সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

বহুস্বর মতামত

আগামীর কর্মসংস্থান: জমজমাট যেসব পেশা অচিরেই যাবে বাতিলের খাতায়

২০২১-০৭-১২

আনিস রায়হান

আগামীর কর্মসংস্থান: জমজমাট যেসব পেশা অচিরেই যাবে বাতিলের খাতায়

 

 

চেনা পৃথিবীটা আমাদের চোখের সামনেই বদলে যাচ্ছে দ্রুত। প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে অবিরাম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পেছনে ঢালা হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার। রাজনীতিতে লোকরঞ্জনবাদের (পপুলিস্ট) উত্থান দেশে দেশে অর্থনীতির ধরন ও কর্মখাতকে প্রভাবিত করে চলেছে। আবার মহামারি কোভিড মোকাবিলায় গৃহীত নানা পদক্ষেপও পরিবর্তন এনে দিয়েছে কাজকর্মের এতদিনের অভ্যাসে। সব মিলিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লাগছে কাজের বাজারে। ব্যবসায়, চাকরি বা দৈহিক শ্রম, পেশা যেমনই হোক, তা কিছুই আর আগের মতো থাকছে না। ‘ফিউচারিস্ট’ তথা ভবিষ্যতবিদরা বলছেন, আগামী ১৫ বছরের মধ্যেই আসবে আমূল পরিবর্তন। সামনের দিকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে, চলমান এমনসব কাজ বা পেশার ওপর আলোকপাত করেছেন আনিস রায়হান

 

বিকাশচন্দ্র সরকার (৭৪) থাকেন রাজধানীর মুগদা সংলগ্ন নন্দীপাড়ায়। নড়াইলে পিতৃপুরুষদের বাড়ি। ঢাকা শহরে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন প্রায়। মুচির কাজ করেই পরিবারকে টেনেছেন। তবে নিজ পুত্র সন্তানদের তিনি নিজের দক্ষতার কিছুই শেখাননি। কন্যা গৃহবধূ, ছেলেটি চাকরিজীবী। তিনি বলেন, এই পেশা যে টিকবে না, খেয়েদেয়ে বাঁচা যাবে না, এটা তো আমি আগেই বুঝেছি। তাই ওদিকে আর ছেলেপেলেরে দেইনি। এখন এই পেশা শেষ। জায়গায় বসে কাজ পাওয়া যায় না, ঘুরতে হয়, পারি না আর এই বয়সে।

 

মুচি-ঋষির পেশার মতো অনেক পেশাই এখন বিলুপ্তপ্রায়। এই পেশায় কাজ করার কথা এখন আর কেউ ভাবেন না। কিন্তু এখনো জারি আছে, ভালোই চলছে, এমন অনেক পেশাও রয়েছে একই হুমকিতে। আজ যে কারবার চলছে জমজমাট, হঠাৎই তা হয়ে উঠতে পারে অপ্রাসঙ্গিক। অ্যান্ড্রয়েড প্রযুক্তি আসার পর ফোনসেট কোম্পানি নোকিয়ার অচল হয়ে পড়াটা এক্ষেত্রে বড় উদাহরণ। তাই কর্মখাতের গতিপ্রকৃতি, বিশেষত ঝুঁকিগ্রস্ত খাতগুলো নজরে রাখা সবার জন্যই জরুরি।

 

ব্যাংকার-হিসাবরক্ষক

 

ব্যাংকের চাকরি কিংবা অ্যাকাউন্ট্যান্ট, হাল আমলের আকর্ষণীয় চাকরি। রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেসব কাজ অনেকাংশেই দখল করে নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, হিসাব-নিকাশ তার মধ্যে অন্যতম। হিসাব রাখার অধিকাংশ কাজই চলে যাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো প্রোগ্রাম/যন্ত্রের হাতে। ব্যাংক খাতে এখনই এটিএম বুথের মাধ্যমে কর্মী ছাড়াই কার্যক্রম চালিত হচ্ছে। মূল শাখায়ও ডিজিটাল মনিটরের মাধ্যমে গ্রাহককে নির্দেশনা প্রদান ও সহায়তাকারী রোবট স্থাপন কাজ বিশ্বজুড়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।

 

রাশিয়ার সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এসবার ব্যাংক ইতিমধ্যে তার আইনবিভাগে কাজ করা তিন হাজার আইনজীবীর চাকরি খেয়েছে আইনি সহায়তাকারী রোবট নিয়োগের মধ্য দিয়ে। ২০১১ সালে ব্যাংকটির মোট কর্মী ছিল ৫৯ হাজার। আগামী ২০২২ সালের মধ্যে এটা তারা এক হাজারে নামিয়ে আনতে চেয়েছে। বাংলাদেশেও এই আঘাত লাগতে শুরু করেছে। ব্যাংকের অনেক কাজই অটোমেশন হচ্ছে। এ মুহূর্তে যারা ব্যাংক বা হিসাব সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়ালেখা করছেন বা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তারা যখন এগুলো শেষ করে কাজে ঢুকবেন, তখন হয়তো দেখপবেন কর্মক্ষেত্রে আর তাদের চাহিদা নেই।

 

ডাক্তার

 

চিকিৎসকের পেশা এখন অবধি সর্বত্রই প্রশংসিত এবং আদরণীয়। বিশেষায়িত এই পেশায় বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ কাজ করেন। চিকিৎসক, প্রশিক্ষক ছাড়াও স্বাস্থ্যকর্মী, সেবিকা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও যন্ত্রপাতি পরিচালনাসহ নানা ধরনের লোকবল যুক্ত এই খাতে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পান এখন ডাক্তাররা। কিন্তু অচিরেই এই খাতে ডাক্তাররা ব্রাত্য হয়ে যাবেন। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াবে যে, একজন ডাক্তারের চেয়ে হয়তো একজন সেবিকার গুরুত্ব বেশি হবে।

 

২০১৫ সালের পরে এরকম বেশ কিছু গবেষণার ফল প্রকাশ হয়েছে, যেগুলো দেখায় যে, রোগীকে চিকিৎসাপত্র প্রদান বা ওষুধের নাম লেখার ক্ষেত্রে ডাক্তাররা প্রচুর ভুল করেন, যা 'হিউম্যান এরর' নামে পরিচিত। ডাক্তার ওষুধের নাম ভুলে যান, অপারেশনের সময় নির্বাচনে ভুল করেন, অপারেশনের সময়ও অনেক ভুল হয়। এসব ভুল এড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে।

 

ডাক্তারি পেশার জন্য অভিশাপ হয়ে আসতে পারে ফাইভ জি ও তার পরবর্তী প্রজন্মের উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা। এই ইন্টারনেটের কল্যাণে দূরনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা ও অপারেশনের ব্যবস্থা বিকশিত হবে। বিশ্বের বড় হাসপাতালগুলো একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। মুহূর্তের মধ্যে তথ্য বিনিময় হবে। একজন রোগী হাসপাতালে গেলে তার লক্ষণ পরীক্ষা করে পৃথিবীর কোথায় এই রোগের ভাল চিকিৎসা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তা খুব অল্প সময়েই যাচাই করে দেখতে পারবে এবং ওই রোগীকে সর্বাধুনিক পরামর্শ দিয়ে বাড়ি পাঠাতে পারবে।

 

ডাক্তারি পেশা হয়তো এখনই মহাসংকটে পড়বে না। অনেকেই মনে করেন, মানবিক কারণেই এই পেশা অটোমেটাইজড হবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি রাজধানী সিলিকন ভ্যালির আলোচিত বিনিয়োগকারী বিনোদ খোসলাকে উদ্ধৃত করে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা বলছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে রোবট ডাক্তারদের জায়গা দখল করবে। ইতিমধ্যেই ডাক্তারদের কাজ হয়ে গেছে যান্ত্রিক পরীক্ষার ফল পাঠ করা, যা কিনা ভবিষ্যতে এই খাতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

ঝুঁকিতে আরো পেশা

 

বিদ্যমান কাজ বা পেশা বাতিলের খাতায় নাম লেখানোর ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন অর্থনীতিবিদ কার্ল ফ্রে ও যন্ত্রশিক্ষা গবেষক মাইকেল অসবর্ন। ২০১৩ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘কর্মসংস্থানের ভবিষ্যত’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে তারা বলেন যে, বিশ্বজুড়ে কিছু কাজ বা পেশা থেকে ৯০ শতাংশ লোকই ছিটকে পড়বে। প্রযুক্তির আধুনিকায়নসহ নানা কারণে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে বিধায় মানুষ আর এসব কাজ পাবে না।

 

বাংলাদেশে কিছু পেশা ভয়াবহ হুমকিতে পড়তে পারে। এর মধ্যে প্যাকেজিং ও অ্যাসেম্বলিং গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। এই খাতে ব্যাপক আকারে মানুষের কাজ হারানোর শঙ্কা রয়েছে।

 

নির্মাণ খাতেও আসবে বড় ধরনের পরিবর্তন। রাজমিস্ত্রী-রঙমিস্ত্রীর পেশায় সামনের দিকে কাজ কমতে থাকবে।

 

বাসা বাড়ি-ভবনের দারোয়ান, প্রতিষ্ঠানের সময় দেখার লোক, কর্মীদের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করা লোকদের প্রয়োজন সামনের দিকে কমে আসবে।

 

খেলাধুলায় আম্পায়ার-রেফারির ভুলের কারণে অনেক ক্ষতি হয়। এসব ক্ষেত্রে দ্রুতই প্রযুক্তি জায়গা দখল করে নেবে।

 

অক্সফোর্ডের ওই দুই গবেষকের দাবি, এগুলো ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার ভেতর প্রথম সারিতে আরো রয়েছে খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, দাপ্তরিক কার্যক্রম, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো নির্মাণ, তথ্যভুক্তি, গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা, আলোকচিত্র ব্যবস্থাপনা, ক্যামেরা মেরামত, করের কাগজপত্র প্রস্তুতকরণ, গণিতভিত্তিক প্রযুক্তিকর্মী, পুষ্টিবিদ ও খাদ্য পরামর্শক, জরিপ পরিচালনা, মানচিত্র প্রণয়ন, পুস্তক বাঁধাই, মুদ্রণ প্রমাদ নিরীক্ষণ, সংযুক্তিকরণ শিল্প ও গাড়ি চালনার মতো অসংখ্য পেশা।

 

কোভিড মহামারির সংক্রমণ প্রযুক্তিকায়নকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। ফলে গবেষণার আশঙ্কার চেয়েও জোর গতিতে ওলটপালট চলছে কর্মসংস্থানের বাজারে।