কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী শাসনামলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে শাসন ও নিপীড়নের চিত্রকে বিশ্লেষণ এবং এই গণমাধ্যম শিল্পকে সংস্কারের একটা রূপরেখা অন্তবর্তীকালীন সরকারে উদ্যোগে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। যে রাজনৈতিক প্রত্যয় নিয়ে সরকার কমিশনটি গ্রহণ করেন, একই রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও মনোযোগ প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। কার্যত প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা ছাড়া সরকারের দিক থেকে এই বিষয়ে আর কোনও উদ্যোগ নেয়া হয় নাই। এই পরিপ্রেক্ষিতে দৃকনিউজের পক্ষ থেকে মীর হুযাইফা আল মামদূহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী- এর সঙ্গে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের নানা দিক নিয়ে আলাপ করেছেন।
হুযাইফা আল মামদূহ: গণমাধ্যম কমিশনের রিপোর্টকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? সুপারিশগুলো কি বাস্তবায়নযোগ্যভাবে করা হয়েছে বলে মনে করেন? অনেক সুপারিশই মনে হয়েছে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর করা সম্ভব না। যেমন ক্রস ওনারশিপ নিষিদ্ধ করা, একাধিক মিডিয়ার মালিকদের কাছ থেকে মিডিয়া সরিয়ে নেওয়া। এই সময় এসে এসব কী আদৌ সম্ভব?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: প্রথম কথা হলো, সংস্কার কমিশনের রিপোর্টটাকে মোটাদাগে দেখলে বলতে হবে—এটা একটা ভালো উদ্যোগ। আমাদের দেশে আগেও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন হয়েছে, কিন্তু কোনোটা বাস্তবায়িত হয়নি। যেকোনো রিপোর্টেই সব চাহিদা একসাথে পাওয়া যায় না। কেউ যদি দশটা পয়েন্ট চায়, হয়তো আটটা পাওয়া যাবে। সেই বিবেচনায় উদ্যোগটা খারাপ ছিল না। কিন্তু গণমাধ্যম সংস্কার করতে গেলে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, গণমাধ্যম একটা সিস্টেম। পৃথিবীতে এমন কোনো গণমাধ্যম সিস্টেম নেই, যেটা কোনো দেশের রাজনৈতিক কাঠামো থেকে আলাদা। আপনি যদি গণমাধ্যমকে সিস্টেম হিসেবে দেখেন, তাহলে আপনাকে ম্যাক্রো লেভেলে চিন্তা করতে হবে। আমার কাছে মনে হয়েছে, উইথ ডিউ রেসপেক্ট—এই সংস্কার রিপোর্টটা খুব মাইক্রো লেভেলে করা। সাংবাদিকের বেতন, নিরাপত্তা, মালিকানা—এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলো পুরো সিস্টেমের খুব ছোট অংশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিস্টেম নিজেই ইউনিক। পৃথিবীর আর কোথাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না। এর কারণ, আমরা নিজের রাজনৈতিক সিস্টেমের ওপর আস্থা রাখতে পারি না।
আপনি নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করলেই মিডিয়া সংস্কার হয়ে যাবে—এটা হয় না। সংস্কার করতে চাইলে রাজনৈতিক সিস্টেমের ছাঁচ বদলাতে হবে। কারণ এই দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি—সবকিছুই রাজনৈতিক সিস্টেমের অধীনে চলে। যতক্ষণ আপনি রাজনৈতিক সিস্টেমকে বুঝবেন না, ততক্ষণ মিডিয়া সিস্টেমের প্রকৃতি ধরতে পারবেন না। আপনি উদাহরণ দিচ্ছেন ক্রস ওনারশিপ। পৃথিবীর সব দেশেই কোনো না কোনোভাবে এটা আছে। দক্ষিণ ইউরোপে পার্টি প্রেস (দলীয় সংবাদমাধ্যম) খুবই ওপেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখানে দলীয় পত্রিকা আছে, অথচ তারা কখনো প্রকাশ্যে বলে না যে তারা পার্টি প্রেস। নীতিটা হওয়া উচিত ছিল—পার্টি প্রেস থাকতে পারবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামাত—যে কোনো দলের মুখপাত্র মিডিয়া থাকতে পারে। পাঠক দেখবে কি দেখবে না, সেটা পাঠকের ব্যাপার। আপনি বিএনপির পক্ষে কথা বলছে বলে কোনো পত্রিকা বন্ধ করে দেবেন—এটা গণতান্ত্রিক চিন্তা না। রাজনৈতিকভাবে ডেমোক্রেসি আনতে হলে এই জায়গাটায় আসতেই হবে। মিডিয়া সিস্টেমেরই অংশ।
এখন প্রশ্ন হলো, ক্রস ওনারশিপ কেন বাস্তবে বন্ধ করা যায় না? কারণ প্রতিটি বিনিয়োগই কোনো না কোনো ইন্টেনশন নিয়ে আসে। সরকার নিজেও একটা ইন্টেনশন নিয়েই যে কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে। বিটিভি কি নিরপেক্ষ? কেন না? কারণ রাজনৈতিক সিস্টেমে সরকারের প্রোপাগান্ডা টুল দরকার। এখানেই মূল সমস্যা। তাই শুধু বিটিভি সংস্কার করলেই মিডিয়া সংস্কার হবে না। আপনি যা করতে পারতেন—বিটিভিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনের বাইরে এনে রাষ্ট্রপতির অধীনে দেওয়া। এর বাইরে বাস্তব কোনো পরিবর্তন হবে না। শুধু বলা যে, একসময় এটা বিবিসির আদলে করা হয়েছিল, আবার সেদিকে ফিরিয়ে নিতে চাই—এভাবে হবে না। কারণ রাজনৈতিক সিস্টেম আলাদা, বাস্তবতা আলাদা।
এই রিপোর্টটা মাইক্রো লেভেলের আরেকটা কারণ হলো—ওনারা বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিচ্ছেন, ইন্দোনেশিয়া বা অন্য দেশ। সেখানে মিডিয়ার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব থাকে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে। মিডিয়া তার বিনিময়ে লাইসেন্স পায়। বাংলাদেশেও লাইসেন্স পায়। কিন্তু বাংলাদেশে মিডিয়া শুধু রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে চলে না—এখানে মিডিয়া সরকারের ক্লায়েন্ট। যদি মিডিয়া কেবল রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিতে চলত, তাহলে ২০০৬ সালে যেসব চ্যানেল ছিল, সেগুলো খোলাখুলি বিএনপির চ্যানেল হতো এবং বলত, “লগি-বৈঠা আন্দোলন ঠিক ছিল না”। কিন্তু তারা সেটা বলেনি, কারণ তারা বুঝেছিল ক্লায়েন্ট বদলাচ্ছে। একইভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে–পরে দেখা গেছে, সব চ্যানেল আওয়ামী লীগ ঘরানার মালিকানাধীন হলেও তারা সরাসরি রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেনি। কারণ তারা বুঝেছে, ক্লায়েন্ট বদলে গেছে।
এটাই বাংলাদেশের ইউনিক বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর কোথাও একসাথে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি আর রাজনৈতিক ক্লায়েন্টেলিজম এত স্পষ্টভাবে কাজ করে না। এই দুইটা একসাথে থাকলে সেটাকে বলা যায় ‘পলিটিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টালাইজেশন’। এটা নতুন কোনো থিওরি না, কিন্তু কমিশন এটা ধরতে পারেনি। এর সঙ্গে আরেকটা বিষয় যুক্ত হয়েছে, ‘করপোরেট ক্লায়েন্টেলিজম’। রাজনৈতিক আর করপোরেট নেক্সাস মিলিয়ে এখানে এক ধরনের অদ্ভুত মিডিয়া সিস্টেম তৈরি হয়েছে, যেটা এই রিপোর্টে অনুপস্থিত। করপোরেট ক্লায়েন্টেলিজম নিয়ে তারা একেবারেই ভাবেননি।
