সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

বহুস্বর মতামত

"বস্তুনিষ্ঠ স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার গোটা সমাজের গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্যও অপরিহার্য"

২০২১-০৬-১৫

নূরুল কবীর

"বস্তুনিষ্ঠ স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার গোটা সমাজের গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্যও অপরিহার্য"

ছবি: তাপস পাল/দৃক 

 

নূরুল কবীর ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজ-এর সম্পাদক। স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য লড়াই এবং আপসহীন অবস্থানের জন্য ইতোমধ্যে সম্পাদক পরিচয়কে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। দৃকনিউজ মুখোমুখি হয়েছিল সংবাদমাধ্যম শিল্পজগতের ভেতরের নানা প্রশ্ন নিয়ে। যেগুলো নিয়ে সাধারণত মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা মুখ খুলতে চান না, হস্তক্ষেপ-চাপ, দলীয়বৃত্তি, বিজ্ঞাপন নিয়ে কারসাজি, দুর্বৃত্ত পুঁজির দৌরাত্ম্যের মতো যেসব প্রশ্ন বরাবরই প্রকাশ্যে এড়িয়ে যাওয়া হয়, সেরকম অনেক বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে এই সাক্ষাৎকারে। নূরুল কবীর কোনো দ্ব্যর্থতা না রেখে কথা বলেছেন। বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘একদলীয় শাসন ব্যবস্থাও তাই এখন সংবাদমাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ হিসেবে সমাজে হাজির রয়েছে। দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে সাংবাদিক সমাজের মেরুকরণ ও বিভক্তি এই দুঃসহ বাস্তবতা জারি রাখতে জ্বালানি যুগিয়ে চলেছে।’’

 

দৃকনিউজ: বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে দেশে-বিদেশে সম্প্রতি অনেক বিরূপ আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার উপলব্ধি কী?

 

নূরুল কবীর: বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের নিরঙ্কুশ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা কোনো কালেই ছিল না, এখনও নেই। তবে সম্প্রতি পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। দৈনিক ইত্তেফাকের ৬৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে, ২০১৯ সালে, পত্রিকাটির বর্তমান প্রকাশক ও রাজনীতিক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তার প্রয়াত বাবা ও দৈনিক হিসেবে আবির্ভূত ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এ জন্য যে, বিদ্যমান ‘বিরূপ’ পরিস্থিতির কারণে পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাকালীন গণতান্ত্রিক চিন্তা ও আদর্শের পতাকাটি সমুন্নত রাখতে পারছেন না। তার কিছু দিন পরেই, ২০২০ সালে, সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম দুঃখ করে লিখেছেন, বাংলাদেশে ‘অনুমতির গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ‘সরকারি অনুমোদনের বাইরে যে কোনো কিছু বললে বা করলে’ তা ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ কিংবা ‘জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী’ বলে বিবেচিত হতে পারে’। অতএব এটি মোটেই আশ্চর্যের নয় যে, ২০২১ সালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকালে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মানদণ্ড পৃথিবীর ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে নেমে এসেছে।

 

আমাদের সংবাদকর্মীরা এখন প্রতিনিয়ত নানা শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। ঢাকাভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ২০২০ সালেই দেশের নানা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, ‘জনপ্রতিনিধি’, সন্ত্রাসী ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা ২৪৭জন সংবাদকর্মী শারীরিক নির্যাতন, হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানিসহ বিভিন্ন রকম নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

 

গণতন্ত্রপরায়ণ বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য এখন আমাদের প্রতিনিয়ত জীবন, জীবিকা ও সম্ভ্রমের ঝুঁকি বয়ে বেড়াতে হয়। দূর অতীতের তুলনায় সমসাময়িক পরিস্থিতি বেশি বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ অতীতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের জন্য সংবাদকর্মীদের একটা সংঘবদ্ধ সংগ্রাম জারি ছিল— যা এখন অনুপস্থিত। তাছাড়া, অতীতে স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রয়াসী পেশাগত আন্দোলনের প্রতি ক্ষমতাবহির্ভূত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সামাজিক শক্তিগুলোর সক্রিয় সমর্থনও পাওয়া যেত, কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কার্যকর রাজনৈতিক তৎপরতার অনুপস্থিতিতে— তা বিরোধী দলগুলোর ওপর সরকারি নিপীড়নের কারণে হোক কিংবা বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে হোক, অথবা উভয় কারণেই হোক— এখন তা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে, সংবাদকর্মীরা বেশ নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। সকল প্রকার ‘ক্ষমতা’কে জবাবদিহিতে বাধ্য করার জন্য গণতন্ত্রপরায়ণ সাংবাদিকতার যে রাজনৈতিক কর্তব্য, সংবাদকর্মীরা তা এখন যথাযথভাবে পালন করতে অসমর্থ হয়ে পড়েছেন।

 

দৃকনিউজ: সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে বর্তমানে প্রধান অন্তরায়গুলো কী কী?

 

নূরুল কবীর: প্রথমত ও প্রধানত রাজনৈতিক। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের যে সরকার দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে, ২০১৪ সালের প্রথম থেকে সে সরকারের ক্ষমতায় থাকার কোনো অবিমিশ্র ‘রাজনৈতিক বৈধতা’ নেই। কারণ, সকল বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বিবর্জিত ২০১৪ সালের নির্বাচনে জনগণের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। অর্ধেকেরও বেশি সংসদীয় আসনে কোনো বিরোধী দলীয় প্রার্থী ছিল না, আর অন্যান্য আসনে সরকারি দলের প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কিছু প্রার্থী থাকলেও ১০ শতাংশেরও কম ভোটার গোটা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তারপর ২০১৮ সালের শেষে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশগ্রহণ করলেও ভোটের মাধ্যমে প্রকৃত জনমত প্রতিফলনের সুষ্ঠু সুযোগ ছিল না; কারণ, ১০ বছর ধরে সাজিয়ে তোলা লীগপন্থী রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও নানা বর্ণের আইন প্রয়োগকারী বাহিনীসমূহ গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জবরদস্তিমূলক দলীয় আধিপত্য জারি রেখেছিল।

 

সর্বোপরি, সিভিল প্রশাসন ও নানা রাষ্ট্রীয় বাহিনী সরকারি দলের ভোট জালিয়াতির সকল অতীত রেকর্ড ভঙ্গ করে, ভোটের আগের রাতেই লীগপন্থী প্রার্থীদের ব্যালটবাক্স ভর্তি করে রাখার কলঙ্কজনক উদাহরণ সৃষ্টি করে দলটিকে জবরদস্তিমূলকভাবে ক্ষমতাসীন রেখেছে। একদিকে জনমতের গণতন্ত্রকে পদদলিত করে লীগ সরকার দেশে কার্যত কর্তৃত্বপরায়ণ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছে, অন্যদিকে তার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন ব্যবস্থার প্রতিবাদকারী সকল রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের গণতন্ত্রপরায়ণ প্রতিবাদী তৎপরতা রুখে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের দমনমূলক সংগঠনগুলো নিপীড়নমূলক কার্যক্রম জারি রেখেছে।

 

একদিকে ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিককর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নানাবিধ পুলিশি হয়রানি, তাদের গ্রেফতার, জেল-জুলুম, পরিকল্পিত গুম, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের নামে পুলিশ ছাড়াও নানা সরকারি গোয়েন্দা বাহিনীর শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, অন্যদিকে খোদ আইন প্রয়োগকারী নানা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারকৃত অভিযুক্তদের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমাজে প্রচণ্ড ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, গোটা দেশে বিস্তার করেছে এক ভয়ের সংস্কৃতি— যেখানে মানুষ মন খুলে প্রাণের কথা বলতে ভয় পায়। দৃশ্যত দেশ ভয়াবহ স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতির এক বিপজ্জনক মহামারির কবলে নিপতিত হয়েছে।

 

কিন্তু একদলীয় ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করার জন্য, কিংবা তার ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য, শুধু দমন-নিপীড়নের কৌশল কখনও পরিপূর্ণ নিশ্চয়তা বিধান করে না, সংশ্লিষ্ট দলটির আধিপত্যমূলক রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠারও প্রয়োজন হয়। আর সেই ন্যায্যতা তৈরির একটি প্রধান অবলম্বন হচ্ছে সংবাদমাধ্যম। সংবাদমাধ্যমের সক্রিয় কর্মীরা কোনো নির্দিষ্ট দলের রাজনীতি ও ভাবাদর্শকে নিত্যদিন নিরন্তর উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করার ভেতর দিয়ে দলটির ক্ষমতায় টিকে থাকার পক্ষে, কিংবা বিরুদ্ধে, সামাজিক ন্যায্যতা নির্মাণ করতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

সেক্ষেত্রে, ভিন্নমতাবলম্বী সংবাদকর্মীগণ কর্তৃত্ববাদী যে কোনো সরকারের চোখে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত আপদ ছাড়া কিছু নয়। ফলে, যে কোনো ভাবাদর্শী একদলীয় শাসনব্যবস্থার ক্ষমতাধর কর্তৃপক্ষ সমাজে ভিন্নমতাবলম্বী সংবাদমাধ্যম ও তার গণতন্ত্রপরায়ণ বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা হ্রাস কিংবা নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর থাকে। লীগ সরকারের একদলীয় শাসন ব্যবস্থাও তাই এখন সংবাদমাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ হিসেবে সমাজে হাজির রয়েছে। দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে সাংবাদিক সমাজের মেরুকরণ ও বিভক্তি এই দুঃসহ বাস্তবতা জারি রাখতে জ্বালানি যুগিয়ে চলেছে।

 

দৃকনিউজ: সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বর্তমান সরকার ঠিক কী কী উপায়ে খর্ব করছে?

