মঙ্গলবার ১৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৯ Tuesday 29th November 2022

মঙ্গলবার ১৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৯

Tuesday 29th November 2022

প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

কাতার বিশ্বকাপ: প্রাচুর্যের ঝলসানিতে চাপা পড়া মৃত্যুর মিছিল

২০২২-১০-১৮

দীপান্বিতা কিংশুক ঋতি

“সবাই কথা বলতে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমরা মারা যাচ্ছি।”- গণমাধ্যমে কাতার বিশ্বকাপ প্রকল্পে কর্মরত একজন অভিবাসী শ্রমিক

 

 

নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে কাতারে যাওয়ার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অপেক্ষায় দেশটির শ্রমিকেরা। ছবি: টাইম।

 

 

চড়া দামের খেলা

নভেম্বরের ২০ তারিখে শুরু হতে যাচ্ছে কাতার বিশ্বকাপ। সব মিলিয়ে এ বিশ্বকাপের খরচ প্রায় ২২ হাজার কোটি ডলার। এর আগে সর্বোচ্চ ব্যয়ের অংকটি ছিল প্রায় দেড় হাজার বিলিয়ন ডলার, ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার আয় আশা করছে কাতার, সেই সঙ্গে এ সময় পর্যটন খাত থেকে আরো প্রায় ৪০০ কোটি ডলার আসবে বলে মনে করছে দেশটি। ৩২টি দেশ এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলবে, যার মধ্যে চ্যাম্পিয়ন দলটি পুরস্কার হিসেবে পাবে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রথম রানার আপ দলের জন্য নির্ধারিত হয়েছে ৩ কোটি, দ্বিতীয় রানার আপের জন্য ২ কোটি ৭ লাখ এবং চতুর্থ স্থান অধিকারীর জন্য আড়াই কোটি মার্কিন ডলার। বিশ্বকাপে প্রাচুর্যের এমন ঝলসানি থাকলেও এই শ্রমিকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের ন্যায্য মজুরিটুকুও পাননি। জাঁকজমকের নিচে চাপা পড়ে গেছে শ্রমিকদের মৃত্যু ও অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি। ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে শুধু বাংলাদেশি শ্রমিকই মারা গেছেন ১০১৮ জন।

 

বিশ্বকাপের এই আয়োজন করতে গিয়ে শুধু  বাংলাদেশেরই ১০১৮ জন শ্রমিক মারা গেছেন এই এক দশকে। এছাড়া, কাতারের পাকিস্তান দূতাবাসের মতে, ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটিতে ৮২৪ জন পাকিস্তানি শ্রমিক মারা গেছেন। 

 

২০২২ সালে অনুষ্ঠিতব্য ২২তম ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজন করার সুযোগ কাতার পেয়েছে আজ থেকে ১২ বছর আগে ২০১০ সালে। এই ১২ বছরে আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে দেশটি। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আটটি স্টেডিয়াম নির্মাণ, বিমানবন্দর পরিবর্ধন এবং একশোটির মতো নতুন হোটেল তৈরি করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে নতুন মেট্রো ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে ভেন্যু সংলগ্ন সড়ক ও রেলপথেরও উন্নয়ন করা হয়েছে। চূড়ান্ত ম্যাচের স্টেডিয়াম ঘিরে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি নতুন শহর। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৩ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অর্থ। এরপরও তাক লাগানো এই আয়োজনকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আখ্যা দিয়েছে ‘উত্তেজনাপূর্ণ, প্রাচুর্যময় এবং মারাত্মক’ হিসেবে। প্রথম দুটি বিশেষণের কারণ সহজেই অনুমেয় হলেও শেষের বিশেষণটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

 

অর্থের যোগান দিলে আপনা থেকেই স্থাপত্য তৈরি হয়ে যায় না। প্রতিটি স্থাপত্যের পেছনে থাকেন শত শত শ্রমিক, যাদের একেকজনের ওপর প্রায়শই নির্ভরশীল থাকে একেকটি পরিবার। পরিবারের মানুষগুলোর কেবল মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে প্রায়শই তাদের নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়।

 

২৩ লক্ষ কোটি টাকার সিংহভাগ অর্থ ইতিমধ্যেই কাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে। তবে, অর্থের যোগান দিলে আপনা থেকেই স্থাপত্য তৈরি হয়ে যায় না। প্রতিটি স্থাপত্যের পেছনে থাকেন শত শত শ্রমিক, যাদের একেকজনের ওপর প্রায়শই নির্ভরশীল থাকে একেকটি পরিবার। পরিবারের মানুষগুলোর কেবল মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে প্রায়শই তাদের নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। পরিস্থিতি আরো শোচনীয় হয়ে ওঠে যখন এই শ্রমিকেরা অভিবাসী হিসেবে অন্য দেশে থেকে কাজ করেন। কাতার বিশ্বকাপে ঠিক সেটিই ঘটেছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তানিএসব দেশ থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটেছে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে কাজ করতে গিয়ে। বহু শ্রমিক মারা গেছেন। অনেকেই বাস করছেন মানবেতর ও চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর অবস্থায়।

