রবিবার ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ Sunday 22nd May 2022

রবিবার ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Sunday 22nd May 2022

বহুস্বর

জনস্বাস্থ্যমুখী সাংবাদিকতা ও অতিমারিকালের অভিজ্ঞতা

২০২২-০৪-২৮

ড. তৌফিক জোয়ার্দার
জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ

জনস্বাস্থ্যমুখী সাংবাদিকতা ও অতিমারিকালের অভিজ্ঞতা

 

বৈশ্বিক বা জাতীয় নানা দুর্যোগ দুর্বিপাকে গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হয়ে থাকেন। কোভিড-১৯ অতিমারিতে এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যেখানে স্বয়ং গণমাধ্যমকর্মীদেরকেই জেনে বা না জেনে বিশেষজ্ঞের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। কারণ, অতিমারি ব্যবস্থাপনার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো রিস্ক কমিউনিকেশন অ্যান্ড কমিউনিটি এনগেজমেন্ট বা ঝুঁকির তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং জনসমাজকে যুক্ত করা, যেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চেয়ে কম নয়। এছাড়াও গণমাধ্যমকর্মীদের অন্যান্য দৈনন্দিন সাংবাদিকতার কাজ তো রয়েছেই যা সরাসরি অতিমারির সাথে জড়িত। যেমন, সরকারি নির্দেশনা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, অতিমারি সংক্রান্ত নিত্যনতুন তথ্য ব্রেক করা, সমাজের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশের দাবি দাওয়া তুলে ধরা, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা সরঞ্জামাদির স্বল্পতা তুলে ধরা, দুর্নীতির খবর উদঘাটন করা ইত্যাদি।

 

বাংলাদেশের গণমাধ্যম এসব দায়িত্বের কতটুকু পালন করেছে বা করেনি, কোথায় ভুল করেছে--এসবের খতিয়ান তুলে ধরা এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং একজন জনস্বাস্থ্যবিদ হিসেবে একটি অতিমারিকালে গণমাধ্যমের কাছে কী প্রত্যাশা করেছি, তা-ই এখানে তুলে ধরবো। এর অনেক কিছুই নানা গণমাধ্যম পরিতুষ্ট করেছে। আর যারা তা করতে পারেননি, এ লেখা থেকে সেসব মিলিয়ে দেখে নিজেরাই নিজেদের ঘাটতির বিচারক হতে পারেন।

 

এ আলোচনায় একটি বিষয় বিবেচনায় না আনলে গণমাধ্যমের প্রতি অবিচার করা হবে। অতিমারির প্রাথমিক দিকে তাদেরকে উভয়সঙ্কটে পড়তে হয়েছে। একদিকে আতঙ্ক ছড়ানোর ভয়, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে না পারার আশঙ্কা। এর মাঝে আবার কোন বিশেষ গোষ্ঠীকে স্টিগমাটাইজ বা কলঙ্কিত না করার ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হয়েছে। গনমাধ্যমের ভূমিকাকে এসব সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে।

 

কার সাথে যোগাযোগ করবে গণমাধ্যম?

 

