মঙ্গলবার ১৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৯ Tuesday 29th November 2022

মঙ্গলবার ১৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৯

Tuesday 29th November 2022

দেশজুড়ে গণমাধ্যম

গণমাধ্যমে চা শ্রমিক আন্দোলনের উপস্থাপন

২০২২-০৮-২৮

সুমাইয়া ফেরদৌস

পর্যালোচনা করা দৈনিক সমূহের নাম: প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, সমকাল, বণিক বার্তা ও নিউ এজ।

 

যতবার চা শ্রমিক নেতাদের দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করার ঘোষণা দেয়ানো হযেছে, চা শ্রমিকরা ততবার রাস্তায় নেমে এসেছেন। ছবি: সুমন পাল

 

 

প্রেক্ষাপট ও ঘটনাক্রম: গত নয় আগস্ট থেকে সিলেটের চা-বাগানগুলোর প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক তাদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩০০ টাকা করার জন্য আন্দোলন করছেন। প্রথমে প্রতিদিন দুই ঘন্টা কর্মবিরতির মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করলেও মালিকপক্ষ কিংবা সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে ১৩ আগস্ট থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করেন। এবারে মালিক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের টনক নড়ে এবং তারা চা-শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সাথে কয়েকদফা বৈঠকে বসেন। সেসব বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় চা-শ্রমিকেরা তাদের ধর্মঘট অব্যহত রাখেন। এরপর ২০ আগস্ট শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে ইউনিয়নের নেতাদের বৈঠকে মজুরি ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুরোধে আরো ৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়। ইউনিয়ন নেতারা এ সিদ্ধান্ত মেনে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও শ্রমিকদের বৃহৎ অংশ তা মানেননি। বরং তারা আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে চা-বাগানে ধর্মঘটের পাশাপাশি ২১ তারিখে ঢাকা সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করেন।

 

 

২২ তারিখ মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক বৈঠক করেন সাধারণ শ্রমিকদের সাথে। প্রধানমন্ত্রী মালিকপক্ষের সাথে কথা বলে তাদের মজুরি বাড়বেন, এরকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১২০ টাকা মজুরিতেই পরেরদিন থেকে তাদের কাজে ফিরতে বলা হয়। তবে অল্পকিছু বাগান ছাড়া কোনো বাগানেই কাজে ফেরেননি শ্রমিকেরা। এই লেখার দিন পর্যন্ত (২৫ আগস্ট) ৩০০ টাকা মজুরির দাবিতে তারা আন্দোলন ও ধর্মঘট জারি রেখেছিলেন।

 

 

সরকার ও মালিকপক্ষের মতো ধর্মঘট ডাকার আগে গণমাধ্যমও চা-শ্রমিকদের আন্দোলনকে ততোটা গুরুত্ব দেয়নি। তবে লাগাতার ধর্মঘটের সময় যতো গড়িয়েছে, এই ইস্যুতে গণমাধ্যমের আগ্রহ ও কাভারেজের বৈচিত্র্য ততো বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বল্পপরিসরে সেই আগ্রহের উৎস আর বৈচিত্রের রকমফের খুঁজে দেখতে এই লেখার অবতারণা। এজন্য ১১ আগস্ট থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৫ দিনে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, সমকাল, নিউ এজ এবং বণিক বার্তা-- এই পাঁচটি পত্রিকায় চা-শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরির আন্দোলন সংক্রান্ত প্রকাশিত সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করে নিচের তিনটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে:       

১। এই ইস্যুতে পত্রিকাগুলো কয়টি সংবাদ, ছবি সম্পাদকীয় ও মতামত কেমন গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে?

২। আন্দোলন নিয়ে পত্রিকাগুলোর মনোভাব কেমন? এই আন্দোলনকে তারা নির্দিষ্ট কোনো দিকে ধাবিত করতে চায় কি?

৩। প্রকাশিত সংবাদ ও ছবিতে আন্দোলন ও আন্দোলনকারীদের উপস্থাপন কেমন হয়েছে?

