মঙ্গলবার ২৫শে শ্রাবণ ১৪২৯ Tuesday 9th August 2022

মঙ্গলবার ২৫শে শ্রাবণ ১৪২৯

Tuesday 9th August 2022

বহুস্বর মতামত

বনরুটি যখন ছোট হয়ে আসে: পোশাক শ্রমিকের জীবনে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি

২০২২-০৭-০৬

তাসলিমা আখ্‌তার

 

১৯৯৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির আওয়াজ তুলে রাস্তায় নেমে এলেই কেবল নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়।

 

১. সরকারি হিসাবেও শ্রমিকের পেটে টান পড়েছে

 

 

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীন, জানি সকলেই। কিন্তু যাদের আয়ের বড় অংশটাই খরচ হয় খাবার কিনতে, তাদের জীবন কিভাবে কাটছে, সেটি বুঝতে প্রথমেই মৌলিক চাহিদার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা) প্রথমটি, অর্থাৎ খাবার নিয়েই আলাপ শুরু করা যাক। শেষবার পোষাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পর বাজারে দ্রব্যমূল্য কিভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার একটি চিত্র তুলে ধরছি।

 

 

শেষবার পোশাক শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণার বছরটি ছিল ২০১৮ সাল, ৫ বছর আগে। টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) দেয়া তথ্য থেকে আমরা বেছে নিয়েছি ২০১৮ থেকে ২০২২ এই পাঁচ সালের চাল, আটা, তেল, আলু, সয়াবিন, পেঁয়াজ, ডিম, ব্রয়লার মুরগি, রুই, গরুর মাংসের দাম। এছাড়া ঢাকার কারওরান বাজার, হাতিরপুল বাজার এবং আশুলিয়ার শ্রমিক অধ্যুষিত অঞ্চল এবং মধ্যবিত্ত এলাকা থেকে বাজারের দাম যাচাইসহ অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করেছি। টিসিবির বাইরেও আমরা বিশেষভাবে পাঙ্গাস-তেলাপিয়া, ছোট মাছ ও বেশ কিছু শাক সবজির এখনকার দাম এখানে যুক্ত করেছি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে প্রায় সব সময়েই টিসিবির দেয়া হিসাবের চাইতে অনেক বেশি দামে বিভিন্ন বাজারে নিত্যপণ্য বিক্রি হয়।

 

 

“ছক ক” তে আমরা দুধরনের চালের দাম পর্যালোচনা করেছি-- মাঝারি ও মোটা চাল। যদিও টিসিবির চালের ৩ রকম ভেদের প্রথম ভাগে আছে: চাল সরু (নাজিরশার/ মিনিকেট); ২য় ভাগে আছে মাঝারি চাল (পাউজাম/লতা); শেষ ভাগে চাল মোটা (স্বর্ণা/চায়না/ ইরি)। তিন ধরনের চাল প্রকৃতার্থে সমাজের ৩টি শ্রেণীর খাবারের পাতের সামর্থ্যকে নির্দেশ করে। টিসিবির তালিকায় আরো বেশ কিছু পণ্যের নামকরনেই সেই বিভেদ স্পষ্ট ভাবেই টের পাওয়া যায়। 

 

ছক: ক: চাল. আটা, আলু, ডিম, তেল, ডাল, পেঁয়াজ (শর্করা ও অন্যান্য)

 তথ্যসূত্র: টিসিবি ও তথ্য সম্পাদনা: গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি। তবে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি বাজার যাচাইয়ে দেখতে পেয়েছে এই সব পণ্য বাজারে ও দোকানে এর চেয়ে অনেক বেশি পণ্যসামগ্রি দামে বিক্রি হয়

 

বাজারের তথ্য ও অবস্থা বিচারে আমরা দেখি বাজারের শ্রেণিভেদ যেমন আছে, তেমনি দ্রব্যের মানেরও প্রকার ভেদ আছে। যেমন হাতিরপুলে সাধারণত মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত বাজার করেন। আবার কারওরান বাজারে সকল শ্রেণির মানুষ বাজার করলেও সেখানকার কাঁচা বাজার মধ্যবিত্ত ও শ্রমিকের জন্য এক নয়। তেমনি আশুলিয়ার বিভিন্ন শ্রমিক পাড়া এবং প্রধান রাস্তার পাশের বাজারের মধ্যেও আছে মান, দাম ও ক্রেতার পার্থক্য। মূল রাস্তা ঘেষা বাজারে যান মূলত কারখানার প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আর এলাকার ভেতর বাজার করেন শ্রমিকরা। ভালো মানের চাল, সবজি, মাছ, মাংস কখনোই শ্রমিকদের বাজারে মেলে থাকে না।

 

 