রোগ যেমন একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মহামারি বা অতিমারি একটি সামাজিক অভিজ্ঞতা। রোগের প্রতিকারের জন্য ব্যক্তির শরীরে ইন্টারভেনশন বা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে। একইভাবে, মহামারির প্রতিকারের জন্য সমাজ তথা ম্যাক্রো-স্তরে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়ে। ’চিকিৎসা’ এবং ’জনস্বাস্থ্য’ এ অভিধা দু’টোর মাঝে পার্থক্য বোঝাটা জরুরি। চিকিৎসকরা পড়াশোনা করেন ব্যক্তির শারীরবৃ্ত্ত নিয়ে, পক্ষান্তরে জনস্বাস্থ্যের প্রতিপাদ্য হলো স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ণায়কসমূহ (Social Determinants of Health)। জনস্বাস্থ্যের সাব-ডিসিপ্লিন বা শিক্ষাগত উপশৃঙ্খলাগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো মহামারিবিদ্যা (Epidemiology), জৈব পরিসংখ্যান (Biostatistics), স্বাস্থ্যনীতি ও ব্যবস্থা (Health Policy and Systems), স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা (Health Service Management), চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান (Medical Anthropology), চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞান (Medical Sociology), স্বাস্থ্য অর্থনীতি (Health Economics), স্বাস্থ্য যোগাযোগবিদ্যা (Health Communication) ইত্যাদি। কাজেই, অতিমারির প্রতিবিধান জানতে গণমাধ্যম যদি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হতে চান, সে বিশেষজ্ঞগণ হবেন জনস্বাস্থ্যবিদ, চিকিৎসক নন। যদিও অতিমারি নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের অধীনে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করবেন চিকিৎসক, নার্স, গবেষণাগার-কর্মী প্রমূখ পেশাজীবিরা, কিন্তু নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে তাঁদের যে ভূমিকা, তা-ও মূলতঃ জনস্বাস্থ্যেরই আওতাধীন। অর্থাৎ, এ কাজগুলো একজন চিকিৎসক বা নার্স করলেও, এক্ষেত্রে তার কাজটি আর চিকিৎসক- কিম্বা নার্স-সুলভ নয়, জনস্বাস্থ্যবিদ-সুলভ।

 

জানিনা এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট বোঝাপড়ার অভাবের কারণে কিনা, অতিমারির শুরুর দিকে অনেক গণমাধ্যমকর্মীকে দেখেছি প্রাজ্ঞ অথচ বিষয়-অসংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সামনে মাইক্রোফোন বাড়িয়ে ধরে মহামারিবিদ্যা বিষয়ক প্রশ্ন করতে, যা ঐ চিকিৎসকের অধীত বিষয়বস্তুর মধ্যেই পড়েনা। বিদ্যালয় খুলে দেওয়া উচিত কিনা সে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়েছে প্রথীতযশা মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে, যিনি রাষ্ট্রের একজন শীর্ষপদাধিকারীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, কিন্তু চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞান তাঁর দক্ষতার ক্ষেত্র বলে কোনদিন শুনিনি। স্মরণকালের ভয়াবহতম জনস্বাস্থ্য দুর্যোগের প্রতিবিধানকল্পে গঠিত ১৭ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির মধ্যে মাত্র তিন জন পেশাজীবি জনস্বাস্থ্যবিদ--এ নিয়েও কোন গণমাধ্যমে প্রশ্ন তুলতে দেখিনি। বরং বিষয়টি নানা আলোচনা অনুষ্ঠানে তুলে ধরলে, অনেক সাংবাদিক সবিস্ময়ে প্রতিপ্রশ্ন করেছেন, “কিন্তু কমিটিতে তো অনেক বড় বড় ডাক্তার রয়েছেন!” তা রয়েছেন বৈকি, কিন্তু কোভিড-১৯-এর মতো শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগের অতিমারির প্রতিবিধানে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ, মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এহেন ‘বড় বড় ডাক্তার’-দের ভূমিকা কী হতে পারে তা সেসব সাংবাদিকের কাছে প্রশ্নযোগ্য বিবেচিত হয়নি।

 

বুঝতে হবে বিজ্ঞান

 

