J.F. (1979) Introduction: The Postmodern Condition: A Report on Knowledge. Manchester University Press, Manchester.

 

[১২] Adichie, C.N.  The Danger of a single story. TED Talk. Available at https://www.ted.com/talks/chimamanda_ngozi_adichie_the_danger_of_a_single_story?language=en