শ্রমিক অঞ্চলে কাজের সূত্রেই বাজার বুঝতে একবার আশুলিয়ার একজন দোকানদারকে জিজ্ঞস করলাম ‘পাইজাম চাল এর দাম কত? উত্তরে তিনি জানান ‘পাইজাম চাল কিনার লোক এখানে নাই। ঐসব বেচি না। এখানে সবাই ২৮ ও ২৯ কেনে’’। অর্থাৎ মাঝারি এবং মোটা চালের মাঝামাঝি বিআর ২৮/২৯ যা হাফবয়েল বা ধামরাই নামে শ্রমিকাঞ্চলে পরিচিত, সেটিই আশুলিয়ায় শ্রমিকরা কিনতে পারেন।

 

 

 

টিসিবির এই দামের তালিকা থেকেই বোঝা যায় শ্রমিকের পাতে ভাত ও রুটির বাজেটে কতটা টান পড়েছে। কিন্তু বাকি সব কিছুর দাম আমলে না নেয়া পর্যন্ত এই টানটা আসলে কতগুন ভয়াবহ, তা বোঝা যাবে না। আর সর্বদাই মনে রাখতে হবে, বাজারে সব কিছুরই দর টিসিবির হিসাবের চাইতে অনেকগুলো বেশি। 

 

 

 

টিসিবির এই দামের তালিকা থেকেই বোঝা যায় শ্রমিকের পাতে ভাত ও রুটির বাজেটে কতটা টান পড়েছে। কিন্তু বাকি সব কিছুর দাম আমলে না নেয়া পর্যন্ত এই টানটা আসলে কতগুন ভয়াবহ, তা বোঝা যাবে না। আর সর্বদাই মনে রাখতে হবে, বাজারে সব কিছুরই দর টিসিবির হিসাবের চাইতে অনেকগুলো বেশি। 

 

 

 

 "ডাইল রান্ধি খুব পাতলা, যাতে ১ কেজি ডাইলে অনেক দিন চলে"। ছবি তাসলিমা আখ্‌তার

 

 

 

২. বনরুটির ছোট হয়ে যাওয়া

 

 

টিসিবিতে দাম যাই বলা থাকুক না কেন, বাজারে বর্তমানে ৬০ টাকার নীচে শ্রমিকের চাল পাওয়া মুশকিল। বাংলাদেশের শ্রমিকরা ভাতের উপরই বেশী নির্ভরশীল। এই চাল গত ৫ বছরে প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। গড়ে হিসাব করলে শতকরা প্রায় ৯-১০%। ৫ বছরে প্যাকেটকৃত আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৫৭%। ডিম প্রায় ১১০%। আলু প্রায় ৫০%। ডাল প্রায় ৭৯%। তেল প্রায় ৯৪%। এভাবে প্রত্যেকটি জিনিসের দাম ৫ বছরে ১০% থেকে ৯০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির হার বিশেষভাবে উর্ধমুখী হয়েছে বিগত ১ বছরে।

 

 

চাল, আলু, আটা বা শর্করা জাতীয় খাবার দাম কম হওয়ায় সুষম খাবারের অন্যান্য খাদ্য উপাদানের (আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ) চেয়ে শর্করা জাতীয় খাবারের ওপর-ই শ্রমিক বেশী নির্ভরশীল। এগুলো দিয়ে বানানো ভাত, আলু ভাজি, আলু ভর্তা, চাপড়া, রুটি, বনরুটি ইত্যাদি খেয়েই বাংলাদেশের অধিকাংশ শ্রমিক পেট ভরান। পুরুষ শ্রমিকদের অনেকেই ওভার টাইমের সময় টিফিনের ২০ টাকা (যা মাসের শেষে বেতনের সাথে দেয়া হয়) খরচ করে সিঙ্গারা, বিস্কিট, পুড়ি, ছোলা, বনরুটি, চা ইত্যাদি কিনে খান।

 

 

নারী শ্রমিকদের বড় অংশ এই সামান্য ব্যায়টাও করেন না। টাকাটা বাঁচাতে তারা সন্ধ্যায় টিফিন হিসাবে বাসা থেকে নানান খাবার বানিয়ে কারখানায় নিয়ে আসেন। সময়ের অভাব হলে চাল ভাজা, সস্তা বিস্কুট বা চানাচুর খান কেউ কেউ। অনেক মেয়ে শ্রমিক আটা দিয়ে তৈরি‘চাপড়’ (সামান্য চিনি দিয়ে কোন মতে সিদ্ধ করে মিষ্টি পিঠার মতো খাবার) বানিয়ে নিয়ে যান। চাল, আটা, ইত্যাদির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায়, এবং আরও সব খরচ সামলাতে শ্রমিকরা এই সস্তাতম খাবার চাল ভাজা এবং চাপড়া নামের আটার পিঠাও এখন আগের চাইতে কম খান।

 

 