জনস্বাস্থ্য অপরিহার্যরূপে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাশৃঙ্খলা (ডিসিপ্লিন), কাজেই এ বিষয় নিয়ে যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রচার করতে গেলে বিজ্ঞান বিষয়ক মৌলিক ধারণাগুলো আয়ত্তে থাকা জরুরি। এসব ধারণার মাঝে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এভিডেন্স ইন্টারপ্রিটেশন তথা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ব্যাখ্যা করতে পারা এবং হায়ারআর্কি অফ এভিডেন্স তথা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অনুক্রম মূল্যায়ণ করতে পারা। সেই সাথে বুঝতে হবে কোনটা বৈজ্ঞানিক তথ্য, কোনটা মতামত আর কোনটা ধারণা বা পার্সেপশন। বৈজ্ঞানিক গবেষণা নানারকম হয়ে থাকে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে জনগোষ্ঠীর ওপর সাধারণীকরণের (জেনারেলাইজেশন) সক্ষমতা তাদের বিভিন্নরকম। বুঝতে হবে, যতবড় বিশেষজ্ঞই একজন হয়ে থাকুন না কেন, তাঁর ব্যক্তিগত মতামত কখনোই একটি সুসম্পন্ন র‌্যান্ডোমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল কিম্বা সিস্টেমেটিক রিভিউর ফলাফলের চেয়ে মূল্যবান হতে পারেনা। এসব মৌলিক বোঝাপড়ার বাইরেও জৈবপরিসংখ্যান এবং মহামারিবিদ্যা (এপিডেমিওলজি) বিষয়ে সাধারণজ্ঞান থাকতে হবে অতিমারির গতিপ্রকৃতি অনুধাবন ও তা নিয়ে প্রতিবেদন করতে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীর।

 

হয়তো এ বিষয়গুলোতে আবহমান দুর্বলতার কারণে কোভিড-১৯ অতিমারিকালে আমরা গণমাধ্যমে অনেক উদ্ভট বিষয়ের অসঙ্গত অপপ্রচার দেখেছি যেগুলো আজ ‘ইনফোডেমিক’ নামে বিশ্বব্যাপী চিহ্নিত হচ্ছে। অনেক আপাত-উত্তেজনাকর (সেনসেশনাল) গবেষণার ফলাফল নিউজ আইটেম হিসেবে পরিবেশিত হয়েছে সম-পর্যালোচিত (পিয়ার-রিভিউ) হয়ে আসার আগেই। এমন সংবাদে মানুষ কেবল বিভ্রান্তই হয়নি, হয়েছে ক্ষতিগ্রস্তও। দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবাদ পরিবেশনের কারণে ত্রস্তক্রয়উন্মাদনার (প্যানিক বাইং) ঘটনাও ঘটে বিভিন্ন দেশে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানুষকে দেখা গিয়েছে বিপুল পরিমাণ টয়লেট পেপার মজুদ করতে, বিভিন্ন ‍ওষুধ--যেমন হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন, আইভারমেকটিন ইত্যাদি--মজুদ করার ঘটনা তো বাংলাদেশেও ঘটেছে। ফলশ্রুতিতে এসব ওষুধ ব্যবহারকারীরা নিরাপত্তার মিথ্যা অনুভূতি নিয়ে রোগাক্রান্ত হয়েছে, অন্যদিকে এসব ওষুধ যাদের সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজন ছিল, তারা মুখোমুখি হয়েছে সঙ্কটের। কোভিড-১৯ এর টিকাদান কর্মসূচী শুরু হবার পরদিন থেকেই শীর্ষস্থানীয় কিছু পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ কলাম জুড়ে খবর বেরুনো শুরু হলো কে কোথায় টিকা গ্রহণের পরপরই কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন। এমন খবর থেকে বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মী টিকার কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ। আর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবাদ পরিবেশনে কত সাধারণ মানুষ টিকার ব্যাপারে মিথ্যে সন্দিহান হয়ে যে রোগাক্রান্ত এমনকি মৃত্যুবরণ করেছেন তারই বা হিসেব কে রেখেছে? যাচাই বাছাই না করেই নানা অবৈজ্ঞানিক নিরাময় পদ্ধতি প্রচারিত হয়েছে অহরহ, যার স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা নিরূপন করাও দুঃসাধ্য।

 

জানতে হবে জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা

 