 

নূরুল কবীর: নানাভাবেই করছে, করে চলেছে। স্বৈরতান্ত্রিক সরকারসমূহ সকল দেশে সকল যুগেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষুণ্ন করার জন্য ‘আইনি’ ও ‘বেআইনি’— উভয় পথই অবলম্বন করে থাকে। ক্ষমতাসীন লীগ সরকারও তাই করছে।

‘আইনি’ কায়দায় নিয়ন্ত্রণ মানে অন্যায় ও অন্যায্য আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রণ, যেমন ধরুন ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, ২০১৮। এই আইনের ভেতর আইনটির ঘোষিত লক্ষ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এমনসব বিমূর্ত বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে, যা দিয়ে যেকোনো দেশপ্রেমিক নাগরিককে দেশদ্রোহীর তকমা লাগিয়ে শায়েস্তা করা যায়। যেমন ধরুন, ‘মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’, প্রভৃতি রাজনৈতিক প্রত্যয়ের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রোপাগান্ডাকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

 

এত ভয়ঙ্কর আইনের কারণ, এই সব রাজনৈতিক প্রতিপাদ্য সম্পর্কে সমাজের নানা শ্রেণির ইতিহাসবোধসম্পন্ন মানুষের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শিক দৃষ্টিকোণ ও অবস্থান রয়েছে, ফলে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণও। কিন্তু মুশকিল হলো, বিদ্যমান সরকার, সরকারি দল ও তাদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণাধীন পুলিশ ও প্রশাসন, এমনকী কখনও কখনও বিচারালয়, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’কে আওয়ামী লীগ ও তার রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে একাকার করে ফেলেছে; বিভিন্ন মতাদর্শগত অবস্থান ও ইতিহাসবোধ থেকে উৎসারিত বিভিন্ন বিশ্লেষণ হাজির করাকে এরা খোদ ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’বিরোধী ‘প্রচার-প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা দিয়েছে।

 

অথচ মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক চেতনা— সমতা, সামাজিক ন্যায় বিচার ও মানবিক মর্যাদা— এ দেশে প্রথম থেকেই শাসকশ্রেণির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামরিক-বেসামরিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে কার্যত পদদলিত হয়েছে। লীগ সরকারের বর্তমান সময়ে বৈষম্য, অবিচার ও অমর্যাদা প্রধান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রবণতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রবণতার বিরোধিতাকারী অনেক ভিন্নমতাবলম্বী সংবাদকর্মী, রাজনীতিক, শিক্ষক, ছাত্র ও লেখক ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের অধীনে গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেছেন, এখনও করছেন। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর অধীনে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত ৯১৩জন নাগরিক অভিযুক্ত হয়েছেন, আটক হয়েছেন ২৭৩জন। আটককৃত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে লেখক ও সাংবাদিক ৩১জন, রাজনীতিবিদ ২৭জন, ছাত্র-ছাত্রী ১৭জন, শিক্ষক রয়েছেন ১৫জন।

 

এই আইনের পূর্বতন ভাষ্য আইসিটি অ্যাক্টের অধীনে খ্যাতিমান ফটোসাংবাদিক শহিদুল আলমের দীর্ঘ কারাবাসের খবর সবাই জানেন। পরবর্তীকালে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর অধীনে আটক নাগরিকদের একজন মুশতাক আহমেদ, কারাগারে এক নিষ্করুণ মৃত্যুবরণ করেছেন। তাছাড়া, আটকাধীন অবস্থায় নির্মম জিজ্ঞাসাবাদের কারণে অনেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন।

 

স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অবাধ প্রবাহের অন্তরায়মূলক আরেকটি নিপীড়নমূলক আইন হলো অফিসিয়াল সিক্রেক্টস অ্যাক্ট। এই আইনের অধীনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে জনগুরুত্বপূর্ণ যাবতীয় রাষ্ট্রীয় তথ্য জনগণের কাছ থেকে আড়াল রাখা হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে, ১৯২৩ সালে, এই আইনটি করা হয়েছিল সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য— প্রধানত ভারতীয় সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের সশস্ত্র তৎপরতা থেকে উপনিবেশিক রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখার স্বার্থে নানা সংরক্ষিত সামরিক-বেসামরিক স্থাপনা সংক্রান্ত গোপন তথ্যাদি বিপ্লবীদের নাগাল ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য।

 

এই সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপনিবেশিক রাষ্ট্রের বড় বড় সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদেরই হেফাজতে থাকত, আর তা হেফাজতে কোনো কর্মকর্তা ব্যর্থ হলে এই আইনের অধীনে তার শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এই আইনের ফলে দেশপ্রেমিক সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষেও ভারতীয় জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মীদেরকে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। উপনিবেশিক আমলে প্রণীত হলেও এই আইনে, আর যাই হোক, দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিক-আমলা ও ব্যবসায়ী চক্র দ্বারা জনসাধারণের অর্থ লোপাটের ইঙ্গিতপূর্ণ দলিল রাষ্ট্রীয় ‘গোপন তথ্য’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের আমলাদের অসাধু অংশ, একশ্রেণির রাজনীতিকদের অনুমোদন ও প্রশ্রয়ে, এখন প্রায় সকল সরকারি ফাইলের ওপরে ‘গোপনীয়’ কিংবা ‘অতি-গোপনীয়’ ছাপ্পর মেরে রাখে। ফলে অনেক দেশপ্রেমিক সরকারি কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে সরকারী দুর্নীতির তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে ভয় পান।

 

প্রসঙ্গত, ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা’ রক্ষার নামে জাতীয়তাবাদী দলের সরকার ২০০৬ সালে দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীকে নাগরিকদের ফোনে আঁড়িপাতা ও ফোনালাপ রেকর্ড করার অসাংবিধানিক অধিকার মঞ্জুর করে একটি আইন— টেলিকমিউনিকেশন (সংশোধন) অ্যাক্ট— প্রণয়ন করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান, জাতিসংঘের নানা বিধান ও প্রবিধান, ইত্যাদি নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু তৎকালীন জাতীয়তাবাদী দলের সরকার সভ্যতার সকল নীতি—নৈতিকতা লঙ্ঘন করে এদেশে এই অসভ্য আইন প্রণয়ন ও জারি করে।

 

তখন আমি নিজে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকির সঙ্গে, এই আইনটির বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেছিলাম। আদালত সরকারের ওপর একটি রুলও জারি করেছিল, কিন্তু সরকার সেই রুলের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, আর আদালতও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ‘আদালত অবমাননার’ কোনো অভিযোগ উত্থাপন করেননি। জাতীয়তাবাদী দলের সরকার প্রণীত জনগণের মৌলিক অধিকার খর্বকারি এই অসভ্য আইন এখনও বহাল তবিয়তে জারি রয়েছে এবং ক্ষমতাসীন লীগ সরকার অন্যায়ভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা আপন কুক্ষিগত রাখার জন্য তা নির্মমভাবে ব্যবহার করে চলেছে।

 

মানবতাবিরোধী এই আইন দিয়ে বলিয়ান সরকারের অনুগত নানা গোয়েন্দাবাহিনী দেশের ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিক, বিবেকবান সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাদার সংবাদকর্মীসহ অসংখ্য রাজনীতি-সচেতন মানুষের ফোনে আড়ি পেতে রাখে, রেকর্ড করে চলে তাদের কথোপকথন। এভাবে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশকে একটি ভয়াবহ ‘অরওয়েলিয়ান রাষ্ট্রে’ অধপতিত করে ফেলেছে। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে দেশের প্রযুক্তির কেরামতি-সচেতন নাগরিকগণ এখন আর ফোনে মন খুলে কথা বলেন না। ফলে, জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল তথ্য আহরণ করা সংবাদকর্মীদের জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

যাই হোক, ‘অফিসিয়েল সিক্রেটস’ সংক্রান্ত আইনটি প্রবর্তনের ইতিহাস ও তার বয়ান পাঠ করলেই বোঝা যায় যে, আইনটি সরকারি দুর্নীতির তথ্যানুসন্ধানী সংবাদকর্মীদের জন্য প্রযোজ্য নয়— অতীতের কখনোই এই আইনের অধীনে কোনো সংবাদকর্মী গ্রেফতার হননি। অথচ, এই সেদিন, মে মাসের মাঝামাঝি, রোজিনা ইসলাম নামে একজন দক্ষ সংবাদকর্মীকে এই আইনের অধীনে গ্রেফতার করে জেল খাটানো হলো, কারণ যারা করোনা মহামারির সংকটকে ব্যবহার করে, আমলাতন্ত্রের যোগসাজসে, জনগণের কোটি কোটি টাকা লোপাট করেছে, তাদের সম্পর্কে রোজিনা কয়েকটি বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন এবং করোনা ভ্যাকসিন ক্রয় সংক্রান্ত সম্ভাব্য নতুন দুর্নীতির তথ্য উদঘাটনে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কথিত ‘গোপন দলিল’ যোগাড় করার চেষ্টা করেছেন— করোনা মহামারির সঙ্গে উদ্ভূত দুর্নীতির মহামারিতে সরকারি যোগসাজশের অনুসন্ধান করেছেন। বর্তমান সরকার এভাবেই নানা বিতর্কিত আইনের যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাধীন সাংবাদিকতা চর্চার পথকে কণ্টকময় করে তুলেছে।

 

দৃকনিউজ: কিন্তু জাতীয়-রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা তো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

 