 

 

কাতার অভিবাসী নেপালি শ্রমিক বালকিষান মণ্ডল খাতওয়ের কফিন ঘিরে আত্মীয় ও গ্রামবাসীরা।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কাতার থেকে অভিবাসী শ্রমিকের

লাশ হয়ে ফেরত আসার অনেকগুলো ঘটনায় এটি একটি। ছবি: এপি

 

 

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপের আয়োজন করার সুযোগ পাওয়ার পর থেকে সে সময় পর্যন্ত কাতারে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের ৬,৫০০ এরও বেশি অভিবাসী শ্রমিক মারা গেছেন। যার অর্থ, ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতি সপ্তাহে গড়ে দক্ষিণ এশিয়ার এই পাঁচটি দেশের ১২ জন শ্রমিক মারা গেছেন কাতারে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-২০২০ সালের মধ্যে কাতারে এ দেশগুলোর ৫,৯২৭ জন শ্রমিক মারা গেছেন। বিশ্বকাপের এই আয়োজন করতে গিয়ে শুধু  বাংলাদেশেরই ১০১৮ জন শ্রমিক মারা গেছেন এই এক দশকে। এছাড়া, কাতারের পাকিস্তান দূতাবাসের মতে, ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটিতে ৮২৪ জন পাকিস্তানি শ্রমিক মারা গেছেন।  কাতারে মৃত মোট শ্রমিকের সংখ্যা নিঃসন্দেহে এরচেয়ে অনেক বেশি। কারণ, কাতারে শ্রমিক পাঠায় এমন অনেক দেশের পরিসংখ্যানই এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এসব দেশের মধ্যে আছে ফিলিপাইন এবং কেনিয়া। তাছাড়া, ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে এখনের সময়ের তথ্য অজানা। কাজেই, শ্রমিকের মৃত্যুর যে পরিসংখ্যান এবং চিত্র দাঁড়াচ্ছে তাকে স্বাভাবিক মনে করা অসম্ভব। এসব মৃত্যুর পেছনে রয়েছে অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, মানবেতর আবাসন ব্যবস্থা, নিপীড়নমূলক চুক্তি, এবং সর্বোপরি শ্রমিকদের অধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন।

 

 

কাতারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নিহত শ্রমিক মোহাম্মদ শহীদ মিয়া। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

 

 

বাংলাদেশের শ্রমিক মোহাম্মদ শহীদ মিয়ার কথাই ধরা যাক। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারে ভারী বর্ষণ হয়। অনেকের জন্য বিষয়টি নিছক অসুবিধার কারণ হলেও, শহীদের জন্য এই বৃষ্টি কাল হয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টির পানি তার ঘরে ঢুকে পড়ার পর খোলা বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে আসে তা। শহীদ মিয়া ঘরে পা দেয়ামাত্রই বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মারা যান। দ্য গার্ডিয়ানকে শহীদ মিয়ার বাবা এসব কথা জানান। ২০১৭ সালে কাতারে চাকরি নিশ্চিত করার জন্য শহীদ দালালকে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি টাকা দিয়েছিলেন। আমাদের দেশের একটি গ্রামীণ পরিবারের জন্য অংকটা বিশাল। এই ঋণের বোঝা এখন শহীদের দরিদ্র বাবা-মায়ের ওপরে। তাছাড়া, শহীদের কর্মস্থল বা কাতার সরকারের কাছ থেকে তারা কোনো ক্ষতিপূরণও পাননি।

 

 

এত মৃত্যুর কারণ কী?

 

 

কাতারে মৃত ভারতীয় শ্রমিক মধু বল্লাপাল্লির ছবি হাতে স্ত্রী লতা ও ছেলে রাজেশ। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

 

 