উল্লেখ্য, সংবাদগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে উক্ত পাঁচটি পত্রিকার ইপেপার সংস্করণ থেকে।

 

 

প্রথম আলো

প্রথম আলোতে চা-শ্রমিকের আন্দোলন নিয়ে প্রথম সংবাদ প্রকাশিত হয় ১২ আগস্ট। এরপর ২৫ আগস্ট পর্যন্ত পত্রিকার নগর সংস্করণে এই আন্দোলন নিয়ে মোট ১৩টি সংবাদ, ৫টি ছবি ও সম্পাদকীয় পাতায় একটি মতামত প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও পত্রিকার সিলেট সংস্করণে আরো চারটি সংবাদ ও তিনটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। এই পনেরো দিনে প্রথম পাতায় এ সংক্রান্ত একটি সংবাদও জায়গা পায়নি, তবে শেষ পাতায় এক কলামে একদিনের একটি সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে।

প্রকাশিত সংবাদের শিরোনামে শ্রমিকেরা কী ধরণের আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছে, তাই বারেবারে এসেছে। বিশেষ করে ধর্মঘট এবং মহাসড়ক অবরোধের কথা একাধিকবার এসেছে। শিরোনামে মহাসড়ক অবরোধের সাথে জনদুর্ভোগের কথা স্মরণ করাতেও ভোলেনি পত্রিকাটি।

 

 

'ধর্মঘট এবং মহাসড়ক অবরোধের কথা একাধিকবার এসেছে…'

 

 

আন্দোলনের প্রথমদিকে চা-শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা ও নারী শ্রমিকদের বয়ানে সংবাদ তৈরী হয়েছে। জিনিসপত্রের অত্যাধিক দামের ভিতর ১২০ টাকায় সংসার চালানো যায় না, তার আবেগী বর্ণনা এসেছে। এরপর কাঁচা পাতার মৌসুমে ধর্মঘট চা-শিল্পের কী বিপুল ক্ষতি করছে, তা বলে মালিক পক্ষের বয়ান আনা হয়েছে। প্রতিদিন ৩০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলা হলো। দফায় দফায় বৈঠকে সমাধান হচ্ছে না বলা হলো। শ্রমিকের মজুরি কম এটা বলা হচ্ছে, আবার বারে বারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে চা-শিল্পে দৈনিক ৩০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। অথচ, টানা ধর্মঘট করে শ্রমিকেরা কোনো মজুরি বা রেশন না পেয়ে প্রায় না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, সে নিয়ে কোনো সংবাদ প্রথম আলোতে আসেনি।

 

 

আন্দোলনের প্রথমদিকে চা-শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা ও নারী শ্রমিকদের বয়ানে সংবাদ তৈরী হয়েছে। জিনিসপত্রের অত্যাধিক দামের ভিতর ১২০ টাকায় সংসার চালানো যায় না, তার আবেগী বর্ণনা এসেছে। এরপর কাঁচা পাতার মৌসুমে ধর্মঘট চা-শিল্পের কী বিপুল ক্ষতি করছে, তা বলে মালিক পক্ষের বয়ান আনা হয়েছে। প্রতিদিন ৩০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলা হলো। দফায় দফায় বৈঠকে সমাধান হচ্ছে না বলা হলো। শ্রমিকের মজুরি কম এটা বলা হচ্ছে, আবার বারে বারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে চা-শিল্পে দৈনিক ৩০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। অথচ, টানা ধর্মঘট করে শ্রমিকেরা কোনো মজুরি বা রেশন না পেয়ে প্রায় না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, সে নিয়ে কোনো সংবাদ প্রথম আলোতে আসেনি।

 

 

২০ তারিখ ১৪৫ টাকা মজুরি ঘোষণার পর শ্রমিকেরা ধর্মঘট চালিয়ে গেলে পত্রিকাটি প্রতদিন আন্দোলনের রুটিন কাভারেজ দিয়েছে। ২২ তারিখ শ্রমিকেরা গায়ে রঙ দিয়ে নিজেদের দাবির কথা লিখে ভুখা মিছিল করে। প্রথম আলো অন্যান্য ইস্যুতে এ ধরণের শিল্পমণ্ডিত প্রতিবাদী ছবিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করলেও ঐদিন তারা এই সকল ছবি ছাড়া একটি সংবাদ করে। এভাবে পত্রিকাটি অন্য সময়ে এ ধরনের সংবাদকে যেভাবে উপস্থাপন করে, তার চাইতে অনেকেটাই ভিন্ন কাভারেজ দিয়েছে।

 

 

প্রথম আলো অন্যান্য ইস্যুতে এ ধরণের শিল্পমণ্ডিত প্রতিবাদী ছবিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করলেও ঐদিন তারা এই সকল ছবি ছাড়া একটি সংবাদ করে

