রবিবার ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ Sunday 22nd May 2022

রবিবার ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Sunday 22nd May 2022

আন্তর্জাতিক

ভারতের বৃহত্তম রাজ্যে নির্বাচন মুসলিম বিরোধী ঘৃণা বাক্য ও সহিংসতা ত্বরান্বিত করছে

২০২২-০৩-০৮

অঙ্গনা চ্যাটার্জি
তর্জমা : ইরফানুর রহমান রাফিন

ভারতের বৃহত্তম রাজ্যে নির্বাচন মুসলিম বিরোধী ঘৃণা বাক্য ও সহিংসতা ত্বরান্বিত করছে

 

[অঙ্গনা চ্যাটার্জি একজন সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী। তিনি বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর রেস অ্যান্ড জেন্ডারের পলিটিকাল কনফ্লিক্ট, জেন্ডার অ্যান্ড পিপলস রাইটস ইনিশিয়েটিভের সহ-সভাপতি। এই লেখাটি ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২২-এ জাস্ট সিকিউরিটিতে প্রকাশিত অঙ্গনার একটি ইংরেজি লেখার বাংলা অনুবাদ।]

 

ভারতের পাঁচটি রাজ্যে তাৎপর্যবহ নির্বাচনী কার্যক্রম চলছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির সবচে জনবহুল রাজ্য ও রাজনৈতিক স্নায়ুকেন্দ্র উত্তর প্রদেশ। উত্তর প্রদেশের নির্বাচন বিশেষভাবে সেই সংখ্যাগুরুবাদী জাতীয়তাবাদের চিত্র তুলে ধরছে, যা ভারত জুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও প্রাণঘাতী আগ্রাসন চালাচ্ছে। রাজ্যটির নির্বাচন এ-বছরের ১০ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছে। শেষ হবে ৭ মার্চ। নির্বাচনের ফল ঘোষিত হবে ১০ মার্চ। এই নির্বাচনের মধ্যেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতারা গণ সহিংসতার আহবান জানিয়ে তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের গা গরম করছেন।

 

হিন্দু সংস্কৃতিকে বিপর্যস্ত ও পর্যুদস্ত করার জন্য মুসলমান পুরুষরা হিন্দু নারীদেরকে বিয়ে করছে এরকম একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ভিত্তিতে উগ্রবাদী প্রচারাভিযান চালানো হচ্ছে। এই প্রচারাভিযান এবং এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রণীত একটি নতুন আইন মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারকে অগ্রাহ্য করছে। রাজ্যের নির্বাচিত প্রধান মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী বক্তৃতাবাজ। শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই নেতা নতুন মেয়াদে নির্বাচিত হতে একটা নির্বাচনী কৌশল হাতে নিয়েছেন। কৌশলটি বিভাজনমূলক, যা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগলোকে সংখ্যাগুরুদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

 

ধর্মীয় সমাবর্তনে চরমপন্থী শপথ

 

২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর ভাইরাল হয়ে যাওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, একটি ‘ধর্ম সংসদের’ কার্যক্রম চলছে। এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের ধর্মীয় সম্মেলন, যেখানে উপস্থিত হওয়া মানুষেরা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার যৌথ শপথ নিয়েছিলেন। মুসলমানদেরকে নির্মূল করা এই শপথের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় হরিদ্বারে, যা উত্তর ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে অবস্থিত, এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত। এই সম্মেলনে উপস্থিতি আধ্যাত্মিক নেতা ও কর্মীরা মুসলমানদের ওপর গণহত্যামূলক সহিংসতা ও জাতিগত হত্যাযজ্ঞ চালানোর পক্ষে তাদের যুক্তি তুলে ধরেন। তারা হিন্দুদেরকে “এই ‘শুদ্ধি অভিযানে’ অংশ নেয়ার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিতে উসকানি দেন, মিয়ানমারের কায়দায়।”

 

