২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই সংবাদমাধ্যমগুলোতে নৈরাজ্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। জুলাই গণভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণমাধ্যমের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হলেও পূর্বের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। আওয়ামী পন্থী নেতৃত্বকে সরিয়ে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা দখলে নিয়েছে ক্ষমতামুখী নতুন নেতৃত্ব। দেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও টেলিভিশনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত ও চাকরিচ্যুত সাবেক সংবাদকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অন্তত ৪০টি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতাতেই সংবাদমাধ্যমের এই রদবদল। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। শুধুমাত্র ঢাকাতেই চাকরি হারানোর সংখ্যা ২’শ এর অধিক। বার্তাকক্ষগুলোতে নেই কোনো স্থিতিশীলতা। প্রতিনিয়ত কর্মস্থলে চাকরি হারানোর ভয়ে দিন পার করছেন সাধারণ সংবাদকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, বার্তাকক্ষে নতুন নেতৃত্ব পাওয়া উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা যোগ্যতা নয়, বরং তাদের অনুগত কর্মীর সন্ধানে আছেন। প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ চাকরি হারাচ্ছেন, আবার নতুন কর্মী নিয়োগ পাচ্ছেন।
৫ আগস্টের পর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন গণঅভ্যুত্থানের শিক্ষার্থী নেতৃত্ব নাহিদ ইসলাম। প্রায় ৭ মাস পর পদত্যাগ করলে, তার স্থলাভিষিক্ত হন আন্দোলনকারি শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি মাহফুজ আলম। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের সম্মুখসারির এই দুইজন নেতা ক্ষমতার আসনে বসেও কোনো পরিবর্তনের সূচনা করতে পারেননি। সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার স্বার্থে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার পতন ও সংবাদমাধ্যমে হামলা-ভাঙচুর-লুটপাট
৫ আগস্ট ২০২৪। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা, শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবর দেশবাসী জানেন। জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থী-জনতার ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো পুলিশ তখন জনরোষের ভয়ে রাস্তা ছেড়েছে। এই সুযোগেই সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা চালাতে সক্রিয় হয়ে উঠে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিভিন্ন অংশ। সেদিন ঢাকায় কমপক্ষে ৫টি বেসরকারি টেলিভিশনে হামলা চালানো হয়। সময় টিভি- তে হামলার ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএনপি’র অঙ্গসংগঠন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতা রবিউল ইসলাম নয়ন। হামলাকারীরা তৎকালীন পরিচালক আহমেদ জোবায়ের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। পরেরদিন ৬ আগস্ট, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর অঙ্গসংগঠন ছাত্রশিবিরের একটি দলও টেলিভিশনটির কার্যালয়ের ভাঙচুর চালায় বলে জানিয়েছেন, সংবাদকর্মীরা।
ফেইসবুকে একটি ভিডিয়োতে লক্ষ্য করা যায় একজন হামলাকারী চেঁচিয়ে বলছেন ‘ইনশাআল্লাহ সময় টিভি আমরা দখলে নিলাম’। এসময় সাংবাদিকরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
একই সময়ে রাজধানীর বারিধারায় একাত্তর টেলিভিশন এর কার্যালয়ের সামনে একাধিক গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কার্যালয়ের ভেতরেও ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। কারওয়ান বাজারেও বেসরকারি চ্যানেল এটিএন নিউজ এর সামনে প্রতিষ্ঠানটির গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। একই মালিকানার প্রতিষ্ঠান এটিএন বাংলা- র সামনেও গাড়ি ভাঙচুর করে, আগুন দেয়া হয়। টেলিভিশনটির কার্যালয়ের ভেতরে স্টেশনেও হামলা চালানো হয়। তেজগাঁওয়ে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে-র কার্যালয়ের নিচেও একই পদ্ধতিতে চলে ভাঙচুর।
এসব ঘটনায় লুটপাট হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এসকল টেলিভিশনের হামলার পেছনে কারণ হিসেবে এসেছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে জুলাই আন্দোলনে একতরফাভাবে শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে। পুলিশি হত্যাকাণ্ড ও এর বিরুদ্ধে গণমানুষের প্রতিবাদের বাস্তব ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে, শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসকল হামলাকারীদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারকে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
সংবাদমাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ও নির্বিচারে ছাঁটাই
সংবাদমাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুধুমাত্র ২০২৪ এর ৫ আগস্টেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পরবর্তীতে দেখা গেছে দখল সংস্কৃতি ও একের পর এক চাকরিচ্যুত করার ঘটনা। হামলা-আক্রমণ ও পূর্বের ধারাবাহিকতায় একক পক্ষের নিয়ন্ত্রণ ও দখলের ফলে দেশের সংবাদমাধ্যম আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়নি।