হাইব্রিড রেজিমের যুগে, হাইব্রিড মিডিয়া সিস্টেমে ‘ওয়ান মিডিয়া, ওয়ান ওনার’ থিওরি আর খাটে না। একসময় প্রথম আলোর শুধু প্রিন্ট ছিল। এখন তাদের কাছে কী নেই? দ্য ডেইলি স্টার, সমকাল—সবাই মাল্টিপ্ল্যাটফর্ম। সবচেয়ে বড় কথা, তারা বিজনেস মডেল চিন্তা করেননি। আপনি যদি ম্যাক্রো লেভেলে ভাবেন, তাহলে বিজনেস মডেল ভাবতেই হবে। আগে মিডিয়ার ব্যবসা ছিল মূলত সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর। এখনও আছে, বিশেষ করে দেয়াল পত্রিকাগুলোর ক্ষেত্রে। তারা সার্কুলেশন দেখিয়ে ডিএফপি থেকে অনুমোদন নেয়, তারপর সরকারি বিজ্ঞাপন পায়।
কিন্তু বড় মিডিয়াগুলো এখন আর শুধু সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল না। এমনকি করপোরেট বিজ্ঞাপনের ওপরও পুরোপুরি না। আগে আপনি গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে নিউজ করতেন না, কারণ তারা বিজ্ঞাপন দিত না। এখন আপনি নিউজ করবেন, কারণ আপনার বড় আয়ের উৎস Google AdSense। আপনি গ্রামীণের বিরুদ্ধে নিউজ করলে গ্রামীণ হয়তো আপনাকে দেশীয় বিজ্ঞাপন দেবে না—কোনো সমস্যা নেই। ইউটিউবে তখন সারা দুনিয়ার বিজ্ঞাপন আসবে, যেখানে বাংলা ভাষাভাষী আছে। মানে মিডিয়ার বিজনেস মডেল বদলে গেছে। কিন্তু রিপোর্টে মনে হয়েছে, ওনারা ধরে নিয়েছেন আমরা এখনো আগের মতো সরকারের বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল। আসলে নির্ভরশীল কারা? যারা দেয়াল পত্রিকা চালায়। যারা পত্রিকা বের করে সার্কুলেশনের জন্য না, বরং অবৈধভাবে নিউজপ্রিন্ট এনে ব্ল্যাক মার্কেটে বিক্রির জন্য। এই জায়গাটায় কোনো কনসার্ন নেই।
আপনি যদি মিডিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে চান, সার্কুলেশন নিয়ে কাজ করতেই পারেন। কিন্তু তার জন্য স্পষ্ট ক্রাইটেরিয়া দরকার। প্রত্যেকটা মিডিয়া হাউসকে ইনকাম–এক্সপেন্স, সার্কুলেশন, ওয়েজ বোর্ড—সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। একটা পত্রিকা কেন এসব হিসাব দেয় না—এই প্রশ্নটা কি গত এক বছর বা ১৬ মাসে একবারও করা হয়েছে? সংস্কার করার আগে আপনাকে দেখাতে হবে যে আপনি স্বচ্ছ হতে চান। এটা প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার করবে না—তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমার মূল্যায়ন হলো, উদ্যোগটা ভালো ছিল, কিন্তু খুবই মাইক্রো লেভেলের।
হুযাইফা আল মামদূহ: থিওরি আলাপ করতে গিয়ে প্রসঙ্গটা এসেছে—মিডিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান কীভাবে কাজ করে, সেটা রিপোর্টে একদমই ধরা পড়েনি।
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: মিডিয়া পলিটিক্যাল ইকোনমি যাই বলেন না কেন, মিডিয়া সিস্টেম বুঝতে হলে সমাজকেও বুঝতে হবে। এখানে ধর্মীয় কনটেন্ট কোন মাত্রায় যাবে, সামাজিক স্থিতি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সেটারও একটা নীতি থাকা দরকার। কারণ আমরা ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়া নই; আমরা ভারতীয় উপমহাদেশ—এখানে রাজনীতি আর ধর্ম একসাথে মিশে থাকে। মোয়ার মতো মুড়ি আর গুড় আলাদা করা যায় না। আলাদা করতে গেলেই ভেঙে যাবে। এই অঞ্চলে ধর্ম বাদ দিয়ে রাজনীতি, বা রাজনীতি বাদ দিয়ে ধর্ম—এভাবে আলাদা করে ভাবা যায় না। ফলে মিডিয়া সিস্টেমও সেই মোয়ার মতো করেই তৈরি।
এই কারণে আপনি যদি পুরো সিস্টেম না ভেবে শুধু বলেন, “অন্য দেশে হয়েছে, আমি কেন পারব না”—তাহলে কাজ হবে না। আপনাকে সিস্টেমের কাঠামোর ভেতরেই চিন্তা করতে হবে। এটাই আমার মূল কথা।
হুযাইফা আল মামদূহ: তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—এর পেছনে কোনো এনজিওবাদী মানসিকতা কাজ করেছে?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: দেখেন, ব্রডকাস্ট পলিসি, কমিউনিটি রেডিও পলিসি, এডভার্টাইজমেন্ট পলিসি—বছরের পর বছর বিদেশি এনজিওদের ফান্ডিংয়ে হয়েছে। সব পলিসি বানায় তথ্য মন্ত্রণালয়। আমি একবার অনলাইন মিডিয়া পলিসি নিয়ে একটি সেমিনারে বলেছিলাম—ওরা কমিউনিটি রেডিও পলিসি থেকে সরাসরি কপি- পেস্ট করেছে, এতটাই যে নীতিমালার একটি ধারায় ‘কমিউনিটি রেডিও’ শব্দটাই থেকে গিয়েছিল।
নীতিমালার মূল উৎস সাধারণত ভারত ও শ্রীলঙ্কা—যারা আগে করেছে। আর নতুন টার্ম বা জার্গন আসে ইউরোপ, আমেরিকা বা পশ্চিমা দেশগুলো থেকে—যারা ফান্ড দেয়। তাদের ধারণা হলো, থার্ড ওয়ার্ল্ড দেশগুলোতে গণতন্ত্র নেই, সুশাসন নেই, তাই মিডিয়াকে শক্তিশালী করতে হবে। কথাটা আংশিক সত্যও। একনায়কতন্ত্র হোক বা আধা-একনায়কতন্ত্র—মিডিয়ার একটা ভূমিকা থাকে বলেই সরকার নিজের মিডিয়া রাখে। খুব পুরনো, ভাঙা কুলার হলেও সেটা রেখে দেয়। তাই তারা এই জার্গন আর ধারণাগুলো ইমপোজ করে—“এগুলো তোমরা বাস্তবায়ন করো।”
আরেকটা বিষয় হলো—আমরা এখন গ্লোবাল ওয়ার্ল্ডে থাকি। পাশ্চাত্যে যা চালু হয়, সেটাই আমাদের এখানেও চলে আসে। পাশ্চাত্যে এআই এসেছে, এখানেও এসেছে। পার্থক্য হলো—ওরা এআই আসার আগেই বুঝেছিল যে এমন কিছু আসছে, তাই আগেই নীতি বানিয়েছে। আমরা সেটা করিনি। এখানে ব্যবহার শুরু হওয়ার পর হুড়োহুড়ি শুরু হয়, তখন তাড়াহুড়ো করে নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, বা দু’দিক থেকে টেনে অস্থায়ী বেড়ার ঘরের মতো একটা কাঠামো বানানোর চেষ্টা চলে। এটাই আসল সমস্যা।
ফলে আমাদের এখানে নীতি যাই হোক, আমরা নিজের বাস্তবতা থেকে চিন্তা করি না। সবকিছু দেখি—পাশের দেশ কী করেছে। কিন্তু আমি চাইলেও ব্রিটিশ গণতন্ত্র এ দেশে বসাতে পারবো না। আমি চাইলেও আমেরিকান প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম এখানে চালু করতে পারবো না। তাই আমরা নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) বানিয়েছি। অতীতে যারা কেয়ারটেকারের বিরোধিতা করেছিল, তারাই এখন কেয়ারটেকারের পক্ষে—কারণ এটাকেই এখন ‘মন্দের ভালো’ মনে হচ্ছে।
রাজনৈতিক নীতি করতে হলে এই ‘মন্দের ভালো’ দিয়েই করতে হবে। ব্রিটিশ ডেমোক্রেসি যেভাবে চলে—“ওদের পিআর আছে, আমারও পিআর লাগবে” —এই চিন্তায় হবে না। আপনাকে ভাবতে হবে আপনার সাবকন্টিনেন্ট, আপনার সামাজিক প্রকৃতি, আপনার ভোটার আর আপনার দর্শকের আচরণ অনুযায়ী। মিডিয়াতে এখানকার মালিকানা, এখানকার নেক্সাস—এসব মাথায় রেখেই ভাবতে হবে। আমরা কখনোই চেষ্টা করিনি—এই দেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী আসলে কতগুলো গণমাধ্যম টেকসই হতে পারে। গণমাধ্যম সংস্কারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল মিডিয়ার ভালনারেবিলিটি বোঝা। মিডিয়া এখন ভয়ংকর রকমের ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। অনেকে ‘মিডিয়া’ নাম ব্যবহার করে শুধু ব্যবসা করছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে চাইলে, মিডিয়ার ভায়াবিলিটি আনতে হলে আগে মিডিয়া মার্কেট বিশ্লেষণ করতে হতো—বাজারের আকার কত, কতগুলো টিভি চ্যানেল বাস্তবে টেকসই—এই হিসাব আগে দরকার ছিল। সেটা না করে নতুন টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স দিচ্ছেন কেন? মিডিয়া তো বেহেশতখানা না—মানুষের বানানো জিনিস, এর সক্ষমতার সীমা আছে।