হরিদ্বারে যখন এই ‘ধর্ম সংসদ’ চলছিল, তখন হিন্দু যুব বাহিনী নামের একটি নজরদারিমূলক তরুণ সংগঠন দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করছিল। “লড়াই করো, মরো, আর প্রয়োজন হলে মারো”, এই স্লোগান দেয়ার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটিতে অংশগ্রহণকারীরা সহিংসতাকে বরণ করে নেন এবং একটি হিন্দু জাতি গঠন করার শপথ নেন। হিন্দু যুব বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যোগী আদিত্যনাথ। সংগঠনটিকে নিজেকে “হিন্দুত্ব [জাতীয়তাবাদী হিন্দুধর্মের মতাদর্শ] ও জাতীয়তাবাদের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ একটি উগ্র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন” বলে পরিচিতি দেয়।

 

হরিদ্বারে ঘৃণার যে বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে, ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকারের প্রধান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার প্রতি নিন্দা জানান নি। নিন্দা জানান নি তার মন্ত্রীসভার বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী নেতারাও। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এদের অন্যতম, যার মন্ত্রণালয়ের ওপর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। বরঞ্চ ২৫ ডিসেম্বর শিখদের এক গুরুদোয়ারায় বক্তৃতা দেয়ার সময় ভারতের ইসলামি ইতিহাসকে নেতিবাচক রঙে চিত্রিত করেছেন মোদী। এক সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিখ ধর্মগুরুর প্রতি ইঙ্গিত করে মোদী ঘোষণা করেন, “[মুসলিম শাসক] আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে গুরু তেজ বাহাদুরের আত্মত্যাগ ও তাঁর বীরত্বপূর্ণ কাজগুলো আমাদেরকে শিখিয়েছে, কীভাবে সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে লড়তে হবে।” মোদীর এই বার্তা ভারতে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ছুঁড়ে দেয়া কথিত হুমকির বিরুদ্ধে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাতে অস্ত্র তুলে নেবার একটা ইশারা হিশাবে কাজ করেছে ।

 

২৬ ডিসেম্বর ছত্তিশগড়ে আরেকটি ধর্ম সংসদ বসে। ছত্তিশগড় হচ্ছে মধ্য ভারতের রাজনৈতিক সংঘাতের একটি কেন্দ্রস্থল। অঞ্চলটির স্থানীয় সামাজিক ন্যায্যতা আন্দোলনগুলো [রাষ্ট্রীয়] কর্তৃপক্ষ আর হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ছত্তিশগড়ের এক নারী নেত্রী মুসলমান পুরুষদের সাথে প্রেম করা জনৈক হিন্দু নারীকে আক্রমণ করার জন্য হিন্দু যুবকদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। উত্তর প্রদেশেও একই ধরণের দৃশ্য দেখা গেছে। ৩০ জানুয়ারি সেখানকার একটি সংসদ ভারতের মাটিতে একটি হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছে। বারবার এরকম দৃষ্টান্ত তৈরি হওয়া সত্ত্বেও ঘৃণা ও উত্তেজনা ছড়ানো ঠেকাতে আদিত্যনাথ কোনো পদক্ষেপ নেন নি।

 

যোগী আদিত্যনাথ

 

মুসলমান ও অন্যান্য বিপদাপন্ন সম্প্রদায়ের অধিকারকে অগ্রাহ্য করে, এমন নানান প্রচারাভিযানে সমর্থন দিয়েছেন যোগী আদিত্যনাথ, কখনো কখনো নেতৃত্বও দিয়েছেন। ২০১৪ সালের এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, আদিত্যনাথ, যার আসল নাম অজয় মোহন বিশত বলে মনে হচ্ছে, বলছেন, “যদি মুসলমানরা একটা হিন্দু মেয়েকে তুলে নেয়, আমরা একশোটা মুসলমান মেয়েকে তুলে নেব। যদি মুসলমানরা একজন হিন্দুকে হত্যা করে, আমরা একশোজন মুসলমানকে হত্যা করব।”

 

আদিত্যনাথের ক্ষমতারোহণ ও গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের উগ্রপন্থী অংশকে উদ্দীপ্ত করছে। অনেক ডানপন্থী কর্মী উত্তর প্রদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের অনেক গভীরে জায়গা করে নিয়েছে। আদিত্যনাথ আস্তে আস্তে নিজেকে মোদীর রাজনৈতিক উত্তরসূরী হিশাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ২০০২ সালে মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মুসলমানদের ওপর যে ঐতিহাসিক গণহত্যা চালিয়েছিল, আদিত্যনাথ তার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে। ওই হামলা মোদীকে হিন্দু ডানপন্থীদের মধ্যে জাতীয় অবস্থানে উঠে আসতে সাহায্য করেছিল।