ভারতের মধু বল্লাপাল্লির মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে কোনো সন্তোষজনক জবাব পায়নি তার পরিবার। ২০১৩ সালে কাতারে কাজ করতে স্ত্রী লতা এবং ১৩ বছরের ছেলে রাজেশকে দেশে রেখে কাতারে কাজ করতে এসেছিলেন মধু। এরপর তার পরিবারের সঙ্গে তার আর কখনো দেখা হয়নি। ২০১৯ সালের এক মধ্যরাতে মধুর রুমমেট ঘরে ফিরে দেখতে পান মধুর মৃতদেহ মেঝেতে পড়ে আছে। অন্য অনেক শ্রমিকের মতো মধুর আকস্মিক ও ব্যাখ্যাতীত মৃত্যুরও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক কারণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মারা গেছেন মধু। নির্দিষ্ট একটি কোম্পানিতে ছয় বছর কাজ করেছেন তিনি, কিন্তু তার স্ত্রী ও ছেলে বকেয়া বেতন ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে সব মিলিয়ে পেয়েছেন মাত্র ১,৪৫,৫৭৮ টাকা। ছেলে রাজেশ জানে না কীভাবে তার বাবা মারা গেলেন। দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, “আমার বাবার কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল না। কোনো অসুখই ছিল না তার।”

 

মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বাভাবিক কারণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মারা গেছেন মধু। নির্দিষ্ট একটি কোম্পানিতে ছয় বছর কাজ করেছেন তিনি, কিন্তু তার স্ত্রী ও ছেলে বকেয়া বেতন ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে সব মিলিয়ে পেয়েছেন মাত্র ১,৪৫,৫৭৮ টাকা। ছেলে রাজেশ জানে না কীভাবে তার বাবা মারা গেলেন। দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, “আমার বাবার কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল না। কোনো অসুখই ছিল না তার।”

 

মৃত শ্রমিকদের পরিসংখ্যানের পেছনে একেকটি জীবনের কাহিনী কমবেশি এমনই। দরিদ্র সন্তান আশা করেছিলেন, দেশের বাইরে ভালো বেতনে কাজ করতে পারবেন, পরিবারেও সচ্ছলতা আসবে। কিন্তু কাতারে কর্মরত বেশিরভাগ শ্রমিকের জন্যই এই সাধারণ চাওয়া হয়ে উঠেছে আকাশকুসুম কল্পনা। উপসাগরীয় অঞ্চলে শ্রমিকের অধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ফেয়ারস্কয়ার প্রজেক্টের পরিচালক নিক ম্যাকগিহান জানান, মৃত্যুর খতিয়ানে যদিও পেশা বা কাজের স্থান বিবেচিত হয়নি, তবু আন্দাজ করা যায় মৃত শ্রমিকদের অনেকেই বিশ্বকাপ সংক্রান্ত নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার মতে, “মৃত শ্রমিকদের অনেকেই কাতারে এসেছিলেন কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পাওয়ার ফলে।” দ্য গার্ডিয়ান এর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ৩৭ জন শ্রমিকের মৃত্যু সরাসরি বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যুকে বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটি বর্ণনা করেছে “কাজের সঙ্গে সম্পর্কহীন” হিসেবে। এই ব্যাখ্যা প্রশ্নের জন্ম দেয়। কেননা যেসব মৃত্যু কাজ চলাকালীন সময়ে ঘটেছে, সেগুলোকেও এই কাতারে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে আছে স্টেডিয়াম নির্মাণকাজের জায়গায় হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে শ্রমিকের মৃত্যুও।

 

 

কাতারে মৃত স্বামী গঙ্গারাম মণ্ডলের ছবি হাতে চার মেয়ে ও বন্ধুদের সঙ্গে বসে আছেন লাদুবতী। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

 

 

এই মৃত্যুর মিছিল থেকে বোঝা যায়, কাতার এর ২০ লাখ মানুষের শ্রমশক্তিকে রক্ষা করতে ব্যর্থ তো বটেই, সেই সাথে দেশটি অপেক্ষাকৃত তরুণ শ্রমিকদের উচ্চ মৃত্যুহারের কারণ অনুসন্ধানেও ব্যর্থ। কাতারে মৃত্যুর দাপ্তরিক হিসাব রাখা হয় লম্বা লম্বা স্প্রেডশিটে, যেখানে মৃত্যুর কারণও উল্লেখ করা হয়। মৃত্যুর কারণ হিসেবে থাকে উঁচু জায়গা থেকে পড়ে যাওয়ার ফলে আঘাত পাওয়া, গলায় দড়ি দেওয়ার ফলে শ্বাসরোধ হওয়া, মৃতদেহ পচে যাওয়ার ফলে কারণ নির্ণয় করতে না পারা ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে কারণটি উল্লেখ করা হয় তা হলো “স্বাভাবিক মৃত্যু”। স্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ হিসাবে প্রায়শই দেখানো হয় হৃদযন্ত্র অথবা শ্বসন সংক্রান্ত জটিলতাকে। দ্য গার্ডিয়ান এর  প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয়, বাংলাদেশি ও নেপালি শ্রমিকদের মোট মৃত্যুর ৬৯ শতাংশকে বলা হয়েছে স্বাভাবিক মৃত্যু। শুধু ভারতীয় শ্রমিকদের মোট মৃত্যু ৮০ শতাংশকেই স্বাভাবিক বলা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই কারণ নির্ণয় করা হয় কোনোরকম ময়নাতদন্ত ছাড়াই। কর্তৃপক্ষ সাধারণত এসব মৃত্যুর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে না। বাংলাদেশি, ভারতীয় ও নেপালি শ্রমিকদের মৃত্যুর অন্যান্য কারণের মধ্যে আছে সড়ক দুর্ঘটনা (১২%), কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা (৭%) এবং আত্মহত্যা (৭%)। কোভিডে মৃত্যুর হার বরাবরই খুব কম ছিল কাতারে। কোভিডের ফলে কাতারে সব দেশ মিলিয়ে ২৫০ জনের মতো শ্রমিক মারা গেছেন।