একাত্তর টেলিভিশনে যখন হামলা চলে তখন প্রতিষ্ঠানটির সংবাদকর্মীরা জানতে পারেন বিএনপি বিটের সিনিয়র রিপোর্টার শফিক আহমেদ মালিকপক্ষ মেঘনা গ্রুপের সাথে মিটিং এ বসেছেন। প্রতিষ্ঠানে লুটপাট ও ভাঙচুর ঠেকাতে বিএনপি’র নেতাদের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। এসময় নিকটবর্তী আরেকটি ভবনের গ্যারেজে আশ্রয় নেন সংবাদকর্মীরা। হামলাকারীরা সরে গেলে একপর্যায়ে কর্মস্থলে প্রবেশ করেন। রাত ১২টার পর বার্তাকক্ষে এসে শফিক আহমেদ জানান, একাত্তর টিভির বার্তা প্রধান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব পদে যারা বহাল ছিলেন বা পূর্বের সরকার ঘনিষ্ঠ উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের চাকরিচ্যুত করা হবে। এরপর থেকেই চলতে থাকে একের পর এক ছাঁটাই। এই প্রতিষ্ঠানের একাধিক সংবাদকর্মী জানিয়েছেন, শফিক আহমেদ দায়িত্ব নেয়ার দেড় বছরেও প্রতিনিয়ত চাকরি হারানোর ঝুঁকি মাথায় নিয়েই কাজ করে যাচ্ছেন।
এই প্রতিষ্ঠানের পূর্বের হর্তাকর্তা সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু ও সাবেক বার্তা প্রধান শাকিল আহমেদ ও সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপা একাধিক হত্যা মামলায় এখনও কারাগারে আছেন। ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগের পতনের পর এই কর্মস্থলে তারা আর প্রবেশ করেননি।
একুশে টিভি– তে কর্মরত, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন ৫ আগস্ট রাতের মধ্যেই কীভাবে মালিকানার বদল ঘটলো।
এই সাংবাদিকের বর্ণনামতে, “এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজ- এ ততক্ষণে ভাঙচুর শুরু হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানের নিচে গাড়িতে জ্বলছে আগুন, ধোঁয়ার কুণ্ডলী আমার অফিসের সামনে থেকেই দেখা যাচ্ছে। এসময় হুট করেই প্রায় ১০ বছর আগে মালিকানা হারানো আব্দুস সালাম স্যার ও তার স্ত্রীকে একটি গাড়িতে করে বাসা থেকে নিয়ে এসেছেন তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউল হাসান অভী। অফিসের নিচে বিএনপির কিছু কর্মীকে লাঠি হাতে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো, যাতে ভাঙচুর ঠেকানো যায়। সালাম স্যার উপরে উঠতেই সবাই স্বাগত জানালেন। অবশ্য অনেকেরই মুখ বেশ শুকনো ছিলো। ততক্ষণে এ খবর ছড়িয়ে পড়েছে সালাম স্যার একুশে টিভির নিয়ন্ত্রণ ফেরত পেয়েছেন। তার মালিকানা হাতছাড়া হওয়ার পর চাকুরিচ্যুতদের ঢল নামলো অফিসে। সালাম স্যার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন এবং তার স্ত্রী তাসনুভা মাহবুব সালাম হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এরইমধ্যে রবিউল হাসান অভী পদত্যাগ করেন। এরপর পুরাতন কর্মীদের অনেকেই কাজ শুরু করলেন।”
৫ আগস্টের পর একুশে টিভি-র প্রায় সব বিভাগেই পূর্ব মালিকানা এস আলম গ্রুপ কর্তৃক নিয়োগকৃত বা পূর্বের মালিকপন্থী কর্মীরা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। একইসঙ্গে এক ঝাঁক কর্মী নিয়োগ পান। বিশেষ করে বার্তাপ্রধান রাশেদ চৌধুরীকে সরিয়ে এই পদে নিয়োগ পান হারুন অর রশীদ। হাসান জাকির হলেন চীফ নিউজ এডিটর (সিএনই)। এছাড়াও মঞ্জুরুল আলম পান্না, পবন আহমেদ, আলী আহম্মেদ ও সঞ্জয় অধিকারীসহ অনেকেই নতুন নিয়োগ পান। পরের কয়েক দিনের মধ্যে চাকুরি হারালেন ডেপুটি হেড অফ নিউজ সাঈফ ইসলাম দিলাল ও ব্যবসা-বাণিজ্য ভিত্তিক সংবাদ প্রধান আতিয়ার রহমান সবুজ।
মূলত ৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যমগুলোতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত উচ্চপদস্থরা কর্মস্থলে ফেরেন নাই। পরবর্তীতে অনেকে ফেরার চেষ্টা করলে তাদেরকে কর্মস্থলে ফিরতে নিষেধ করা হয়। বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদেও পরিবর্তন আনা হয়।
ডিবিসি নিউজ টেলিভিশনের শীর্ষ পদে থাকা সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু, সম্পাদক প্রণব সাহা, বার্তাপ্রধান নইম তারিক ও অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মাসুদ কার্জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। পাশাপাশি সিনিয়র রিপোর্টার কাওসারা চৌধুরী কুমু, নাদিম মাহমুদ সহ কমপক্ষে ৫ জন প্রতিবেদক চাকরিচ্যুত হয়েছেন। বিএনপি ঘনিষ্ঠ দৈনিক সমকালের সহযোগী সম্পাদক লোটন একরামকে ডিবিসিতে সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তবে এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী স্বপদে বহাল আছেন। প্রধান সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও কোনো পরিবর্তনের কথা জানা যায়নি। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা কর্মস্থলে ফেরেননি।
বৈশাখী টিভি থেকে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী বার্তাপ্রধান অশোক চৌধুরী পদ ছাড়তে বাধ্য হন। একসময় দিগন্ত টিভিতে (আওয়ামী আমলে বন্ধ প্রতিষ্ঠান) কাজ করা জিয়াউল কবির সুমন এই পদে নিয়োগ পান। প্রধান বার্তা সম্পাদক সাইফুল ইসলামকে সরিয়ে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয় দীর্ঘদিন বিএনপি বিটে কর্মরত তৌহিদুল ইসলাম শান্তকে। এছাড়াও বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী ও প্রতিবেদক চাকরিচ্যুত হন।