নূরুল কবীর: অবশ্যই। তবে বলে রাখি, জাতি আর রাষ্ট্র এক কথা নয়। তাছাড়া বাংলাদেশ এক জাতির দেশও নয়, আর রাষ্ট্রটিও সমগ্র জনগণের কল্যাণকামী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সে সব অন্য কথা। এরপরও, আপনি যে অর্থে জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা তুলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। এই ‘নিরাপত্তা’ নিয়ে আমরাও অনেক উদ্বিগ্ন— সম্ভবত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের চেয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন।এটা বোঝা জরুরি যে, রাষ্ট্রের যাবতীয় প্রকাশ্য কিংবা গোপনীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল ডাটার নিরাপত্তা বিধান জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের হয়রানি করা জাতীয় নিরাপত্তার ধারণার পরিপূর্ণ পরিপন্থী।

 

আবার, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মাধ্যমে সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যাবলি কোনো সরকারি কর্মকর্তা কর্তৃক ভিনদেশের স্বার্থে গোয়েন্দাবৃত্তির হাত থেকে রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় তথ্য আহরণে সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে এই আইন ব্যবহার করা জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী, কারণ ‘জাতীয়’ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য-জ্ঞানে সমৃদ্ধ না হয়ে কোনো জাতি তার আপন নিরাপত্তা বিধানে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারে না।

 

মনে রাখতে হবে, বর্তমান যুগে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র পুরনো ধারণার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। বৈরী বিদেশি শক্তির আক্রমণ থেকে জাতীয়/রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য একদিকে যেমন ইতিহাস-সচেতন, দেশপ্রেমিক চৌকস ও শক্তিমান জাতীয় সেনাবাহিনী প্রয়োজন, তেমনি দেশের যুব-সমাজকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রয়োজন পুরো অর্থনীতির সুষম বিকাশের মাধ্যমে জনগণের দারিদ্র্য মোচন করা, গোটা জনগোষ্ঠীর সুশিক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি জারি রেখে জনপরিসরে জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ নানা রাজনৈতিক, ভাবাদর্শিক ও প্রযুক্তিগত বিষয়ে, তত্ত্ব ও তথ্যসমৃদ্ধ উন্মুক্ত আলাপ-আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে, জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠার বিপদমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।

 

কোনো ক্ষমতাসীন দলের স্থূল স্বার্থ রক্ষায় তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা দল-নিরপেক্ষ ভিন্নমতাবলম্বীদের হয়রানি করা, এক কথাতো নয়ই, বরং তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য খুবই বিপজ্জনক। ফলে, জাতীয়-রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অযথা অজুহাতে গোটা জাতিকে জনজীবন-প্রভাবিত যাবতীয় প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত রাখা, কিংবা সে সব তথ্য আহরণে ও পরিবেশনায় সংবাদকর্মীদের বাধাগ্রস্ত করা, দেশের গোটা জনগোষ্ঠীর সার্বিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এক ভয়াবহ রাজনৈতিক অপরাধ ছাড়া কিছু নয়।

 

দৃকনিউজ: আচ্ছা, আমরা আবার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ফিরে আসি। রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমান সরকার আর কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়?

 

নূরুল কবীর: এদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের আরেক জোড়া অতিচেনা সরকারি কায়দা হচ্ছে, পত্র-পত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনের সরকারি লাইসেন্স ও রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন বিতরণের দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। সরকারি ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে আপন দলের প্রতি রাজনৈতিকভাবে অনুগত বিত্তবানদেরই সাধারণত লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এক ব্যক্তিকেই একাধিক লাইসেন্স দেওয়া হয় একই সঙ্গে একাধিক পত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন পরিচালনার জন্য। সরকারপন্থী এই সব মালিক কর্তৃপক্ষ আবার তাদের মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য খুঁজে খুঁজে সরকারি রাজনীতির প্রতি অনুগত সংবাদকর্মীদের খুঁজে বের করেন।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কখনো কখনো এমনকী রাষ্ট্রীয় নানা গোয়েন্দা বাহিনীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেরও সাহায্য নেওয়া হয়, যাতে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ার ফাঁক গলিয়ে কোনো ভিন্নমতাবলম্বী সংবাদকর্মী ওই সব প্রতিষ্ঠানে ঢুকে না পড়ে। এই সব প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকভাবে বাছাইকৃত কর্মীগণ, স্বভাবতই, কী তথ্য প্রকাশে, কী তথ্যের বিশ্লেষণ উপস্থাপনায়, স্বপ্রণোদিত হয়েই সরকারি রাজনীতি ও ভাবাদর্শ সমাজে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন করে চলে— নিয়োজিত থাকে আপন রাজনৈতিক দলের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে ‘সামাজিক ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠার নিরন্তর প্রয়াসে। সে ক্ষেত্রে, তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন কোন খবর প্রচার করতে হবে আর কোনটা হবে না। এই সব প্রতিষ্ঠানের ওপর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারি নজরদারির প্রয়োজন পড়ে না, প্রয়োজনে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে চাহিদা অনুযায়ী পরামর্শ ও নির্দেশনা জানিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। এভাবে, অনেক সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কর্মীগণ সাংবাদিক না হয়ে, প্রকারান্তরে, সরকারি জনসংযোগ কর্মকর্তায় পরিণত হন।

 

তারপরও যেসব সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মীরা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ, নিজেরা জনমতের গণতন্ত্রের ওপর আস্থাশীল এবং ভিন্নমত ও বিশ্লেষণের প্রবাহ জারি রেখে সমাজে গণতান্ত্রিক ভাবনার প্রসার ঘটাতে অবিচল, তাদের জন্য শুধু সরকারি চোখ রাঙানিই একমাত্র পাওনা নয়; নানা ধরনের অন্য শাস্তিও নিয়তির মতো তাদের তাড়া করে বেড়ায়। বিজ্ঞাপনের দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা সেসব শাস্তির একটি।

 

নানা রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণে সংবাদমাধ্যম ব্যবস্থাপনা এখন একটি পুঁজিঘন ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য সৎ, সুশিক্ষিত ও দক্ষ সংবাদকর্মী যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাদের শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এবং সর্বোপরি তাদের আত্মনির্ভরশীল সম্মানজনক জীবন যাপনের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানসমূহের আয়ের প্রধান উৎস সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপন। আর এখানেই কোনো স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পোয়াবারো: সরকারি নীতি-নৈতিকতার সমালোচক প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া, কিংবা কিছু দিলেও নানা অসত্য ও অন্যায় অজুহাতে বিজ্ঞাপনের বিল আটকে রাখা, একটি প্রধান সরকারি কৌশল। বেসরকারি নানা বিজ্ঞাপনদাতা কোম্পানিকেও সরকারি লোকজন আকারে-ইঙ্গিতে বা পরিষ্কার করেই বুঝিয়ে দেয় যে, তাদের অপছন্দের প্রতিষ্ঠানকে বিজ্ঞাপনী পৃষ্ঠপোষকতা দান সরকার পছন্দ করে না। এটা হলো স্বাধীনচেতা সংবাদমাধ্যমের হাত মুচড়ে দেওয়া (ফিন্যানসিয়াল আর্মটুইস্টিং)— ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিকতাকে আর্থিকভাবে বিপন্ন করে তোলাই এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

 

দৃকনিউজ: সম্পাদক হিসেবে আপনি এই সব সরকারি অপতৎপরতার শিকার হয়েছেন কি?

 

নূরুল কবীর: দেখুন, দৈনিক নিউ এইজ-এর পাশাপাশি, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে আমি ‘বুধবার’ নামে একটি বাংলা সাপ্তাহিক সম্পাদনা শুরু করেছিলাম। বিশ্লেষণধর্মী খবর ও পর্যালোচনামূলক মতামত নিয়ে প্রতি সপ্তাহের বুধবার এটি প্রকাশিত হতো। নানা শ্রেণির গণতন্ত্রপরায়ণ মানুষের কাছে পত্রিকাটি প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু ২২ মাস নিয়মিত চালিয়ে আমরা ২০১১ সালের জুলাই মাসে পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। কারণ বিজ্ঞাপনের রাজনীতি। সরকারি বিজ্ঞাপন আমরা একেবারেই পাইনি, বেসরকারি বিজ্ঞাপন দাতারা কাগজটির প্রশংসা করেও বলত— ‘এ কাগজে বিজ্ঞাপন দিলে আমরা সরকারের কু’নজরে পড়ব। আমরা তো সরকারের সঙ্গে ঝগড়া করে ব্যবসা করতে পারব না।’ ফলে, কাগজটাকে টিকিয়ে রাখা যায়নি।

 

নিউ এইজের সম্পাদক হিসেবেও বিজ্ঞাপন সম্পর্কিত বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা সুখের নয়। সংবাদ পরিবেশনা ও সংবাদের বিশ্লেষণ উপস্থাপনার দিক থেকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্র হিসেবে ‘নিউ এইজ’—এর খ্যাতি তার পাঠকমাত্রই জানেন, আবার এটাও তাদের অজানা নয় যে, মতামত প্রকাশের দিক থেকে এই কাগজটি কোনো রাজনৈতিক দলের স্থূল স্বার্থ দেখার দায় বোধ করে না। বহুত্ববাদের ভিত্তিতে ‘জনমতের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে লিপ্ত থাকাই এই পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি। কিন্তু সরকারি দলের একটি প্রভাবশালী অংশ এবং দলবাজ ক্ষমতাবান আমলাদের অধিকাংশই এই কাগজটিকে অপছন্দ করে বললে অনেক কম বলা হবে— তারা বরং কাগজটির বিলুপ্তি কামনা করে।

 