 

২০১৭ সালের মার্চ মাসে আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হন। এর কিছুকাল পরেই স্থানীয় বিজেপি নেতারা তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এরপর উত্তর প্রদেশ সরকার ১৩১টি ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০১৩ সালে মুজাফফরনগর শহরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দু-নেতৃত্বাধীন গণ সহিংসতায় অংশ নেয়ার দায়ে যারা অভিযুক্ত হয়েছিলেন, এই মামলাগুলো ছিল তাদের বিরুদ্ধে। মুজাফফরনগরের ওই ঘটনায় ৫২ জন মারা যান এবং ৫০,০০০এরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। এইসব মামলায় অভিযুক্তরা ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের আগস্টের মাঝামাঝি, আদিত্যনাথ সরকার প্রায় ৭৯টি মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। যে-৫৬৬টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, এগুলো ছিল তার ১৪ শতাংশ। চারটি গণধর্ষণের মামলাসহ মুজাফফরনগরের ৪১টি মামলার মধ্যে ৪০টির অভিযুক্তদেরকেই খালাস দেয়া হয়।

 

উত্তর প্রদেশ সরকার সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক আর অর্থনৈতিক ঐতিহ্যসমূহের বিভিন্ন উপাদানকেও তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। ‘উত্তর প্রদেশ প্রিভেনশন অফ কাউ স্লটার অ্যাক্ট, ১৯৫৫’ ব্যবহার করে আদিত্যনাথ সরকার যেসব আদেশ বাস্তবায়ন করেছে, তার শুরুতেই ছিল বিভিন্ন গোয়ালঘর আর কসাইখানায় অভিযান চালানো। ‘অপারেশন রেগুলেশনস’-এর দোহাই দিয়ে চালানো এই অভিযানগুলো মুসলমান ও দলিতদের রুটিরুজির ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে হামলা চালায়। ভারতের আধিপত্যশীল গোষ্ঠীগুলো ও জাতিভেদ প্রথা দলিতদেরকে ঐতিহাসিকভাবেই ‘অস্পৃশ্য’ বলে আসছে।

 

এই দলিতরা ক্রমবর্ধমান জুলুম-নিপীড়ণের শিকার হয়ে চলেছেন। একই সময়ে, আদিত্যনাথের শাসনে, গরুর গোশত খাওয়া আর অবৈধভাবে গবাদিপশুর বাণিজ্যে লিপ্ত থাকার দায়ে অভিযুক্ত মুসলমান পুরুষদেরকে দল বেঁধে ধাওয়া করা আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রহার করায় যেসব হিন্দুরা অংশ নিয়েছিলেন, উত্তর প্রদেশ পুলিশ তাদেরকে আটক করতে ব্যর্থ হয়েছে। অভিযুক্তদের একজন বলেন, “পুলিশ আমাদের কিসসু করে না, কারণ সরকারই তো আমাদের।”

 

২০১৭ সালের মার্চ মাসে বিজেপি সরকার উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত রাজ্যটির পুলিশ ১৪৬ জন মানুষকে খুন এবং ৩,৩০০ জন মানুষকে জখম করেছে। ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত, পুলিশি আক্রমণের শিকারদের ৩৭ শতাংশই ছিলেন মুসলমান। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক দলিত তরুণীকে চারজন উঁচু বর্ণের পুরুষ ধর্ষণ করে হত্যা করার পর, উত্তর প্রদেশ পুলিশ ও জেলা প্রশাসন মেয়েটির মৃতদেহ তড়িঘড়ি করে দাহ করেছে বলে জানা গেছে।

 

সাধারণভাবে, ভারত জুড়ে, বিজেপি নিজেদেরকে হিন্দুদের মিত্র বলে জাহির করে। দলটি ১৯৯২ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধবংসের প্রশংসা করে। কাশ্মীরে ভারত সরকারের সামরিক শাসন ও কাশ্মীরের ব্যাপারে উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি জারি রাখে। পক্ষপাতমূলক নাগরিক আইন উর্দ্ধে তুলে ধরে। জোরপূর্বক হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরকরণ সমর্থন করে। নিম্ন বর্ণের জন্য ‘কোটা সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে’ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত করে। গবাদিপশু হত্যা নিষিদ্ধ করে। মুসলমান নারীদের হিজাব পরার অধিকারে বাধা দেয়। এবং ‘লাভ জিহাদ’ ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে বড় করে তোলে।    

