সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

সেজান-সজীব গ্রুপের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড: লাশ হস্তান্তরে সমন্বয়হীনতা, স্বজনদের দুর্ভোগ

২০২১-০৮-১০

আনিস রায়হান
রূপগঞ্জ থেকে ফিরে

সেজান-সজীব গ্রুপের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড:  লাশ হস্তান্তরে সমন্বয়হীনতা, স্বজনদের দুর্ভোগ

 

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান-সজীব গ্রুপের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ২৪ জনের লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ০৪ আগস্ট ২০২১ সকালে লাশ হস্তান্তরের কথা থাকলেও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বেলা প্রায় ২টা বেজে যায়। লাশ নিতে আসা স্বজনরা এ কারণে ভয়াবহ দুর্ভোগের মুখে পড়েন। তারা লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় সমন্বয়হীনতার অভিযোগ আনেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত শ্রমিক নেতারা বলেন, শ্রমজীবীদের মানুষ মনে না করার কারণেই তাদের নিয়ে এরকম আচরণ করে দায়িত্বশীলরা।

 

লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে সকাল আটটার মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ প্রাঙ্গণে পৌঁছায় দৃকনিউজের সংবাদকর্মীরা। পৌঁছেই দেখা যায়, মর্গ প্রাঙ্গণে একটি কক্ষে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের স্বজনরা অনেকেই অপেক্ষা করছেন। তখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, কারখানা কর্তৃপক্ষ বা নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কেউ সেখানে হাজির হননি।

 

অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিক রাশেদের ভাই হাশেম (২৯) জানান, তিনি নোয়াখালির সুবর্ণচর থেকে এসেছেন ভাইয়ের লাশ নেয়ার জন্য। ভোর রাত চারটার দিকে তিনি ঢাকায় পৌঁছেছেন। তাদের বলা হয়েছিল, সকাল ৯টায় লাশ হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু নাম ডাকা শুরু হতেই ১০টার বেশি বেজে যায়।

 

বেলা ১২টা ৩০ মিনিটে এই প্রতিবেদককে হাশেম বলেন, 'অন তো বুঝি না, লাশ কখন দিব। এত দেরি হইলে তো মুশকিল। লাশ নিতে নিতে রাইত হই যাইব। লাশের গাড়ি, বিপদাপদ হইতে পারে। সকাল সকাল দিলে আইজকাই দাফন কইরতে পাইরতাম। কিন্তু অন তো মন হয় বিকাল হই যাইব। আইজকা আর দাফন হইব না। দাফনে যত দেরি হইব তত সমস্যা, মাইনষে নানা কথা কয়।'

 

১৮ বছর বয়সি জাকির হোসেন এসেছেন তার মা জাহানারা বেগমের লাশ নিতে। অগ্নিদগ্ধ কারখানার চতুর্থ তলায় ললিপপ উৎপাদন শাখায় কাজ করতেন তিনি। জাকির বলেন, 'আর কত বসে থাকা লাগবে জানি না। এলাকার কয়েকজন আছে সাথে। সবাইর কষ্ট হইতাছে। আমাগো খালি জাগায় জাগায় বইসা থাকা লাগে।'

 

লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করা নিয়ে উপস্থিত স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করলে নারায়ণগঞ্জ সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জীবনকান্তি সরকার বেলা ১১টা ৩৫ মিনিটে সাংবাদিক ও নিহতের স্বজনদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, 'এখনো আমরা সমস্ত কাগজপত্র চূড়ান্ত করতে পারিনি। আমাদের অফিসাররা ২টা বাজে আসবে। তারা এলে আপনাদের সমস্ত কিছু জানাবেন এবং তারাই লাশ হস্তান্তর করবেন।'

 

এ সময় মর্গ প্রাঙ্গণে ভিড় বাড়তে থাকে। আগে থেকেই যদিও জানানো হয়েছিল যে, প্রথম দফায় ২৪ জনের লাশ হস্তান্তর হবে, তবু দেখা যায়, বাকি নিহতদের স্বজনরাও হাজির হতে থাকে। সব লাশ একবারে না দেয়ায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 