দৈনিক পত্রিকা সমকাল এর সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক আলমগীর হোসেন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হা-মীম গ্রুপের মালিক আবুল কালাম আজাদ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। দৈনিক যুগান্তর এর সম্পাদক সাইফুল আলম পদত্যাগ করলে সম্পাদকের দায়িত্ব নেন বিএনপি সংশ্লিষ্ট কবি আবদুল হাই শিকদার। দৈনিক দেশ রূপান্তর থেকে মোস্তফা মামুন পদত্যাগ করলে সম্পাদকের দায়িত্ব নেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ।
বেক্সিমকো গ্রুপের ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি- র প্রধান বার্তা সম্পাদক আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ আশীষ সৈকত শেখ হাসিনার পতনের পর আর কর্মস্থলে ফেরেননি। পরবর্তীতে বিএনপি ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক মোস্তফা আকমলকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তবে এই টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পাদক এম শামসুর রহমান মোমেন ও বার্তাপ্রধান মামুন আব্দুল্লাহর পদে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দেশ টিভি- র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ হাসান আওয়ামী লীগের পতনের পর কারাগারে আছেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেও আওয়ামী লীগ বিটের প্রতিবেদকসহ বেশ কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
নাগরিক টিভি থেকে বার্তাপ্রধান দীপ আজাদ ও উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন আওয়ামী সমর্থক হাসিনা সরকারের পতনের পরপর পদত্যাগ করেন। সাবেক মেয়র মরহুম আনিসুল হক ও তার স্ত্রী পোশাক কারখানার মালিক রুবানা হকের মালিকানাধীন এই বেসরকারি চ্যানেল থেকে কমপক্ষে ৪০ জন সংবাদকর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এটিএন বাংলা থেকে চাকরিচ্যুত করা হয় প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুনকে ও এটিএন নিউজ থেকে চাকরিচ্যুত হন বার্তাপ্রধান প্রভাস আমীন। মানবজমিন পত্রিকা থেকে শহীদুল আজম এটিএন নিউজ এ বার্তাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান।
দৈনিকযায়যায়দিন এর মালিকানা বদল
৯০ দিনের মধ্যে দখল, ডিক্লারেশন বাতিল ও প্রত্যাবর্তন
ডিসেম্বর ২০২৪ – মার্চ ২০২৫
১৫ ডিসেম্বর ২০২৪
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার প্রধান কার্যালয় ও ছাপাখানা দখলের অভিযোগ ওঠে। মূল লোগোর সাথে হুবুহু মিল রেখে দৈনিক যায়যায়দিনপ্রতিদিন নামে নতুন প্রকাশনা বের হয়। মূল পত্রিকার সাংবাদিকরা জানান এ ধরনের কার্যক্রম অবৈধ ও অনৈতিক।এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পত্রিকাটির প্রধান কার্যালয়ে কয়েক দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন সাংবাদিকরা।
১১ মার্চ ২০২৫
সাবেক সম্পাদক শফিক রেহমানের তরফ থেকে প্রকাশনার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে ঢাকা জেলা প্রশাসন যায়যায়দিন পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করে। হঠাৎ করেই কর্মহীন হয়ে পড়েন প্রায় ৭০০ সংবাদকর্মী।
১২ মার্চ ২০২৫
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কাজী রুকুনউদ্দীন আহমেদ জানান, সাংবাদিক শফিক রেহমানকে সামনে রেখে একটি চক্র তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে পত্রিকাটির প্রধান কার্যালয় এইচআরসি মিডিয়া ভবন ও ছাপাখানা দখল করলে, ভিন্ন ছাপাখানা থেকে পত্রিকা বের করতে হয়। এই ভিন্ন ছাপাখানা থেকে প্রকাশের অভিযোগ তুলে চক্রান্তের মাধ্যমে পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
১৮ মার্চ ২০২৫
১৮ বছর পর দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার ডিক্লারেশন ফিরে পান শফিক রেহমান। এরপর থেকে যায়যায়দিনপ্রতিদিন নামে নতুন প্রকাশনাটি আর বের করা হয়নি। এই কার্যক্রম ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ এর ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দখলের অভিযোগের বিষয়ে শফিক রেহমান গণমাধ্যমে বলেছেন, “ ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল”। উল্লেখ্য ২০০৭ সালে দৈনিক যায়যায়দিন পাবলিকেসন্স- এর শেয়ার এইচআরসি গ্রুপের চেয়ারম্যান সাঈদ হোসেন চৌধুরীর কাছে বিক্রি হয়। ১৭ জুলাই ২০০৭ অতিরিক্ত ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে উপস্থিত হয়ে প্রকাশকের পদ ছাড়তে বাধ্য হন শফিক রেহমান।
শফিক রেহমানের করা আবেদনে প্রকাশনার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই ‘ডিক্লারেশন’ বাতিল করা হয়। বাতিল করার ৭দিনের মধ্যেই শফিক রেহমানকে পত্রিকাটির ‘ডিক্লারেশন’ দেয়া হয়। ভবন ও ছাপাখানা দখলের পাল্টা অভিযোগ জানান তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কাজী রুকুনউদ্দীন আহমেদ। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সেই একই জোরপূর্বক প্রক্রিয়ার মালিকানা ফেরত কিংবা বদলের পুনরাবৃত্তি ঘটলো। এছাড়া এই পত্রিকা সংশ্লিষ্টরা জানান যায়যায়দিন পত্রিকাটি বর্তমানে শফিক রেহমানের তত্ত্বাবধানে থাকলেও পূর্বের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে অনলাইন মাধ্যমটি।