 

 

পর্যালোচনাভুক্ত পুরো সময়টুকু জুড়ে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় এই ইস্যুতে একটিই মাত্র কলাম ছেপেছে। টিআইবি পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের লেখা ঐ কলামে চা-শ্রমিকদের সাথে হওয়া বিভিন্ন বৈষম্য তুলে ধরা হয় এবং বলা হয় এসব সমস্যা না মেটালে তা হবে চা-শিল্পের টেকসই বিকাশের জন্য ক্ষতিকর।

 

 

প্রথম আলোয় চা শ্রমিকের আন্দোলন

 

 

পত্রিকাটি এ ইস্যুতে ঢাকা সিলেট সংস্ককরণ মিলিয়ে মোট আটটি ছবি প্রকাশ করেছে। তার অধিকাংশই বড় মিছিলের ছবি। দুটি ছবিতে নারীদের বড় মিছিলের সামনের লাইনে মাঝখানে নেতাগোছের একজন পুরুষ এবং একটি ছবিতে নারীদের মিছিলের সামনে একদল যুবক স্লোগান দিচ্ছে দেখা যায়। এই ধরনের ছবিগুলো সাধারণত মালিক ও সরকারপক্ষের প্রিয় ‘শ্রমিকদের কেউ উস্কানি দিচ্ছে’ বয়ানকেই প্রতিষ্ঠিত করে। অধিকাংশ ছবিতে শ্রমিকদের অতিসরল, বোকাসোকা ও বিভ্রান্ত চাহনি ফুটে উঠেছে।

 

 

'নারীদের মিছিলের সামনে একদল যুবক স্লোগান দিচ্ছে'

 

 

আন্দোলনের সমর্থনে এই সময়টুকুতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচি এই পত্রিকায় কাভারেজ পায়নি।

 

 

'নারীদের বড় মিছিলের সামনের লাইনে মাঝখানে নেতাগোছের একজন পুরুষ'

 

 

চা-শ্রমিকের আন্দোলন নিয়ে প্রথম আলোর মনোভাব সম্ভবত এমন-- শ্রমিকদের সাথে যে বৈষম্য হয়, তা না হওয়াই ভালো। তবে একারণে চা-শ্রমিকদের আন্দোলন কিছুটা বিরক্তিকর কিংবা জনদুর্ভোগ তৈরি করছে, শিল্পের ক্ষতি হচ্ছে। শ্রমিকরা দ্রুত কাজে ফিরলেই বাঁচা যায়।

 

 

দ্য ডেইলি স্টার

এই পত্রিকায় চা-শ্রমিকের আন্দোলন নিয়ে ১১-২৫ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৫টি সংবাদ, ১০টি ছবি এবং সম্পাদকীয় পাতায় একটি উপম্পাদকীয় এবং তিনটি কলাম প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে প্রথম পাতায় চারটি সংবাদ, দুটি ছবি ও শেষ পাতায় একটি ব্যাক লিড সহ মোট দুটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

'পোস্টারে দাবি লেখা ছবি বারেবারে এসেছে

 

 

ডেইলি স্টারে প্রকাশিত সংবাদ, ছবি বা কলামে শ্রমিকেরা নিজেদের বয়ানে হাজির হয়েছেন। সংবাদ শিরোনামে চা-শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ উক্তির ব্যবহার বেশী। সংবাদ কাহিনী তৈরীতেও উক্তির অধিক ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। শ্রমিক নেতাদের চেয়ে সাধারণ শ্রমিকের বয়ানে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তবে নেতাদেরকেও সহমর্মিতার সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে মালিকের চেয়ে শ্রমিকের বয়ান প্রাধান্য পেয়েছে। সংবাদকাহিনী, কলাম ও ছবিতে শ্রমিকের দুরাবস্থার কথা বারবার মনে করানো হয়েছে। মজুরি বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করার পর শ্রমিকেরা ধর্মঘট না তুললে তার সমর্থনে উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি।

 

 

