সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ইসরায়েল প্রসঙ্গ: বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র কি বদলে যাচ্ছে

২০২১-০৫-৩০

সামিয়া রহমান প্রিমা
দৃকনিউজ রিপোর্টার

ইসরায়েল প্রসঙ্গ: বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র কি বদলে যাচ্ছে

  • সংবিধানে নিপীড়িত জাতির পক্ষে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে
  • সরকারের কৌশলী পদক্ষেপে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র
  • বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, সামরিক-বাণিজ্যিক স্বার্থ ও বিদেশি প্রভাবেই এমন সিদ্ধান্ত
  • রাজনীতিকদের মতে, ‘সরকারের পদক্ষেপে গণমানুষের সমর্থন নেই'

বাংলাদেশ সরকারের ইসরায়েল নীতি কি বদলে যাচ্ছে? বাংলাদেশি নাগরিকরা কি এখন থেকে বিনা বাধায় ইসরায়েল যেতে পারবেন? পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি উঠে যাওয়ার পর সবার মনেই এমন প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু সরকারের বক্তব্যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। পরররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন দৃকনিউজকে সরাসরি বলেছেন, ইসরায়েল ভ্রমণে গেলে বাংলাদেশিদের এখনো শাস্তি পেতে হবে, সরকারের নীতিতেও কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার মুখে যাই বলুক, কার্যত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট বাংলাদেশ শপথ নিয়েছিল বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে থাকার। নতুন রাষ্ট্রের সংবিধানেও প্রতিফলিত হয় সেই অবস্থান। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের প্রাক্কালে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলছেন, সরকার কি নিপীড়িতের চেয়ে নিপীড়ক রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেই বেশি আগ্রহী!

 

বাংলাদেশের মহান সংবিধানের ২৫তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে "জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা- এই সকল নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র (ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করিবেন; (খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন; এবং (গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন৷

 

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আছে কি নেই?

গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে ইস্যুকৃত কিছু ই-পাসপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকার নাগরিকদের ইসরায়েল ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বক্তব্য পাসপোর্ট থেকে মুছে দিয়েছে। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলার মধ্যেই সরকারের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর প্রেক্ষিতে দাবি করে যে, এ বিষয়ে অন্তত ছয় মাস আগে সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতেই এই পরিবর্তন। বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়ার জেরে এক পর্যায়ে বিবৃতির মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং ‘ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা’ বহাল থাকছে। এমনকি সেখানে ভ্রমণে শাস্তি হতে পারে।

 

সরকারের সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য পরস্পর বিপরীতমুখী বলে মনে হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য তেমনটা মনে করছেন না। দৃকনিউজকে তিনি বলেন, ‘ই-পাসপোর্টের স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের জন্য অল কান্ট্রিজ এক্সসেপ্ট ইসরায়েল ডিলিট করেছি। এই ডিলিট ডাজ নট মিন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশ শুরু থেকেই ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সোচ্চার। ইসরায়েলি বাহিনীর সহিংসতার নিন্দাও জানিয়েছে বাংলাদেশ।’ পাসপোর্টে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর আবার ভ্রমণের জন্য কিসের শাস্তি, এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানান, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি, তাই কেউ ভ্রমণ করলে শাস্তি পেতে হবে।’ তবে এক্ষেত্রে কোনো আইন নেই। কোনো আইনে এই শাস্তি দেওয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আগেও শাস্তি দিয়েছি। এর আগে সাংবাদিক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর সাত বছরের জেল হয়েছে।’ উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে এই সাংবাদিক ইসরায়েল যাওয়ার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা এবং ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

 

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা শাস্তির বিষয়টিকে ‘কৌশলী পদক্ষেপ’ হিসেবেই দেখছেন। শাস্তির শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে তারা বলছেন, এতদিন যে গোপনীয়তা ছিল পাসপোর্ট থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় আগামীতে আর তা থাকবে না। যদি কেউ পাসপোর্ট নিয়ে অন্য কোনো দেশের ইসরায়েলের দূতাবাসে গিয়ে ভিসা পেয়ে যায়, তাহলে তাকে আটকানোর সুযোগ নেই। তাদের মতে, ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে সরকার তার পূর্বেকার পরিষ্কার অবস্থান থেকে সরে আসছে। বাংলাদেশ যে এক্ষেত্রে কৌশলী পথে অগ্রসর হচ্ছে, বিশ্লেষকরা তা স্বীকার করেন। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী কিছু দেশ যখন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছে তখন বাংলাদেশও সেই সুযোগ নিতে পারে বলে মত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘এটা অনেকটা ট্র্যাক টু ডিপ্লোম্যাসি (অনানুষ্ঠানিক)। স্বীকৃতিও দিচ্ছি না, অস্তিত্ব অস্বীকার করছি না।’

 