নারী শ্রমিকদের বড় অংশ এই সামান্য ব্যায়টাও করেন না। টাকাটা বাঁচাতে তারা সন্ধ্যায় টিফিন হিসাবে বাসা থেকে নানান খাবার বানিয়ে কারখানায় নিয়ে আসেন। সময়ের অভাব হলে চাল ভাজা, সস্তা বিস্কুট বা চানাচুর খান কেউ কেউ। অনেক মেয়ে শ্রমিক আটা দিয়ে তৈরি‘চাপড়’ (সামান্য চিনি দিয়ে কোন মতে সিদ্ধ করে মিষ্টি পিঠার মতো খাবার) বানিয়ে নিয়ে যান। চাল, আটা, ইত্যাদির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায়, এবং আরও সব খরচ সামলাতে শ্রমিকরা এই সস্তাতম খাবার চাল ভাজা এবং চাপড়া নামের আটার পিঠাও এখন আগের চাইতে কম খান।

 

গত বছরের ১৫ থেকে ২০ টাকার আলু এখন বিক্রি হচ্ছে আগের চাইতে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ টাকা বেশী দরে। আটা ময়দা উভয়ের দাম বৃদ্ধির কারণে বাইরে সিঙ্গারা, পুরি, রুটি বা পরোটাও কম কিনতে পারেন। ফলে এখানেও তারা চাপের মধ্যে পড়েছেন।

 

 

“ছক খ” তে দেখতে পাবো গত ৫ বছরে চাল, আটা ও আলু দামের তারতম্য। চাল (৯-১৮%) ৬০ এর কাছাকাছি, আটা ৫০ থেকে ৫৫ টাকা (৫৭%)  আলু প্রায় ৩০ টাকা কেজি (৫০%) ।

 

ছক : খ- ৫ বছরে চাল, আটা ও আলুর দামের ফারাক

    গ্রাফ ও তথ্য সম্পাদনা: গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি। তথ্য সূত্র: টিসিবি

 

 

টিসিবির তথ্য থেকেই দেখা যাবে, গত ৬ মাসের মধ্যে দফায় দফা আটার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। মে -জুন মাসে আটার দাম বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১৫/ ২০ টাকা বেড়েছে। শ্রমিকদের এলাকায় দোকানে রুটি/পরোটার দাম ৭/৮ থেকে বেড়ে ১০/১৫ টাকা, সিঙ্গারা ৫ টাকা থেকে বেড়ে ৮-১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

 

বৃদ্ধি পেয়েছে বনরুটির দামও। যে বনরুটি ১০ টাকা করে কিনে খেতেন শ্রমিক, তার দাম বাড়িয়ে প্রথমে ১৫ টাকা করেন কারিগর ও দোকানিরা। রাতারাতি এতে শ্রমিকদের বনরুটি কেনা কমে যায়। হার কমলে দাম আবার ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এবার বন রুটির আকার ছোট হয়ে আসে।

 

 

বৃদ্ধি পেয়েছে বনরুটির দামও। যে বনরুটি ১০ টাকা করে কিনে খেতেন শ্রমিক, তার দাম বাড়িয়ে প্রথমে ১৫ টাকা করেন কারিগর ও দোকানিরা। রাতারাতি এতে শ্রমিকদের বনরুটি কেনা কমে যায়। হার কমলে দাম আবার ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এবার বন রুটির আকার ছোট হয়ে আসে। বনরুটির আগের আকার রাখলে যে দাম হয়, তাতে শ্রমিকের পোষায় না বলে তারা কিনতে পারবেন না, ফলে কারিগররা বনরুটিকে ছোট করে ফেলেন। অন্যদিকে যে দামে রাখলে বিক্রি ঠিক থাকবে, সেই দামে আগের আকার রাখলে কারিগরের পোষাবে না বলে বনরুটির আকারটাই শেষ পর্যন্ত ছোট হয়ে গেলো। এভাবে শ্রমিকের পেটের ওপর দিয়েই দামবৃদ্ধির কোপটা শেষ পর্যন্ত গেলো।

 

৩. দাম কমলেও কেন কমেছে ব্রয়লার মুরগির বিক্রি?

 

 

আগেই বলা হয়েছে, আমিষ জাতীয় খাবার কম খেতে পারেন শ্রমিকরা। খেলেও সব চাইতে কম দামের আমিষই তাদের ভরসা।

“ছক গ” দেখলে আমরা গত কয়েক বছরের মাছ-মাংসের দামের ফারাক বুঝতে পারবো।

 

 ছক : গ: মাছ-মাংস (আমিষ)

        তথ্যসূত্র: টিসিবি তথ্য পর্যালোচনা ও সম্পাদনা: গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি। তবে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি বাজার যাচাইয়ে দেখেছে এর চাইতে অনেক বেশি দামে পণ্যগুলো বিক্রি হয়

 

 