এ তো গেল জনস্বাস্থ্যের বৈজ্ঞানিক ভিত্তির বিষয়ে সাধারণ জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা, কিন্তু বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা (হেলথ সিস্টেমস), বিশ্বস্বাস্থ্য (গ্লোবাল হেলথ), স্বাস্থ্যনীতি ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া ইত্যাদি সম্পর্কেও সম্যক ধারণা থাকা জরুরি। স্বাস্থ্যব্যবস্থার যে ছয়টি গাঠনিক উপাদান (বিল্ডিং ব্লক) আছে, যথা, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্য মানবসম্পদ, স্বাস্থ্য অর্থায়ন, স্বাস্থ্য দ্রব্যাদি এবং স্বাস্থ্য সুশাসন প্রক্রিয়া, সেগুলো নিয়ে জানাটা অপরিহার্য। এমন কাঠামোবদ্ধ আলোচনার বিপরীত আমাদের দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংক্রান্ত বেশিরভাগ সংবাদ আবর্তিত হয় স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, হাসপাতাল ভাঙচুর, চিকিৎসায় অবহেলা বা এ জাতীয় সহজ ও গতানুগতিক বিষয়াদি নিয়ে। বলছিনা এসব বিষয় গুরুত্বহীন বা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু স্বাস্থ্য বিষয়ক সাংবাদিকতা এসব গতানুগতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য, তত্ত্ব ও উপাত্ত নির্ভর এবং বিশ্লেষণাত্বক রিপোর্টিংয়ের পথ ধরবে, সে আশা রাখি।

 

কাঠামোভিত্তিক আলোচনাটা কেন জরুরি? করোনাকালে আমরা উপলব্ধি করেছি, দুর্নীতি উদঘাটনে গণমাধ্যমের যতটা উৎসাহ ছিল, দুর্নীতির উৎস বা কারণ সন্ধানে ছিল ততটাই উদাসীনতা। করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারপার্সন সাবরিনা আরিফের জালিয়াতি, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. শাহেদের চিকিৎসা প্রতারণা, জেএমআই কর্তৃক নিম্নমানের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ, স্থানীয় সরকার নেতৃবৃন্দ কর্তৃক ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মালেক ড্রাইভার কর্তৃক শতকোটি টাকা লোপাট--এসব মুখরোচক দুর্নীতির বয়ানে ভরপুর ছিল গণমাধ্যম। এসবের পেছনে যে রাজনীতি রয়েছে, ক্ষমতার কুক্ষিগতকরণ রয়েছে, আমলানির্ভরতা রয়েছে, গণতন্ত্রহীনতা রয়েছে, তার বিশ্লেষণ চোখে পড়েনি খুব একটা। গণমাধ্যম চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়নি, দলীয় বিবেচনায় কোভিড-১৯ পরীক্ষা বা চিকিৎসালয় অনুমোদন করবারই প্রয়োজন হতোনা যদি একটি স্বচ্ছ নির্দেশিকা অথবা নির্দেশনা থাকতো। নির্দেশিকার চেকলিস্ট পূরণ করে যে কেউ এসব সেবা প্রদানের অধিকারী হতে পারতেন, তার রাজনৈতিক বা অন্য কোন প্রভাব বলয় বিস্তারের বা ব্যবহারের প্রয়োজনই পড়তোনা। চেকলিস্ট পূরণ তো করণিকের কাজ, সচিবের নয়; অথচ বিদ্যার অভাবে মান্যবর সচিবেরা যে করণিকের কাজ নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছেন, সেই প্রশ্নটি কি আমরা গণমাধ্যমে উত্থাপিত হতে দেখেছি? কেউ কি প্রশ্ন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মতো এত বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি কারিগরি (টেকনিক্যাল) মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন মানুষ বলতে গেলে একজনও নেই কেন?