ডেইলি স্টারে প্রকাশিত সংবাদ, ছবি বা কলামে শ্রমিকেরা নিজেদের বয়ানে হাজির হয়েছেন। সংবাদ শিরোনামে চা-শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ উক্তির ব্যবহার বেশী। সংবাদ কাহিনী তৈরীতেও উক্তির অধিক ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। শ্রমিক নেতাদের চেয়ে সাধারণ শ্রমিকের বয়ানে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তবে নেতাদেরকেও সহমর্মিতার সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে মালিকের চেয়ে শ্রমিকের বয়ান প্রাধান্য পেয়েছে। সংবাদকাহিনী, কলাম ও ছবিতে শ্রমিকের দুরাবস্থার কথা বারবার মনে করানো হয়েছে। মজুরি বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করার পর শ্রমিকেরা ধর্মঘট না তুললে তার সমর্থনে উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে পত্রিকাটি।

 

 

তবে আন্দোলনের সমর্থনে ঢাকায় অনুষ্ঠিত কোনো কর্মসূচি এবং নাগরিকদের বিবৃতি সংক্রান্ত খবর প্রকাশযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি।

 

 

ডেইলি স্টারের সংবাদ শিরোনাম ও সংবাদ কাহিনীতে শ্রমিকের প্রত্যক্ষ উক্তি

 

 

এই পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে শ্রমিকদের রিপ্রেজেন্টেশন প্রথম আলোর তুলনায় মর্যাদাপূর্ণ মনে হয়েছে। পোস্টারে দাবি লেখা ছবি বারেবারে এসেছে। কাউকে বিশেষবভাবে নেতা বানানোর চেষ্টা নাই।

 

 

সমকাল

সমকাল পত্রিকায় ১১ আগস্ট থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চা-শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন নিয়ে মোট ২০টি সংবাদ, ১১টি ছবি ও ১টি কলাম প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদের মধ্যে ২টি প্রথম পাতায় ও ৬টি শেষ পাতায় এবং প্রকাশিত ছবির মধ্যে ২টি প্রথম পাতায় ও ৫টি শেষ পাতায় স্থান পেয়েছে।

 

 

সমকালে চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের ছবি

 

 

চা-শ্রমিক আন্দোলনের খবর দিতে গিয়ে চা-শ্রমিকদের ভেতর গড়ে ওঠা বিভিন্ন ধরণের রাজনৈতিক নেতৃত্বের যত্নশীল উপস্থাপন করেছে পত্রিকাটি। এতে করে আন্দোলন শুধু একটি সংঠনের বা শুধু সাধারণ শ্রমিকের বলে মনে হয়নি। অধিকাংশ সংবাদে শ্রমিকের জীবন ও আন্দোলনের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখালেও মালিকের চা শিল্পের সংকট কিংবা আন্দোলনে নগরবাসীর ভোগান্তির কথা উঠেছে মাঝেমধ্যে। চা শ্রমিকের দুরাবস্থা নিয়ে ফিচার করেছে পত্রিকাটি। সেইসাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সমর্থন গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে।

 

 

চা-শ্রমিক আন্দোলনের খবর দিতে গিয়ে চা-শ্রমিকদের ভেতর গড়ে ওঠা বিভিন্ন ধরণের রাজনৈতিক নেতৃত্বের যত্নশীল উপস্থাপন করেছে পত্রিকাটি। এতে করে আন্দোলন শুধু একটি সংঠনের বা শুধু সাধারণ শ্রমিকের বলে মনে হয়নি। অধিকাংশ সংবাদে শ্রমিকের জীবন ও আন্দোলনের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখালেও মালিকের চা শিল্পের সংকট কিংবা আন্দোলনে নগরবাসীর ভোগান্তির কথা উঠেছে মাঝেমধ্যে। চা শ্রমিকের দুরাবস্থা নিয়ে ফিচার করেছে পত্রিকাটি। সেইসাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সমর্থন গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে।

 

 

আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি যেমন, ভুখা মিছিল, চা শ্রমিকের সন্তানদের সংহতি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে পত্রিকাটি। সেইসাথে প্রকাশিত ছবিগুলোতে আন্দোলনকারীদের শক্তিশালী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রিপ্রেজেন্টেশান ফুটে উঠেছে।

 

 

নিউ এজ

১৩ আগস্ট থেকে শুরু করে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত এই পত্রিকায় চা-শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে মোট ১৫টি সংবাদ, ছয়টি ছবি, দুইটি উপ-সম্পাদকীয় ও একটি কলাম প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি সংবাদ ও তিনটি ছবি প্রথম পাতায় এবং তিনটি সংবাদ শেষ পাতায় জায়গা পেয়েছে।

 

 