আমার এক সাংবাদিক সহকর্মীকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন, এমন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বছর তিনেক আগে তাকে জানিয়েছিলেন যে, নিউ এইজ পত্রিকার জন্য ইস্যু করা একটি বিজ্ঞাপন একজন মন্ত্রী নিজ হাতে কেটে দিয়েছেন। সম্প্রতি অন্য এক মন্ত্রীর অভিন্ন নির্দেশের কথাও কানে এলো। নিউ এইজ-এ বেসরকারিখাতের বিজ্ঞাপন সরবরাহ বন্ধ করার জন্যও কিছু সরকারপন্থী লোক তৎপর থাকেন। এগুলো সবই স্বাধীনচেতা সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠরোধ করার জন্য আর্থিকভাবে হাত মুচড়ে দেওয়া সরকারি নীতি। আগেই বলেছি স্বৈরাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বহুত্ববাদী সমাজ-চেতনা সহ্য করে না— করতে পারে না।

 

শাসকশ্রেণির বিভিন্ন শক্তিশালী দল, বিশেষত ক্ষমতাসীন সংগঠনসমূহ, সংবাদমাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা বেআইনিভাবে ক্ষুণ্ন করে থাকে তাদের সংগঠিত পেশী শক্তির নির্মম ব্যবহারের মাধ্যমে। ঢাকাভিত্তিক নানা সংবাদমাধ্যমের বিশেষত আঞ্চলিক প্রতিনিধিরা প্রায়ই এই পেশী শক্তির শিকার হন। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরকারি দল ও প্রশাসনের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আর্থিক দুর্নীতির খবর ছাপা হওয়া মাত্রই সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মীর ওপর দলীয় পেশীবাজ কর্মীদের ঝাপিয়ে পড়ার অজস্র উদাহরণ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার দলীয়করণের কারণে এই সব হামলার শিকার সংবাদকর্মীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। সারা দেশজুড়ে বিরাজিত এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা কিংবা স্বাধীন সাংবাদিকতার চর্চা অব্যাহত রাখা খুবই দুরূহ হয়ে পড়েছে।

 

দৃকনিউজ: সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানসমূহের মালিকানা স্বাধীন সাংবাদিকতার কতটা অন্তরায়? সম্প্রতি এক তরুণীর আত্মহত্যার পেছনে বসুন্ধরা গ্রুপের একজন পরিচালকের ভূমিকা থাকার অভিযোগ উত্থাপিত হলে ওই গ্রুপের মালিকানাধীন মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরব ভূমিকা থেকেই প্রশ্নটি ফের সামনে এসেছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

 

নূরুল কবীর: মালিকানার প্রশ্নটি অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে, ব্যক্তিমালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কথা বলার আগে, আমাদের স্মরণ করা দরকার যে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, অর্থাৎ জনগণের দেওয়া করের টাকায় পরিচালিত, শক্তিমান রেডিও, টেলিভিশন প্রতিষ্ঠান ও সংবাদ সংস্থা রয়েছে। বিপুল আকারের জনবলসহ এই সব প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় খরচ এদেশের মানুষের দেওয়া করের টাকাতেই নিষ্পন্ন হয়। কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে এই রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতাসীন সরকারের ও সরকারি দলের নেতা-পাতিনেতাদের নানা তৎপরতায় সস্তা প্রোপাগান্ডায় নিয়োজিত থাকে।

 

সরকারি দলের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষসমূহের ভিন্নমত ও তৎপরতার ‘ইতিবাচক’ উপস্থাপনা তো দূরের কথা, এদের কার্যক্রমের মধ্যে দেশের বিরাট অসংগঠিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক সমস্যার কোনো তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিফলন থাকে না। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই সব সম্প্রচারমাধ্যমের কর্মী ও কর্মকর্তাদের এমনভাবে বাছাই করা হয় যে, সরকার ও সরকারি দলের কার্যকলাপের গুণকীর্তন করা ও তাদের যাবতীয় গণবিরোধী তৎপরতা আড়াল করাকেই তারা দায়িত্ব বলে বিশ্বাস করেন, জনগণকে প্রয়োজনীয় সঠিক ও সর্বাঙ্গীন তথ্য সরবরাহ করার দায় বোধ করেন না— সম্ভবত বোধ করার সুযোগও নেই। জনগণের টাকায় জনস্বার্থের বিরুদ্ধে এ এক ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক পাপাচার এদেশে নিরন্তর জারি রয়েছে। এই পাপাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

ব্যক্তিখাতে পরিচালিত সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, আগেই বলেছি, একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় পর্যবসিত হয়েছে। ফলে প্রভাবশালী পত্র-পত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনের মালিকানা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজের রাজনৈতিকভাবে প্রতিপত্তিশালী বিত্তবান শ্রেণির কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে, যাদের বিপুল অধিকাংশই তাদের মালিকানাধীন মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব জারি রাখা কিংবা আরো সম্প্রসারিত করার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেই বেশি উৎসাহী।

 

এটা পুঁজি ও পুঁজিওয়ালা শ্রেণির সাধারণ অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য। এরা এমনকী, কখনো কখনো আপন শ্রেণির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে আপন আপন মালিকানাধীন মিডিয়া-প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে থাকে। বসুন্ধরা গ্রুপ ও যমুনা গ্রুপের মালিকানাধীন দুটি পত্রিকার মাধ্যমে মালিক পক্ষসমূহের ঝগড়া-বিবাদ আমরা সবাই কয়েক বছর আগে দেখেছি। ওই বিবাদ-বিসম্বাদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বড় বড় কোম্পানির প্রভাবশালী মালিকদের অনেক অন্যায় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মানুষ যেমন অবহিত হয়েছেন, তেমনি অঢেল বিত্তের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ নিজেদের স্বার্থে কীভাবে নিজ নিজ মালিকানাধীন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে, তাও মানুষের কাছে খানিকটা পরিষ্কার হয়েছে।

 

কিন্তু সাধারণভাবে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে স্বাধীন সাংবাদিকতার সম্পর্কটি জটিল প্রকৃতির, যেটাকে, অন্তত আমাদের দেশে, কোনো সরলীকৃত ফর্মুলায় আবদ্ধ করা কঠিন। আমার নিজের অভিজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা হলো, মালিকমাত্রই স্বাধীন সাংবাদিকতার শত্রু— এমন মনে করার সুযোগ নেই কারণ, বিনিয়োগকৃত পুঁজির উৎস, আকার, প্রকার ও তার অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য ছাড়াও, এটা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট মালিকদের শিক্ষা-দীক্ষা, মনস্তাত্ত্বিক গঠন ও মর্যাদাবোধ, বেড়ে ওঠার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ, ভাবাদর্শগত অঙ্গীকার, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, তাদের সাংস্কৃতিক মানস, ব্যক্তিগত রুচিশীলতা, ইত্যাদির ওপর।

 

আমি নিজে একাধিক পত্র-পত্রিকায় কাজ করেছি, কিন্তু স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চর্চার প্রশ্নে সকল প্রতিষ্ঠানে আমার অভিজ্ঞতা এক রকমের নয়। যেমন ধরুন, একটি ইংরেজি দৈনিক থেকে ১৯৯৫ সালে আমি চাকরিচ্যুত হয়েছি, কারণ পত্রিকাটির সাপ্তাহিক সাময়িকীতে লিখিত আমার একটি নিবন্ধে পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রভাষা বিতর্কে পত্রিকাটির মালিক ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রয়াত রাজনীতিক পিতার বাংলা ভাষাবিরোধী ও উর্দুর পক্ষাবলম্বনকারী ভূমিকার কথা খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখিত হয়েছিল— যা মালিক পক্ষের পছন্দ হয়নি।

 

তারা সে সপ্তাহে সাময়িকীর বিতরণ ও বিপণন বন্ধ করে দেন, আমার অফিসের কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক থেকে লেখাটি চিরতরে মুছে দেন এবং ওই নিবন্ধ রচনার ‘অপরাধে’ আমি ‘দুঃখিত’ বলতে রাজি হইনি বলে বিনা বেতনে আমাকে কর্মচ্যুত করেন। উল্লেখ্য, আমার সংশ্লিষ্ট সম্পাদকগণ সেদিন আমার বস্তুনিষ্ঠতার পক্ষে দাঁড়াননি, কিন্তু আমার কয়েকজন নীতিনিষ্ঠ তরুণ সাংবাদিক সহকর্মী মালিক কর্তৃপক্ষের ওই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন। পরবর্তীকালে, ২০০১ সালে, আরেকটি ইংরেজি দৈনিকের মালিক-সম্পাদকের সঙ্গে মতান্তর ঘটায় আমি পদত্যাগ করেছি, তবে আমাদের মনান্তর হয়নি— দেশ ও জগতের বহু বিষয়ে আমাদের ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এখনও অটুট রয়েছে।

 

আবার, ২০০৪ সালে, একটি ইংরেজি সাপ্তাহিকের মালিক-সম্পাদকের লিখিত প্রবন্ধে প্রকাশিত একটি নির্দিষ্ট মতের বিরুদ্ধে পরবর্তী সপ্তাহে আমার একটি নিবন্ধন মুদ্রিত হয়েছিল। কিন্তু আমি চাকরিচ্যুত হইনি, সম্পাদক হেসে বলেছেন, ‘তুমি আমার বিরুদ্ধে লেগেছ’। উত্তরে বলেছি, ‘আপনার বিরুদ্ধে নয়, আপনার নির্দিষ্ট মতের বিরুদ্ধে’। তিনি ক্ষুব্ধ হননি, বরং এক পেয়ালা চা দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন, চা পান করতে করতে নানা জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিষয়ে আমাদের মতবিনিময় হয়েছে।

 