২০১৮ তে ঘোষিত এবং ২০১৯ এ কার্যকর হওয়া ৮ হাজার টাকা মজুরিতে শ্রমিকের পক্ষে গরুর মাংস (৬৫০-৬৮০), ইলিশ মাছ বা অন্যান্য দামি মাছ কেনা অসম্ভব। দাম কম থাকায় সাধারণত শ্রমিকরা ব্রয়লার মুরগি ও তেলাপিয়া, পাঙ্গাস মাছসহ কমদামি মাছ বেশি খান। আগে শ্রমিকরা মাঝেমধ্যে চাষের রুই ও কাতল কিনতে পারলেও এখন তা সাধ্যের বাইরে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে এখন গরিবের মাছ হিসাবে পরিচিত পাঙ্গাস বা তেলাপিয়া মাছের চেয়েও ব্রয়লার মুরগির দাম কম। পাঙ্গাস যেখানে কেজি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ থেকে ১৫০ টাকায়। বাকি কয়েক ধরনের আমিষের সাথে ব্রয়লার মুরগির দাম বৃদ্ধি না পাওয়ার চিত্রটি “ছক ঘ”তে মিলবে।

 

 

 

ছক: ঘ: গত ৫ বছরে মাছ, মাংস, দুধ ও মাছের দাম

গ্রাফ ও তথ্য সম্পাদনা: গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি। তথ্য সূত্র: টিসিবি

 

 

কিন্তু গত ৫ বছরে ব্রয়লার মুরগির দাম না বাড়লেও আগের চেয়ে ব্রয়লার কেনার হার কমেছে। কারণ সংসারের বাকি সব খরচের উর্ধগতির চাপে দাম কমতে থাকা সেই ব্রয়লার মুরগি খাওয়াও কমিয়ে দিয়েছেন শ্রমিকরা। বাকি সব খরচ বৃদ্ধির উদারহরণ হিসেবে বলা যাক তেলের কথা। এ বছর সয়াবিন তেলের দাম গত ৫ মাসে ৪ বার বৃদ্ধি পেয়েছে। ৯৪% বৃদ্ধি ঘটেছে এখাতে। ১ বছর আগে এই তেলের দাম ছিলো ১৪০-১৫০ টাকা। এছাড়া দাম বেড়েছে জ্বালানির, দাম বেড়েছে সাবানের, দাম বেড়েছে অন্য সকল উপকরণের। 

 

‘‘আগে মাসে আমরা পরিবারের দুইজন ২/৩ বার রুই মাছ বা বয়লার মুরগি কিনতাম। এই মাসে সেটাও কেনা হয় নাই। এই মাসে ছোট মাছ, শুটকি এসব বেশী খাওয়া হইছে। আগে মেয়েকে বাসায় মুড়ি, বিস্কিট বাইরে থেকে খাবার জন্য কিছু টাকা যা পারি দিতাম। এখন সেটাও দিতে পারি না।“

 

 

 

বাজারদর ও শ্রমিকের সামর্থ্যের বাস্তব পরিস্থিতি বিষয়ক গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির উদ্যোগে একটি গবেষণা পরিচালনার সময়ে সাক্ষাতকারে একজন নারী শ্রমিক জানান ‘‘আগে মাসে আমরা পরিবারের দুইজন ২/৩ বার রুই মাছ বা বয়লার মুরগি কিনতাম। এই মাসে সেটাও কেনা হয় নাই। এই মাসে ছোট মাছ, শুটকি এসব বেশী খাওয়া হইছে। আগে মেয়েকে বাসায় মুড়ি, বিস্কিট বাইরে থেকে খাবার জন্য কিছু টাকা যা পারি দিতাম। এখন সেটাও দিতে পারি না।“

 

 

আর একজন শ্রমিক জানান ”জিনিসপত্রের দাম লাগাম ছাড়া হওয়ায় এখন সবজি  আর গুড়া মাছ বেশি কেনা হয়। অল্প গুড়া মাছ অল্প সবজিতে দিয়ে এক তরকারি পাক হয়।“ তিনি আরো বলেন “ডাইল কিনলেও রান্ধি খুব পাতলা, ১ কেজি ডাইলে যাতে অনেক দিন চলে। আগে কলা ছাড়াও মৌসুমী ফল অল্প দামের মধ্যে কিনা হইতো এখন তাও কিনতে চিন্তা করতে হয়।”  

 

বাজার যাচাইয়ের কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, আশুলিয়ার শ্রমিক পাড়ায় যে নিম্ন মানের সবজি পাওয়া যায়, সেই একইমানের বা তারও খারাপ মানের পণ্য পাওয়া যায় ঢাকার কারওরান বাজারের বাইরে খোলা জায়গায়ও। কারওরান বাজারে সকল শ্রেণির ক্রেতা গেলেও শ্রমজীবীর মানুষেরা যে অংশটাতে যান, সেখানে রয়েছে খারাপ মানের জিনিসপত্রের সস্তা বাজার। মাছের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি বেশির ভাগ শ্রমিক পাঙ্গাস, তেলাপিয়াসহ কম দামি মাছ ও ছোট মাছ বেশি খান।