'এই পত্রিকার একটি ছবিতে আন্দোলনকারীদের সাথে মুখোমুখি অবস্থায় পুলিশকে দেখানো হয়েছে'

 

 

পত্রিকাটি ১৬ তারিখ চা-শ্রমিকদের দাবীকে মেনে নেওয়ার আর্জি জানিয়ে উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করে প্রমাণ করে আন্দোলন নিয়ে তাদের সহানুভূতিশীল অবস্থানের কথা। তবে এই পত্রিকায় শুরু থেকেই আন্দোলনকারী সংগঠন হিসেবে চা-শ্রমিক ইউনিয়ন অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। সংবাদ কাহিনীতে অনেক সময় ‘তাদের (চা-শ্রমিক ইউনিয়ন) আন্দোলন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

 

নিউ এজ পত্রিকায় মালিকপক্ষের দুঃখের কাহিনী, চা-শিল্পের সংকট প্রভৃতি কোনো জায়গা পায়নি। বরং, শ্রমিকদের আন্দোলনকে অবৈধ বলা কিংবা চা-বাগানের পাতা নষ্ট হচ্ছে বলে শ্রীমঙ্গল থানায় মামলা করা মালিকপক্ষের চরিত্র তুলে ধরেছে। মালিকপক্ষ মামলা করার পর তা যে চা-বাগানের সমস্যা দূরীকরণে কাজে আসবে না, তা নিয়ে আরেকটি উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করে নিউ এজ। এই পত্রিকার আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয়, পূর্ণাঙ্গ সংবাদ হিসেবে বা সংবাদ কাহিনীর অংশ হিসেবে আন্দোলনের সাথে সংহতি জানানো অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বক্তব্য গুরুত্ব পেয়েছে।

 

 

নিউ এজ পত্রিকায় মালিকপক্ষের দুঃখের কাহিনী, চা-শিল্পের সংকট প্রভৃতি কোনো জায়গা পায়নি। বরং, শ্রমিকদের আন্দোলনকে অবৈধ বলা কিংবা চা-বাগানের পাতা নষ্ট হচ্ছে বলে শ্রীমঙ্গল থানায় মামলা করা মালিকপক্ষের চরিত্র তুলে ধরেছে। মালিকপক্ষ মামলা করার পর তা যে চা-বাগানের সমস্যা দূরীকরণে কাজে আসবে না, তা নিয়ে আরেকটি উপসম্পাদকীয় প্রকাশ করে নিউ এজ। এই পত্রিকার আরেকটি লক্ষ্যণীয় বিষয়, পূর্ণাঙ্গ সংবাদ হিসেবে বা সংবাদ কাহিনীর অংশ হিসেবে আন্দোলনের সাথে সংহতি জানানো অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বক্তব্য গুরুত্ব পেয়েছে।

 

 

এই পত্রিকার একটি ছবিতে আন্দোলনকারীদের সাথে মুখোমুখি অবস্থায় পুলিশকে দেখানো হয়েছে, অন্য চারটি পত্রিকায় পুলিশের উপস্থিতি ছিলো না। তবে এখানেও অনেক নারী আন্দোলনকারীর সামনের সারিতে মাঝখানে একজন নেতৃস্থানীয় পুরুষকে দেখা গিয়েছ, তবে সম্ভবত উদ্দেশ্য ছিলো সংগঠনকে মহিমান্বিত কর।

 

 

বণিকবার্তা

বণিকবার্তায় চা-শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে ১১ তারিখ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত মোট ১৯টি সংবাদ, ৫টি ছবি ও সম্পাদকীয় পাতায় দুটি কলাম প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদের মধ্যে প্রথম পাতায় জায়গা পেয়েছে ছয়টি এবং শেষ পাতায় সাতটি।

 

 

বণিক বার্তায় গুরুত্ব পেয়েছে যে খবর

 

 

বণিক বার্তায় আন্দোলনের খবর আসে প্রথম ১৪ আগস্ট। শুরু থেকেই সংবাদ কাহিনী ও শিরোনামে মালিকপক্ষের বয়ানের প্রাধান্য। শিরোনামগুলোতে ‘কাজে ফেরেনি’, ‘আন্দোলন অব্যাহত’, ‘দাবিতে অনড়’ এই ধরণের শব্দের ব্যবহার বেশী। শ্রমিকেরা কবে কাজে ফিরবে এ পত্রিকার কাছে সেটাই মূল, মজুরি কবে দেবে তা ধর্তব্যে নাই। যেনো, শ্রমিকেরা খামখেয়ালি করে কাজে ফিরছে না, কবে ফিরবে এটা তাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিক করতে হবে- এক্ষেত্রে সরকার বা মালিকের কিছু করার নাই।