 

যেসব ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব ক্ষেত্রেও একেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য একেক রকম। তাছাড়া, মৃত্যুর কারণের রেকর্ড রাখার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কোনো ফরম্যাট ব্যবহৃত হয়নি। একটি দক্ষিণ এশিয় দূতাবাস জানিয়েছে, মৃত্যুর কারণ সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করা সম্ভব নয় কারণ তা কেবল একটি নোটবুকে হাতে লেখা অবস্থায় আছে।

 

দ্য গার্ডিয়ান এর প্রতিবেদনে কাতারে মৃত্যুর রেকর্ড রাখার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সুষ্ঠুতা এবং খুঁটিনাটি বিষয়ের অভাবের ওপরেও আলোকপাত করা হয়েছে। দোহায় অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাস এবং শ্রমিকদের দেশের সরকারেরা সম্ভবত রাজনৈতিক কারণেই তথ্য জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। যেসব ক্ষেত্রে তথ্য পাওয়া গেছে, সেসব ক্ষেত্রেও একেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য একেক রকম। তাছাড়া, মৃত্যুর কারণের রেকর্ড রাখার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কোনো ফরম্যাট ব্যবহৃত হয়নি। একটি দক্ষিণ এশিয় দূতাবাস জানিয়েছে, মৃত্যুর কারণ সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করা সম্ভব নয় কারণ তা কেবল একটি নোটবুকে হাতে লেখা অবস্থায় আছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উপসাগরীয় অঞ্চল বিশেষজ্ঞ মে রোমানোস বলেন, “এসব মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতার পরিষ্কার ঘাটতি আছে। কাতারের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।”

 

 

সরকার ও কর্তৃপক্ষ কী বলছে

কাতারে বিশ্বকাপের আয়োজক কমিটিকে স্টেডিয়াম প্রকল্পে শ্রমিক মৃত্যু বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, “আমরা এই ট্র্যাজেডিতে গভীরভাবে শোকাহত। এর থেকে শিক্ষা নিতে আমরা প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করেছি। এ বিষয়ে আমরা সবসময় স্বচ্ছতা বজায় রেখেছি এবং আমাদের প্রকল্পে মৃত শ্রমিকের ভুল সংখ্যার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছি।”

 

ফিফার একজন মুখপাত্র জানান যে, ফিফার প্রকল্পগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে ফিফা বদ্ধপরিকর। তার বক্তব্য অনুযায়ী, “কর্মস্থলে কঠোর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকায় ফিফা বিশ্বকাপের নির্মাণ কাজে বিশ্বের অন্যান্য বড় নির্মাণ কাজের তুলনায় কম শ্রমিক মারা গেছেন।” অবশ্য এই দাবির পক্ষে কোনো তথ্য বা প্রমাণ দেয়নি ফিফা।

 

ফিফার একজন মুখপাত্র জানান যে, ফিফার প্রকল্পগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে ফিফা বদ্ধপরিকর। তার বক্তব্য অনুযায়ী, “কর্মস্থলে কঠোর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকায় ফিফা বিশ্বকাপের নির্মাণ কাজে বিশ্বের অন্যান্য বড় নির্মাণ কাজের তুলনায় কম শ্রমিক মারা গেছেন।” অবশ্য এই দাবির পক্ষে কোনো তথ্য বা প্রমাণ দেয়নি ফিফা।

 

 

কাতারের প্রখর রোদ এড়াতে সূর্যোদয়ের অনেক আগেই কাজ শুরু করেন নেপালি শ্রমিকরা। ছবি: পিট প্যাটিনসন

 

 

ধারণা করা হয়, শ্রমিকদের মৃত্যুর একটা বড় কারণ কাতারের প্রখর রোদ। দ্য গার্ডিয়ান এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এ বিষয়ে একমত। আইএলওর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে অন্তত চার মাস ধরে শ্রমিকেরা প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে খোলা জায়গায় কাজ করেছেন। কাতার সরকারের আইনজীবীরা ২০১৪ সালে একটি প্রতিবেদনে অভিবাসী শ্রমিকদের হৃদপিণ্ডের জটিলতায় মৃত্যুর বিষয়টি খতিয়ে দেখার এবং আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের পরামর্শ দেন। কাতার সরকার এর কোনোটিই করেনি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ - এর উপসাগরীয় অঞ্চল গবেষক হিবা জায়াদিন বলেন, “শ্রমিক মৃত্যুর মতো গুরুতর ও জরুরি বিষয়ে কাতার সরকার গড়িমসি করছে এবং উদাসীন থাকছে। আমরা কাতার সরকারকে বলেছি তাদের ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত আইন সংশোধন করতে, যাতে যাবতীয় আকস্মিক ও ব্যাখ্যাতীত মৃত্যুর ফরেনসিক তদন্ত করা হয় এবং সকল মৃত্যু সনদে মৃত্যুর একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত যথার্থ কারণের উল্লেখ থাকতে হবে।

 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ - এর উপসাগরীয় অঞ্চল গবেষক হিবা জায়াদিন বলেন, “শ্রমিক মৃত্যুর মতো গুরুতর ও জরুরি বিষয়ে কাতার সরকার গড়িমসি করছে এবং উদাসীন থাকছে। আমরা কাতার সরকারকে বলেছি তাদের ময়নাতদন্ত সংক্রান্ত আইন সংশোধন করতে, যাতে যাবতীয় আকস্মিক ও ব্যাখ্যাতীত মৃত্যুর ফরেনসিক তদন্ত করা হয় এবং সকল মৃত্যু সনদে মৃত্যুর একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত যথার্থ কারণের উল্লেখ থাকতে হবে।

 

কাতার সরকার অবশ্য মৃত শ্রমিকের সংখ্যার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেনি। তবে তাদের মতে, মৃত শ্রমিকের সংখ্যা মোট অভিবাসী শ্রমিকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মৃত কর্মীদের অনেকেই শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করতেন না। কাতার সরকারের বক্তব্য হলো, দৈহিক শ্রম না করা কর্মীদের অনেকেই স্বাভাবিক কারণে মারা গেছেন। কাজেই, দৈহিক শ্রমের চাপ বা কর্মপরিবেশ শ্রমিকদের মৃত্যুর জন্য দায়ী নয়। সরকার আরো জানায় যে, উল্লেখকৃত দেশগুলো থেকে আসা শ্রমিকদের মাত্র ২০ শতাংশ নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত এবং এই শ্রমিকদের মাত্র ১০ শতাংশ কাজ সংক্রান্ত কারণে মারা গেছেন। কাতার সরকারের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন,  “জনসংখ্যার আকার ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিচার করলে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে মৃত্যুর হার স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যেই আছে। যাই হোক, প্রতিটি মৃত্যুই মর্মান্তিক এবং আমাদের দেশে প্রতিটি মৃত্যু ঠেকানোর কোনো সুযোগই হাতছাড়া করা হয় না।” তিনি আরো বলেন যে, কাতারে বসবাসরত সকল নাগরিক ও অভিবাসীর প্রথম শ্রেণির স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ আছে। তার মতে, শ্রম ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিবর্তনের ফলে বিগত এক দশকে “অতিথি শ্রমিকদের” মৃত্যুর হার কমেছে।

 

 

রক্তচোষা কাফালা পদ্ধতি

কাতারে শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে কুখ্যাত কর্মব্যবস্থার নাম কাফালা, যা কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পাওয়ার পরেও বছর দশেক চালু ছিল। ২০২০ সালে এ ব্যবস্থা কাগজে-কলমে বাতিল হয়ে যায়। কাফালা ব্যবস্থা শ্রমিকদেরকে তাদের চাকুরিদাতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত করে দিত, যার ফলে তারা চাকরিদাতার অনুমতি ছাড়া চাকরি পাল্টাতে পারতেন না বা কাতার ত্যাগ করতে পারতেন না। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বহু বছর ধরে উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে এ ব্যবস্থা বদলানোর চেষ্টা করে আসছিল। এ দেশগুলোতে অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকে বহু শ্রমিক কাজ করেন, যাদের বড় অংশই আসেন ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে।

 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ - এর মতে, অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে ঘটা শোষণের মূলে ছিল এই ‘কাফালা ব্যবস্থা’। এ ব্যবস্থার ফলে শ্রমিকদেরকে কাতারে বৈধ আবাসন ও পরিচয়ের জন্য তাদের চাকুরিদাতার ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে মালিকপক্ষ সহজেই শ্রমিকদের অসহায়তার সুযোগ নিতে পারত। কাফালা ব্যবস্থার ফলে মালিকপক্ষ শ্রমিকের ওপর ক্ষমতার যথেচ্ছ চর্চা করতে পারত, শ্রমিক অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারত খেয়ালখুশিমতো। ক্রমশ শ্রমিকের ওপর বাড়ত ঋণের বোঝা, আর চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে তাড়া করে ফিরত মালিকপক্ষের প্রতিহিংসার ভয়। কাতারে অভিবাসী শ্রমিকরা, বিশেষত নিম্ন আয়ের গৃহকর্মীরা মালিকপক্ষের ওপর শুধু চাকরির জন্যই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই আবাসন ও খাবারের জন্যেও নির্ভর করেন। কাফালা ব্যবস্থা পাসপোর্ট আটকে রাখা, বড় অংকের নিয়োগ ফি ও প্রতারণাপূর্ণ নিয়োগ ব্যবস্থার সুযোগ করে দিত, যার পরিণতি হতো শ্রমিক নিপীড়ন এবং জোরপূর্বক শ্রম।

 

কাফালা ব্যবস্থার ফলে মালিকপক্ষ শ্রমিকের ওপর ক্ষমতার যথেচ্ছ চর্চা করতে পারত, শ্রমিক অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারত খেয়ালখুশিমতো। ক্রমশ শ্রমিকের ওপর বাড়ত ঋণের বোঝা, আর চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে তাড়া করে ফিরত মালিকপক্ষের প্রতিহিংসার ভয়। কাতারে অভিবাসী শ্রমিকরা, বিশেষত নিম্ন আয়ের গৃহকর্মীরা মালিকপক্ষের ওপর শুধু চাকরির জন্যই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই আবাসন ও খাবারের জন্যেও নির্ভর করেন। কাফালা ব্যবস্থা পাসপোর্ট আটকে রাখা, বড় অংকের নিয়োগ ফি ও প্রতারণাপূর্ণ নিয়োগ ব্যবস্থার সুযোগ করে দিত, যার পরিণতি হতো শ্রমিক নিপীড়ন এবং জোরপূর্বক শ্রম।

 

ফিফা ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ভেন্যু হিসেবে কাতারকে নির্বাচন করায় কাতারের ওপর বৈশ্বিক নজরদারি বাড়ে। যার প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে কাতার সরকার অবশেষে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সঙ্গে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি করার অঙ্গিকার করে একটি সমঝোতামূলক চুক্তি সই করে। অবশেষে ২০২০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কাতার সরকার কাফালা ব্যবস্থা বাতিল করে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর মতে, শ্রম আইনের এই সংশোধনী কতটা কার্যকর হবে তা নির্ভর করবে কাতার সরকারের আইন প্রয়োগ ও তদারকির ওপর। এ সংশোধনী অভিবাসী শ্রমিককে চাকরিদাতার অনুমতি ছাড়াই শ্রমিককে চাকরি বদলের অধিকার দেয় এবং জাতীয়তা নির্বিশেষে সকল শ্রমিকের জন্য ন্যূনতম মজুরি বাড়ায়। কাতারই আরবের উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম দেশ, যা মালিকপক্ষের অনুমতি ছাড়াই শ্রমিককে চাকরি পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে। কুয়েতের পর কাতার দ্বিতীয় দেশ হিসেবে অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ধার্য করেছে।

 

অবশ্য, এসব পরিবর্তন সেই শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যারা শ্রম আইনের আওতাভুক্ত নন, যেমন গৃহকর্মীরা। এরপরেও অভিবাসী শ্রমিক শোষণে সহায়ক অনেক আইনই রয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনের সাথে যুক্ত আনুষ্ঠানিক খাতের যে সব শ্রমিকরা শ্রম আইনের আওতাভুক্ত, তারাও এই পরিবর্তনের সুযোগ আদতে পাননি। কেননা আ্‌ইনটি বদলাতে যে দীর্ঘসূত্রিতা অবলম্বন করা হয়, তার আগেই বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকাংশ কাজই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

 

 

কাফালার পর

কাফালা ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর অভিবাসী শ্রমিকেরা কেমন আছেন, সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় ২৩ সেপ্টেম্বর দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত পিট প্যাটিনসনের প্রতিবেদন থেকে। অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে কাতারের রাজধানী দোহায় অভিবাসী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন পিট। শ্রমিকদের চাকরিদাতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি জানলে কাতার সরকার ক্রুদ্ধ ও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতে পারেন বলেই এই সতর্কতা। শ্রমিক ‘ক’ তার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হন তার লেখা নিবন্ধ দেখে ও তার পাসপোর্টের সঙ্গে নিবন্ধ লেখকের নাম মিলিয়ে নিয়ে। এছাড়াও পিট সেই শ্রমিককে নিজের ফোন দিয়ে দেন এটা নিশ্চিত করতে যে, তিনি কোনোকিছু রেকর্ড করছেন না। শ্রমিক ‘ক’ জানান যে, সম্প্রতি তার চাকরিদাতা সন্দেহভাজন কর্মীদের চিহ্নিত করতে “গোয়েন্দা” নিয়োগ করেছেন। তিনি বলেন, “সবাই-ই কথা বলতে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমরা মারা যাচ্ছি।”

 

 

কাতারে একটি শ্রমিক ক্যাম্পের রান্নাঘর। ছবি: ইএসপিএন

 

 

তিনি জানান, তিনি ও তার সহকর্মীরা সপ্তাহে ছয় দিন ১২ ঘণ্টা করে কাজ করেন, কিন্তু বাড়তি সময়ের জন্য প্রতিশ্রুত মজুরি পান না। মাসে তারা পান ৩৬,০০০ টাকার মতো। তিনি বলেন, “আমাদের ব্যবস্থাপকের একটা চমৎকার গাড়ি আছে, কিন্তু আমার বেতন দিয়ে এর চাকাগুলোও কেনা যাবে না। কণা পরিমাণ আয় আমার।” শ্রমিক ‘ক’ আরো জানান, তাদের শ্রমিক ক্যাম্পে একেক ঘরে ছয়জন করে শ্রমিক থাকেন, যা অবৈধ। তার মতে, তাদেরকে এত নিম্নমানের খাবার দেয়া হয় “যা কুকুরেরও খাওয়ার অযোগ্য।” একজন সহকর্মীর কথা বলেন তিনি, যিনি সম্প্রতি কাজের জায়গায় ঢলে পড়েন এবং মারা যান। অসুস্থতার কথা জানানো সত্ত্বেও তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

 

“আমাদের ব্যবস্থাপকের একটা চমৎকার গাড়ি আছে, কিন্তু আমার বেতন দিয়ে এর চাকাগুলোও কেনা যাবে না। কণা পরিমাণ আয় আমার।” শ্রমিক ‘ক’ আরো জানান, তাদের শ্রমিক ক্যাম্পে একেক ঘরে ছয়জন করে শ্রমিক থাকেন, যা অবৈধ। তার মতে, তাদেরকে এত নিম্নমানের খাবার দেয়া হয় “যা কুকুরেরও খাওয়ার অযোগ্য।” একজন সহকর্মীর কথা বলেন তিনি, যিনি সম্প্রতি কাজের জায়গায় ঢলে পড়েন এবং মারা যান। অসুস্থতার কথা জানানো সত্ত্বেও তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

 

আরেকজন শ্রমিক পিটকে একজন নিহত শ্রমিকের ছবি পাঠান। তার সঙ্গে প্রথম দেখার সময়ে পিট তার ফোন নম্বর নিজের ফোনে সেইভ করতে চাইলে তিনি তাকে অপেক্ষা করতে বলেন, কারণ তার চাকরিদাতা বিষয়টি দেখে ফেলতে পারেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি এক টুকরো কাগজে নিজের ফোন নম্বর লিখে গোপনে পিটকে তা দেন। এছাড়া আরেকবার পিটের সঙ্গে একজন শ্রমিককে কথা বলতে দেখে ফেলেন মালিকপক্ষের কেউ। কিছুদিন পর পুলিশ ঐ শ্রমিককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এভাবেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ফুটবল টুর্নামেন্টের নির্মাণকাজে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতে হয় সাংবাদিকদের। তাদেরকে প্রতিটি বাক্য লিখতে হয় সতর্কতার সঙ্গে, যাতে তাদের লেখনীর কারণে কেউ বিপদে না পড়েন।

 

অতিমারীর শুরুর দিকে একজন শ্রমিক পিটকে বলেছিলেন, তিনি কোভিডকে ভয় পান না, ভয় পান বাড়ি ফিরে যাওয়াকে। তার ভাষায়, “আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই এখানে আসার জন্য টাকা ধার করেছে। আমাদের যদি বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়, কে এই ধার শোধ করবে? খালি হাতে ফিরে যাওয়ার ভয় আমাদের তাড়া করে।”

 

এই শ্রমিকরা কোন জিনিসটাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান? বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়াকে। যেসব নিদারুণ দুর্ভোগের মধ্যে তারা থাকেন, তারচেয়েও বড় সত্য হলো, তাদের কাজ দরকার এবং কাজ পেতে যে ঋণ তাদের করতে হয়েছে সেটিও শোধ করা দরকার। অতিমারীর শুরুর দিকে একজন শ্রমিক পিটকে বলেছিলেন, তিনি কোভিডকে ভয় পান না, ভয় পান বাড়ি ফিরে যাওয়াকে। তার ভাষায়, “আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই এখানে আসার জন্য টাকা ধার করেছে। আমাদের যদি বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়, কে এই ধার শোধ করবে? খালি হাতে ফিরে যাওয়ার ভয় আমাদের তাড়া করে।” আরেকজন শ্রমিক বলেন, “যখন ওরা টের পেয়ে যায় কেউ তার অধিকারের জন্য লড়াই করছে, তখন তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে ওদের তেমন কোনো অজুহাত খুঁজতে হয় না।”

 

এই ভয় যে শুধু কাতারের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সেটি পিট টের পান নেপালে সদ্য কাতার থেকে ফেরা কয়েকজন শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে। ফুটবল বিশ্বকাপ সংক্রান্ত কাজ প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ায় তাদেরকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। দুই বছর কাজ করার কথা থাকলেও তারা সাকুল্যে ৬ মাস কাতারে ছিলেন। যার ফলে কাতারে যাওয়ার জন্য করা ঋণ শোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। কাতারফেরত এই নেপালি শ্রমিকরা কথা বলতে রাজি হলেও এই ভেবে ভয় পাচ্ছিলেন যে, তারা কথা বলেছেন জানতে পারলে হয়তো তাদের কাতারে আর কোনো কাজই জুটবে না।

 

 

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অল্প জায়গায় অনেকজন শ্রমিককে বাস করতে হচ্ছে কাতারে। ছবি: বিবিসি

 

 

যতবারই পিট এসব কাতারফেরত শ্রমিককে জিজ্ঞাসা করেছেন তারা আবারও কাতারে যাবেন কিনা, প্রতিবারই তিনি ইতিবাচক উত্তর পেয়েছেন। এর কারণ, তাদের এছাড়া তেমন কোনো উপায় নেই। নেপালে একদিন কাজ করলে যেখানে হয়তো ৩০০ টাকা পাওয়া যাবে, সেখানে কাতারের সাড়ে  ৮০০ টাকা লোভনীয় মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বেশিরভাগ অভিবাসী শ্রমিকের ক্ষেত্রে এই একই চিত্র দেখা যায়। এর আগে উল্লিখিত শ্রমিক ‘ক’ বলেন, “বাড়িতে রেখে আসা তিন ছেলের স্কুলের খরচ আমি এখান থেকে পাঠাই। ওরা আমার সবকিছু। ওদের জন্যই আমি এখানে আছি। এখন যদি আমি বাড়ি ফিরে যাই, আমার বাচ্চারা না খেয়ে থাকবে।” কাজেই, তার মতো অনেক শ্রমিকের জন্যই কাতারে থাকার চেয়েও একমাত্র যে জিনিসটি ভীতিকর তা হলো কাতারে থাকতে না পারা।

 

 

হীরার খনির মজুর হয়ে কানাকড়ি নাই

কাতারে ১২ বছর ধরে কাজ করেছেন একজন শ্রমিক। এ সময়ের মধ্যে কয়েকটি বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামেও কাজ করেছেন তিনি। এই শ্রমিক দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “আমার মতো বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামে কাজ করা শ্রমিকেরা যদি নিজেদের তৈরি স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখতে পারত তাহলে কী চমৎকার হত! কিন্তু আমাদের কথা কে ভাবে? এই দেশে শ্রমিকদের কেউ দাম দেয় না। আমার তো মনে হয় বিশ্বকাপ শুধু বড়লোকদের উৎসব।” অন্য একজন শ্রমিক দ্য গার্ডিয়ানকে জানান, বিশ্বকাপ বিষয়ে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

 

 

চারপাশে কাতারে নানা পেশায় কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকেরা, মাঝখানে আল ওয়াকরাহ স্টেডিয়াম। নিজেদের রক্ত পানি করা শ্রমে নির্মিত এই স্টেডিয়ামে খেলা দেখা ভাবনা এই শ্রমিকদের কাছে আকাশকুসুম কল্পনা।

ছবি: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

 

 

যেখানে খাদ্য বা আবাসনের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতেই কাতারের অভিবাসী শ্রমিকদের হিমশিম খেতে হয়, সেখানে নিজেদের তৈরি স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপ দেখা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। কাতারসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো যদিও বলছে যে তারা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করে দারিদ্র্য নিরসনে ভূমিকা রাখছে, এরপরও বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামগুলোতে রক্তের দাগ আর মৃত্যুর মিছিল উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। যেসব শ্রমিক এখনও বেঁচে আছেন, তাদের ও তাদের পরিবারের শোচনীয় পরিস্থিতির দায়ও পুরোপুরি কাতার সরকার ও মালিকপক্ষের।

 

 

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ডয়চে ভেলে

লেখা: দীপান্বিতা কিংশুক ঋতি