 

বাজারে দ্রব্য মূল্য বাড়ার ফলে বড় মাছের বদলে ছোট মাছ কিনে সেটা যে সবজির সাথে মিশিয়ে খান বেশির ভাগ শ্রমিকরা, সেই সবজির দামও অত্যন্ত চড়া। বাজারে চিচিঙ্গা, ধুন্দুল দাম কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পটল-ভেন্ডির দাম ৩০থেকে ৪০ টাকা, শাক ১০ থেকে ২৫ টাকা। ফলে সবজির দামও বাড়ার কারণে শ্রমিকরা সবজি কিনতে পারছেন আগের চেয়ে কম।

 

 

৫. শ্রমিকের শরীর টিকছে না

 

 

গত কয়েক বছরে বাজার পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। কিন্তু এর আগের সময়েও দেহ গঠন ঠিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ২২০০-৩০০০ কিলোক্যালোরির শক্তি উৎপাদনের মত সুষম খাবার শ্রমিকরা খেতে পেতেন না। তাদের বেতনে ডিম, দুধ, মাছ, মাংস, মাখন, ফল-মূল তাদের খাবারের তালিকায় নিয়মিত হবার কোনই সুযোগ ছিল না। বেশির ভাগ শ্রমিক উপলক্ষ ছাড়া বাসায় চিনি বা দুধ কেনেন না। আগে থেকেই তারা খাদ্য তালিকা থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যমান বাদ দিতে বাধ্য হয়ে শর্করা জাতীয় খাবার শ্রমিকরা বেশি বেশি গ্রহণ করতেন। এখন এমনকি বাড়িতে শিশু থাকলে কিংবা আত্মীয় মেহমান আসলে বা কোন উপলক্ষেও দুধ-চিনি কেনা কমে গিয়েছে বাড়তি দামের কারণে। কেননা দুধের দাম পাঁচ বছরে বেড়েছে প্রায় ৫৯% ভাগ, চিনির দাম ৩৭ ভাগ। মজুরি সেই একই আছে।

 

 

  ছক ঙ: ২ : ৫ বছরে চিনি ও দুধের দাম বৃদ্ধি

   তথ্যসূত্র: টিসিবি তথ্য সম্পাদনা ও পর্যালোচনা: গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি ।

 

 

এ অবস্থায় আমিষ , ভিটামিন, স্নেহ ও খনিজ জাতীয় খাবারের ন্যূনতম সমন্বয়ের বদলে শর্করা জাতীয় খাবারের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় শ্রমিকদের পুষ্টি পরিস্থিতি বর্তমানে আরো খারাপ অবস্থার দিকে যাচ্ছে।

 

দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের আর্থিক সংকটের মাত্রাটা বোঝা যায় যখন তারা আগের চাইতে কম পুষ্টি গ্রহণে বাধ্য হন। নারী শ্রমিকদের অবস্থা এক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি নাজুক। নারী শ্রমিকদের সন্তান জন্মদানের জন্য শরীরে বাড়তি পুষ্টি ও খাদ্য দরকার। কিন্তু বর্তমানে কম পুষ্টিকর খাবার অধিক খাওয়া এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করার কারণে তারা দ্রুত ক্লান্ত হচ্ছেন, রোগাক্রান্ত হচ্ছেন এবং হারাচ্ছেন কর্ম উদ্দীপনা ও কর্মক্ষমতা। নারী-পুরুষ উভয় শ্রমিকই অনির্দিষ্ট সময় কাজের চাপ, ওভার টাইম, ছুটির অভাব এবং কম মজুরির কারণে নিজেদের শরীরের ক্ষয় মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

 

দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকদের আর্থিক সংকটের মাত্রাটা বোঝা যায় যখন তারা আগের চাইতে কম পুষ্টি গ্রহণে বাধ্য হন। নারী শ্রমিকদের অবস্থা এক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি নাজুক। নারী শ্রমিকদের সন্তান জন্মদানের জন্য শরীরে বাড়তি পুষ্টি ও খাদ্য দরকার। কিন্তু বর্তমানে কম পুষ্টিকর খাবার অধিক খাওয়া এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করার কারণে তারা দ্রুত ক্লান্ত হচ্ছেন, রোগাক্রান্ত হচ্ছেন এবং হারাচ্ছেন কর্ম উদ্দীপনা ও কর্মক্ষমতা। নারী-পুরুষ উভয় শ্রমিকই অনির্দিষ্ট সময় কাজের চাপ, ওভার টাইম, ছুটির অভাব এবং কম মজুরির কারণে নিজেদের শরীরের ক্ষয় মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

 

 