 

 

বণিক বার্তায় আন্দোলনের খবর আসে প্রথম ১৪ আগস্ট। শুরু থেকেই সংবাদ কাহিনী ও শিরোনামে মালিকপক্ষের বয়ানের প্রাধান্য। শিরোনামগুলোতে ‘কাজে ফেরেনি’, ‘আন্দোলন অব্যাহত’, ‘দাবিতে অনড়’ এই ধরণের শব্দের ব্যবহার বেশী। শ্রমিকেরা কবে কাজে ফিরবে এ পত্রিকার কাছে সেটাই মূল, মজুরি কবে দেবে তা ধর্তব্যে নাই। যেনো, শ্রমিকেরা খামখেয়ালি করে কাজে ফিরছে না, কবে ফিরবে এটা তাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিক করতে হবে- এক্ষেত্রে সরকার বা মালিকের কিছু করার নাই।

 

 

সংবাদকাহিনীর মূল সুর ধর্মঘটের কারণে চা-শিল্পের কতটা ক্ষতি হচ্ছে। মালিকের সংকট ও সমস্যার কথা বারেবারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অথচ শ্রমিকের দুরবস্থার কথা নেই। সংবাদকাহিনীতে মালিকপক্ষ ও শ্রমিক নেতাদের কথা বেশী, , সাধারণ শ্রমিকের বক্তব্য নেই বললেই চলে।

 

 

সংবাদ শিরোনামে ও কাহিনীতে আন্দোলনকে ঘিরে শ্রমিকের দ্বন্দ্ব গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকের কথা শুধু তখনই পাওয়া গেছে, যখন সে বলছে শ্রমিকনেতা তাকে ধোঁকা দিয়েছে।

এই পত্রিকায় ২২ তারিখের প্রথম পাতার একটি খবর ‘নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাগানের কর্মকর্তারা’, যেখানে বলা হয়েছে আন্দোলনরত শ্রমিকদের থেকে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় কর্মকর্তারা। বাকী চারটি পরত্রিকায় এ সংক্রান্ত কোনো খবর প্রকাশ পায়নি।   

 

 

বণিক বার্তায় বাক্যের ব্যবহার: 'নেতাদের কথাও শুনছেন না শ্রমিকদের একপক্ষ', 'আন্দোলনে নেমেছে তাদের স্কুলপড়ুয়া শিশুসন্তানরাও'

 

 

১৯ আগস্ট এই পত্রিকার প্রধান খবর ছিলো, ‘অতি ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাই চা বাগানের মালিক’। খবরে বিভিন্ন চা বাগানের মালিকদের পরিচয় তুলে ধরা হয়। কিন্তু এরপর আবার চা-শিল্প ও মালিকের সমস্যা সংক্রান্ত আলাপে ফিরে যাওয়া হয়। এই প্রশ্নের উত্তর মেলে না যে, এতো সমস্যা নিয়ে মালিকেরা অতি ধনাঢ্য হলেন কী করে?

 

 

সারসংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত;

আন্দোলন চলাকালীন ১৯ তারিখ চা-বাগানের চারজন নারী শ্রমিক টিলা ধ্বসে চাপা পড়ে নিহত হন। পাঁচটি পত্রিকাই এ ঘটনা খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। যদি আন্দোলনের মাঝে এই ঘটনা না ঘটতো, তাহলে হয়তো চা-শ্রমিকের আরো শত শত দুর্দশার মতো এই ঘটনা পত্রিকায় ঠাঁই পেতো না। কোনো বিষয়ে গণমাধ্যমের মনোযোগ সবসময়ই আংশিক। সিলেটের বাগানগুলোতে একযোগে ধর্মঘট ডেকে প্রতিদিন ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি করতে পারছে বলেই সরকার, মালিক ও গণমাধ্যম সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে শ্রমিকেরা।

 

 