২০২৪ এর ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাসনাত আব্দুল্লাহ একটি দল নিয়ে সময় টিভি-র বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের কার্যালয়ে গিয়ে এই টিভি থেকে প্রায় ১০ জনকে চাকরিচ্যুত করার তালিকা দেন। এই ঘটনায় অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ মিললেও সিটি গ্রুপের সাথে দেখা করার বিষয়টি অস্বীকার করেননি হাসনাত আব্দুল্লাহ। পরবর্তীতে সময় টিভি থেকে কয়েকজনকে জোরপূর্বক অব্যাহতি দেয়া হয়। সিটি গ্রুপের পরিচালক শম্পা রহমানকে এই টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে চাকরিচ্যুতদের মধ্যে রয়েছেন ইনপুট এডিটর ওমর ফারুক, আউটপুট এডিটর আরিফুল সাজ্জাদ, ডিজিটাল হেড কামাল শাহরিয়ার, সহযোগী বিশেষ প্রতিবেদক দেবাশীষ রায় ও সিনিয়র রিপোর্টার বুলবুল রেজা, লোপা আহমেদ, খান মুহাম্মদ রুমেলসহ অনেকেই।
জোরপূর্বক চাকরিচ্যুতদের বাইরে যারা স্বেচ্ছায় ছেড়েছেন তারা জানিয়েছেন, কর্মস্থলে বিভিন্ন সুবিধা বাতিল করা থেকে শুরু করে নানা উপায়ে একটি প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করার ফলে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেকেই।
উল্লেখ্য ২০২৫ সালের এপ্রিলে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এ অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীকে প্রশ্ন করার জেরে তিনটি বেসরকারি চ্যানেল থেকে ৩ জন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এই ৩ জন, চ্যানেল আইয়ের সাংবাদিক রফিকুল বাসার, দীপ্ত টিভির সাংবাদিক মিজানুর রহমান ও এটিএন বাংলার সাংবাদিক ফজলে রাব্বি। এই সংবাদ সম্মেলন বা ঘটনার পরেরদিন দীপ্ত টিভি তাদের স্ক্রলে জানায়, সংবাদ সম্প্রচার বন্ধ রয়েছে। দুপুর ২টার পর থেকে পাঁচটি বুলেটিন প্রচার হয়নি। রাত ১১টায় আবার সংবাদে ফেরে তারা। সেসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে ‘জুলাই রেভ্যুলেশনারী অ্যালায়েন্স-জেআরএ’ ফেইসবুক পেজ থেকে ৩ জন সাংবাদিকের ছবিসহ বারবার পোস্ট দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। পরবর্তীতে ৩টি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানায়, এই ৩ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ায়—এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে মব এড়ানোর লক্ষ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এরপর চাকরিচ্যুতির ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে সংস্কৃতি উপদেষ্টা ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখা করেন। চাকরি চলে যাওয়ার বিষয়ে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নেই জানিয়ে তিনি লেখেন, “প্রত্যেক চ্যানেলেরই নিজস্ব এডিটোরিয়াল পলিসি থাকে। তারা সেই পলিসির আলোকে কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা তাদের ব্যাপার।”
দীপ্ত টিভি-র সংবাদ সাময়িক বন্ধ থাকা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, “সংবাদ কার্যক্রম বন্ধ করতে সরকার বলেনি। জুলাই গণহত্যার পক্ষ প্রশ্ন করায় টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের আমলের একই প্রক্রিয়ায় বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘নেক্সট টিভি’ ও ‘লাইভ টিভি’ অনুমোদন পেয়েছে। নেক্সট টিভি-র লাইসেন্স নিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন, যিনি এর আগে একটি ইংরেজি দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। লাইভ টিভি-র লাইসেন্স পেয়েছেন এনসিপি ঘনিষ্ঠ আরিফুর রহমান, যিনি শিক্ষার্থী থাকাকালীন আরেকটি দৈনিকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক ছিলেন।
আওয়ামী লীগের টানা ৪ মেয়াদের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে দলের রাজনীতিক ও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের প্রায় ৩০টি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব চ্যানেলের নিরপেক্ষতা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন ছিল। এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পরে সম্প্রচারে এসেছে স্টার নিউজ নামে আরেকটি বেসরকারি চ্যানেল। এই টিভির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ, যা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী সংশ্লিষ্ট। উল্লেখ্য আওয়ামী আমলে বন্ধ হওয়া সংবাদমাধ্যমের মধ্যে চ্যানেল ওয়ান পুনরায় কার্যক্রম শুরু করেছে। কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়ায় আছে দিগন্ত টিভি। ২০২৪ এর সরকার পতনের পর দৈনিক আমার দেশ পুনরায় প্রকাশিত হচ্ছে।
গণঅভ্যুত্থানের আগে-পরে বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া হালচাল