৬. শুধু খাবার নয়, যাতায়াতেও নিঃস্ব হচ্ছেন শ্রমিকরা

 

 

খাদ্যদ্রব্যর পাশাপাশি অন্যান্য দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির দিকেও লক্ষ্য করা জরুরি। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেতে পেতে ৫ জুন ২০২২ এ ৯৭৫ টাকা থেকে ১০৮০(২ চুলা) টাকা হয়েছে। ২২.৭৮% শতাংশ দাম বেড়েছে। গত বছরের (২০২১) নভেম্বরে ৪ তারিখে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে একলাফে ১৫ টাকা। অর্থাৎ লিটার প্রতি ৬৫ থেকে এখন ৮০ টাকা। এর ফলে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পায় গড়ে ২৬. ০৫%। সব নিত্যপণ্যের দাম এতে আরও একদফা বৃদ্ধি পায়।

 

গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধিতে গত বছরের শেষ থেকেই শ্রমিকরা একটা বড় ধাক্কার মধ্যে আছেন। ডিজেলের দাম বাড়ার পর সব বাসের ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে লোকাল বাস প্রতি স্টপেজ মিনি বাস ৫  টাকা নিম্ন ভাড়া ছিলো, সেখানে এখন তা ৮ টাকা। আর বড় বাসে যে ভাড়া ছিল ৭ টাকা, তা ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত বাসের ভাড়ার বেশি ভাড়া নিচ্ছে বাস মালিকরা। অনেক বাসে ১৫ টা পর্যন্ত নিম্ন ভাড়া নেয়া হয়। (সূত্র: কালের কণ্ঠ: ৭ নভেম্বর)। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধিসহ পরিবহন খরচ বাড়ার প্রভাব অন্যসব দ্রব্যের মধ্যেও পড়েছে। এর প্রভাবে চাল-ডাল-তেল-শাক-সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।  

শ্রমিকের জীবনের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে দেয়ার জন্যই যেন জুন ৪ তারিখে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পায়, দুই চুলা ৯৭৫ টাকা থেকে ১০৮০ টাকা হয়। বৃদ্ধির পরিমান ১০৫ টাকা, বৃদ্ধির হার ২২.৭৮%।  

 

 

 এভাবে গাদাগাদি ঘুমও অজস্র শ্রমিকের জীবনের বাস্তবতা। ছবি তাসলিমা আখ্‌তার

 

 

 

 ৭. শ্রমিকের দিন চলে কী করে?

 

 

বাংলাদেশে ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিক গত ২০১৮ সালের মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত মজুরি ৮ হাজার টাকায় কাজ করছেন। এর আগে (২০১৩-১৮) মজুরি ছিল ৫৩০০ টাকা। ৫ বছর আগে তীব্র শ্রমিক আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ৪৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়, মোট মজুরি ৮ হাজার টাকা। তখন শ্রমিকদের দাবি ছিলো ১০ হাজার বেসিক এবং সর্বমোট ১৬ হাজার টাকা বেতন। কিন্তু মালিকরা বেসিক দিয়েছেন ৪১০০ টাকা এবং সব মিলিয়ে ৮ হাজার টাকা বেতন। চাহিদার তুলনায় অনেক কম বেতন দেয়ার বিরুদ্ধে শ্রমিকদের আন্দোলন থামাতে তখন আশুলিয়ায় স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের বড় অংশকে গ্রেফতার করা হয়। মালিকরা সব সময়ই বেসিকের পরিমান কম দেন, এতে ওভারটাইমসহ অন্যান্য খাতেও শ্রমিকদের মজুরি কম ধরা যায়।

 

 

২০১৯ সালেই শ্রমিক সংগঠনগুলো বলেছিল, শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত বেতন ৮ হাজার টাকায় ৪ সদস্য কিংবা ৬ জনের সংসার চালানো অসম্ভব। ২২০০-৩০০০ কিলো ক্যালোরি শক্তি উৎপাদনের জন্য যে খাবার প্রয়োজন, সেই খাবারের ব্যয় এতে কোনভাবেই সংকুলান হয় না। শ্রমিকরা বর্তমানে ওভার টাইম এবং কখনো কখনো অনির্দিষ্ট সময় কাজ করে তাদের জীবন কোন মতে নির্বাহ করেন। কেবল মজুরির উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার কোন সুযোগ তাদের নেই

নীচে ১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৮ এর পর্যন্ত মজুরি বোর্ড এর নির্ধারিত পোশাক শ্রমিকের বেতন এবং শ্রমিকদের দাবি উত্থাপন করা হলো।

 

 

ক. ১৯৯৪ সালে মজুরি ছিল ৯৩০ টাকা।

খ. আন্দোলনের মুখে ২০০৬ এ ১৬৬২ টাকা করা হয়। তখন দাবি ছিল ৩০০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি।