 

“লাভ জিহাদ”

 

“লাভ জিহাদ” ধারণাটি একটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এই তত্ত্বটির মাধ্যমে মুসলমান পুরুষদেরকে অপরাধী হিশাবে চিহ্নিত করতে এবং ইসলামবিদ্বেষ বাড়িয়ে তুলতে ধর্মান্ধতা প্রচার করা হয়। এটি একটি সমন্বিত মিথ্যাচারমূলক প্রচারাভিযান। এই প্রচারাভিযান মুসলমানদেরকে একটি সহিংস বর্ণ হিশাবে চিহ্নিত করে, এবং ‘মুসলিম অপরের’ ব্যাপারে ঘৃণা ছড়ায়। মুসলমান পুরুষদেরকে যৌন উন্মত্ত শিকারী পশু হিশাবে দেখিয়ে তাদেরকে তীব্রভাবে গালমন্দ করে। এই তত্ত্ব অনুসারে, মুসলমান পুরুষদের লক্ষ্য হিন্দু নারীদেরকে বিয়ে করা ও ইসলামে ধর্মান্তরিত করা, এবং এর মধ্য দিয়ে ভারতের হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠতার অবসান ঘটানো।

 

কিছু জাত্যাভিমানী ও হেটেরোনরমেটিভ ধারণার ওপর ভিত্তি করে, এটি হিন্দু নারীদেরকে দুর্বল ও ভালোমন্দের বুঝহীন হিশাবে দেখায়, সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাত হিশাবেও দেখায়। একইসাথে, হিন্দু নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালায়। এটি হিন্দু নারীর “উদ্ধারকারী” ও রক্ষক-আগ্রাসী হিশাবে হিন্দু পুরুষদের প্রথাগত পরিচয়কে হাতিয়ারে পরিণত করে। এটি দাবি করে যে, মুসলমানরা হিন্দু নারীদেরকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে “অপহরণ” করে।

 

২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর আদিত্যনাথ-নেতৃত্বাধীন সরকার উত্তর প্রদেশ প্রহিবিশন অফ আনলফুল কনভার্শন অফ রিলিজিয়ন অর্ডিন্যান্স, ২০২০ প্রবর্তন করে, একই দিনে আইনটি অনুমোদন লাভ করে। নিত্যদিনের আলাপে আইনটিকে “লাভ জিহাদ” আইন বলে অভিহিত করা হয়। বর্ণশঙ্করত্ব-বিরোধী ও ধর্মান্তরকরণ-বিরোধী এই আইন চারদিন পরে কার্যকর হয়। ২০২১ সালের মার্চে উত্তর প্রদেশের রাজ্যপাল বিধানসভায় গৃহীত হওয়া একটি বিধিতে সই করলে আইনটি রাজ্য আইনের রূপ লাভ করে।

 

আইনটি আদতে একটি নিরাপত্তাবিধি যা সংখ্যালঘু ধর্মগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। বিশেষ করে ইসলামকে। এটি ব্যক্তির অধিকারের জন্য বাধা সৃষ্টি করে। বিশেষত সেইসব মুসলমান পুরুষ ও হিন্দু নারীর জন্য, যারা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক গড়েছেন অথবা খ্রিস্টধর্মে বা ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন।

 

অহিন্দুদেরকে জোর করে হিন্দুধর্মে দীক্ষিত করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে ‘ঘর ওয়াপসি’ প্রচারাভিযান চালু আছে, উল্লিখিত আইনটি সেটিকে শক্তিশালী করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে কেউ হিন্দুধর্ম থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে তার ক্ষেত্রে এই আইন প্রযুক্ত হয় না। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা একটি পৌরাণিক বিশ্বাস তৈরি করেছে, যা সকল ভারতীয়ই ‘মূলত হিন্দু’ এমন একটি ধারণা প্রচার করে থাকে। তাই ‘ঘর ওয়াপসি’-কে নিজের আসল ধর্মে ফিরে আসা হিশাবে দেখা হয়। কিন্তু এর প্রভাবের একটি লৈঙ্গিক দিক চোখে পড়ে।