বসুন্ধরা গ্রুপ মালিকানাধীন দৈনিক কালের কণ্ঠ- তে ১৯ জুলাই থেকে পুলিশের গুলিতে ঢাকার রাস্তায় মানুষের নিহত হওয়ার সংখ্যা প্রকাশ করা হলেও প্রথম পাতায় আন্দোলনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হতো। পত্রিকাটির একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির নিউজ বা দলীয় প্রোপাগান্ডা নিয়মিত প্রথম ও শেষ পাতায় প্রায় হুবুহু ছাপা হতো। ভেতরের পাতাগুলোতে মাঝে মাঝে রাখা হতো ‘সংঘর্ষের’ ছবি। এসব তদারকি করতেন উপ সম্পাদক হায়দার আলী। রাজনৈতিক রিপোর্ট তদারকি করতেন আওয়ামীলীগ বিটের তৎকালীন রিপোর্টার তৈমুর ফারুক তুষার (বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে)। পরবর্তী দিনগুলোতেও একই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।
যেমন ৪ আগস্ট ২০২৪, গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ হত্যাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রধান শিরোনাম করা হয়, ‘২০ জেলায় ১৪ পুলিশসহ নিহত ৯৭’ এবং পাশাপাশি রাখা হয় শেখ হাসিনার বক্তব্য ‘নৈরাজ্যবাদী কঠোর হাতে দমনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর’। পরদিন ৫ আগস্ট এই খবর প্রকাশিত হয়। এছাড়া তৃতীয় পাতায় বিএনপিসহ সরকারের সমালোচনাকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবাদের খবর ছাপা হতো।
৫ আগস্ট ২০২৪, আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকরা কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনার পতনের পর সেদিন বিকেল নাগাদ এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদকরা জানতে পারেন, মূল পত্রিকার সাথে ‘জ্যাকেট পাতা’ যুক্ত করা হবে, এবং ‘কোটা আন্দোলন থেকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান’ নামে একটি টাইম লাইন প্রকাশ করা হবে। যা ৬ আগস্ট ২০২৪ প্রকাশিত হয়। টাইম লাইনটি প্রস্তুতের পর উপ সম্পাদক হায়দার আলী সেখানে জুলাই শহীদ আবু সাঈদের ছবি রাখার নির্দেশ দেন।
৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তীতে বসুন্ধরা গ্রুপের অতীত ককর্মকাণ্ডের জেরে এই পত্রিকার সংবাদকর্মীরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। একইসঙ্গে তারা লক্ষ্য করেছেন, কালের কণ্ঠে-র অফিসে অন্তত দুইবার এসে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী -র আমির শফিকুর রহমান। ঘনঘন সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপি-র মিডিয়া সেলের অন্যতম সদস্য শায়রুল কবির খান।
এই আগস্ট মাসেই বিএনপি’র পদধারী সাংবাদিক নেতা কাদের গণি চৌধুরীকে বসুন্ধরার ইস্ট ওয়েস্টে মিডিয়া গ্রুপের উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তবে এই নিয়োগে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অসন্তুষ্ট হয়। একইসাথে দলটিতে তার পদ স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে বসুন্ধরা মালিকানাধীন বেসরকারি চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোরে-র উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। আর কাদের গনি চৌধুরীর স্থলে কারামুক্ত হওয়ার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বন্ধু ও ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন নিয়োগ পান।
ইমদাদুল হক মিলনকে সরিয়ে ২৭ আগস্ট ২০২৪, কালের কন্ঠের সম্পাদক হন জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিএনপিপন্থী সাংবাদিক হাসান হাফিজ। এছাড়া এই পত্রিকার বিভিন্ন বিভাগে নিয়োগ পান বিএনপিপন্থী একাধিক সংবাদকর্মী।
২০২৫ এর ফেব্রুয়ারিতে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী একটি মব তৈরি করলে, প্রভাবশালী কর্মী হায়দার আলী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর তাকে বসুন্ধরা ল্যান্ড বিভাগে যুক্ত করা হয়। কয়েক মাস পর তিনি আবারও নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কালের কন্ঠে ফেরেন। এসময় যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পান বিএনপিপন্থী সাংবাদিক নেতা হাফিজ আল আসাদ সাঈদ খান। সাঈদ খান নিয়োগের পর সম্প্রতি হায়দার আলীর সঙ্গে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এই পরিস্থিতিতে কালের কন্ঠে- র কর্মীদের বেতন বিলম্বিত হয়ে পড়েছে।
২০২৪ এর অক্টোবরে, জুলাই শহীদ আবু সাঈদের ভাই রমজান আলীকে বাংলাদেশ প্রতিদিন- এর রংপুর ব্যুরো অফিসের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী এবং আরেক ভাই আবু হোসেনকে টিভি চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোরে-র রংপুর ব্যুরো অফিসের জ্যেষ্ঠ নিবার্হী পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এক মাসের মধ্যে নভেম্বরেই এই চাকরি ছেড়ে দেয়ার কথাও জানান আবু সাঈদের পরিবার।
বসুন্ধরা গ্রুপ মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোর এর আওয়ামী ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী নির্বাহী সম্পাদক রাহুল রাহাকে সরিয়ে একই বার্তাকক্ষের ফরহাদুল ইসলাম ফরিদকে এই পদের দায়িত্ব দেয়া হয়। একইসঙ্গে বার্তাপ্রধানসহ উচ্চপদস্থ সকল পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনলাইন মিডিয়া বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর এর প্রধান সম্পাদক জুয়েল মাজহারের পদে নিয়োগ পান লুৎফর রহমান হিমেল। তবে পরবর্তীতে এই পদে পরিবর্তন আসে, যোগ দেন তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু।