গ. ২০১০ সালে আরেকদফা শ্রমিক আন্দোলনের মুখে মোট বেতন ৩০০০ টাকা করা হয়। তখন দাবি ছিল ৫০০০ টাকা।

ঘ. ২০১৩ সালে আবারও আন্দোলনের সুবাদে শ্রমিকদের বেতন ৫৩০০ টাকা করা হয় । যদিও তখন শ্রমিকদের দাবি ছিল ন্যূনতম ৮ হাজার টাকা বেসিক সহ মোট মজুরি ১২০০০ টাকা নির্ধারণ করার।

ঙ. ২০১৮ সালে মোট মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৮০০০ টাকা । তখন দাবি ছিল ১০ হাজার টাকার বেসিক সহ মোট মজুরি ১৬০০০ টাকা করার। উল্লেখ্য যে, এই একবছরই সরকার নিজের আইন মেনে যথাসময়ে মজুরি বোর্ড গঠন করেন। কিন্তু সেই মজুরি বোর্ড শ্রমিকদের বেঁচে থাকার জন্য তখন ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ১৬ হাজার টাকার বদলে অর্ধেক, অর্থাৎ ৮ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে।

 

 

১৯৯৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির আওয়াজ তুলে রাস্তায় নেমে এলেই কেবলনতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়।

 

শ্রমআইনের ১৩৯ এর ৬ উপধারা অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পর পর এমনিতেই মজুরি বোর্ড গঠন করার কথা থাকলেও একই আইনের ১৪০ এর ক অনুযায়ী প্রয়োজনে দেশীয় পরিস্থিতিতে যে কোন সময় মজুরি পূনর্বিবেচনায় বোর্ড গঠন করার ধারাও আছে। আন্দোলনের মুখে এই জরুরি ভিত্তিতে মজুরি বোর্ড গঠনের নজির ২০১০ এবং ২০১৩ তে দেখা যায়। এই দুই পর্বেই দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশেহারা শ্রমিকদের আন্দোলনের চাপে একবার ৪ বছর পর, আরেকবার ৩ বছরের মাথায় মজুরি বোর্ড গঠন করতে বাধ্য হয় মালিক ও সরকার।

 

 

শ্রমআইনের ১৩৯ এর ৬ উপধারা অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পর পর এমনিতেই মজুরি বোর্ড গঠন করার কথা থাকলেও একই আইনের ১৪০ এর ক অনুযায়ী প্রয়োজনে দেশীয় পরিস্থিতিতে যে কোন সময় মজুরি পূনর্বিবেচনায় বোর্ড গঠন করার ধারাও আছে। আন্দোলনের মুখে এই জরুরি ভিত্তিতে মজুরি বোর্ড গঠনের নজির ২০১০ এবং ২০১৩ তে দেখা যায়। এই দুই পর্বেই দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশেহারা শ্রমিকদের আন্দোলনের চাপে একবার ৪ বছর পর, আরেকবার ৩ বছরের মাথায় মজুরি বোর্ড গঠন করতে বাধ্য হয় মালিক ও সরকার।

 

করোনা কালে ৩ লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন। ৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অর্ডার তখন বাতিল হয়। পরবর্তীতে কিন্তু ৯০ শতাংশ অর্ডার ফেরত আসে। শ্রমিকরাও অনেকে নতুন কারখানায় কাজ পান। কিন্তু তাদের আয় কমে যায়। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন অনেককে বেকার থাকতে হয়। একদিকে করোনার ধাক্কা অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের নির্মম চাপ  শ্রমিকদের উপর থাকলেও মজুরি বোর্ড গঠন করার বিষয় সরকার এবং মালিকদের কোন  উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শ্রমিক এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা ও ২০ হাজার টাকা মজুরি করার জন্য গত ১ বছরের বেশি সময় ধরে বলে আসছে। বিশেষভাবে গত এক বছরে দ্রব্যমূল্যে উর্ধ্বগতিতে শ্রমিকের জীবন আরো বিপর্যস্ত হয়েছে।

 