আমি নিজে ২০০৬ সালে একটি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক সম্পাদনার ভার গ্রহণ করি। সম্পাদক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতাও সমাজে প্রচলিত কিছু কিছু ধারণার সঙ্গে মেলে না। নিউ এইজ পত্রিকায় আমি ও আমার সাংবাদিক সহকর্মীগণ বরাবরই সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে দল-নিরপেক্ষ সংগ্রামে নিয়োজিত থেকেছি, আছি এখনও। সেক্ষেত্রে, পত্রিকার মালিক-প্রকাশক নানাবিধ ঝুঁকি নিয়েও আমাদের নৈতিক সমর্থন যুগিয়েছেন, যুগিয়ে চলেছেন এখনও। আমাদের সঙ্গে প্রকাশক-মালিকের কোনোই মতপার্থক্য হয় না, তা নয়। মতভিন্নতা দেখা দিলে আমরা তা নিরসন করি যুক্তিপূর্ণ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। আমাদের মতদ্বৈততা যে কখনো কোনো অচলাবস্থায় পৌঁছেনি, তার কারণ, সম্ভবত, আমাদের মতো তিনিও কতগুলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করেন, কিন্তু শাসকশ্রেণির কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি আমাদের মতো তারও কোনো বিশেষ পক্ষপাত নেই।

 

পাকিস্তানি নয়া-ঔপনিবেশিক শাসনামলে, বিশেষত ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে, সামরিক স্বৈরতন্ত্রবিরোধী প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখ সারির একজন মেধাবী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে এবং, পরবর্তীকালে, ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমগ্র ঢাকার গেরিলা অপারেশনসমূহের মূল দায়িত্বে নিয়োজিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, যে সব জনকল্যাণমূলক রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত ধারণা তার মন ও মননে প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই সবের অনেক কিছুই নিউ এইজ-এর প্রকাশক এখনও ধারণ করেন।

 

ওদিকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মৌল-চেতনাসমূহের প্রতি আমাদের সংবাদকর্মীদের রয়েছে অমলিন অঙ্গীকার— যা উভয় পক্ষের ভেতর একটা স্বাস্থ্যকর, পেশাদারি সম্পর্ক সৃষ্টিতে অবদান রেখেছে। আমি মোটেও দাবি করছি না যে, আমাদের সম্পাদক-প্রকাশক সম্পর্ক একেবারেই অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু আমার ধারণা, আমাদের প্রায়-অভিন্ন ইতিহাসবোধ এবং তা থেকে উৎসারিত গণতন্ত্রপরায়ণ সাংবাদিকতার দায় আমাদের উভয় পক্ষের মধ্যে যে সেতু নির্মাণ করেছে, তা ক্ষণভঙুর হওয়ার নয়। সে যাই হোক, সাধারণভাবে, আমি মনে করি, সম্পাদক ও মালিক-প্রকাশকের ভেতরে সমসাময়িক, এমনকী ঐতিহাসিক, নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়মিত বুদ্ধিবৃত্তিক মত-বিনিময় ছাড়াও তাদের ভেতর পেশাগত সংগ্রাম ও সমঝোতার নিরন্তর প্রক্রিয়াটি গণতন্ত্রপরায়ণ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মালিক-কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নীতিগত সংগ্রাম ও সমঝোতার ঝুঁকি ও সুবিধা গ্রহণের পথ অবলম্বন না করে, কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞার কাল্পনিক অজুহাতে, কোনো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ কিংবা কায়েমি স্বার্থবিরোধী কোনো নিবন্ধ প্রকাশে বিরত থাকা, সম্পাদকের তরফে পেশাগত নৈতিকতাবিরোধী এক ঘোরতর অপরাধ।

 

যাই হোক, বসুন্ধরা গ্রুপের একজন তরুণ মালিকের বিরুদ্ধে একজন কলেজছাত্রী হত্যার, কিংবা মেয়েটিকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার, অভিযোগ সম্পর্কে বসুন্ধরার মালিকাধীন পত্র-পত্রিকার নীরবতার বিষয়টি মিডিয়া-মালিকানার একটি ভিন্ন ধরনের প্রতি সমাজের যথাযথ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটা সকলের জানা কথা যে, আমাদের দেশে নানা বিতর্কিত উপায়ে কিছু ব্যক্তি পুঁজির পাহাড় গড়ে তুলে বড় বড় কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সেসব কোম্পানির অনেকেই মিডিয়া প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছে। বসুন্ধরা গ্রুপ ওই সব কোম্পানির একটি। মুশকিলের ব্যাপার হলো, এই সব কোম্পানির অধিকাংশই মিডিয়া ব্যবসায় যত না উৎসাহী, তার চেয়ে বেশি উৎসাহী মিডিয়া প্রতিষ্ঠান দিয়ে ব্যবসা করায়, অর্থাৎ একটি দুর্নীতিপরায়ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিরাজিত মিডিয়ার ‘ন্যুইসেন্স ভ্যালু’ ব্যবহার করে একদিকে নতুন নতুন ব্যবসা বাগানোয়, অন্যদিকে তাদের অপরাপর বিতর্কিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করায়।

 

সময়ের বিবর্তনে এই সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ভার অনেক ক্ষেত্রে তাদের তরুণ সন্তানদের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। কিন্তু বাবার অন্যায়ভাবে অর্জিত কিংবা অনোপার্জিত অঢেল বিত্তের অনিবার্য উশৃঙ্খলতায় বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় প্রজন্মের এই তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, তাদের আয়ত্তাধীন রাশি রাশি নোংরা টাকার অপশক্তির জোরে, নানাবিধ বেপরোয়া জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতির লোভাতুর ছত্রছায়ায় তাদের ভেতর আবার সঞ্চারিত করেছে যাবতীয় অপরাধের দায়মুক্তির প্রায়োগিক ধারণা। ফলে তারা হয়ে উঠেছে ক্ষমতার সন্তান (পাওয়ার চিলড্রেন)। দুর্নীতিপরায়ণ পুলিশ প্রশাসন ও দুর্বল বিচার-ব্যবস্থার সুযোগে নানা অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থেকেও এরা থেকে যায় আইনকানুনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এই অবস্থায়, এক বা একাধিক মিডিয়া-প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বলয় সম্প্রসারণে একটা বাড়তি শক্তি যোগায়— এরা তখন হয়ে ওঠে প্রায় অপ্রতিরোধ্য। জনকল্যাণ-প্রয়াসী স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশে, বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া, এই তরুণ দঙ্গলের অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এই ধরনের মিডিয়া-মালিকদের সঙ্গে সম্পাদক ও সাংবাদিকদের পেশাগত পরিশুদ্ধতা নিয়ে সংলাপ ও সমঝোতার কোনো কার্যকর প্রক্রিয়া জারি রাখাও দুষ্কর বৈকি।

 

তথাপি, আমার ব্যক্তিগত ধারণা, বসুন্ধরা গ্রুপের সম্পাদকগণ মৃত তরুণীর সংবাদ পরিবেশন সংক্রান্ত বিষয়ে একটা পেশাগত সংলাপের মাধ্যমে একধরনের সমঝোতায় উপনীত হয়েছেন। বসুন্ধরার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা মেয়েটির অস্বাভাবিক অকাল মৃত্যু সম্পর্কে প্রতিবেদন না ছেপে সমাজের চোখে নিজেদের ছোট করেছেন ঠিকই, কিন্তু এই মৃত্যুর পেছনে বসুন্ধরার অভিযুক্ত তরুণ মালিকের সম্ভাব্য দায় অস্বীকার করে তার সাফাই গাওয়ার পাপাচারে নিজেদের লিপ্ত করেননি, চেষ্টা করেননি মৃত মেয়েটির ঘাড়ে দুশ্চরিত্রের তকমা এঁটে দিতে, বিশেষত যখন কয়েকটি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান অভিযুক্ত তরুণের প্রতি ‘মাসির দরদ’ নিয়ে এগিয়ে এসে ভুক্তভোগী মেয়েটিকেই কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে। তবে, ‘বসুন্ধরা’র মালিকানাধীন তাবৎ মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সংবাদকর্মীরা কেন তখন ‘গর্বিত’ সাংবাদিক হিসেব একটি সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে একযোগে নিজেদের বিজ্ঞাপিত করেছিলেন, আর কেনই-বা আবার প্রায় সম্মিলিতভাবে তা প্রত্যাহার করেছেন, সেটা ঠিক বুঝতে পারিনি। প্রথমে হয়তো কোম্পানি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তা করেছিলেন, পরে আবার জনপরিসরে বিরূপ সমালোচনার চাপে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। সে যাই হোক না কেন, অভিযুক্ত অপরাধীর পক্ষাবলম্বনকারী অসত্য বিবরণ প্রচার করার গুরুতর পাপের তুলনায়, সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে নীরব থাকা লঘু পাপ বৈকি— যদিও তা এদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটা অত্যন্ত ‘বাজে ঘটনা’ হিসেবে জনমনে বহুদিন জাগরুক থাকবে, সাংবাদিকতা সংক্রান্ত একাডেমিক আলোচনায় ফিরে আসবে বারংবার।

 

দৃকনিউজ: সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য কী কী করা প্রয়োজন?

 

২০২০ সালে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অধীনে হয়রানিমুলক মামলায় গ্রেপ্তারকৃত একজন সাংবাদিকের কারাজীবনের ইলাস্ট্রেটেড ডায়েরির একটা পাতা। সূত্র: দৃক গবেষণা ও পাবলিক ক্যাম্পেইন বিভাগ

নূরুল কবীর: আগেই বলেছি, সংবাদমাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার প্রধান অন্তরায় হলো বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি। ফলে, সাধারণভাবে, দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য, সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর সাধনের জন্য, রাজনৈতিকভাবে সংঘটিত ফলপ্রসূ লড়াই-সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে, ঝুঁকি নিয়ে হলেও বিদ্যমান কর্তৃত্বমূলক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার নানা রূপ উম্মোচন ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন— যা প্রধানত গণতন্ত্রপরায়ণ সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানসমূহ ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ওপর বর্তায়। তবে কাজটি শুধু সাংবাদিকতার কিংবা সংবাদকর্মীদের একার দায় নয়, কারণ সুষ্ঠু ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অভাবে গোটা সমাজ তার প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত হয়, ফলে জীবন-প্রভাবী নানা বিষয়ে পরিজ্ঞাত মতামত গঠন করতে অসমর্থ হয়ে পড়ে গোটা সমাজ— যা দেশের পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর। সেক্ষেত্রে, সমাজে বিদ্যমান গণতন্ত্রকামী বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ রাজনীতি-সচেতন নাগরিকদের সংগ্রামী ভূমিকার মধ্য দিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করতে সহযোগিতা করতে হবে। উভয়পক্ষের সম্মিলিত সক্রিয় প্রয়াসের মাধ্যমেই সাংবাদিকতা, ‘ক্ষমতা’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তার জনকল্যাণকর ভূমিকা রাখায় পরিপূরক পরিবেশ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

 

সে যাই হোক, সরকারি ও বেসরকারি স্বেচ্ছাচার ও নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে জনকল্যাণমূলক সাংবাদিকতা করার জন্য সংবাদকর্মীদের প্রথমেই পেশাগত অঙ্গীকারের ভিত্তিতে নিজেদের সংগঠিত করা প্রয়োজন। শাসকশ্রেণির দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে সাংবাদিক সমাজের বিভক্তি সংবাদকর্মীদের শুধু পেশাগত শক্তি ও সম্মানহানী ঘটায়নি, তাদের বিপুল অধিকাংশের বৈষয়িক জীবনকেও অনিশ্চয়তার অভিশাপে জর্জরিত করেছে—করে চলেছে নিরন্তর। দেশের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকগণ বছরের পর বছর আইনসম্মত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পেশাগত সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন, এদের অনেকে সমাজের দুর্নীতিপরায়ণ বিত্তবানদের নানা দুষ্কর্মের সন্ধানে গিয়ে, দারিদ্রের চাপে, নিজেদের পেশাগত নৈতিকতা আপস করতে বাধ্য হয়েছেন, কিন্তু এই অবস্থার অবসান ঘটাতে দলীয়ভাবে বিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোকে কোনো সংঘবদ্ধ সংগ্রামী ভূমিকা নিতে দেখা যায় না— অধিকাংশ সময়ে আপন আপন দলের প্রয়োজনে বিবৃতি দিয়েই ইউনিয়ন নেতাদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ থাকে। এমনকী, সাংবাদিকদের বিভিন্ন পেশাগত সংগঠনের নির্বাচনে কে কোন পদের জন্য প্রার্থী হবেন, শোনা যায়, তাও এখন বড় বড় রাজনৈতিক দলের সদর দফতরে স্থির হয়। ফলে, ভোট শেষে, দেখা যায়, নির্বাচিত নেতা-নেত্রীরা পুরোপুরি নিজ নিজ দলের শীর্ষ নেতাদের আশীর্বাদের জন্য ছুটে যান।

 

শাসকশ্রেণির রাজনৈতিক দলসমূহের মনোনীত ও আশীর্বাদপুষ্ট ‘সাংবাদিক’দের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে আর যাই হোক দল নিরপেক্ষ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করা, অসাধ্য না হলেও, দুঃসাধ্য বটে। জনকল্যাণকর স্বাধীন সাংবাদিকতা চর্চার সংগ্রামে সংবাদকর্মীদের সংঘশক্তিকে ব্যবহার করতে হলে সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠনগুলোকে দলীয় রাজনীতির শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করে, সাধারণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে, ফের লড়াকু প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে হবে। একটি মহৎ পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হলেও দলীয় রাজনীতির আধিপত্যবাদী প্রভাব থেকে সংবাদকর্মীদের মুক্তি অপরিহার্য।

 

সংবাদমাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতায় আগ্রহী মালিকদেরও কিছু নৈতিক ও বস্তুগত দায়িত্ব পালন করার আছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চর্চার জন্য, আগেই বলেছি, প্রকাশক ও সম্পাদকের ভেতর, তথা মালিকপক্ষ ও সাংবাদিকদের মধ্যে, একটা সুষ্ঠু বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম ও সমঝোতার প্রক্রিয়া জারি থাকা প্রয়োজন, যেখানে, মালিকপক্ষের অগ্রণী ভূমিকা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি রাষ্ট্রীয় ও সরকারি বৈরীতা, তা রাজনৈতিক হোক কিংবা হোক অর্থনৈতিক, মোকাবিলা করে অগ্রসর হওয়ার জন্য এই উভয়পক্ষের ভেতর সুস্থ পেশাগত সম্পর্ক প্রয়োজন। মালিকপক্ষের উচিৎ সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ন্যায়সংগত ও বাস্তবানুগ বেতন-ভাতাদি নিয়মিত পরিশোধ করার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল সম্মানজনক জীবন যাপনে সহযোগিতা করা— যা শুধু সংবাদকর্মীদের প্রত্যাশিত উচ্চ নৈতিক মান বজায় রাখতেই সাহায্য করবে না, প্রকারান্তরে, সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মীদের দলীয় আনুগত্য হ্রাসেও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

দ্বিতীয়ত, সংবাদপত্রের আয়-বৃদ্ধির জন্য একদিকে উৎপাদন ও বিপণন খরচ কমানোর সংঘবদ্ধ কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন, অন্যদিকে ১৮ কোটি মানুষ অধ্যুষিত বাংলাদেশে পত্র-পত্রিকা বিপণন ও বিতরণের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রচারসংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি করার বাস্তব সুযোগ ব্যবহার করতে পারেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে মুদ্রিত পত্র-পত্রিকার চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে— এমন বিশ্বাস করার, অন্তত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, কোন জরিপভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশের উচ্চকিত সরকারি স্লোগান কতটা অন্তসারশূন্য— তা করোনাক্রান্ত বাংলাদেশে নির্মমভাবে প্রমাণিত হয়েছে— দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের বিপুল অধিকাংশের কম্পিউটার ও ওয়াই-ফাই সুবিধা না থাকার কারণে বছরাধিক কাল ধরে সর্বস্তরের শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।

 

উচ্চ বা মধ্যবিত্তশ্রেণির তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি-নির্ভর অনলাইন অধ্যয়নে অভ্যস্ত হয়েছে বটে— তাদের জন্য পত্র-পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ তো রয়েছেই— কিন্তু দেশব্যাপী মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ভেতর মুদ্রিত পত্র-পত্রিকার বিরাট বাজার এখনও বিরান পড়ে রয়েছে। পত্র-পত্রিকা পাঠে এই বিরাট জনগোষ্ঠীকে অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে মালিকপক্ষ তাদের আয় যেমন বহুলাংশে বাড়াতে পারে, তেমনি নানা জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও তার পর্যালোচনা দেশের কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে জনসাধারণের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনা বিকশিত করার দেশপ্রেমিক কর্তব্য পালন করতে পারে—যা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এ ধরনের প্রকল্পে মালিকপক্ষ সহজেই সংবাদকর্মীদের সক্রিয় সহযোগিতা পেতে পারে। এভাবে, বিপুল বর্ধিতসংখ্যক মানুষের কাছে বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত বর্ধিত আয় মুদ্রণ—গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ও বেসরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে—যা স্বাধীন সাংবাদিকতা চর্চায় সমর্থন যোগাতে মালিকপক্ষকে তাৎপর্যপূর্ণ শক্তি যোগাবে।

 

তবে, গণতন্ত্রপরায়ণ স্বাধীন সাংবাদিকতার চর্চার জন্য প্রধান সংগ্রামটি প্রধানত সংবাদকর্মীদের ওপরই বর্তায়। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার তরফে দলনিরপেক্ষ নৈতিক অবস্থান থেকে সাংবাদিকরা সংঘবদ্ধ সংগ্রামে নিয়োজিত থাকলে সমাজের অপরাপর অংশের সপ্রশংস সহযোগিতা পাওয়া খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। ন্যায়সংগত সংঘবদ্ধ সংগ্রামের মুখে যে কোনো সরকার, তা যতই কর্তৃত্বপরায়ণ ও স্বৈরতান্ত্রিক হোক না কেন, তার সকল প্রকার নিপীড়নমূলক আইন-কা নুনসহ পিছু হটতে বাধ্য হয়।

 

দৃকনিউজ: গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রপরায়ণ স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকাশে আমাদের ‘সিভিল সোসাইটির ভূমিকার কথা আপনি উল্লেখ করেননি।

 

নূরুল কবীর: ঠিক। সাধারণভাবে, তাত্ত্বিক অর্থে, গণতন্ত্রের বিকাশে ও গণতন্ত্রপরায়ণ সাংবাদিকতা চর্চায় ‘সিভিল সোসাইটি’র বা মুক্ত চিন্তায় অভ্যস্ত অগ্রসর জনসমাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান থাকতে পারে— থাকা উচিত ও প্রয়োজন। কিন্তু এ বিষয়ে, আমি কিছু বলিনি, কারণ বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে কোনো ‘সিভিল সোসাইটি’-র অস্তিত্ব নেই। ‘সিভিল সোসাইটি’ নামে আমাদের জনগোষ্ঠীর যে অংশটি নিজেদের পরিচিত করেছেন বা পরিচয় দিতে আহ্লাদিত বোধ করেন, তারা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক অর্থে ‘সিভিল সোসাইটি’ নয়, বরং ইতিহাসের নানা পর্বে এদের অনেকেই জনগণের গণতান্ত্রিক মুক্তির পরিপন্থী ‘আনসিভিল’ কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থেকেছেন।

 

আমি এদের বহুদিন ধরে ‘ইভিল সোসাইটি’ বা ‘অশুভ সমাজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছি। আমার ধারণা এদের দিয়ে বৃহত্তর সমাজের জন্য শুভকর কিছু আর আশা করার নেই। আমার এই ধারণার পক্ষে ব্যক্তি পরিসরে অনেক সমর্থক মিললেও, জনপরিসরে কোরাসের জন্য কোনো সঙ্গী মেলেনি এখনও। স্বভাবতই, এই ‘সমাজে’র অনেকে আমার ওপর ক্ষুব্ধ। এদের একজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ বিভাগের এক অধ্যাপক, ‘সিভিল সোসাইটি, রাষ্ট্র ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ’ সংক্রান্ত তার এক কিতাবে, পরোক্ষভাবে, আমার ‘অজ্ঞতা’ নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, আমার বিরুদ্ধে ‘সস্তা-জনপ্রিয়তাকামিতা’র অভিযোগ এনেছেন এবং আমার ‘বদুদ্দেশ্য’ সম্পর্কে অন্যদের সতর্ক করেছেন। তা তিনি করুন— কারো ভিত্তিহীন প্রশংসা যেমন আমাকে আনন্দে উদ্বেলিত করে না, কারো অযৌক্তিক নিন্দাও আমাকে বেদনায় ভাসায় না। কিন্তু, মুশকিল হলো, বাংলাদেশে কোনো কেজো ‘সিভিল সোসাইটি’র অস্তিত্বহীনতা সম্পর্কে আমার অবস্থান বদলাতে তার পুস্তক, বা তিনি, কোনো সাহায্য করতে পারেননি।

 

দৃকনিউজ: সে যাই হোক, সংজ্ঞার দিক থেকে ‘সিভিল সোসাইটি বস্তুটি আসলে কী এবং তা কীভাবে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে বা নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিংবা গণতন্ত্রপরায়ণ স্বাধীন সাংবাদিকতা চর্চায় সহযোগিতা করতে পারে?

 

নূরুল কবীর: ‘সিভিল সোসাইটি’ নামক পশ্চিমা প্রত্যয়টি সেই আদ্দিযুগের গ্রিক ‘নগর রাষ্ট্রে’র আমল থেকে আধুনিক যুগে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত অনেক দার্শনিক, পণ্ডিত ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নানাভাবে ব্যবহার করেছেন। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শব্দবন্ধটির অর্থ বদলেছে, পরিগ্রহণ করেছে নতুন নতুন অর্থ। এই প্রত্যয়টিকে সিসেরো, অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে হেগেল, টকোভিল, মার্কস, গ্রামসি, হেবারমাস প্রমুখ রাজনৈতিক চিন্তাবিদগণ নানা সময়ে নানা অর্থে বিশ্লেষণ ও ব্যবহার করেছেন। আমাদের সমসাময়িক কালে, পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে, ‘সিভিল সোসাইটি’র একটা ‘সাধারণ সংজ্ঞা’ দাঁড়িয়েছে বৈকি। কোনো রাষ্ট্র সরকারসহ তার তাবৎ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান, তার আইন-আদালত ও তার গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের ওপর যে জবরদস্তিমূলক আধিপত্য কায়েম রাখতে চায়, তাকে নানাভাবে মোকাবেলার মাধ্যমে, গোটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক ও বিচারিক ক্ষমতা কাঠামোকে বরং গণতান্ত্রিক জবাবাদিহির অধীনে ন্যস্ত করার জন্য জনপরিসরে নিরন্তর প্রতিবাদী তৎপরতায় নিয়োজিত গণতন্ত্রপরায়ণ বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও তাদের নানা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ও সম্মিলিত রূপই হলো সিভিল সোসাইটি।

 

এই ‘সিভিল সোসাইটি’ভুক্ত ব্যক্তিবর্গ কিংবা প্রতিষ্ঠানসমূহ ভাবাদর্শগতভাবে বৈপ্লবিক চরিত্রের কিছু নন, কিন্তু তারা বিদ্যমান রাষ্ট্র, রাষ্ট্র পরিচালনাকারী নানা রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলমুক্ত প্রতিবাদী মুক্তচিন্তার অধিকারী হয়ে থাকেন। পৃথিবীর নানা দেশে জনগণের গণতান্ত্রিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী এ ধরনের প্রতিবাদী লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, আইনজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলী, মানবাধিকারকর্মী এবং তাদের নানা প্রতিষ্ঠানকে ‘ক্ষমতা’র সর্বগ্রাসী আধিপত্যের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জনগণের গণতান্ত্রিক স্বার্থে জনপরিসরে তৎপর দেখা যায়। এরাই হলো ওই সব দেশের ‘সিভিল সোসাইটি’। কিন্তু, এই সংজ্ঞার আলোকে বিচার করলে, আমাদের দেশে ‘সিভিল সোসাইটি’র দাবিদার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে কি সেই মর্যাদায় ভূষিত করা সম্ভব?

 

আমাদের গোটা সমাজ, বিশেষত সমাজের প্রায় সকল পেশাজীবী সংগঠন, নানা ঐতিহাসিক কারণে, প্রধানত শাসক শ্রেণীর দ্বি-দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে, আওয়ামী ও জাতীয়তাবাদী শিবিরে, খাড়াখাড়িভাবে বিভক্ত হয়ে রয়েছে। বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় নিয়োজিত এমনকী অসামান্য মেধাবী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও দল-নিরপেক্ষ মানুষ এখন খুঁজে পাওয়া রীতিমত দুরূহ। প্রায় প্রত্যেকেই নিজ দলের রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে যাবতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজ বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান গ্রহণ করেন এবং জনপরিসরে নিজেদের রাজনৈতিক শিবিরের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে শক্তিমান করার চেষ্টা করেন।

 

একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত হলো জনসাধারণের ভোটাধিকার— ভোটাধিকারের নিরুপদ্রব চর্চার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নানা স্তরে জনগণের জনপ্রতিনিধিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশের মানুষ অতীতে নানা সময়ে, বিশেষত বিভিন্ন সামরিক শাসনামলে, নানাভাবে ভোটাধিকার বঞ্চিত হয়েছে, আবার তীব্র রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে সেই অধিকার পুনরুদ্ধার করেছে। কিন্তু বিদ্যমান বেসামরিক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, প্রায় এক দশক ধরে, মানুষ কার্যত ভোটাধিকার বঞ্চিত রয়েছে। বিগত দুই-দুটি জাতীয় নির্বাচনে, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে, মানুষকে সার্বজনীন ভোটাধিকার চর্চার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

 

লীগ সরকার তার নিয়ন্ত্রণাধীন নানা রাষ্ট্রীয় সংগঠনের নিবর্তনমূলক শক্তিকে ব্যবহার করে বলপূর্বক ক্ষমতায় রয়েছে। ফলে, ক্ষমতায় থাকার জন্য লীগের, পশ্চিমারা যাকে বলে ‘পপুলার লেজিটিমেসি’, সেই সামাজিক-রাজনৈতিক ন্যায্যতা এখন নেই। কিন্তু লীগের রাজনৈতিক বলয়ভুক্ত পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবীর দল, যারা নিজেদের গণতান্ত্রিক ‘সিভিল সোসাইটি’র সদস্য হিসেবে তুলে ধরেন, লীগের ক্ষমতায় থাকার ন্যায্যতা নিয়ে ঘুণাক্ষরেও প্রশ্ন তোলেন না, এদের অনেকেই যে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পাননি— তা নিয়েও কোনো উচ্চবাচ্য করেন না, উল্টো বরং পাকিস্তানি জমানার ‘গণতন্ত্রবিহীন’ উন্নয়নের ‘আয়ুবী’ তত্ত্বের সাফাই গেয়ে বেড়ান। অন্যদিকে, লীগের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তি জাতীয়তাবাদী দলের শিবিরভুক্ত পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবীগণ দেশের তাবৎ সমস্যার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে থাকেন, কিন্তু জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে বিরোধীদলের অপরিহার্য দায় ও দায়িত্বের কথা এবং সে দায়িত্ব পালনে জাতীয়তাবাদী দলের ক্ষমার অযোগ্য অনাগ্রহ কিংবা ব্যর্থতার কথা মুখেও আনেন না। বিবেক প্রতিবন্ধী এমন দ্বিদলীয় ‘সিভিল সোসাইটি’, যা কিনা নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে, কিংবা দলের ভেতর বহুমাত্রিক গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশে ভূমিকা রাখতেই অক্ষম, জনস্বার্থপরায়ণ গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতা বিকাশে কীভাবে তারা কোনো ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে?

 

দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সংগঠিত এই পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাসবোধও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির মতো সংকীর্ণতায় আকীর্ণ। পঠন-পাঠনের অলিখিত দলীয় সিলেবাসের মধ্যেই সীমিত থাকে তাদের রাজনৈতিক মেধা ও মনীষা চর্চার গণ্ডি। জাতীয় জনজীবনে তার ফলাফল ভয়াবহ। আওয়ামী লীগ ও তার বলয়ভুক্ত বুদ্ধিজীবীগণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের, বিশেষত মওলানা ভাসানী ও বামপন্থীদের, অবদান স্বীকার করে না। আর স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম প্রহরে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমানের সশস্ত্র বিদ্রোহের সশব্দ ঘোষণা ও স্বাধীনতা যুদ্ধে সবাইকে ঝাপিয়ে পড়ার আহ্বানের ইতিবাচক সামরিক তাৎপর্য এবং পাকিস্তানি আক্রমণে বিহ্বল বাঙালি জনমনে তার তাৎক্ষণিক সঞ্জীবনী প্রভাব স্বীকার করা তো দূরের কথা, স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার ও জেড-ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে তার গৌরবজনক ভূমিকাও অস্বীকার করে; তাকে বরং মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের গুপ্তচর হিসেবে চিত্রিত করে থাকে। অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী দল ও তার শিবিরভুক্ত বুদ্ধিজীবীগণ বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের, বিশেষত শেখ মুজিবুর রহমানের, অনবদ্য অবদানকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করে, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্বের অবিসম্বাদিত নেতা মুজিবের গ্রেফতার বরণকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে প্রচার করে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের বিশাল রাজনৈতিক পশ্চাৎপট ও সেক্ষেত্রে রাজনীতিকদের ত্যাগী ভূমিকা সম্পর্কে নিরব থেকে, স্বাধীনতা যুদ্ধকে প্রকারান্তরে রাজনীতিবিচ্ছিন্ন একটি নিছক সামরিক তৎপরতা হিসেবে তুলে ধরে, সেই যুদ্ধের প্রধান ‘নায়ক’ হিসেবে জিয়াকে মহিমান্বিত করে থাকে।

 

সর্বোপরি, এই উভয় রাজনৈতিক শিবিরভুক্ত পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবীর দল আমাদের স্বাধীনোত্তর ইতিহাসের নানা পর্বে বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র ও সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে পালাক্রমে শুধু সমর্থনই করেনি, সেই সব স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার ‘ঐতিহাসিক ন্যায্যতা’ প্রতিষ্ঠার কাজে এখনো নিয়োজিত রয়েছে, জনপরিসরে এই সব বিষয় নিয়ে নিজ নিজ অবস্থানের কারণে তারা নিয়মিত বাগবিস্তারে ব্যস্ত থাকে। এদের অনেকেই আবার নিজ নিজ দলের সরকার প্রতিষ্ঠিত থাকার সময় নানা সরকারি, আধা-সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নানা ‘লোভনীয়’ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন, পদ ও সুবিধা বাগানোর জন্য এদের অনেকের ইঁদুরদৌড় এমনকী নূন্যতম রুচিসম্পন্ন নাগরিকদের ভেতরও বিবমিষার উদ্রেক করে। কৌতুককর ব্যাপার হলো, রাষ্ট্রক্ষমতার পট পরিবর্তনের পরপর এই সব পেশাজীবী-বুদ্ধিজীবীদের অনেকে, অতি লোভের বশবর্তী হয়ে, দলীয় শিবির পরিবর্তন করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করে না। এমন নৈতিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘সিভিল সোসাইটি’ বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে, কিংবা জনস্বার্থপরায়ণ সাংবাদিকতা চর্চায়, কোনো শুভ উদ্যোগ নিতে সক্ষম, কিংবা কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে সমর্থ— এমন বিশ্বাস আমাদের ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ বিষয়ের উত্তম্মন্য অধ্যাপক ধারণ করতে পারেন, কিন্তু এই অধমাধম আমি তাতে ইমান রাখতে অক্ষম।

 

তবে, হ্যাঁ, আমি জানি, শাসকশ্রেণীর দ্বি-দলীয় তথাকথিত ‘সিভিল সোসাইটি’র বাইরে নানা বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় নিয়োজিত ইতিহাস সচেতন গণতন্ত্রপরায়ণ কিছু প্রগতিশীল নারী-পুরুষ আছেন, যারা বিদ্যমান স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় রয়েছেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা ও প্রভাব এখনো পর্যন্ত এতই কম যে, তাদের তৎপরতার দূরপ্রসারী তাৎপর্য থাকলেও, প্রতিষ্ঠিত স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার সফল মোকাবিলা করতে এখনো অসমর্থ। এদের বাইরেও, দেশের প্রতিটি পেশায় স্বাধীন চিন্তাশীল অনেক নির্লোভ ব্যক্তি রয়েছেন, যারা নিরবে সততার সঙ্গে জনকল্যাণপ্রয়াসী নিজ নিজ বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, বিবেকের তাড়নায় মাঝে মাঝে সমমনা ব্যক্তিদের সঙ্গে মিলে প্রতিবাদী বক্তব্যও রাখেন, কিন্তু দলবাজ বুদ্ধিজীবীদের সংগঠিত পেশীশক্তির ভয়ে তারা জনপরিসরে নিরন্তর সরব ভূমিকা পালন করতে নিরাপদ বোধ করেন না।

 

কোনোভাবে এই সব ব্যক্তির মধ্যে যদি সমন্বয় সাধন করা যায়, আর তারাও যদি আরো খানিকটা সাহসী হয়ে ওঠেন, তবে এদেশে ক্ষমতা ও জনতার মাঝখানে গণতন্ত্রপরায়ণ একটা কার্যকর সিভিল সোসাইটির আবির্ভাব সম্ভব। সেই ‘সিভিল সমাজ’ নিশ্চয় দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে সংবাদকর্মীদের স্বাধীন সাংবাদিকতার সংগ্রামে সক্রিয় সহযোগিতা দান করবেন— যা প্রকারান্তরে গোটা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জনগণের রাজনৈতিক সংগ্রামকেও বেগবান করবে। তার আগ পর্যন্ত, আগেই বলেছি, সংবাদমাধ্যমের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার জন্য প্রধানত গণতন্ত্রপরায়ণ সাংবাদিকদেরই সাহসের সঙ্গে সংঘবদ্ধভাবে লড়ে যেতে হবে। আর, সে লড়াইয়ের প্রক্রিয়ায়, সমাজে এই সত্যের পক্ষে চেতনা সঞ্চার করতে হবে যে, বস্তুনিষ্ঠ স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার শুধু সংবাদকর্মীদেরই প্রয়োজন নয়, গোটা সমাজের গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্যও অপরিহার্য।

 

দৃকনিউজ: কিন্তু বর্তমান সরকার তো কোনো আন্দোলন-সংগ্রামই বরদাস্ত করছে না।

 

নূরুল কবীর: অতীতেও কোনো সরকার আন্দোলন-সংগ্রামকে স্বাগত জানায়নি, ক্ষমতার প্রতি হুমকি সৃষ্টিকারী গণসংগ্রামকে বরং নির্মম নিপীড়নের মাধ্যমে অবদমিত করার চেষ্টা করেছে। বর্তমান সরকারও তাই করছে, হয়তো বেশি মাত্রায় করছে, কিন্তু মর্মের দিক থেকে এরা নতুন কিছু করছে না। তবে, এ কথা সত্য যে, বিদ্যমান সরকার নানা অভিনব উপায়ে গোটা সমাজের ভেতর যে সর্বগ্রাসী ভয়ের সঞ্চার করতে পেরেছে, তা তার পূর্ববর্তী সরকারগুলো করতে পারেনি। এই ভীতিকর পরিস্থিতিতে ক্ষমতাবানদের কিছু কিছু কার্যকলাপ সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তি-সংবাদকর্মীদের জন্য বিপজ্জনক বৈকি। এ জন্যই আমি সংঘবদ্ধ ‘সাহসী’ সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছি। মনে রাখবেন— ‘ভয়’ যেমন, তেমনি ‘সাহস’ও সংক্রামক। কোনো নির্দিষ্ট বিরূপ পরিস্থিতিতে একজনের ভীত অবস্থা যেমন তার কাছাকাছি অন্যকেও ভয়ে সন্ত্রস্ত করে তুলতে পারে, আবার একজনের দৃঢ় সাহসী ভূমিকাও পার্শ্ববর্তী অন্যের ভেতর দুর্জয় সাহস সঞ্চার করতে সক্ষম। তবে, কোনো মহৎ উদ্দেশ্য বিবর্জিত সাহস, তা হোক ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক, কোনো গুরুত্বপূর্ণ কেজো গুণ নয়, কারণ ডাকাত, গুণ্ডা, বদমাশেরও সাহস থাকে, এমনকি আত্মঘাতি বেকুবও কখনো কখনো হঠকারী সাহস প্রদর্শন করতে পারে। এগুলো নেতিবাচক সাহস। ক্ষতিকর।

 

আমাদের উদ্দিষ্ট সংগ্রামের জন্য প্রয়োজন জনকল্যাণকামী মহৎ উদ্দেশ্য তাড়িত ইতিবাচক সাহস— বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চর্চার নির্বিঘ্ন অধিকার আদায়, সংবাদকর্মীদের পেশাগত জীবন ও মর্যাদার উন্নয়ন সাধন, জনসাধারণের উন্নত জীবন ও সম্মানজনক জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় তথ্য উদঘাটন, বিশ্লেষণ ও প্রকাশের অবাধ সুযোগ আর, সর্বোপরি, সমাজে— ‘সাম্য, ন্যায়বিচার ও ব্যক্তির মানবীয় মর্যাদা’ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য নিরুপদ্রব বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা জারি রাখার নিষ্কলুষ গণতান্ত্রিক চেতনা যে সাহসের নৈতিক ভিত্তি। এরকম ন্যায়-নীতিভিত্তিক সাহসী ও সংঘবদ্ধ কোনো পেশাজীবী সংগ্রামকে দমন করার উদ্যোগ ও প্রয়াস গ্রহণ একটি ‘রাজনৈতিক-ন্যায্যতা’ বিবর্জিত সরকারের জন্য সহজ নয়। তাছাড়া, এ ধরনের সংগ্রামের সূত্রপাত হলে, তার প্রতি সমাজের গণতন্ত্রপরায়ণ অপরাপর সম্প্রদায়গুলোর সক্রিয় সমর্থন অর্জন করাও সহজতর হবে— যা প্রস্তাবিত সংগ্রামের অনিবার্য বিজয় ত্বরান্বিত করতে বাধ্য।