উল্লেখ্য ১৯ আগস্ট ২০২৫, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া কমপ্লেক্সে বসুন্ধরা গ্রুপ মালিকানাধীন সকল সংবাদমাধ্যমে—কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও রেডিও ক্যাপিটালের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক আয়াতুল্লাহ বেহেশতীর নেতৃত্বে একাধিক তরুণকে সমন্বয়ক পরিচয়ে ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে দেখা যায়।
জনকণ্ঠ পত্রিকায় দফায় দফায় হামলা ও দখলের পাঁয়তারা
দেড় বছরে ধারাবাহিক অস্থিরতা
দৈনিক পত্রিকা জনকণ্ঠ- তে দফায় দফায় হামলা, লুটপাট ও ছাঁটাইসহ অস্বাভাবিক অনেক ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সূত্রপাত ধরা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ সময় থেকেই। ২৬ জুলাই ২০২৪, সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা- ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) আফিজুর রহমান আফিজ জনকণ্ঠ পত্রিকায় প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) হিসেবে নিযুক্ত হন। জনাব আফিজ সাধারণত নিজেকে ‘বঙ্গবন্ধু গবেষক’ হিসেবেও পরিচয় দেন। আওয়ামী আমলে বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের পত্রিকা দৈনিক বাংলা’-র নির্বাহী পরিচালক ছিলেন এবং পতিত তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের ঘনিষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন। জানা যায়, আত্মীয়তার সূত্রে জামায়াতের সাথেও ওনার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এই ব্যক্তি পত্রিকাটিতে যোগদানের কয়েকদিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলেও, রাতারাতি এখানকার নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে প্রতিষ্ঠানটির সংবাদকর্মীদের বেতন আটকে যায়।
২০২৫ এর ফেব্রুয়ারিতে, আওয়ামী পন্থী নির্বাহী সম্পাদক ওবায়দুল কবীর ও উপদেষ্টা সম্পাদক কামরুল ইসলাম খানকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হয়। কয়েকমাস ধরে সংবাদকর্মীদের বেতন বকেয়া থাকার মাঝেই— হুট করেই সিওও জনাব আফিজ নতুন কর্মী নিয়োগ দিতে থাকায় অসন্তোষ বেড়ে যায়। লক্ষ্য করা যায়, নতুন কর্মীদের সংবাদমাধ্যমে পূর্বে তেমন অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বড় বড় পদে নিয়োগ পান। এদেরমধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব, জয়নাল আবেদীন শিশির যিনি গত মার্চে, পরিকল্পনা সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পান। জামায়াত ঘনিষ্ঠ মনির আহমাদ জারিফ জয়েন্ট নিউজ এডিটর হিসেবে নিয়োগ পান, যিনি সাবেক কর্মস্থল মানবকণ্ঠ- তে সিনিয়র সাব এডিটর ছিলেন। শিক্ষানবিশ প্রতিবেদক থেকে সরাসরি ডেপুটি চিফ রিপোর্টার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন ইসরাফিল ফরায়েজী। ডিজিটাল টিমের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান সাবরিনা বিনতে আহমদ, যিনি বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী। এছাড়াও নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন মীর জসিম নামে একজন এবং প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নতুন নিয়োগ দেয়া হয়।
এই প্রতিষ্ঠানের একজন ভুক্তভোগী সাংবাদিক বলেন, “পুরাতনদের বেতন বকেয়া রেখে, মেজর আফিজ এনসিপি, জামায়াত, বিএনপি সংশ্লিষ্ট ও দলীয় পদধারীদের নিয়োগ দিতে থাকেন। এই সংখ্যা ২০ এর অধিক, যাদের বেশিরভাগই জামায়াত সংশ্লিষ্ট।”
বার্তাকক্ষের উচ্চপদস্থদের সাথে পরামর্শ না করে বার্তাকক্ষে নতুন নিয়োগে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মাঝেও অসন্তোষ তৈরি হয়। এর মাঝে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে ৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এদিকে বকেয়া বেতনের দাবিতে দীর্ঘবছরের পুরনো সংবাদকর্মীরা, ২২ সদস্য বিশিষ্ট ‘সাংবাদিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করে। এই অবস্থায় বকেয়া পাওনা পরিশোধ ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় ছাঁটাইয়ের দাবিতে, ৪ মে ২০২৫ বিকেল ৪টা থেকে কর্মবিরতি পালন করেন সাংবাদিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ। সেদিন সন্ধ্যায় তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
শুরুতে গেইটের বাইরে অবস্থান নেন হামলাকারীরা। এই অংশটির বক্তব্য, তাদের নেতা জয়নাল আবেদীন শিশিরকে অবরুদ্ধ রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার একটি ভিডিয়োতে লক্ষ্য করা যায়, ভেতরে থাকা কর্মীরা উত্তেজিত দলটিকে আশ্বস্ত করে বলছেন, ‘কাউকে আটকে রাখা হয় নাই, উনি চাইলেই নিচে আসতে পারেন’।
জনকণ্ঠ পত্রিকার সাংবাদিকরা জানান, নিচে শিশিরের নামে বিক্ষোভ হচ্ছে জানার পর শিশিরকে বারবার নিচে যেতে বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি যাননি। উনি বলেন আমি এখানে চাকরি করছি, আমি কেন নিচে যাব? অথচ নিচের থেকে বলা হচ্ছে ওনাকে আটকে রাখা হয়েছে।
কিছু সময়ের মধ্যেই গেট ভেঙে প্রায় ৫০/৬০ জনের দলটি ভেতরে প্রবেশ করে, কর্মবিরতি পালনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এসময় সংবাদকর্মীরা থানায় যোগাযোগ করলে পুলিশ সাড়া দেয়নি।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা জানান, বকেয়া বেতনের দাবিতে ও নির্বিচারে ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণভাবে সিঁড়িতে বসে কর্মবিরতি পালন করছিলেন। রাত ৮টা নাগাদ এনসিপি- জামায়াত সমর্থকদের একটি দল গেট ভেঙে ভেতরে এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। নিয়মিত বেতন ছাড়া তাদের আর কোনো দাবি ছিল না।
এই হামলার ঘটনায় একজন ভুক্তভোগী বলেন, “জনকণ্ঠ ভবনের রিসেপশনে সাংবাদিক কর্চারীদের নেতা জ্যেষ্ঠ সংবাদকর্মী মো. আফজাল হোসেনকে প্রায় ২০ জন মিলে মারধর করেন। আফজালের শরীরে রক্তের দাগও দেখা যায়। তাকে বাঁচাতে গিয়ে অনেকে আহত হয়েছেন। তিনি কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিউজরুমে চলে যান। এরপর আবারও তাকে পেটাতে পেটাতে সাবরিনা ও শিশিরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়। শিশির ও সাবরিনা তাকে টার্মিনেশন লেটার দিয়ে দেন।”
এর পরেরদিন যারা হামলার শিকার হয়েছেন ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীলদের কর্মস্থলে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। আবার সবাইকে চাকরিচ্যুতও করা হয়নি। ওইদিনের ঘটনায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন অনেকেই। এই ট্রমা থেকে বের হতে জুন মাসে আরও দুই জন পদত্যাগ করেন।
চাকরিচ্যুত সাংবাদিকরা বলেন, যদি প্রতিষ্ঠান মনে করে তাদেরকে প্রয়োজন নাই, মালিকের ছাঁটাইয়ের অধিকার আছে। কিন্তু শ্রম আইন মোতাবেক হিসাব-নিকাশ তো বুঝিয়ে দিতে হবে। তারা জানান, ৩২ বছর ধরে কাজ করা ব্যক্তিও বিনা নোটিশে চাকরি হারিয়েছেন।
সংবাদকর্মীদের ওপর এই হামলার ঘটনার পর ২০২৫ এর আগস্টে, জনকণ্ঠ পত্রিকায় দ্বিতীয়দফায় আরেকটি সন্দেহজনক ঘটনা ঘটে। ২রা আগস্ট ২০২৫, প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে আবারও হামলার ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগের আমলে ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে যে শোকের মাস পালন করা হতো— তা সামনে রেখেই এই ঘটনা ঘটে। সেদিন পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণে— “মালিকের হাত ধরে জনকণ্ঠে আবারো সক্রিয় হয়েছে ‘র’-” শিরোনামে এবং “জনকণ্ঠের সকল কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করেছে জনকণ্ঠে কর্মরত সাংবাদিকেরা” শিরোনামে দুটি খবর অনলাইনে প্রকাশ করা হয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ৪ আগস্ট ২০২৫ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি’র মাধ্যমে দৈনিক জনকণ্ঠে-র সম্পাদক ও প্রকাশক শামীমা এ খান জানান, পেশিশক্তি ও মবোক্রেসির মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের বের করে দিয়ে তার কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “গত ১ আগস্ট রাতে আফিজুর রহমানের পরামর্শে ও তার সহযোগীরা দৈনিক জনকণ্ঠের অনলাইনে পরিকল্পিতভাবে টেমপ্লেট লাল থেকে কালো রঙের করে। এর আগে গত জুনে প্ল্যানিং এডিটর জয়নাল আবেদীন শিশিরের মাধ্যমে সম্পাদকের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। দফায় দফায় চেষ্টা চালিয়ে তারা চাঁদা আদায় করতে না পেরে, মব সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এ কাজ করেছে। পরদিন ২ আগস্ট সম্পাদকের নির্দেশে জনকণ্ঠ ছাপা পত্রিকার মলাট জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে লাল রঙে প্রকাশ করা হয়।”
“দেশের সংবাদপত্র জগতের ইতিহাসে এটি অন্যায় অপকর্ম এবং দেশের প্রচলিত আইনের ক্ষেত্রে একটি বিরল ঘটনা” বলেও মন্তব্য করেন শামীমা এ খান। এসময় পরিকল্পিতভাবে দখলের উদ্দেশ্যে বিগত সরকার ও শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শোকের মাসে সংহতি জানিয়ে, টেমপ্লেট কালো রঙ করার ক্ষেত্রে পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করেছেন জানিয়ে, প্রায় ২০জনকে চাকরিচ্যুত করেন গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প কর্তৃপক্ষ।
এদিকে এনসিপি নেতা জয়নাল আবেদীন শিশিরসহ যাদের বিরুদ্ধে এই অসৎ পরিকল্পনার অভিযোগ এসেছে, তাদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা জানান, গ্লোব-জনকণ্ঠ শিল্প গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জিশাল এ খান, আগস্টকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিকে অনুসরণ করে— ফেইসবুকে নিউজ আপলোডের টেমপ্লেট কালো করার নির্দেশ দেন। অর্থাৎ টেমপ্লেট লাল থেকে কালো করার বিষয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠে আসে।
এর ধারাবাহিকতায় ৬ আগস্ট ২০২৫, মালিক-সম্পাদক-প্রকাশক শামীমা এ খান ও গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প নেতৃত্বকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে, এনসিপি নেতা শিশিরের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়। জনকণ্ঠে-র সাংবাদিকরা জানান এক্ষেত্রে মেজর (অব.) আফিজুর রহমানের ইন্ধন রয়েছে। উল্লেখ্য এই বোর্ডের প্রত্যেক সদস্যই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে, এই সাবেক সেনা কর্মকর্তার মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। এই গ্রুপটি, শামীমা এ খানসহ গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হাতিরঝিল থানায় মামলাও দায়ের করেন। পাল্টা আইনের আশ্রয় নিয়েছেন মালিকপক্ষ। একপর্যায়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের মধ্যস্থতায় সংকটের মীমাংসা করা হয়।