 

মানতে হবে নৈতিকতার মানদন্ড

 

সবশেষে যে বিষয়টির প্রসঙ্গ টানতে চাই তা হলো গণমাধ্যমকর্মীদের এথিকস বা ন্যায়শাস্ত্র বিষয়ে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ন্যায়শাস্ত্রের আলোচনায় তিনটি মূলনীতি (Principle) বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো Autonomy তথা ব্যক্তির ইচ্ছা অনিচ্ছার ব্যাপারে শ্রদ্ধা, Beneficence তথা যা করা হচ্ছে তা মানুষের উপকারের জন্যই করা এবং Justice তথা সুফলের সুষম বন্টন। বিবেচনায় রাখা দরকার কোন নিউজ আইটেম কোন ব্যক্তিমানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে কিনা, রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি কেবল ক্ষমতাশালীদের কুক্ষিগত হচ্ছে কিনা, স্বাস্থ্য intervention-গুলোর ঝুঁকির পাল্লাটি কেবল সুবিধাবঞ্চিতদের দিকেই ঝুঁকে আছে কিনা। সংক্রামক রোগের মহামারিতে ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন সময় স্টিগমা বা কলঙ্কের শীকার হতে হয়েছে। যেমন বাইবেলের কাহিনীতে কুষ্ঠ রোগীদের প্রতি নির্মমতার উদাহরণ পেয়েছি, তাদেরকে সমাজ থেকে নির্বাসন দেওয়া হতো, অপরিচ্ছন্ন পোষাক ছাড়া অন্য কিছু পরিধানের অধিকারও তাদের ছিল না।

 

কলেরার কলঙ্ক বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর প্রযুক্ত হয়েছে। ইউরোপে কলেরার সবচেয়ে বিধ্বংসী মহামারির আক্রমণ ঘটে ১৮৩১ সালে যার উৎপত্তিস্থল ছিল তৎকালীন বাংলা তথা আজকের বাংলাদেশ। তারা এ মহামারির নাম দেয় ’এশিয়ান ভমিটিং ডিজিজ’ বা ’এশিয় বমন রোগ’ এবং এমন নামকরণের মাধ্যমে গোটা এশিয়া মহাদেশের ওপর লেপে দেয় কলঙ্কের তিলক। খ্রিস্টাব্দ ৫৪১, ১৩৪৭, ১৮৯৪, এবং সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে প্লেগ রোগের মহামারি দেখা দেয় যার কলঙ্কের ভাগিদার হয় কখনো ইহুদি সম্প্রদায়, কখনোবা এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অধিবাসীগণ। ১৫২৪ সালের একটি নথিতে সিফিলিসের প্রায় ২০০ নামের সন্ধান পাওয়া যায় যেসবের মাধ্যমে এক দেশের মানুষ অন্যদেশের মানুষকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করে। যেমন জার্মানরা এর নাম দেয় ফরাসি রোগ, ফরাসিরা ইতালিয় রোগ, ওলন্দাজরা জার্মান রোগ, জাপানিরা পর্তুগিজ রোগ, পারসিকরা তুর্কি রোগ, পোলিশরা রাশিয়ান রোগ, বাঙ্গালিরা ফিরিঙ্গি ব্যাধি ইত্যাদি। ১৯৮০’র দশকে মার্কিনিরা এইডসের নামকরণ করে হাইতি দেশের রোগ; অথচ কী পরিহাস যে ফরাসিরা এর নাম দেয় মার্কিন রোগ! এসব ঘটনার সাথে কোভিড-১৯ অতিমারির শুরুর দিকের অনেক মিল পাওয়া যায়। পশ্চিমা বিশ্বে এ রোগের নাম দেওয়া হয় ’চীনা প্লেগ’। এমনকি বাংলাদেশেও অনেকে এ রোগকে চীনাদের খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মীয় নানা প্রসঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট করে।   

 

ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন দেখেছি গণমাধ্যমকর্মীরা সদ্যবিদেশফেরত মানুষদেরকে অনুসরণ করেছে, সর্বসমক্ষে লজ্জিত, অপদস্থ ও কলঙ্কিত করেছে, অথচ সরকারিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা কেন করা হলোনা, তা নিয়ে প্রশ্ন করেনি। বিদেশফেরতাদের এমন নির্বিচার দোষারোপের ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট কলঙ্কের ডালপালা বিস্তৃত হয় নানা আঙ্গিকে: মানুষ রোগ গোপন রাখা শুরু করে, হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়, বৃদ্ধ বাবা মা’কে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসে, মৃত আত্মীয়স্বজনকে কবর দিতে অস্বীকৃতি জানায়, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়। এথিকস বিষয়ে সাংবাদিকদের উদাসীনতার আরেকটি নজির হলো স্বাস্থ্যবিধি না মানার দায় জনগণের ওপর চাপানো। অথচ সরকারের যোগাযোগ কর্মকৌশল না থাকার ব্যাপারে সাংবাদিকরা উচ্চবাচ্য করেছেন, সরাকরের কাছে জবাবদিহিতা তলব করেছেন এমনটি খুব কমই চোখে পড়েছে। সরকার কর্তৃক ন্যায্যতার মূলনীতি লঙ্ঘনের নানা ঘটনা অনেকসময়ই গণমাধ্যমের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। উদাহরণ হতে পারে প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের শহরে পরিবহণের ব্যবস্থা না রেখেই লকডাউন আরোপ (২০০০ সালের প্রথম লকডাউনের সময়), দরিদ্র পোশাকশ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অগ্রাহ্য করে মালিকদের লাভলিপ্সার সামনে অসহায় আত্মসমর্পন, ক্ষমতাশীলদের দ্বারা হাসপাতালের আসন কুক্ষিগতকরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া, চরম আসন সঙ্কটের মাঝেও ‘ভিআইপি’ দের জন্য গোপনে আসন সংরক্ষণের অভিযোগ ইত্যাদি।

 

উপসংসহার

 

প্রসঙ্গক্রমে নেতিবাচক নানা আলোচনা উঠে আসলেও গোটা অতিমারিকালে গণমাধ্যমের অসাধারণ অবদানের কথা অস্বীকার করলে সত্যের অপলাপ হবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যম তার সামর্থের সবটুকু দিয়ে জনগণের কাছে স্বাস্থ্যবিধির বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, মানুষকে সচেতন করে তুলেছে, ভেন্টিলেটর ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র সহ নানা চিকিৎসা উপকরণের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির অভাবনীয় চিত্র উদ্ঘাটন করেছে। গণমাধ্যমের কাছে প্রত্যাশিত যে তারা জনস্বাস্থ্য সমস্যার সমাধানে জনস্বাস্থ্যবিদদের কাজের সহায়ক হবেন, তাদের প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরে সমাধানের দাবি জানাবেন। ২০০০ সালের মার্চ মাসে দু’জন বাংলাদেশি মহামারিবিদের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত গাণিতিক অভিক্ষেপ (Mathematical Projection) ফাঁস হলে তাঁরা রাষ্ট্রযন্ত্রের ও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কোপানলে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। সুইডেন থেকে প্রকাশিত নেত্র নিউজ মহামারিবিদদের হয়রানির খবর ছাপিয়ে ইতিবাচক সাংবাদিক সুলভ বলিষ্ঠ ভূমিকার সাক্ষর রেখেছে।

 

সবচেয়ে বড় কথা, অতিমারির প্রায় দুই বছর পর আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে অনেক গুণগত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। তারা এখন জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্যনীতি ইত্যাদির ওপর ফোকাস করছেন, প্রতিকার তথা চিকিৎসার ওপর প্রতিরোধ তথা জনস্বাস্থ্যের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। তবে এটুকুই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের জন্য তাদের আরও বিজ্ঞানমনস্ক ও ন্যায়নীষ্ঠ হতে হবে। বুঝতে হবে, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষার পরে যে মৌলিক অধিকারটি রয়েছে, তার নাম ‘চিকিৎসা’ নয়, ‘স্বাস্থ্য’। সেই স্বাস্থ্যের অধিকার অনুশীলনে গণমাধ্যমের রয়েছে অনবদ্য ভূমিকা।

 

ড. তৌফিক জোয়ার্দার

জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ,

ভাইস-চেয়ারপার্সন, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

১২ জানুয়ারি ২০২২