নিহত শ্রমিক অমৃতার স্বামী সেলিম জানান, তিনি নারায়ণগঞ্জের ভূলতা-গাউছিয়া থেকে লাশ হস্তান্তরের খবর শুনে এসেছেন। কিন্তু আজ তাকে ডাকা হয়নি। তিনি বলেন, 'আমারে কইছে শনিবার লাশ দিব। কিন্তু মন তো মানে না। আইজকা কার লাশ দেয় না দেয়, যদি দিয়া দেয়। এইগুলা ভাইবাই চইলা আইছি। এদের তো উচিত ছিল একদিনে দেয়া।'

 

উপস্থিত আরো অনেকেই সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তোলেন। দিনমজুর মোহাম্মদ তাহেরউদ্দিন বলেন, 'আমার একমাত্র ছেলে মারা গেছে। তারা খালি কয় সাহায্য পাইবেন। কিসের সাহায্য? আমার ছেলের লাশটা দেন। এত ঘুরাঘুরি কেন? আমাদের বেলায় ঘুরাঘুরি। মালিকরে তো ঠিকই ছাইড়া দিছে। কেমনে কী করমু, একেকজন একেক কথা কয়।'

 

লাশ কিভাবে দেয়া হচ্ছে, কিভাবে তারা নিয়ে যাবেন, এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জীবনকান্তি সরকার বলেন, 'আমাদের তরফ থেকে আমরা চেষ্টা করছি কিভাবে তাদের সাপোর্ট দেয়া যায়। যারা নিজেরা পারবেন, তারা নিজেরা করবেন। যদি না পারেন আমাদের সহায়তা নেবেন।'

 

তবে তার এই বক্তব্যের বিপরীতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সজীব গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (রপ্তানি) কাজী আব্দুর রহিম এই প্রতিবেদককে বলেন, 'সকল ব্যবস্থাপনা আমরাই করেছি। লাশ ধোয়ানো, প্যাকেট করা, বক্সে ঢোকানো, অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা, সবই আমরা করে রেখেছি। সবই আমাদের ব্যবস্থাপনা। এমনকি শ্রমিকদের যে স্বজনরা এসে পৌঁছেছেন তাদের সকাল-দুপুরের খাবারও আমরা দিয়েছি। কিন্তু পুলিশ-সিআইডির জন্যই লাশ দিতে দেরি হচ্ছে।'

 

বেলা দেড়টার দিকে স্বজনদের অপেক্ষার পালা শেষ হয়। এর আগ পর্যন্ত কেবল সিআইডি নাম-তালিকা মিলিয়ে দেখছিল। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ সময় কাজে হাত লাগান। এরপর ধীরে ধীরে শুরু হয় লাশ হস্তান্তর। চোখের পানি মুছতে মুছতে স্বজনেরা অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন এবং বাড়ির দিকে রওনা হন।

 

নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম মাহফুজুর রহমান মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে দৃকনিউজকে জানান, আজ ২৪ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হচ্ছে। বাকিগুলো শনিবার হস্তান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে। লাশ বহন ও দাফনের জন্য নগদ ২৫ হাজার করে টাকার একটি খাম আমরা নিহতের স্বজনদের হাতে দিচ্ছি।

 

ঘটনাস্থলে উপস্থিত শ্রমিকনেতা শামীম ইমাম দৃকনিউজকে বলেন, 'আমরা সকাল থেকে এখানে এসে অব্যবস্থাপনাই দেখতে পেয়েছি। নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের যে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলা হয়েছে, তা অকল্পনীয়। তাদের মানুষ মনে করা হয় না। মানুষের মর্যাদা তাদের দেয়া হয় না। রাষ্ট্র যদি তাদের মানুষ মনে করত, তাহলে লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটা আরও সম্মানজনক হতো।'

 

গত ৮ জুলাই ২০২১ রূপগঞ্জে সেজান-সজীব ব্র্যান্ডের খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুডস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে আগুন থেকে বাঁচতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যান তিনজন। পরদিন আগুনে পুড়ে বিকৃত হওয়া ৪৯টি লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। আগুনে পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় লাশগুলো শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়।