 

দলিত, আদিবাসী, ও এলজিবিটিআইকিউএ ব্যক্তিদের (বিষমকামী নন এমন সব মানুষদেরকে বুঝাতে সাধারণভাবে ব্যবহৃত একটি পদ। - অনুবাদকের নোট) মত যারা জাতিভেদ প্রথা বা জাতিগত নিপীড়ণের শিকার, ‘ঘর ওয়াপসি’ তাদের ওপরও প্রভাব ফেলে।

 

ভারতে যদিও ১৯৬৭ সাল থেকেই ধর্মান্তরকরণ-বিরোধী আইন বলবৎ আছে, আজকের দিনের “লাভ জিহাদ” আইনের অধীনে সংঘটিত হওয়া কোনো অপরাধের জন্য কেউ অভিযুক্ত হলে, বিচারের অপেক্ষায় থাকাকালে তিনি জামিনলাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। বর্তমান আইন সেসব বিয়ের বৈধতা খারিজ করে দেয় যেগুলোর “একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এক ধর্মের পুরুষ কর্তৃক আরেক ধর্মের নারীকে ধর্মান্তরিত করা।” এহেন অপরাধের সাজা ১ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড।

 

আন্তঃধর্মীয় বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা কোনো ব্যক্তি যদি ধর্মান্তরিত হতে চান তাহলে তাঁকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হবে। অধিকন্তু, ব্যাপক ধর্মান্তরকরণে নেতৃত্বদানকারী গোষ্ঠীগুলোর ৫০,০০০ ভারতীয় রুপি পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ধর্মান্তরকরণে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের ৩-১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। কাউকে তার সম্মতি ছাড়া ধর্মান্তরিত করার সাজা ১৫০০০ ভারতীয় রুপি জরিমানা এবং ১ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড। শিশু, নারী, এবং “তফসিলি জাতি” বা “তফসিলি আদিবাসী গোষ্ঠী”-র কাউকে ধর্মান্তরিত করলে তার সাজা ২ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ২৫০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে।

 

মারাত্মক প্রভাব

 

আমার গবেষণার ধারাবাহিকতায়, গত বছর আমি এমন একজন নারীর সাথে কথা বলেছি, “লাভ জিহাদের” শোধ নিতে চাওয়া হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের কর্মকাণ্ডে যার জীবন চিরকালের জন্য জখম হয়ে গেছে। (আমি তার ও তার সাবেক জীবনসঙ্গীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাদের নাম উল্লেখ করা থেকে এবং ঘটনার বিশদ বিবরণ দেয়া থেকে বিরত থাকছি।) নারীটি হিন্দু সম্প্রদায়ের। উত্তর প্রদেশের এক মফস্বল শহরে এক মুসলমান পুরুষের সাথে তার পরিচয় ঘটে। দুজনে প্রেমে পড়ে যান এবং একে অপরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ একটি যৌথ জীবনের সূচনা ঘটান।

 

এ-ধরণের সম্পর্কগুলোর ব্যাপারে খবরদারি করা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের অনুদার তর্জনগর্জনের কারণে এই যুগলের গণ্ডিটা যতই ছোট হয়ে আসতে থাকে, ততোই তাদের বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যরা তাদের সুরক্ষার কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়ে। হুমকি যতই বাড়তে থাকে, দুই পরিবার আর সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকা ছোটখাটো মতপার্থক্যগুলোকে উসকে দেয় হিন্দু ডানপন্থীরা। ফলে পুরো পরিবেশটা বিষাক্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায় যুগলটির বিয়ের অধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং তাদের ওপর অসহনীয় মাত্রায় চাপপ্রয়োগ করতে থাকে। ঘটনাপ্রবাহ ছেলেটির আত্মবিশ্বাস ভেঙ্গে চূর্ণ করে দেয়। মেয়েটির বেঁচে থাকার ইচ্ছাও ভঙ্গুর হয়ে ওঠে।

 