জনকণ্ঠে-র একজন সাংবাদিক বলেন, “মেজর আফিজ ও শিশিরের নেতৃত্বে এই বিভিন্ন দলের অসাধু নেতারা তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য, অবৈধ আয়ের উৎস তৈরি করার লক্ষ্যেই দফায় দফায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছেন। এই পত্রিকা দখল করাই ছিল এই গোষ্ঠির মূল উদ্দেশ্য।”
জানা যায়, জনাব আফিজ সবশেষ ঘটনার পর আর কর্মস্থলে আসেননি। তবে আওয়ামী লীগের পতনের পর তার অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত ও পরবর্তীতে মালিক-সম্পাদক-প্রকাশক কে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা, এনসিপির শিশিরসহ জামায়াত ও বিএনপির দলীয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখনও এই কর্মস্থলে নিযুক্ত আছেন। মেজর (অব.) আফিজুর রহমান ও জয়নাল আবেদীন শিশির উভয়েই জনকণ্ঠ দখলের পাঁয়তারা, হামলার মদদদাতা হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বছর গড়ালেও চাকরিচ্যুতদের পাওনা পরিশোধ করেনি জনকন্ঠ।
মালিকগোষ্ঠীর দায়মুক্তি ও অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্ক্রিয়তা
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার, নির্বিচারে গণমাধ্যম দখল, ছাঁটাই ও নৈরাজ্য ঠেকাতে আদৌ কোনো চেষ্টা করেছে কি না প্রশ্নের জবাবে— সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, “সংবাদমাধ্যম দখলের বিষয়টা রাজনৈতিক দলের। রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো পলিসি সরকারের ছিল না।”
অতীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হলে পর্যায়ক্রমে এই দলের সমর্থক সাংবাদিকরা একইভাবে নেতৃত্ব দখলে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর সংবাদমাধ্যমগুলোতে ক্ষমতামুখী তোষণ দৃশ্যমান হয়ে উঠে। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর শেখ হাসিনার সরকার ঢাকাসহ সারাদেশের সংবাদমাধ্যমে একক আধিপত্য চালায়। ফলে নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হন বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের অনুগত সাংবাদিকরা। বিগত আমলে প্রায় সকল সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে, রাতারাতি মালিকগোষ্ঠী রাজনৈতিক আনুগত্য বদলে ফেলেন। মালিকপক্ষের হয়ে আওয়মী ক্ষমতার বলয়ে সাংবাদিকতা করে অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন, মামলার শিকার হয়েছেন, কারাভোগ করছেন, পলাতকও রয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে যে পরিমাণে সংবাদকর্মীরা চাকরি হারিয়েছেন, হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন— সংবাদমাধ্যমগুলোর মালিকানায় সে পরিবর্তন আসেনি। বার্তাকক্ষের নতুন নেতৃত্ব ও কর্মী পর্যায়ে যেসকল রদবদল ঘটেছে, তা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়নি। পূর্বের ধারাবাহিকতা কিংবা জোরপূর্বক এই পরিবর্তনের ফলে পুনরায় মালিকপক্ষ ও নতুন কর্তৃপক্ষ একই প্রক্রিয়ায় সংবাদকর্মী ও সংবাদ প্রবাহের নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রেখেছে।
সংবাদমাধ্যমের মালিকদের একপ্রকার দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, “বিচার হলে সংবাদমাধ্যমের মালিকদের বিচার হওয়া দরকার। মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে নিজের স্বার্থে ক্ষমতার সান্নিধ্যে থেকেছেন। কর্মীদের ব্যবহার করে ফায়দা লুটেছেন। আবার একই মালিক ৫ আগস্টের পর তার কর্মীদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছেন। অন্যায় সব তারা করবে আর সাংবাদিকদের ওপর সেই দায় চাপিয়ে দিবে এটা তো হতে পারে না। তাই মালিকদের জবাবদিহিতায় আনা জরুরি।”
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, “এসব ছাঁটাই রাজনৈতিক কারণে কিছুটা হয়েছে, সেটা পট পরিবর্তনের কারণে হয়েছে— যা মালিকরা করেছেন মালিকদের স্বার্থে আবার যারা বিগত শাসনামলে বঞ্চিত হয়েছেন তারা করেছেন, সুযোগ নেয়ার জন্য বা প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। এই জন্যেই আমরা সুপারিশে (গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন) বলেছি যে এখানে (সংবাদমাধ্যম শিল্প) আগে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, সংস্কার করা সেগুলো হলেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে।”
২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে কর্তৃত্ববাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে গণমাধ্যম প্রকৃত অর্থেই গণমুখী সাংবাদিকতার পথে ধাবিত হবে এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়। এই লক্ষ্যেই ২০২৪ এর নভেম্বরে ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত ২২ মার্চ ২০২৫ প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। এই কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেসময় আশু করণীয় জানতে চাইলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা জমা দেয়া হয়। কিন্তু প্রায় ১ বছর ঘনিয়ে আসলেও সংস্কারের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সবমিলিয়ে সাংবাদিক মহলে হতাশা বিরাজ করছে।