এই কারণেই বলছি, রিপোর্টটা খুব মাইক্রো লেভেলে রয়ে গেছে। উপরিতলে কথা হয়েছে, গভীরে যাওয়া হয়নি। একটা সিস্টেমে অনেকগুলো ডট থাকে, সেগুলো জোড়া লাগাতে হয়। এই রিপোর্টে সেই ডটগুলো মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়নি।
হুযাইফা আল মামদূহ: রিপোর্ট পড়তে পড়তে মনে হয়েছে—উনারা একদিকে মিডিয়াকে রাষ্ট্রের ‘ ফোর্থ এস্টেট’ হিসেবে দেখতে চান, আবার একই সঙ্গে এটাকে ব্যবসা হিসেবেও দাঁড় করাতে চান। সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন তারা।
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: উইথ ডিউ রেসপেক্ট—বাংলাদেশের সাংবাদিকদের মধ্যে আমরা যেসব ক্যাটাগরি করি, রিপোর্টিং, ডেস্ক ইত্যাদি—তার মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। এই মিডিয়া কমিশনে কি এমন কেউ আছেন, যিনি বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে দীর্ঘদিন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেছেন? আপনার যে অসুখ হয়েছে, তার বেদনা আপনি বেশি বুঝবেন, না আমি? বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং জায়গাটার ভুক্তভোগী এখানে কেউ নেই। পুরো রিপোর্ট পড়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কোনো বাস্তব ধারণাই পাওয়া যায় না।
আমার মনে হয়েছে, তারা মিডিয়াকে একটা দালান হিসেবে ভাবছেন—যেখানে মালিক বা সম্পাদক বসে থাকেন। কিন্তু এই দালানের বাইরে যে বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি কাজ করে, সেটাকে তারা বুঝতে চাননি। সাংবাদিকের বেতন নিয়ে কথা বলেছেন, নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু আপনি যদি মিডিয়া সিস্টেমের সঙ্গে রাজনৈতিক সিস্টেমটা ঠিক করতে পারেন, তাহলে বেতন, নিরাপত্তা—সবকিছুই অনেকটাই নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। তখন সাংবাদিককে, রাজনৈতিক নেতা মারবেন না।
কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? বিশেষ ক্ষমতা আইনে সাংবাদিক গ্রেফতার হচ্ছে। আপনি ডিএসএ বাদ দিয়েছেন, সমালোচনার পর সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টও সংশোধন করেছেন। কিন্তু ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৯ থেকে ৫০২ ধারা রেখে দিয়েছেন—যেখানে যেকোনো সম্পাদক বা প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে যেকোনো দিন মানহানির মামলা হতে পারে। ডেইলি স্টারের সম্পাদকের বিরুদ্ধে একদিনে ৮৩ বা ৮৭টা মামলা হয়েছিল—এই নজির তো আছে। মানে, বটগাছ রেখে দিয়ে আপনি সুপারি গাছগুলো ছাঁটাই করছেন।
হুযাইফা আল মামদূহ: কমিশনের প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বেশ কিছু প্রস্তাব আছে, সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের একটি খসড়ার কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতার জায়গায় তেমন জোর দেওয়া হয়নি, বরং প্রেস কাউন্সিল পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। আপনি এই বিষয়টা কীভাবে দেখেন?
সাইফুল আলম চৌধুরী: উদাহরণ দিই। একজন নারী সাংবাদিককে তার সহকর্মী পছন্দ করলো, প্রস্তাব দিল, নারী রাজি হলো না। পরে ওই ব্যক্তি তার বিকৃত বা অশ্লীল ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দিল। নারী সাংবাদিক ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে (ডিএসএ) মামলা করলেন। আমরা রিপোর্ট করলাম—“সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা।”আবার আরেকটা কেস—একজন সাংবাদিক একটি কলেজছাত্রীকে হ্যারাস করেছে, মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে, বাবা মামলা করেছেন। আমরা বলছি—“সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে মামলা।”
কিন্তু একই ঘটনা যদি একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে হতো, তখন আমরা ডিএসএকে ভালো আইন বলতাম। আরও মজার উদাহরণ আছে। কোর্টরুমে এক মুহুরি দুপুরে একটু ঘুমাচ্ছিল। কেউ সেটা ভিডিও করে এক সাংবাদিককে দিল। সাংবাদিক সেটা টিভি বা পত্রিকায় দেয়নি—ফেসবুকে লাইভ করেছে, আদালতে কী হচ্ছে তা দেখাচ্ছে বলে। আদালত তাকে কনটেম্পট অফ কোর্টে না নিয়ে ডিএসএতে মামলা করেছে। আর আমরা বলছি—“সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে মামলা।”
সাংবাদিক হলেই কেউ মহামানব হয়ে যায়—এই ধারণা ঠিক না। একজন মালিক বা সম্পাদক যদি মানবপাচারের মতো অপরাধ করে, আমি বা আপনি করলে যে অপরাধ হতো, তার ক্ষেত্রেও তাই হবে। আইনে কোথাও লেখা নেই যে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা সুবিধা থাকবে। তাই আমার শাস্তি যেমন হবে, তারও তেমনই হবে। আমরা এখানে একধরনের ককটেল বানিয়ে ফেলেছি। এটা আমাদের সিস্টেমের দুর্বলতা, আবার এটাকে কেউ কেউ ইউনিকনেসও বলে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিএনপি আমলে সাংবাদিকরা নিউজ করতে পারেনি—এটা প্রমাণিত। কিন্তু ডিএসএ থাকার কারণে সাংবাদিকরা নিউজ করতে পারেনি—এটা প্রমাণিত নয়।
এটা বলছি আইনের গোড়ায় যেতে হবে বলে। কারণ ডিএসএ না থাকলেও মানহানি আইনে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৯ থেকে ৫০২ ধারায়, একসঙ্গে ৬৪ জেলায় মামলা করা যেত। থার্ড পার্টি মানহানি মামলা করতে পারে—ডিএসএতেও পারত। তাই আপনি শুধু একটি নিবর্তনমূলক আইন বাদ দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। রুট আইনগুলো—ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি—সব জায়গায় ছড়িয়ে আছে।
মানহানি, অন্যান্য অপরাধ—সব একত্র করে নতুন নামে আরও বড় একটি নিবর্তন কাঠামো বানানো হয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার আইন নেই—এই কথা বলা যাবে না। দার্শনিকভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সব দেশেই আছে, পার্থক্যটা হলো রাজনৈতিক সিস্টেমে। ইংল্যান্ডে আইন আছে, কিন্তু তারা ব্যবহার করে না—কারণ তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলে জনগণের ওপর এই আইন প্রয়োগ করা যাবে না।
আপনি ডিএসএ বাদ দিয়েছেন, সাইবার সিকিউরিটি আইন সংশোধন করেছেন—কিন্তু বিশেষ ক্ষমতা আইন রেখে দিয়েছেন। ওই আইনে আপনি সাংবাদিককে ধরতে পারবেন। সাংবাদিককে খুনের মামলায় ফাঁসানো হলে কোন ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ তাকে বাঁচাবে?
আবার উল্টো উদাহরণও আছে। ভালো আইন থাকলেও কাজ হয় না। ২০১১ সালে হুইসেল-ব্লোয়ার আইন হলো—জনস্বার্থে তথ্য ফাঁস করলে কাউকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই আইন কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়নি। শেষ উদাহরণ দেই—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছিল, সেটা বিদেশে থাকা এক সাংবাদিক ফাঁস করে দেয়। সরকার খুঁজে বের করে কোন কর্মকর্তা তথ্য দিয়েছে। তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়, অথচ ওই আইনের অধীনে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল।
ভালো আইন আমাদের আছে। কিন্তু আমরা ব্যবহার করি না। আইন থাকলেই হয় না—আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হয়। হুইসেল-ব্লোয়ার আইনের কথাই ধরুন—ওই কর্মকর্তার জন্য সেটাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে সুরক্ষা না দিয়ে উল্টো বিশেষ ক্ষমতা আইনে ফেলা হলো।
হুযাইফা আল মামদূহ: আইন তো আছে, কিন্তু সাংবাদিকদের দায়বদ্ধ করার যে ব্যবস্থাটা দরকার, সেটা আসে না। ডিএসএ কিংবা একই ধরনের আইন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অপরাধ, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকায় না। সাংবাদিককে দায়বদ্ধ করার জন্য প্রেস কাউন্সিল আছে। কিন্তু সেটা কি যথেষ্ট?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: কোড অব কন্ডাক্ট থাকা দরকার—শুধু সাংবাদিকের জন্য না, পুরো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের জন্য, মালিকসহ সবার জন্য। আপনি বলছেন ‘স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান’, কিন্তু কাগজে-কলমের স্বায়ত্তশাসন আর বাস্তব স্বায়ত্তশাসন এক জিনিস না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাগজে স্বায়ত্তশাসিত, কিন্তু বাস্তবে কী? ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ভিসি যদি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা রাখতে চাইতেন, পারতেন? একদম না। মানে প্রয়োজনে, বাস্তবতার চাপে, আমরা স্বায়ত্তশাসনের ধারণাটাই ভুলে যাই। তাই শুধু স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো দিয়ে হবে না—সেফগার্ড দরকার।
সেফগার্ডের প্রথম শর্ত হলো আয়ের সক্ষমতা। ক্ষুধার্ত মানুষকে আপনি চুরি না করতে কীভাবে বলবেন? পাশে পুলিশ রাখলে সে বাধ্য হয়ে পুলিশকেই কামড়াবে। বাংলাদেশের মিডিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মিডিয়া যদি বাঁচতেই না পারে, তাহলে নৈতিকতা টিকবে কীভাবে?
সামাজিক নিরাপত্তা যত গাণিতিক হারে কমে, সাংবাদিকের ঝুঁকি তত জ্যামিতিক হারে বাড়ে—কারণ সাংবাদিক সেই নিরাপত্তাহীনতাই এক্সপোজ করে। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ঠিক না হলে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন কোনো কাজই করবে না। যদি রাষ্ট্রের দর্শনই হয়—“তুমি আমার সমর্থক না, তাই তোমাকে কেউ মারলেও সে শাস্তি পাবে না”—তাহলে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সাংবাদিক মার খেলে সেখানেও কোনো রেমেডি থাকবে না।
খুব সহজ কথা—গণমাধ্যমকে যদি ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপ’ ধরে সংস্কার করতে চান, তাহলে কোনোদিনই সংস্কার হবে না। এটা অসম্ভব।
হুযাইফা আল মামদূহ: মিডিয়ার কথা বলতে গেলে আমরা দেখি—গত সরকারের সময়ে যে টিভি চ্যানেলগুলো লাইসেন্স পেয়েছে, তারা সরাসরি ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’, ‘উন্নয়ন’—এই ভাষায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, ৫ আগস্টের পর কি আপনি মনে করেন কোনো রিকনসিলিয়েশন দরকার ছিল?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: আমাদের রাজনৈতিক সিস্টেম এমন—যে ক্ষমতায় আসে, সে তার গুণগান চাইবে। শুরুতেই বলেছিলাম—লাইসেন্স দেওয়া হয় এই বিবেচনায় যে আপনি ‘আমার লোক’ কি না। এটাকে আমরা বলি রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি বা political patronage structure। কিন্তু দিনের শেষে মিডিয়া মালিকরা হয়ে যায় রাজনৈতিক ক্লায়েন্ট। করপোরেট দরকার হলে করপোরেট ক্লায়েন্ট, রাজনৈতিক দরকার হলে রাজনৈতিক ক্লায়েন্ট। বাংলাদেশে স্বীকৃত পার্টি প্রেস না থাকা একটা বড় ঘাটতি। যদি মিডিয়া প্রকাশ্যে বলত—আমি বিএনপির, আমি জামাতের, আমি আওয়ামী লীগের, এবং আমি তাদেরই পক্ষে কথা বলবো—তাহলে দর্শক জানত। তখন তথ্য মন্ত্রণালয়ের বাইরে একটা রেগুলেটরি বোর্ড থাকা দরকার ছিল—একটা ন্যায়পালের মতো। যারা কনটেন্ট দেখে বলত, এটা প্রো-আওয়ামী লীগ, এটা প্রো-বিএনপি, এটা প্রো-জামাত। যদি তাই হয়, তাহলে বলা হতো—তুমি ডিক্লেয়ার করো, তুমি পার্টি প্রেস।
গণমাধ্যম কারও কাছে শপথ নেয় না। শপথ নেয় তার টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে। তাই গণমাধ্যমকে আগে টার্গেট অডিয়েন্স ঠিক করতে হবে। অডিয়েন্স যদি বলে—তুমি আসলে প্রো-আওয়ামী লীগ বা প্রো-বিএনপি, এবং সেটা ঘোষণা কর—তাহলে মিডিয়াকে ঘোষণা করতে হতো। এই প্রক্রিয়াটা যদি রেগুলেটরি বোর্ডের মাধ্যমে থাকত, তাহলে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির চেহারাটা অনেক পরিষ্কার হতো।
কারণ আপনি যতই রাজনৈতিক ব্যবসায়ী হন না কেন, আপনি দেখবেন—ধরি মাছ না ছুঁই পানিতে ইনভেস্ট করা যাচ্ছে। তখন আপনি সেটাই করবেন। কেননা আপনি জানেন, ক্ষমতা বদলালে ক্লায়েন্ট বদলানো যাবে। বাংলাদেশে ক্ষমতা বদলালেই রাতারাতি মিডিয়ার অবস্থান বদলে যায়। ৫ আগস্টেও তাই হয়েছে। যারা আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ছিল, ক্ষমতা যেতেই হঠাৎ সবাই আওয়ামী-বিরোধী হয়ে গেল। কোনো কেসও হলো না। এর আগেই আপনি লিখে ফেললেন— ‘খুনি হাসিনা’। অথচ জেনুইন সাংবাদিক হলে আপনাকে লিখতে হতো— ‘খুনের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত’। আমি যখন সাংবাদিকতা করতাম, সবাই লিখত ‘যুদ্ধাপরাধী’। আমি লিখতাম— ‘যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত’। কারণ সাংবাদিক হিসেবে আমি এই দায় নিতে পারি না। মতামত লিখলে ভিন্ন কথা—সেখানে আমার নিজস্ব মত থাকতে পারে। এই জায়গা থেকে সরে এসে যখন আপনি সরাসরি লিখবেন ‘যুদ্ধাপরাধী’, তখন বোর্ডের কাছে অভিযোগ জানানো যেত—আপনি এথিকস মানছেন না। একটা লেয়ার থাকত—প্রথমে সতর্কতা, তারপর পরবর্তী ব্যবস্থা।
কিন্তু মালিক যখন দেখেন, বাংলাদেশের মিডিয়া সিস্টেমে যেকোনো সময় ক্লায়েন্ট বদলানো যায়, বিনিয়োগের ঝুঁকি খুব সামান্য, আর কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যায়—এবং করপোরেট ক্লায়েন্টরা ঠিকই থাকে, তখন এই সিস্টেম ভাঙে না।
হুযাইফা আল মামদূহ: গণমাধ্যমের ঐতিহাসিক পরিক্রমায় কি কোনোভাবে পক্ষপাত করা হয়েছে বলে মনে করেন? বিএনপি আমলেও সাংবাদিকতা নানা ভাবে হুমকির মুখে পড়েছে। বিগত সরকারের সময় ও কাজকে ফোকাস করতে গিয়ে কি বিএনপির সময়কে ছাড় দিয়ে দেখানো হয়েছে বলে আপনার মনে হয়?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: তাদের চিন্তাভাবনায় মূলত দুটি স্তর ছিল। এক, গণমাধ্যমের কনটেন্ট; দুই, সেই কনটেন্ট কোন সরকারের সময়ে তৈরি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দেখবেন, এরশাদের সময়কে সাধারণত আলোচনায় আনা হয় না। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়টাও খুব একটা ধরা হয় না। আলোচনায় বেশি আসে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের তিনটি মেয়াদ। বিএনপি সময়ের বাস্তব ঘটনাগুলো তুলনামূলকভাবে খুব কমই উঠে এসেছে। ফলে দেশের প্রায় বারো বছরের শাসনকাল কার্যত আলোচনার বাইরে থেকে গেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকের পক্ষেই বিএনপির নাম সরাসরি উচ্চারণ করা সহজ নয়। ফলে আলোচনা স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। যে কোনো নীতিগত বা সংস্কারমূলক কাজে যদি রাজনৈতিক এফিলিয়েশন কাজ করে, তাহলে এমনটাই হয়। তখনই বোঝা যায়— context is everything, content is nothing। বিহাইন্ড দ্য থিংকিংয়ে তাদের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগের কথাই বলা যাবে; বিএনপি নিয়ে কথা বলা যাবে না।
আঞ্চলিক তুলনাটাও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিরুদ্ধে যত সমালোচনাই থাকুক না কেন, দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক চর্চায় ভারতকে এখনও এগিয়ে রাখতে হয়। জনসংখ্যা, রাজনৈতিক প্র্যাকটিস এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতার কারণে সেখানে সব সময়ই মিডিয়ার ওপর চাপ ছিল—বিজেপি হোক, কংগ্রেস হোক, বা অন্য যে দলই ক্ষমতায় থাকুক। তাই কোন দেশে বা কোন সরকারের সময়ে কোন ঘটনা ঘটেছে, সেটা আলাদা কনটেক্সটে বিচার না করলে বিশ্লেষণ ভুল হবে। এখন যদি আমি প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়কার বাস্তবতা দিয়ে আজকের পরিস্থিতি বিচার করি, সেটা ঠিক হবে না। কারণ তখনকার প্রেক্ষাপট আলাদা ছিল। আবার খালেদা জিয়া বা শেখ হাসিনার সময়ের বাস্তবতা পুরোপুরি বর্তমানের ওপর চাপিয়ে দিলেও ঠিক হবে না। কনটেক্সট বুঝে কাজ করতে হবে।
এই সমস্যা শুধু গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে নয়, সংবিধান সংস্কারের আলোচনাতেও আছে। আমার কাছে আরেকটা বিষয় চোখে পড়েছে—এতগুলো সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে দেখবেন, সংবিধান সংস্কারের চিন্তা প্রায় সব জায়গায় ঢুকে গেছে, এমনকি দেশের নাম পরিবর্তনের মতো বিষয়ও। যেমন, নির্বাচন কমিশনের কোনো দরকার ছিল না তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা পিআর পদ্ধতি নিয়ে কথা বলার। সরকার কাঠামো কেমন হবে, সেটা নির্বাচন কমিশনের কাজ না; সেটা সংবিধানের বিষয়। অথচ সেখানেও এসব বলা হয়েছে।
এর মানে হলো, গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য কিছু বিষয় জোর করে ঢোকানো হয়েছে। কারণ সব কমিশনের রিপোর্টেই প্রায় একই ধরনের কথা এসেছে। ঠিক একইভাবে, মিডিয়া কমিশনের রিপোর্টেও এমন কিছু বিষয় এসেছে, যেগুলো গণমাধ্যম সংস্কারের সঙ্গে সরাসরি যায় না, বা আদৌ প্রয়োজন ছিল না।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি ছিল নিউ মিডিয়ার উত্থান। এখন পত্রিকা মানে শুধু ছাপা কাগজ নয়—সবাই হাইব্রিড মডেলে চলে গেছে। প্রতিটি নিউজ আলাদা একটি কনটেন্ট, যার আলাদা বাজার, আলাদা সার্কুলেশন, আলাদা মনোযোগ অর্থনীতি আছে। ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়া—এসবের মাধ্যমে মিডিয়া পোস্টিং ও আয়ের কাঠামো পুরোপুরি বদলে গেছে। এই বড় পরিবর্তনটাকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: শুধু এড়িয়ে যায়নি, এটা চিন্তাই করেনি। আমি তো বললাম, যেরকম ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট কেউ ছিল না, তেমনি টেকনোলজি- বেসড বিজনেস বোঝে এমন কেউও ছিল না। আপনি ধরেন, বাই ডিফল্ট চার-পাঁচজন সম্পাদকের নাম বলবেন, যাদের একজন হলেও থাকা উচিত ছিল মিডিয়া সংস্কার কমিশনে। বাংলাদেশে মিডিয়া বিষয়ে সংস্কার কমিশন করতে হলে কিছু লোক তো থাকতেই হয়।
আপনি পছন্দ না-ও করতে পারেন, সেটা আপনার ব্যক্তিগত মত। আপনি মতি ভাইকে পছন্দ নাও করতে পারেন, মতিউর রহমান (প্রথম আলো), মতিউর রহমান চৌধুরী (মানবজমিন), মাহফুজ আনামকে পছন্দ নাও করতে পারেন, নূরুল কবীরকে পছন্দ নাও করতে পারেন। আরও অনেক পুরোনো সম্পাদক আছেন, তাদেরকেও আপনি পছন্দ নাও করতে পারেন। কিন্তু তারা তো যার যার জায়গায় সফল। প্রথম আলো যে ফরম্যাটে এখন পর্যন্ত টিকে আছে, এবং প্রতিটি ধাপে করপোরেট করেছে, সেটাও ছোট কথা না। একসময় পত্রিকার প্রিন্ট সার্কুলেশনই সব ছিল। সে আলোকিত চট্টগ্রাম, আলোকিত দক্ষিণ-উত্তর সব করেছে। এখন সে এগুলো কমিয়ে এনেছে, কারণ দেখেছে এখানে ব্যবসা নেই। অন্যভাবে দর্শক টানতে হবে। সে দেখছে এআই আসছে, তাকে এআই-ও করপোরেট করতে হবে।
কিন্তু যারা আগে এগিয়ে ছিল, তাদের কেউ এখানে নেই। আপনি কোনোভাবেই ডাকেননি। আপনি সংস্কারের একটা রিপোর্ট দেবেন, তাদেরকে এক ঘণ্টার জন্য ডাকবেন, আর ধরে নেবেন তারা আমার মতো খুব অ্যাভেইলেবল, আপনাকে সব দিয়ে দেবে, এটা তো হয় না। এটা আপনাকে নিজের করে নিতে হবে। এবং করতেই হবে। আমি সেটাই বোঝাচ্ছি। আপনি একজন ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টকে, যে ২০ বছর ধরে বাংলাদেশে চ্যালেঞ্জের মুখে ইনভেস্টিগেশন করছে, তাকে চেনেন-জানেন, অথচ কমিশনে রাখলেন না কেন? তার চেয়ে কি আমি বেশি বুঝবো?
উইথ ডিউ রেস্পেক্ট, কামাল ভাই বাংলাদেশে মাঠে-ঘাটে কয়দিন সাংবাদিকতা করেছে? আমি নাম ধরে বললাম, স্যরি টু সে। উনি খুব নামকরা সাংবাদিক। খুব স্মার্ট, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সাংবাদিকতার বেসিক জ্ঞান আমাদের চেয়ে অনেক ভালো দিতে পারবেন। কিন্তু আমার কথা হলো, আমি যে রকম বাংলাদেশের ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমকে বুঝি না, তিনিও বুঝেন না। কারণ এই বেদনার জায়গাটায় তিনি আসেননি। আমি বলছি না যে আপনাকে রবীন্দ্রনাথ সমালোচক হওয়ার জন্য আরেকটা রবীন্দ্রনাথ হতে হবে। কিন্তু আপনাকে রবীন্দ্রনাথ পড়তে হবে, রবীন্দ্রনাথকে জানতে হবে, সাহিত্যটা জানতে হবে। আপনি করেননি। দ্যাটস মাই পয়েন্ট।
আরেকটা ব্যাপার হলো, এই যে বিজনেস মডেলটা না বোঝা। এখন বাংলাদেশের মিডিয়ার সমস্যা কী, যখন আমরা নিউ মিডিয়া, ইনক্লুডিং এআই, এসবের দিকে জাম্প করছি? আসলে আগে বিজনেস মডেল ছিল আমরা পুকুরে মাছ ধরতাম। এখন সেইম জাল দিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরার চেষ্টা করছি। যেহেতু আমাদের কখনোই পলিসি, বা সরকারি গাইডেন্স, বা কোনো স্বায়ত্তশাসিত বডি নেই, যারা রিসার্চ করবে। আমার সার্কুলেশন কমে যাচ্ছে, তাহলে কী করতে হবে? বাইরে দেশে এটা হয়। এই বডি মালিকদের হতে পারে। পুরো সাংবাদিক কমিউনিটির হতে পারে। অথবা রাষ্ট্রের সঙ্গে মালিকদের যৌথ হতে পারে। রাষ্ট্রের স্পন্সরশিপেও হতে পারে।
এই যে বিদেশি ফান্ডগুলো আসে, ভাই তুমি আমাকে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কম শেখাও। আগে শেখাও যে আমার মিডিয়ার ভালনারেবিলিটি কী হবে। এখন ধরেন, কেউ নতুন পত্রিকা করবে, কেউ নতুন মিডিয়া করবে, কোনো অডিয়েন্স রিসার্চ আছে? না আছে সরকারের, না আছে আর কারও। ওদেরকে বলেন, ফান্ডিংটা আপনারা এই খাতে খরচ করেন, ডেটাটা অ্যাভেইলেবল করেন, পাবলিক করেন। এনজিওরা তো টাকা নিয়ে আসবে। আর আমি বলছি, এভরি ইনভেস্টমেন্ট কামস উইথ ইনটেনশন। আমাকে বলতে হবে, ঠিক আছে, তোমার ইনটেনশন ২৫-৫০ শতাংশ রাখো, আমার ইনটেনশন ৫০ শতাংশ দাও। কিন্তু আমি মনে করছি, কবে টাকা আসবে, টাকা কীভাবে খরচ করবো। ও বলছে, তাড়াতাড়ি করে দাও। এটা তো আসলে লং টার্ম চিন্তা না।
২০১৮-এর পর থেকে আমরা এআই যুগে চলে এসেছি। সত্যিকার অর্থে যদি ফ্রি, ফেয়ার, ইনক্লুসিভ নির্বাচন ৫০ শতাংশও হয়, তাতে বাংলাদেশের যে ভালনারেবল সিচুয়েশন তৈরি হবে, সেটা হবে মিডিয়ার মাধ্যমে। কারণ আপনি মেইনস্ট্রিম মিডিয়াকে দোষ দিতে পারবেন না, আপনার সোশ্যাল মিডিয়া আছে। সেটা আমাদের ধারণার মধ্যেই ছিল না। এআই বা ডিপফেকের ব্যাড ইমপ্যাক্ট হলো একজন ক্যান্ডিডেটকে ম্যাল করা হবে, ডিফেম করা হবে। আপনি কল্পনাই করতে পারবেন না।
ঢাকা শহরের ভোটিং বিহেভিয়ার, তেতুলিয়ার ভোটিং বিহেভিয়ার থেকে আলাদা। বিশেষ করে যেখানে মন্দির-মসজিদ পাশাপাশি আছে, ধর্ম আর রাজনীতি একসঙ্গে মিলে ভোটিং বিহেভিয়ার বদলে দেয়। সেখানে আপনি থামাতে পারবেন না। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হবে সাংবাদিকরা।
২০১৮ সালে একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমি সাংবাদিকদের বলেছিলাম, ওনাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, এটা হলে কী হবে। কেউ জিজ্ঞেস করলো না। সেটা হলো, ২০১৮ সালে খুলনার একটা আসনে রিটার্নিং অফিসার, ভোট কত পেয়েছে বলে যাচ্ছিলেন, প্রতিটা কেন্দ্রে। সাংবাদিকরা খেয়াল করেনি। তারা ভোটকেন্দ্রের নাম লেখেনি, খালি সংখ্যা লিখে গেছে। মানে, উনি পাঁচ মিনিট আগে ভোটকেন্দ্র তিন বলছেন, দশ মিনিট পরে গিয়ে ভোটকেন্দ্র তিন আবার বলছেন। সাংবাদিক সব লিখে গেছেন। লিখতে লিখতে ৭০টা ভোটকেন্দ্রের জায়গায় রিপিটেড তথ্যসহ সাংবাদিকের কাছে ভোটকেন্দ্র হয়ে গেছে ৭৫টা। দেখা গেছে ১০০ শতাংশের বেশি ভোট কাস্ট হয়েছে। সাংবাদিক ওটাই নিউজ করেছে। ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ডিএসএ মামলা হয়েছিল, অ্যারেস্ট হয়েছেন।
দোষটা কার? দোষ তো রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে সাংবাদিকেরও। কিন্তু প্রথম দোষটা কার, আপনি যদি ধরতে চান? আপনি আইনে বলেছেন, ভুল তথ্য কে দিলো সেটা বিষয় না। ভুল তথ্য যে ছড়ালো, সে দোষী। আপনি পত্রপত্রিকা দেখেন, যদি সত্যিকার অর্থে ওই আইনটা ফলো করতে চায়, তাহলে ওই দিন ৫০ শতাংশ সাংবাদিক জেলে যাবে। আপনি এখানে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন দিয়ে কী করবেন? আপনি মিডিয়া পলিসি দিয়ে কী করবেন?
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: যেহেতু এআইয়ের আলাপ এলো, ফ্যাক্ট চেকিং…
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: আসলে সাংবাদিকরা ফ্যাক্ট চেকিং করি না। এটা একটা খুব ভুল পারসেপশন। সাংবাদিকরা করে ভেরিফিকেশন। ফ্যাক্ট চেকিং হচ্ছে ভেরিফিকেশনের একটা ডিজিটাল টুল মাত্র। ধরেন, এই মুহূর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা গন্ডগোল হলো, দুজন লোক মারা গেল। আপনি স্পটে গেলেন। কেউ বলছে তিনজন, কেউ চারজন, কেউ পাঁচজন, কেউ ছয়জন। আপনি এটা ডিজিটালি কীভাবে ফ্যাক্ট চেক করবেন? এটা ফার্স্ট হ্যান্ড ইনফরমেশন। এটা অনলাইনে নাই, আগে কোথাও আপ হয়নি। এটা কোনো ডিজিটাল ফ্যাক্ট চেকিংয়ের বিষয় না। এখানে আপনাকে ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন করতে হবে।
সাংবাদিকরা সারা জীবন ভেরিফিকেশনই করে এসেছে। এখন ডিজিটালি এটাকে স্মার্ট শোনানোর জন্য আমরা টুল হিসেবে বলছি ফ্যাক্ট চেকিং। সমস্যা হয়েছে এখানে। এই কনসেপ্টটা একটা বড় মিসকনসেপশন তৈরি করেছে। সবাই মনে করছে সব তথ্য ডিজিটালি ফ্যাক্ট চেক করা সম্ভব। কিন্তু যেটা এইমাত্র ঘটেছে, যেটা ফাস্ট হ্যান্ড ইনফরমেশন, যেটা অনলাইনে নেই, সেটাকে ফ্যাক্ট চেক করা সম্ভব না।
এই মিসকনসেপশনটা এখন পলিসি লেভেলেও ঢুকে গেছে। এটা একটা বড় সমস্যা। সাংবাদিক ভেরিফিকেশন করবে।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: মিডিয়া ফ্রিডম নিয়ে যে সব ডোনার-ফান্ডেড প্রকল্প আছে, সেখানে ফ্যাক্ট চেকিংকে বেশ প্রাধান্য দেওয়া হয়। ভুয়া তথ্য বা সংবাদ উৎপাদন ও প্রবাহের যে রাজনীতি আছে, সেটা এসব প্রকল্পে আমলে নেওয়া হয় না। ফ্যাক্ট চেকিং প্রসঙ্গে কমিশনের সুপারিশকে আপনি কি এই এনজিওয়াইজড ডিসকোর্সের প্রভাব বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: ওই যে বললাম, বাজওয়ার্ড। কখনো সিটিজেন জার্নালিজম, কখনো কিডস জার্নালিজম, কখনো এআই। কোনো দেশ প্রতি বছর, বা পাঁচ বছর পরপর একটা ডোনেশন দেয়। ডোনেশন দেবে, এখন বাজওয়ার্ড কী? ফ্যাক্ট চেকিং। আর উইথইন সিক্স মান্থস, ফ্যাক্ট চেকিং শব্দটা কেউ শুনবেই না। এটা এআই টুলসের অংশ হয়ে যাবে।
আপনি এখন দেখেন, গুগল লেন্স কী বলছে? গুগল রিভার্স ইমেজকে গুগল নিজেই বলছে, এটা আমার এআই টুল। সো ফ্যাক্ট চেকিং আলাদা করে আর থাকবে না। যেরকম একসময় সিটিজেন জার্নালিস্ট শব্দটা খুব শুনতেন। পুরো প্রফেশনটাই নষ্ট করার জন্য। কারণ এগুলো বাজওয়ার্ড। ডোনাররা টাকা দেয় এই বাজওয়ার্ড ধরে।
একসময় শুনতেন ক্লাইমেট জার্নালিজম। এখন শুনেন? ক্লাইমেট কি মরে গেছে? এখন নাই? কারণ হলো, ওই বাজওয়ার্ডের এক্সপায়ারি ডেট শেষ। এগুলো মৌসুমি শব্দ। ওরা মৌসুমী ওয়ার্ড বানায়।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: কিন্তু এনজিওরা তো আমাদের জন্য যেটা জরুরি, সেই জিনিসটা শেখাবে না।
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: ওই যে বললাম, এভরি ইনভেস্টমেন্ট কামস উইথ অ্যান ইনটেনশন। আপনি তাদের ইনটেনশন পুরোপুরি মেনে নেবেন না। বলবেন, ভাই, তুমি ৫০ শতাংশ দাও তোমার মতো করে, আর ৫০ শতাংশ এই প্রয়োজনটা দাও।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: কিন্তু আমি যদি ক্লাইমেট জার্নালিজমের বদলে এমন কিছু দিই, সেটা কি তারা নেবেন?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: তাহলে ক্লাইমেট ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমে নিয়ে আসেন। অথবা ক্লাইমেট জার্নালিজমের ওপর ভিত্তি করে একটা মিডিয়া দাঁড় করানোর প্রস্তাব দেন। ধরেন, মিডিয়া ভালনারেবিলিটি নিয়ে একটা আলাদা ওয়েবসাইট, যেটা শুধু এই বিষয়টাই দেখবে।
এতদিন ধরে ক্লাইমেট জার্নালিজমে ডোনেশন আসছে। একটা প্রতিষ্ঠানও কি দাঁড় করানো গেছে, যেটা শুধুই ক্লাইমেট রিপোর্টিং নিয়ে নিউজ করবে? তাহলে কেন? অথচ যত টাকা খরচ হয়েছে, তার ২৫ শতাংশ আমাকে দিলে আমি চারটা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারতাম। এটা তো ক্লায়েন্টের সম্পর্ক। আপনি ক্লায়েন্টকে বোঝাবেন, ভাই, তোমার ৫০, আমার ৫০।
এখন এআই শুরু হয়েছে। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে নিউজ গ্যাদারিং থেকে শুরু করে নিউজ ডিস্ট্রিবিউশন পর্যন্ত, এমনকি কেউ যদি নিজে একজন ইন্ডিপেন্ডেন্ট জার্নালিস্ট হতে চায়, ঘর থেকে না বের হয়েও এআই দিয়ে সেটা পুরোপুরি কীভাবে সম্ভব, আমি দেখাই। সবাই চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে, কিন্তু আসলে কেউ প্রম্পটিং জানে না। যারা এআই কিনে ব্যবহার করে, আমি তাদের দেখাই, আমার না কেনা ভার্সন দিয়েই ভালো প্রম্পটিং করে কীভাবে আরও ভালো রেজাল্ট আনা যায়।
বাংলাদেশে আসলে প্রম্পটিংটাই শেখানো দরকার। অনেকেই অনেক টুলস জানে না। ধরেন, ইন্টারভিউয়ের ক্ষেত্রে গুগল পিনপয়েন্ট ব্যবহার করলে পুরোটা ট্রান্সক্রাইব করে দেয়। অটো ল্যাঙ্গুয়েজ ডিটেক্ট করে, পুরো বাংলায়। কোথাও কথা না বুঝলে সেখানে মার্ক করে দেয়, যাতে আপনি নিজে চেক করতে পারেন। আর সবকিছু সেকেন্ডের মধ্যে ভাগ করে দেয়। আমি এগুলো শেখাই।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা এআই বলতে শুধু চ্যাটজিপিটিকেই বুঝি। দ্যাটস দ্য প্রবলেম।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: আমি শেষ প্রশ্নটা করি। এই যে নতুন মিডিয়া বাস্তবতায় মিডিয়াগুলো ধুঁকছে। ইনকাম করতে পারছে না, আর যা ইনকাম করছে সেটার বড় অংশ ইউটিউব আর সোশ্যাল মিডিয়ার পয়সা। মিডিয়া নিজে তো আয় করতে পারছে না। আবার বিজ্ঞাপনের একটা বাস্তবতা আছে। এই সময়ে এসে কি কনটেন্টের ওপর ভিত্তি করে মিডিয়া চলতে পারে? শুধু কনটেন্ট বিক্রি করে?
মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী: আমি আগেই বলেছিলাম, বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে ভালনারেবল দেশে কনটেন্ট ইজ নাথিং, কনটেক্সট ইজ এভরিথিং। উদাহরণ দিই। ৫ আগস্টের আগে যে কনটেন্ট আমি করতে পারতাম, ৫ আগস্টের পরে কি সেটা করতে পারি? পারি না। আবার এখন যেটা করতে পারি, সেটা কি আগে করতে পারতাম? না। তার মানে কী? কনটেক্সট বদলালে কনটেন্টও বদলে যায়।
বাংলাদেশের মিডিয়ার মূল সমস্যা হলো, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হয়েও কেউ বিজনেস মডেল দাঁড় করাতে চায় না। দুই-তিনটা ব্যতিক্রম ছাড়া কেউই ভাবে না যে আগামী পাঁচ বা দশ বছর পরে আমি কোথায় থাকবো। নতুন প্রযুক্তি আসছে, নতুন ধরনের দর্শক আসছে, আমাকে কী করতে হবে—এই প্রশ্নটাই কেউ করছে না। আমি আবার বলি, আমরা যে জাল দিয়ে আগে পুকুরে মাছ ধরতাম, এখন সেই জাল দিয়েই সমুদ্রে মাছ ধরার চেষ্টা করছি। বিজ্ঞাপন এখন গুগলে চলে গেছে। গুগল যা দেয়, সেটাই সবাই পায়।
আমি একটা সহজ উদাহরণ দিই। বাংলাদেশের মিডিয়াকে কত সহজে ইকোনমিকেলি ভায়াবল করা যায়। ধরেণ, আপনি মোহাম্মদপুরে থাকেন। জাপান গার্ডেন সিটি, মোহাম্মদিয়া হাউজিং—এই এলাকায় কত মানুষ থাকে? ধরি দুই লাখ। আসলে দুই লাখ না, তিন লাখ, চার লাখ মোবাইল সেট আছে। প্রত্যেকের ইউটিউব আছে, প্রত্যেকের ফেসবুক আছে। কিন্তু কেউ কেন মনে করে না যে তারাই আমার গ্রাহক? এখন গ্রামের একজন কৃষক ঢাকা শহরের শিক্ষিত মানুষের চেয়ে বেশি মোবাইল ব্যবহার করে। সে কৃষিকাজ করার সময় ইউটিউব চালিয়ে রাখে। সে আপনার দর্শক না কেন? কখনো কি এটা জানার চেষ্টা করেছেন?
বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ আমার গ্রাহক হবে না। আমাকে ঠিক করতে হবে আমার টার্গেট অডিয়েন্স কে। আমি কি চাই—১০ লাখ, ১ মিলিয়ন, ১ কোটি? এই ১ কোটি মানুষ কোথায়? চট্টগ্রামে? মোহাম্মদপুরে? না ঢাকার কোন অংশে? ঢাকাকে চার ভাগে ভাগ করে যদি কেউ শুধু ঢাকা-কেন্দ্রিক অডিয়েন্স টার্গেট করে, তার টিভি চ্যানেলও লাগবে না। একটা ইউটিউব চ্যানেলই যথেষ্ট। আমি লিখে দিতে পারি, সেটার ইনকাম বাংলাদেশের যেকোনো টিভি চ্যানেলের চেয়ে বেশি হবে। আপনার বুলেটিনে জাতীয় সব নিউজ যাবে, কিন্তু আপনার অডিয়েন্স তো নির্দিষ্ট থাকতে হবে।
প্রেসিডেন্ট এরশাদ যে ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্স করেছিলেন, মিডিয়াও সেভাবেই চলে। আগে প্রথমে আওয়ামী লীগের খবর থাকত, এখন বিএনপির। তারপর জামায়াত, তারপর এনসিপি। এনসিপিকে কখনো এক নম্বরে আনা হয় না। আগে আওয়ামী লীগ, তারপর ১৪ দলের খবর—এখনও একই প্যাটার্ন, শুধু নাম বদলেছে।
আপনি আপনার টার্গেট অডিয়েন্সকে পাত্তাই দেন না। এই সময়ে এসে নির্বাচনকে একটা মিডিয়া ইস্যু হিসেবেও ঠিকভাবে তৈরি করতে পারেননি। কোথাও কি নিউজ দেখেছেন—ভোটার তালিকা হালনাগাদ হয়েছে, কয়জন মানুষ ভোটার হতে পারেনি, কেন পারেনি? সবাই কি ভোটার হয়ে গেছে? অসম্ভব। খোঁজ নিলে দেখবেন, অনেক নেতাও ভোটার হতে পারেনি।
তার মানে কী? আপনি কনটেক্সটের নামে কনটেন্টের পেছনে দৌড়ান। আপনি আসলে নিউজের পেছনে দৌড়ান না, ইনফরমেশনের পেছনে দৌড়ান না। আপনি আসলে টার্গেট অডিয়েন্সকে খুশি করতে চান না। এইভাবে ইনকাম জেনারেট হবে না। তখন আপনাকে সরকারি বিজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। অথচ বাংলাদেশের মতো বিশাল পপুলেশন থাকলে আপনার বিজ্ঞাপন আটকে দেবে কে?
এখনো যদি কৃষকদের কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান বলতে শাইখ সিরাজের মডেলই চালু থাকে, তাহলে প্রযুক্তির ডেভেলপমেন্ট হলো কোথায়? আমি ওনাকে অবজ্ঞা করছি না। উনি বাংলাদেশের কৃষির জন্য অনেক কিছু করেছেন। কিন্তু এখনো যদি সেই মডেলটাই থেকে যায়, তার মানে দর্শকের রুচি আর প্রযুক্তির মধ্যে ব্যালেন্স করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এই ব্যর্থতার কারণেই মিডিয়ার বিজনেস মডেল দাঁড়াচ্ছে না। আর যাদেরটা দাঁড়িয়েছে, তারা টিকে আছে। যারা পারেনি, তারা ধুঁকছে।
মীর হুযাইফা আল মামদূহ: সময় দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।