আরেকটা ঘটনা বলি। আরবাজ মোল্লা নামের এক ২৪ বছর বয়সী মুসলমান পুরুষ এক হিন্দু নারী প্রেমে পড়ে যান। দক্ষিণপশ্চিম ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বেলগাভি জেলায় আরবাজকে খুন করা হয়। ২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তার লাশ পাওয়া যায়। বিকৃত ও ছিন্নমস্তক লাশটি রেলরাস্তার পাশে পড়ে ছিল। একই মাসে, উত্তর প্রদেশে একটি দঙ্গল ১৬ বছর বয়সী একটা ছেলেকে আক্রমণ করে বসে। লাভ জিহাদের সন্দেহে এই আক্রমণ চালানো হয়। আক্রমণ চলাকালে ছেলেটি একটা ১২ বছর বয়সী মেয়ের সাথে বাসে করে কোথাও যাচ্ছিল। পরবর্তীতে আসল কাহিনী কী তা যাচাই করতে গিয়ে জানা গেল, বাচ্চা মেয়েটি ও কিশোরী ছেলেটি উভয়েই মুসলমান সম্প্রদায়ের সদস্য।

 

উত্তর প্রদেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দঙ্গলগুলো কখনো কখনো নিছকই অনুমানের বশে আন্তঃধর্মীয় বিবাহ অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে, অথবা এসব অনুষ্ঠান পণ্ড করে দিতে পুলিশ ডেকেছে। নারীরা সহিংসতার শিকার হয়েছে। এমনকি পুলিশী হেফাজতেও। একবার এমন একটি আক্রমণের কারণে গর্ভপাতের ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। কয়েকশো মুসলমান পুরুষ শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন। ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে, উত্তর প্রদেশে লাভ জিহাদ আইন ভঙ্গ করার দায়ে অন্তত ১৮৯ জন মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

হুমকির মুখে বহু যুগল গা ঢাকা দিয়েছেন। এর কারণ হল আইনটি প্রাত্যহিক জীবনে আতঙ্ক তৈরি করে। একজন মুসলমান নারী আমাকে বলেছেন, “তারা [হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা] আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে তার হিন্দু প্রেমিকাকে ধোঁকা দেয়া ও শোষণ করার দায়ে অভিযুক্ত করেছে। তারা আমার ভাইয়ের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই লোকগুলো আমাদের চিরচেনা। এখন তারা আমাদের মহল্লায় টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে আর আমাদের ওপর নজরদারি করছে। আমার পরিবার আতঙ্কিত বোধ করছে। আমাদের যুক্ততার বোধ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। নিজ শহরে আমরা পরবাসী হয়ে গেছি।”

 

উত্তর প্রদেশ নির্বাচন ও এর পরে

 

উত্তর প্রদেশ ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সম্মুখীন। সর্বস্তরের জনগণের কাছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে কিংবা দায়িত্বশীলতার সাথে করোনাসৃষ্ট মহামারী পরিস্থিতি সামাল দিতে পারার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা প্রকটরূপে দৃশ্যমান হচ্ছে। তবু, ২০২০ সালে, আদিত্যনাথ সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিলের বরাদ্দকৃত অংশের মাত্র ১০ ভাগ সংখ্যালঘু কল্যাণ কর্মসূচির পেছনে ব্যয় করেছে বলে জানা গেছে।

 

চলমান নির্বাচন শুধু যে আদিত্যনাথের রাজনৈতিক ভাগ্যই নির্ধারণ করবে তা নয়, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের ভাগ্যও নির্ধারণ করবে। সেইসাথে নির্ধারণ করবে বিজেপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। আদিত্যনাথ ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি বিশ্বাস করেন উত্তর প্রদেশের হিন্দুরা, যারা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ, আবারও রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনবেন। নির্বাচনী প্রচারাভিযানে, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী আর রাজনীতির ব্যাপারে উদাসীন মানুষদেরকে জড়ো করতে ঘৃণা বাক্য ব্যবহার করছে। কানকথা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ও সামাজিক গণমাধ্যমে মুসলমানদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এহেন আক্রমণের মুখে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো ও তাদের মিত্ররা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে, তা নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন। নির্বাচনে বিজেপির বিজয় মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদেরকে বিরাট ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে। একইসাথে, উত্তর প্রদেশে যদি বিজেপি না জেতে, তাহলে হিন্দুত্ববাদী কর্মীরা কি নিরঙ্কুশ হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধোঁয়া তুলে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে?

 

মূল নিবন্ধের লিংক https://www.justsecurity.org/80203/election-in-indias-largest-state-accelerates-anti-muslim-hate-speech-and-violence/