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত তৌহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে দৃকনিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার সময় নেবে, কারণ দেখবে সব আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের বিষয়ে কী করে। চাপ না থাকলেও পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর তা নির্ভর করে। এখন পর্যন্ত ওই পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।’ সরকারের এসব পদক্ষেপে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলেরই নির্দেশ মেলে বলে দাবি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। এ প্রসঙ্গে তিনি দৃকনিউজকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ তো আসলে একটা নৈতিক শক্তি। সারা পৃথিবীর যেসব মানুষ নিজেদের জাতিসত্ত্বার মুক্তির জন্য লড়াই সংগ্রাম করছে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সফলতা তাদের উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণে যখন আমাদের সংবিধান হয়, তখন নিজেরাই আমরা সে বিষয়টি সংবিধানে সন্নিবেশিত করি। এটা তো একটা নৈতিক অবস্থান, রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের নৈতিক অবস্থান। তবে এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে তার সেই নৈতিক অবস্থানে আর থাকবে না। পৃথিবীজুড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মানুষ যে সমর্থনটা আশা করত সেখানে একটা বড় শূন্যতা তৈরি হলো।’

 

এতে বাংলাদেশের নানা ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে শঙ্কা এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকের। তার মতে, ‘রাষ্ট্রের শক্তিকে আমরা শুধু অস্ত্র দিয়ে বুঝি না, ভাবমূর্তি দিয়েও বুঝি। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি একটি রাষ্ট্রের জন্য শক্তি হতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর লড়াই কিংবা জাতিসংঘে এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে থাকে বাংলাদেশ, সেই জায়গাটা এখন প্রশ্নবিদ্ধ হলো। রাষ্ট্র হিসেবে আমরা আমাদের নৈতিকতা হারিয়েছি।’

 

কেন বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

নিপীড়িত রাষ্ট্রের পক্ষে থাকার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ রাষ্ট্র কেন ভুলে যেতে চাইছে? কেন ইসরায়েলের মতো বিশ্বব্যাপী ‘নিন্দিত’ একটি রাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশকে অবস্থান নিতে হচ্ছে, এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে দৃকনিউজ। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের এক সাবেক মহাপরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এমন সিদ্ধান্তে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়।’ তার মতে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকার নীতিতেই ছিল আরব দেশগুলো। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক গড়ে তোলার মূল কলকাঠি নেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েও সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ফায়দা লুটতেই ইসরায়েল ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে অবস্থানের পরিবর্তন আনছে মধ্যপ্রাচ্য। পশ্চিমা ও আরব দেশগুলোর নজরে আসতে বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটছে।

 



সর্বাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত ইসরায়েলী বাহিনীর মুখোমুখি পাথর সম্বল করে দাঁড়ানো ফিলিস্তিনী তরুণ। ছবি উইকিপিডিয়া

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ইসরায়েল গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই জানিয়েছিল ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দেশের সঙ্গে তারা দ্রুতই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পথে অগ্রসর হচ্ছে, তবে এ দেশটি পাকিস্তান নয়।’ সে সময় সংশ্লিষ্টরা এই দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বা ইন্দোনেশিয়া থাকতে পারে বলে অনুমান করেছিলেন। সরকারের বর্তমান পদক্ষেপ এবং ‘ছয় মাস আগেই এ সিদ্ধান্ত’ নেওয়া হয়েছে মর্মে স্বীকারোক্তি থেকে অনুমান করা যায় যে, ইসরায়েল তখন কোন দেশটিকে ইঙ্গিত করেছিল। এ থেকেই বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, ইসরায়েল তথা নিপীড়ক রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নীতি বদলের পথেই এগোচ্ছে সরকার।
 

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরায়েল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ মদদ পায় ইহুদিবাদী দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো শুরু থেকে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিগত ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইনের মতো কিছু দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। মূলত আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে মোকাবিলার লক্ষ্যেই তাদের এমন রণসজ্জা। বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইরান এখন চীন ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ। ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা বলয়ের চেয়ে চীন-রাশিয়ার দিকেই বাংলাদেশ বেশি ঝুঁকে রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এ অবস্থায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের জন্য জটিল সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

 

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দৃকনিউজকে বলেন, ‘যে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কই নাই, সেখানে উই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টক অ্যাবাউট ইট। আপনারা উঠে পড়ে লাগছেন কেন যে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে?’

 

বাণিজ্যে লাভই কি উদ্দেশ্য?

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জন ও ব্যবসায়ীদের চাপেই সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে যেতে পারে। তবে আরেকটি অংশের শঙ্কা, টিকা কূটনীতি ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাবেই বাংলাদেশ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কেউ সরাসরি বিস্তারিত আলাপে যেতে রাজি হননি। জানা যায়, কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা স্বত্ত্বেও বাংলাদেশ-ইসরায়েলে এর মধ্যে নিরব বাণিজ্য চলছে অনেক দিন ধরেই। ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সল্যুশন (ডব্লিউআইটিএস) সূত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ইসরায়েল থেকে প্রায় ৩৭ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আর এর বিপরীতে প্রায় ৩৩ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে ২০১০ থেকে ২০১৮ সময়ের মধ্যে।

 

আমদানি-রফতানির তথ্য জানান দেয় যে, বাংলাদেশ ক্রমেই ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, ‘পাসপোর্ট থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় বাণিজ্যের পথ আরও সুগম হয়েছে।’ তানজীমউদ্দিন খান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা আসলে এখন যাই বলি না কেন, যে ব্যাখ্যাই দেই না কেন আইনগতভাবে কেউ ইসরায়েলে যে যাবে না কিংবা সেটাকে আটকানোর আর কোনো উপায় নেই। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসা করার পথটা খুলে গেল।’

 

তবে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ইসরায়েল ছোট দেশ ও সেখানে লোকসংখ্যা কম থাকায় সরাসরি বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’ গত ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইসরায়েল থেকে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়ের অভিযোগ ওঠে। সেনাবাহিনী বিবৃতি দিয়ে তা অস্বীকার করলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, এটা ঘটেছে এবং এর ধারাবাহিকতায়ই ইসরায়েলে যাতায়াতের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিনের মতে, ‘আল জাজিরার প্রতিবেদনে সামনে আসে, আমরা ইসরায়েল থেকে নিরাপত্তা সরঞ্জাম কিনছি। বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলের একটি সুনাম আছে, তারা ভিড় নিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ ক্রাউড ম্যানেজমেন্টে নন-ইথাইল (প্রাণঘাতী নয়, এমন) যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। এসব অস্ত্র বাংলাদেশে আসার এখন আইনগত কোনো বাধা আর থাকল না। সরকার কেন জনমত আমলে নিচ্ছে না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের পদক্ষেপ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা আমাদের দেশে বর্তমানে বিপরীতমুখী। সরকার তার নিজস্ব স্বার্থটাকে গুরুত্ব দেয়, যেহেতু ভোটের রাজনীতি নেই, সেহেতু সরকার মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেয় না। ভোট থাকলে সরকার এসব স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর দিকে গুরুত্ব দেয়।’

 

এদিকে সামরিক-বাণিজ্যিক সুবিধা প্রাপ্তির উদ্দেশ্যেই হোক কিংবা চাপের মুখে পড়ে, সরকার যে পথে হাঁটছে, দেশের অধিকাংশ নাগরিক তা সমর্থন করেন না। ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এ দেশের মানুষ কখনোই স্বীকার করেনি। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে ইসরায়েলের বাধা ও দ্বিমতই এর কারণ। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশই ফিলিস্তিনীদের ওপর ইসরায়েলের নিপীড়ন ও দখলদারিত্বে ক্ষুব্ধ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া ছাড়াও দেশের প্রগতিশীল মহলেও ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ আন্দোলন বেশ শক্তিশালী।

 

গত ১৯ মে ২০২১ দুপুরে রাজধানীর জাতীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি সহিংসতার প্রতিবাদে এক নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বিশিষ্ট নাগরিক, রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অংশগ্রহণের আধিক্য দেখা যায়। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি ওই সভায় উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন। প্রশ্ন করা হলে দৃকনিউজকে তিনি বলেন, ‘জায়নবাদ এক উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক মতাদর্শ। তারা নাকি ঈশ্বরের পছন্দনীয় গোষ্ঠী। এরকম একটি ধর্মীয় বয়ান নিজেরা তৈরি করে তার ওপর দাঁড়িয়ে ফিলিস্তিনিদের যেখানে শত বছর ধরে বসবাস, সেখানে তাদের সামরিক শক্তির বলে তাদের উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে গত ৭০ বছর যাবৎ গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। আজকের সভ্যতার বড় ক্ষত হচ্ছে প্যালেস্টাইন। পৃথিবীর নিরাময় চাইলে প্যালেস্টাইন সংকটের নিরাময় ঘটতে হবে।’

 

জোনায়েদ সাকি আরো বলেন, ‘ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার মতাদর্শের দিক থেকে জায়নবাদীদের ঘনিষ্ঠ, তারা একই মনোভাবাপন্ন। বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি পাসপোর্ট থেকে যে ইসরায়েল প্রসঙ্গ মুছে ফেলল, এছাড়াও অন্য নানা উপায়ে ইসরায়েলের সঙ্গে তারা সম্পর্কে জড়াচ্ছে। এর পেছনে ভারতের প্রভাব থাকতে পারে বলে আমার আশঙ্কা।’ এই রাজনীতিক জানান, ‘দেশের সাধারণ মানুষ সরকারের এমন পদক্ষেপকে মোটেই ইতিবাচকভাবে দেখছে না, গণমানুষের কোনো সমর্থন এখানে নেই। এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেই মানুষ এর জবাব দেবে।’