ডেইলি স্টার তাদের উপস্থাপন করছে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে, যাদের মাঝে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নেই, এমনকি বাগানের বাইরের দুনিয়ার থেকে আলাদা একজটিক সত্তা হিসেবে। নিউ এজ আবার একটি সংগঠনকে অনেক বড় করে দেখিয়েছে। পাঁচটি পত্রিকার ভেতরে এই ইস্যুকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিয়েছে প্রথম আলো। একই প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন পত্রিকা হয়েও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কাভারেজের ধরনে পার্থক্য কৌতূহলের জন্ম দেয়। বণিকবার্তা পরিপূর্ণভাবেই মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এক্ষেত্রে সমকাল আন্দোলনকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে অধিক গুরুত্ব দিলেও বাকি বিষয়গুলোতে সমন্বয় করার চেষ্টা করেছে এবং আন্দোলন কর্মসূচিকে লোকপ্রিয় উপায়ে উপস্থাপন করবার চেষ্টা করে আন্দোলনকে সহায়তা করেছে।

 

 

পত্রিকাগুলো যে বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করেনি

১. শ্রমিকদের সংক্ষিপ্ত মন্তব্যের বাইরে তাদের আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে এমন কারও দীর্ঘ সাক্ষাৎকার কোন পত্রিকা ছেপেছে কি না।

উত্তর: না। আন্দোলনের সংগঠকদের তেমন কোন বক্তব্য যেমন আসেনি, তেমনি এধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত যে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেয়ার প্রচলন রয়েছে, সেই কাজটি কোন পত্রিকা করেনি।

 

২. চা শ্রমিক আন্দোলনে  নেতাদের ভূমিকা, নেতৃত্বের বিভাজন ইত্যাদি নিয়ে কোন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছিল কি না।

উত্তর: না। আন্দোলনের একটা পর্যায়ে চা শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী চা-শ্রমিক ইউনিয়ন মাঠ পর্যায়ের আন্দোলন থেকে সরে গেলেও, এবং পরিণামে আমাদের গবেষণার সময়সীমার বাইরে একটা পর্যায়ে চা- শ্রমিক অধিকার পরিষদ’ নামে  নতুন একটি সংগঠনের জন্ম হলেও এ বিষয়ে অনুসন্ধানী কোন প্রতিবেদন করতে বা পূর্বধারণা করতে গণমাধ্যম ব্যর্থ হয়েছে।

 

৩. এই সময়ে প্রতিবেশী অন্য দেশের চা শ্রমিকদের সাথে বাংলাদেশের শ্রমিকদের কোন তুলনা প্রতিবেদনগুলোতে ছিল কি না।

উত্তর: এই পাঁচটি পত্রিকার প্রতিবেদনে এমন কোন তুলনা ছিল না। তবে এই গবেষণার বাইরের একটি ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনের স্ট্যান্ডার্ড এ বিষয়ে একটি লেখা প্রকাশ করে যেখানে দেখানো হয়েছিল শ্রীলঙ্কা, ভারতের চাইতে বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের মজুরি বেশ কম।

 

৪. বাংলাদেশের পঞ্চগড় এলাকায় কেন চা শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ নেই, বা তারা এই আন্দোলনে যুক্ত হয়নি, তেমন কোন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এই পাঁচটা পত্রিকায় ছিল কি না।

উত্তর: না। তবে ডেইলি স্টারে ২৫ তারিখ একটা  ছিলো 'Farmers in Lalmonirhat losing interest in tea cultivation' সেখানে বলা হয়েছে উত্তরবঙ্গে সরকারি চা প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র নাই বলে বাগান মালিকদের ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলোতে কেন এমন আন্দোলন দেখা যায়নি, সে বিষয়ে কোন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন গবেষণাভুক্ত পত্রিকাগুলো করেনি। তবে গবেষণার আওতা বহির্ভূত একটি দৈনিকে নিউজ বাংলায় “সিলেটের চা শ্রমিকদের দ্বিগুণ আয় পঞ্চগড়ের শ্রমিকদের” শীর্ষক একটি মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন প্রচার করেছে।

 

উল্লেখ্য যে, এটা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সামগ্রিক চিত্র নয়। এর বাইরেও অনেকগুলো দৈনিক পত্রিকা ছিল। তাছাড়া অনলাইনেও পত্রিকাগুলো নানান মাত্রিক ভূমিকা রেখেছে। একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা এবং কোন কোন ক্ষমতা সম্পর্কের প্রেক্ষিতে কোন গণমাধ্যমটি কী ভূমিকা পালন করেছে, তার বিশ্লেষণ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের গতিধারা বুঝবার জন্যই জরুরি একটা কাজ হতে পারে।