সম্প্রতি সিপিডি একটি গবেষণায় দেখিয়েছে, ঢাকায় একজনের খাবারের খরচই শুধু ৫৩৩৯ টাকা। ৪ জনার খাবার খরচ ২১,৩৫৮ টাকা। মাসে একটি পরিবারের খরচ হয় ৪২ হাজার ৫৪৮। শ্রমিক সংগঠনের দিক থেকে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ২০ হাজার টাকার দাবি ১ থেকে দেড় বছর আগে তোলা হয়েছিল। অথচ গত ৫ বছরের মধ্যে শেষ এক বছরে অর্থাৎ ২০২১-২০২২ সালে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার ব্যাপক। “ছক ক” দেখলেই সেই চিত্র স্পষ্ট হয়। এই কারণেই বর্তমান বাজার পরিস্থিতির বিবেচনায়  বিভিন্ন সংগঠন প্রস্তাবিত মজুরি ২০ হাজার টাকার চাইতে আরও বেশি বৃদ্ধি করে দাবি তোলার কথা ভাবছে। নিয়ন্ত্রণহীন বাজার বিচারে ২০ হাজার টাকার দাবিকে এখন আর যথেষ্ট বিবেচিত না হওয়া তারা এখন নতুন করে আরও বেশি মজুররি দাবি উত্থাপনের প্রয়োজন বোধ করছে। সেই মজুরিকে এমন হতে হবে যেন তা শ্রমিকের ন্যূনতম চাহিদাগুলো মেটাতে পারে। যে কোন অযুহাতে মজুরি বৃদ্ধির এই দাবিকে উপেক্ষা করা মানে শ্রমিকের বেঁচে থাকার অধিকারকেই অস্বীকার করা।

 

৮. মালিকদের মুনাফা কমেনি

 

 

একদিকে শ্রমিকরা দুর্দশা নিমমজ্জিত, অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাকখাতের নানান সাফল্যের আলাপ অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সামনে এসেছে। বিশ্ব বাজারে পোশাক কেনার গতি করোনাকালে কিছুটা স্থবির হলেও পরবর্তীতে এর ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি নতুন নতুন বাজারও তৈরী হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের ঘুরে দাঁড়ানো এবং রপ্তানি আয়ের উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধির খবর ছাপা হচ্ছে পত্রিকায়।

 

 

প্রথমেই উদ্ধৃত করা যেতে পারে সরকারি হিসাব। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রথম ৬ মাসে ( জুলাই -ডিসেম্বরে) সারা বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানী হয়েছে ১ হাজার ৯৯০ কোটি ডলার, এটা আগের বছর ছিল ১ হাজার ৫৫৪ কোটি ৫৫ লাখ ৭ হাজার ডলার। সেই অনুযায়ী রপ্তানী ও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে শতকরা ২৮ শতাংশ।

 

 

 এছাড়া পত্রপত্রিকার সূত্রে জানা গিয়েছে আরও কিছু “অগ্রগতির” চিত্র।

 

 

২০২১-২২ অর্থ বছরে আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের প্রচলিত চেনা বাজারের মধ্যে  যুক্তরাষ্ট্রে ৪৬% ইউরোপ ও কানাডার বাজারে ২৬% রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, সবচেয়ে বেশী প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ইউরোপের বাজারে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অবস্থার কারণে ক্রয় বৃদ্ধির সাথে সাথে বাজারও সম্প্রসারণ হয়েছে। অন্য দেশ থেকেও বাজার সরে এসেছে বাংলাদেশে। বিশেষভাবে চীনসহ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার, মিয়ানমার ও ইউথোপিয়ার ক্রয়াদেশ এখন বাংলাদেশে আসছে। চীনের অর্ডার স্থানান্তর হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিকভাবে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে আমেরিকা। চীন-আমেরিকার স্নায়ু যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই গতি থাকবে বলে মালিকরা মনে করেন। ততদিনে নিজেদের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির আরো বৃদ্ধি পাবে তাদের।

 

 

চেনা বাজারের সীমানা বিস্তৃত হয়েছে চিলি, চীন , জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা ও রাশিয়ার বাজার পর্যন্ত। এই অপ্রচলিত বা নতুন অচেনা বাজারে প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি বেড়েছে গাণিতকি হারে যা প্রায় ২৪.২৬ %। সার্বিকভাবে এই অবস্থায় অব্যাহত রাখার বিষয় মালিক এবং সরকার উভয় পক্ষ আশাবাদী। বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশীর  ভাষ্যে ‘চলতি বছর এই খাত ৫২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে একটি মাইল ফলক সৃষ্টি  করবে। যা হবে ৫০ বছরের বড় অর্জন।

 

 

সর্বশেষ, ৬ জুলাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয়ের এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বিজিএমইএ।

 

শ্রমিকদের দাবিটা তাই খুব সহজ। পোষাক খাতের যা কিছু অর্জন, সবই শ্রমিকদের ঘাম ও রক্তের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে। তাদেরকে বঞ্চিত রেখে মালিকদের ভাগে পুরোটা মুনাফা তুলে দেয়াটা চরম অমানবিক একটা বন্দোবস্ত। বাংলাদেশের শ্রমিক সমাজ এই বন্দোবস্ত মেনে নেবে না। শ্রমিককে অভুক্ত রেখে, তার শিশুদের শিক্ষা-চিকিৎসা বন্ধ করে, শ্রমিকের দেহ ক্ষয় করে আমরা কোন উন্নয়ন আর অগ্রগতির স্বপ্ন দেখি?

 

তাসলিমা আখ্‌তার

সভা প্রধান গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি