মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯ Tuesday 4th October 2022

মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯

Tuesday 4th October 2022

দেশজুড়ে গণমাধ্যম

সংবাদমাধ্যম সংকট: বিজ্ঞাপন ও ক্ষমতার আধিপত্য

২০২২-০৫-১১

সামিয়া রহমান প্রিমা
সিনিয়র রিপোর্টার

দ্বিতীয় পর্ব

 

  • সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সংবাদমাধ্যম 
  • মালিকানা, বিজ্ঞাপন ও রাজনৈতিক প্রভাবে বদলে যাচ্ছে সংবাদ
  • সংবাদ নয়, প্রাধান্য পাচ্ছে বিজ্ঞাপন
  • জনগণের আস্থা হারিয়েছে সংবাদমাধ্যম 
  • শ্রম অধিকারের বালাই নেই, হতাশাগ্রস্ত সাংবাদিকরা  

 

সংবাদমাধ্যম সংকট: বিজ্ঞাপন ও ক্ষমতার আধিপত্য

 

সামাজিক, রাজনৈতিক নানা চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে অর্ধশত বছর পার করেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে রাষ্ট্রের ভুল-ত্রুটি বিশ্লেষণ করে ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর তৈরির দায়িত্ব ছিল সংবাদমাধ্যমের কাঁধে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমগুলো কি পেরেছে তাদের দায়িত্ব পালন করতে? কী ধরনের বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে তাদের? স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আজ কোথায় এসে দাঁড়াল? এসব প্রশ্ন অনুসন্ধানে দৃকনিউজ কথা বলেছে গণমানুষ, বিশ্লেষক, সংবাদকর্মী ও রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। সংবাদমাধ্যম সংকটকে ঘিরে দৃকনিউজ-এর বিশ্লেষণী প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।

 

সংবাদমাধ্যমের অর্থনীতি (মালিকপক্ষের হস্তক্ষেপ)

  

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা নিয়ে বিস্তৃত কোনও গবেষণা হয়নি। সবশেষ সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ সিজিএস-এর উদ্যোগে ২০২১ সালে ‘বাংলাদেশে মিডিয়ার মালিক কারা?’ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, ব্যাংক, বীমাসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও আবাসন খাতের ব্যবসায়িক গোষ্ঠীই সংবাদমাধ্যম শিল্পের মালিকগোষ্ঠী। গত কয়েক বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত ঋণখেলাপিসহ এ সকল ব্যবসায়িক খাতই দুর্নীতিতে জড়িয়েছে। এই গবেষণায় এটি স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও পারিবারিক সম্পর্কের একচেটিয়া আধিপত্যেই গড়ে উঠেছে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা। 

 

 

অধ্যাপক ও গবেষক ড. গীতি আরা নাসরীনের মতে, ক্রনি ক্যাপিটালিজম (দুর্বৃত্ত পুঁজিবাদ) ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকে গেছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের অধিকাংশ সদস্যই এখন ব্যবসায়ী। এদের অনেকের মিডিয়া আছে। তিনি বলেন, “কলেজছাত্রী মুনিয়ার কথিত আত্মহত্যার কেসের কথা ভাবেন। সেখানে আমরা দেখলাম সব মিডিয়াই মুনিয়ার ছবি দিয়েছে, অথচ সন্দেহভাজন অপরাধী বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের ছবি দেয়নি।” শুধু তাই নয়, সার্বিকভাবে এই ঘটনায় মুনিয়া ও তার পরিবারকে আক্রমণ করে একের পর এক প্রতিবেদন তৈরি করেছে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন মাধ্যমের প্রতিবেদকদেরও ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এই ঘটনায় প্রতিবাদীদের হেয় করার চেষ্টা দেখা যায়। 

 

 

এই প্রসঙ্গে ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউ এজ- এর সম্পাদক নূরুল কবীর দৃকনিউজকে বলেন, ‘বসুন্ধরা’র মালিকানাধীন তাবৎ মিডিয়া প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সংবাদকর্মীরা কেন তখন ‘গর্বিত’ সাংবাদিক হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে একযোগে নিজেদের বিজ্ঞাপিত করেছিলেন, আর কেনই বা আবার প্রায় সম্মিলিতভাবে তা প্রত্যাহার করেছেন; সেটা ঠিক বুঝতে পারিনি। প্রথমে হয়তো কোম্পানি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তা করেছিলেন, পরে আবার জনপরিসরে বিরূপ সমালোচনার চাপে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।” দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এটি অত্যন্ত ‘বাজে ঘটনা’ যা মানুষ মনে রাখবে এবং একাডেমিক আলোচনাতেও বারবার ফিরে আসবে বলে মনে করেন, নূরুল কবীর।

 

 

জনকণ্ঠ-এর সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রাজন ভট্টাচার্য বলেন, “সরকার বিভিন্ন মেয়াদে টাকা দিয়ে জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করেছেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেও প্রধানমন্ত্রী এই প্রতিষ্ঠানকে ভালোবেসে ৪০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন। সেই চিঠির কপিও আমাদের কাছে ছিল। রাষ্ট্রের এত প্রণোদনা নিয়েও টাকার অভাব দেখিয়ে প্রতিনিয়ত ছাঁটাই করা হয়েছে, এই ষড়যন্ত্রটা ধারাবাহিক ছিল।”

 

 

২০১৮ সালে ‘মাছরাঙা টেলিভিশন’-এ শুরু হয় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘অনুসন্ধান’। এতে ‘পরিকল্পনা ও গ্রন্থনা’ ভূমিকায় দায়িত্ব পালন করাসহ প্রায় ৯ বছর এই টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করেছেন বদরুদ্দোজা বাবু। তিনি বলেন, “২য় সিজনের বিরতির পর যখন ৩য় সিজন নিয়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি তখনই ‘মাছরাঙা টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ’ দায়িত্ব ছেড়ে দিতে জানান। আমি চাকরি ছেড়ে দেই। এরপর ‘অনুসন্ধান’ আর ফিরে আসে নি।” এই ঘটনায় মাছরাঙা চ্যানেলের মালিকানা শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপের কোনও ব্যবসায়িক স্বার্থ কাজ করেছে কিনা- জানতে চাইলে এই অনুসন্ধানী সাংবাদিক বলেন, “আমার চাকরিটা কেন গেল, সেটা আমি আর খুঁজতে যাইনি। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সব ধারণাই আমার আছে। কেন আমার সাথে আর কন্টিনিউ (কাজ) করবেন না, এটাই আমার জন্য যথেষ্ট ছিল।”

 

সরকারপন্থী এই সব মালিক কর্তৃপক্ষ আবার তাদের মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য খুঁজে খুঁজে সরকারি রাজনীতির প্রতি অনুগত সংবাদকর্মীদের খুঁজে বের করেন। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কখনো কখনো এমনকি রাষ্ট্রীয় নানা গোয়েন্দা বাহিনীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেরও সাহায্য নেওয়া হয়, যাতে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ার ফাঁক গলিয়ে কোনো ভিন্নমতাবলম্বী সংবাদকর্মী ওই সব প্রতিষ্ঠানে ঢুকে না পড়ে।

 

দৃকনিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক নূরুল কবীর বলেন, “সরকারপন্থী এই সব মালিক কর্তৃপক্ষ আবার তাদের মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য খুঁজে খুঁজে সরকারি রাজনীতির প্রতি অনুগত সংবাদকর্মীদের খুঁজে বের করেন। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কখনো কখনো এমনকি রাষ্ট্রীয় নানা গোয়েন্দা বাহিনীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেরও সাহায্য নেওয়া হয়, যাতে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ার ফাঁক গলিয়ে কোনো ভিন্নমতাবলম্বী সংবাদকর্মী ওই সব প্রতিষ্ঠানে ঢুকে না পড়ে।” 

 

 

পর্যবেক্ষণ বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এক ব্যক্তিকেই একাধিক পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইনের লাইসেন্স দেয়া হয়। সরাসরি নিজেদের নাম না থাকলেও আত্মীয়স্বজনের নামে থাকে মালিকানা।  এছাড়া নানা কৌশলে প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের দায়িত্বশীল পদ তৈরি করা হয়। 

 

 

এই পরিস্থিতিতে গোটা সংবাদমাধ্যম সুবিধা পাওয়ার ভিত্তিতে চলছে, বলে মত বিশ্লেষকদের। “সরকার, বাণিজ্যিক গোষ্ঠী ও বিভিন্ন পক্ষের সুবিধা দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক সাংবাদিকতার নীতি নির্ধারণ করছে। মালিকানা ব্যক্তির হাতে থাকুক বা সরকার, সংবাদমাধ্যমের নীতি-নির্ধারকদের যা দায়িত্ব তা পালন করতে হবে,” বলে জানান অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন। 

 

সংবাদমাধ্যমের অর্থনীতি (বিজ্ঞাপনের প্রভাব) 

 

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম মূলত বিজ্ঞাপনের হাট হিসেবে ধরা দিয়েছে। প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইনসহ প্রায় সকল মাধ্যমেই খবরের ছদ্মবেশে দেখা যায় বিজ্ঞাপন। সংবাদের মাঝে কায়দা করে প্রতিনিয়ত পণ্যের নাম ঢুকিয়ে দেয়া, পত্রিকার মলাট ধারণাসহ সব মিলিয়ে সংবাদের চেয়ে বিজ্ঞাপন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে বলে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের আবাসিক অধ্যাপক ও গবেষক ড. ফাহমিদুল হক। তিনি বলেন, “ধরা যাক, কোনও একটা ব্যাংক কিংবা টেলকো তাদের নতুন পণ্য ও নতুন সার্ভিসের (সেবা) বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। এই বিজ্ঞাপন যদি প্রথম পাতায় বড় করে থাকে তো ভেতরের পাতায় ওটারই একটা প্রতিবেদন। তার মানে ওই নিউজটা হয়েছে এবং নিউজহোলের ওই জায়গাটা সে অধিগ্রহণ করেছে ওই বিজ্ঞাপনের বিনিময়ে, বা ওই সংবাদটা রেখেছে ওই বিজ্ঞাপনের কারণে। অথচ যেটা নির্ভেজাল সংবাদ হওয়ার কথা ছিল। তার মানে যেখানে অন্য একটা জরুরি খবর প্রকাশ হতে পারত যা এভাবে কার্টেইল্ড (সংকুচিত) হয়ে যায়। প্রথম থেকেই আমি এই প্র্রক্রিয়াটার সমালোচনা করে এসেছি।” 

 

 

মিডিয়া মনিটরিং এজেন্সি ‘ট্র্যাকার’ এর তথ্যমতে, ২০১৯ সালে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো বিজ্ঞাপন থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয় করেছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে ট্রান্সকম গ্রুপের আওতাধীন- প্রথম আলোদ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে আয় দেখা যায়, প্রায় ১৬৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপন বিভাগের মূল্যতালিকা থেকে এই হিসাব পাওয়া গেছে। দেশে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের মার্কেটিং বিভাগের কর্মীদের সূত্রে জানা যায়, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপনের বাজার প্রায় পনেরোশ কোটি টাকা। 

 

 

মিডিয়া মনিটরিং কোম্পানি ‘রায়ানস আর্কাইভ’-এর প্রকাশিত একটি তথ্যে জানা যায়, ২০২১ সালের অক্টোবরে ১ লাখ ৮ হাজার ৯শ কলাম-ইঞ্চি বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে ৫৫টি মূলধারার জাতীয় দৈনিকের চেয়ে এগিয়ে ছিল প্রথম আলো। এরপর ধারাবাহিকভাবে অবস্থান করেছে সমকাল, ছাপিয়েছে ৩২ হাজার ১শ ৫০ কলাম-ইঞ্চি বিজ্ঞাপন। সংবাদ পরিবেশনার ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রাইম টাইম ধরা হয় সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টা। এসময় ৩৩টি টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে ১৫ হাজার ৭শ ৫০ মিনিট।  

 

 

সেই ‌৯০-এর দশকের শেষ থেকে ‘একুশে’ টিভি’র প্রচারপদ্ধতি অনুসরণ করেই চলছে এটিএন, চ্যানেল আই, এনটিভিসহ ২৪ ঘণ্টা সংবাদভিত্তিক সকল চ্যানেল। দেশে পুরোপুরি বিজ্ঞাপননির্ভর এই চ্যানেলগুলো কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং বা স্পনসরশিপ-এর মাধ্যমে শিরোনাম ও সংবাদের প্রায় সব অংশই বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিক্রি করেছে। ফলে প্রেজেন্টারের সংবাদ পরিবেশন থেকে শুরু করে রিপোর্টারের প্রতিবেদন ও লাইভের চারপাশ জুড়েও থাকে বিজ্ঞাপন। পরিস্থিতি এমন যে বিজ্ঞাপনের মাঝে, আগে বা পরে, যা কিছু প্রচারিত হয় তাই দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদ।  

 

 

বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদের শিরোনাম থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিজ্ঞাপন বিরতি ছাড়াই কমপক্ষে ১৫ বার সংবাদের মাঝে বিজ্ঞাপন প্রচার করেন নিউজ প্রেজেন্টার। যেমন চ্যানেল আইয়ের সংবাদে দেখা যায়, ‘জিপিএইচ ইস্পাত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সংবাদ’, ‘সামিট আন্তর্জাতিক সংবাদ’, ‘পপুলার লাইফ বাণিজ্য সংবাদ’, ‘পূবালী ব্যাংক কৃষি সংবাদ’, ‘সোশাল ইসলামী ব্যাংক লি. বিশেষ সংবাদ’, ‘ধামাকা শপিং ডটকম তথ্য-প্রযুক্তি সংবাদ’সহ নানা প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের নামে সিজি (সংবাদ পরিবেশনার এক একটি অংশ) । এসব সিজির ভেতরে যে সংবাদ থাকে তাও পাঠকের জন্য কোনও সংবাদ নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব সংবাদ বিভিন্ন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা। এমনকি প্রায়ই এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রচারণাভিত্তিক বার্তা ও ছবি পাঠানো হয়। এসব প্রচারে বাধ্য থাকেন বার্তা সম্পাদক।  

 

 

নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে, টেলিভিশন চ্যানেলের একজন বার্তা সম্পাদক বলেন, “বিশেষ অনুষ্ঠান ও বিজ্ঞাপনের চাপে প্রায়ই নিউজ বুলেটিনের নির্ধারিত সময় ৫ থেকে ১০ মিনিট কমে যায়। মানে সংবাদের বিন্দুমাত্র ছিটেফোঁটা নেই, মালিকপক্ষের এমন আয়োজনের প্রতিবেদনেই ৫ মিনিট ছাড়িয়ে গেছে। ৩০ মিনিটের নিউজে আরও আছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এই পক্ষ সেই পক্ষ। কী করব? এই অবস্থায় প্রায়ই আমাদের তৈরি করা জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন ফেলে দিতে হয়।” ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের এসব চ্যানেল জনসেবার উদ্দেশ্যে চালু হয় না বলেই মনে করেন এই বার্তা সম্পাদক। 

 

আমি যখন কোনো একটা পত্রিকা পড়ছি, সংবাদের পাশাপাশি প্রচুর বিজ্ঞাপনও পড়ছি। সংবাদমাধ্যম আমাদেরকে এই বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করছে। আধুনিক সংবাদমাধ্যম বিজ্ঞাপন ছাড়া চলবে না জানি। কিন্তু আপনি ১০ টাকা নিয়ে ১০০ বার সালাম দিচ্ছেন। অনেকে একটা হাস্যকর কথা বলেন, সংবাদমাধ্যম ব্যবসা করে। মুদি দোকানদারও তো ব্যবসা করে। না করলে প্রয়োজনীয় পণ্য পেতেন না আপনি। ব্যবসা করা তো খারাপ কিছু না। খারাপ হল, দোকানে প্রয়োজনীয় পণ্য না রাখা, খারাপ জিনিস গছিয়ে দেয়া। তেমনি ব্যবসা করে বলেই কোনো কিছু চেপে যাওয়ার বা আপনাকে ক্ষতিকর ভুল তথ্য সরবরাহ করার অধিকার সংবাদমাধ্যম কখনোই রাখে না।

 

ড. গীতি আরা বিজ্ঞাপনের আধিপত্যের বিশ্লেষণে বলেন, “আমি যখন কোনো একটা পত্রিকা পড়ছি, সংবাদের পাশাপাশি প্রচুর বিজ্ঞাপনও পড়ছি। সংবাদমাধ্যম আমাদেরকে এই বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করছে। আধুনিক সংবাদমাধ্যম বিজ্ঞাপন ছাড়া চলবে না জানি। কিন্তু আপনি ১০ টাকা নিয়ে ১০০ বার সালাম দিচ্ছেন। অনেকে একটা হাস্যকর কথা বলেন, সংবাদমাধ্যম ব্যবসা করে। মুদি দোকানদারও তো ব্যবসা করে। না করলে প্রয়োজনীয় পণ্য পেতেন না আপনি। ব্যবসা করা তো খারাপ কিছু না। খারাপ হল, দোকানে প্রয়োজনীয় পণ্য না রাখা, খারাপ জিনিস গছিয়ে দেয়া। তেমনি ব্যবসা করে বলেই কোনো কিছু চেপে যাওয়ার বা আপনাকে ক্ষতিকর ভুল তথ্য সরবরাহ করার অধিকার সংবাদমাধ্যম কখনোই রাখে না।” 

 

 

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোসহ যেকোনো অনলাইন নিউজ পোর্টালে খবরের খোঁজে প্রবেশ করলে প্রথমেই বাধা হিসেবে আসে চোখের সামনে ধরা দেয় বিজ্ঞাপন। এছাড়াও কোনো সংবাদের ভেতর প্রবেশ করলে এমনকি খবরটি পড়ার সময়েও হুট করে নানা নকশায় হাজির হয় বিজ্ঞাপন। যা মুহূর্তেই পাঠককে খবর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। 

 

রাষ্ট্রীয় মালিকানার কারণে বিটিভি সঠিক দায়িত্ব পালন করতে না পারায় অনেক আগেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে বেসরকারি টেলিভিশনগুলো ছিল জনগণের সহজে সংবাদ পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। দীর্ঘ সময়ের পরেও পত্রিকার মত বিস্তারিত ও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে যেতে পারেনি দেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতা। 

 

 

“এত এত টিভি চ্যানেল– শুধু নাম, লোগোই আলাদা। এখানে আপনি আসলে প্রচুর তথ্য দেখবেন কিন্তু কোনো খবর তার মধ্যে নাই। অথচ বাংলাদেশে তো খবর কম নয়, বরং দেওয়ার মত খবর অনেক। মানে হচ্ছে মিডিয়া আপনাকে যতখানি খবর দিচ্ছে তার থেকে বেশি লুকাচ্ছে। টিভির একটা অনুষ্ঠান শুনছিলাম। সেটাতে পুরো এক মিনিটও যাচ্ছে না, বারবার কি জানি বোধহয় গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপন হচ্ছে, কোনায় কোনায় ফোরজি নেটওয়ার্ক। কী বলব– আমার একদম মাথা ধরে যাচ্ছে, বমি চলে আসছে। আর লাইভের নামে এবং নানা উপায়ে অপ্রয়োজনীয় তথ্যের ভিড়ে মাথাটা খারাপ করে দিবে,” টেলিভিশন দেখার অভিজ্ঞতা এভাবেই বর্ণনা করেন ড. গীতি আরা। 

 

 

দীর্ঘদিন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ‘বার্তা প্রধান’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাংবাদিক নাজমুল আশরাফের মতে, “লাইভের নামে, টকশোর নামে এখন টেলিভিশনগুলোতে যা দেখানো হয় তার ৯০ ভাগই অপ্রয়োজনীয় এবং ভুল তথ্য! যা জনগণকে প্রতিনিয়ত বিভ্রান্ত করছে। কারণ, এখন নেতৃত্বে যারা আছেন তারা চরম অদক্ষ। আমরা একসময় যাদেরকে বাতিল গণ্য করতাম, হাসাহাসি করতাম তারাই এখন বিভিন্ন চ্যানেলে হেড অব নিউজ, সিএনই, অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর। যদি যোগ্য লোকজনের কাছে দায়িত্ব থাকত, তাহলে তো এই পরিস্থিতি তৈরি হত না।”

 

 

করপোরেট সংবাদমাধ্যমের উদাহরণ হিসেবে একই মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টারকে তুলে ধরেন অধ্যাপক ও গবেষক ড. ফাহমিদুল হক। ২০০৮ সালে এরা পলিটিকসকে ইনফ্লুয়েন্স (রাজনীতির গতিপথকে প্রভাবিত) করতে চেয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন এই অধ্যাপক। 

 

 

তবে সাংবাদিক নাজমুল আশরাফ বলেন, “ওয়ান ইলেভেনে দ্য ডেইলি স্টার আর প্রথম আলো যা করেছে, এটা তারাও বলে না যে ঠিক কাজ করেছি। এজন্য সম্পাদক মাহফুজ আনাম বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বহুবার ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন। তাই এটা দিয়ে পত্রিকার সব সফলতাকে ম্লান করে দেয়া যায় না।”

 

 

এই দুটি পত্রিকা অবশ্যই অন্য সংবাদমাধ্যমের তুলনায় ব্যতিক্রম বলে মনে করেন ড. ফাহমিদুল হক। তবে আপত্তির জায়গায় বলেন, “এরা ব্যবসায়িক মহলের হয়ে কাজ করেন। মূলত ব্যবসাকেই প্রাধান্য দেন। তাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের গল্প, সমাজের প্রভাবশালীদের সাথে সিমবায়োটিক রিলেশন (পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক), এসবও তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। সরকারি বয়ানের বিপরীতে পাল্টা বয়ান তারা হাজির করতে পারে, কিন্তু সেটাও শেষমেশ বিজনেস ক্লাসের বয়ান। আপামর জনসাধারণের কথা তাদের বয়ানে আসে না, সেই অর্থে তারাও পুরোপুরি গণমাধ্যম নয়।” 

 

 

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় করপোরেট সংবাদমাধ্যমে নারীকে পণ্য হিসেবে বিবেচনা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিনোদন বা ভোগ্য অনুষঙ্গ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা নতুন নয়। বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমেই ‘লিঙ্গীয় সমতা ও ভিন্নতা’র বিষয়ে সংবেদনশীলতা দেখা যায় না, উল্টো অপমানজনক শব্দ ও তথ্য জুড়ে তৈরি হয় প্রতিবেদন। নারী শিল্পী ও অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে রীতিমত অনুসন্ধান করেন বিনোদন প্রতিবেদক। সংবাদের নামে এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরিতে পিছিয়ে নেই সংবাদমাধ্যম জগতে অন্যতম জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম। প্রথম আলো পত্রিকার ‘বিনোদন’ পাতা কৈশোরে যারা পড়েছেন তা স্মরণ করে চলমান অনলাইন মাধ্যমকে মেলাতে পারছেন না পাঠকরা। অর্থাৎ ছাপা পত্রিকাটির বিনোদন পাতায় এসব না থাকলেও একই প্রতিষ্ঠান, একই বার্তাকক্ষের হয়রানিমূলক চর্চা দেখা যাচ্ছে অনলাইনে।

 

 

পর্যবেক্ষণ বলছে, দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও একই পরিস্থিতি। বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর সম্প্রচারে দেখা না গেলেও এরাও অনলাইন, ‘ফেইসবুক’ ও ‘ইউটিউব’ কনটেন্টের মাধ্যমে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে।সংবাদের মাধ্যমে নারীর চরিত্র হননের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইন্টারনেটভিত্তিক এই সম্প্রচারমাধ্যম। নিপীড়নের শিকার শিশু-কিশোরদের সংবাদ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।  

 

 

সংবাদের মাধ্যমে নারীর চরিত্র হনন, হয়রানিমূলক এবং বৈষম্যমূলক আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ বলে জানিয়েছেন সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষক ও নারীবাদীরা। ‘ধর্ষণের’ ঘটনা তুলে ধরার প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যম বিশ্লেষক এবং নারীবাদীদের মত, ‘ধর্ষণ’-এর ঘটনা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি ‘ধর্ষণের উপায়’ প্রচার করা অবশ্যই অপ্রয়োজনীয় এবং উদ্দেশ্যমূলক। এই প্রক্রিয়ায় খবর প্রকাশের মাধ্যমে ‘ধর্ষক তৈরি হওয়া’ এবং ‘ধর্ষণের শিকার হওয়ার ভয়’কে ঘিরে ‘ধর্ষকামী সংস্কৃতি’ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা এড়ানো যায় না বলে মনে করেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা। 

 

ধর্ষণের ঘটনার খবর দিতে হবে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে। কী উপায়ে ধর্ষণ হচ্ছে এটি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার মানে, যারা পারপেট্রেটর (অপরাধী) আছে তাদের সেই চাহিদা ও অপরাধকে আরও উস্কে দেয়া। এটা তো ভয়াবহ! এসব চাহিদাকে তুষ্ট করা তো সংবাদমাধ্যমের কাজ না। বিশেষ করে অপরাধ বিটের সাংবাদিকদের অনেকেই মামলার এফআইআর হুবহু তুলে দেন, যা দরকার নেই। এসবই সাংবাদিকতার এথিকস (নীতি-নৈতিকতা) বিরোধী। এসব ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পাদকীয় নীতিমালা কোথায়? এই প্রশ্ন বারবার করতে হবে। আর নয় জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, এরকম জায়গায় যাওয়া উচিৎ।

 

তিনি বলেন, “ধর্ষণের ঘটনার খবর দিতে হবে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে। কী উপায়ে ধর্ষণ হচ্ছে এটি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার মানে, যারা পারপেট্রেটর (অপরাধী) আছে তাদের সেই চাহিদা ও অপরাধকে আরও উস্কে দেয়া। এটা তো ভয়াবহ! এসব চাহিদাকে তুষ্ট করা তো সংবাদমাধ্যমের কাজ না। বিশেষ করে অপরাধ বিটের সাংবাদিকদের অনেকেই মামলার এফআইআর হুবহু তুলে দেন, যা দরকার নেই। এসবই সাংবাদিকতার এথিকস (নীতি-নৈতিকতা) বিরোধী। এসব ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পাদকীয় নীতিমালা কোথায়? এই প্রশ্ন বারবার করতে হবে। আর নয় জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে, এরকম জায়গায় যাওয়া উচিৎ।” 

 

ধর্ষণের ঘটনার প্রচার এবং নারী শিল্পীদের ব্যক্তিগত জীবন ঘিরে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর হয়রানিমূলক আচরণ। ছবি: দৃকনিউজ    

 

ড. গীতি আরা বলেন, “জেন্ডার ইনসেন্সিটিভ (লিঙ্গীয় বৈষম্যমূলক/নারীবিদ্বেষী) কোনো সংবাদ যখন চোখে পড়ে, একই সাথে দেখছি যে সেটা শুধু জেন্ডার ইনসেন্সিটিভই নয়, একটা বাজে রিপোর্ট। এ রকম আমি প্রচুর দেখি– সেটা রিপোর্ট হিসেবেই বাজে। শুধু রিপোর্টার না, এখানে তো এডিটররাও থাকেন। যদিও বেশিরভাগ সময় সংবাদ দেখে মনে হবে না যে এরা আছে, যাদেরকে আমরা গেইটকিপার বলি।” 

 

 

সাংবাদিক নাজমুল আশরাফ এক্ষেত্রে বলেন, “মানুষের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নাই, ভদ্রতার কোনও বালাই নাই, দায়িত্বজ্ঞান ও নীতি-নৈতিকতা তো একেবারে নাই। এটা এখন অনলাইনের বাস্তবতা (কাটতি, বাড়তি শেয়ার, লাইক)। রগরগে সংবাদ পরিবেশন করে অন্যরা এগিয়ে যাচ্ছে বলে আমিও কি সেই পথে যাব, এটা সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়।” প্রথম আলো পত্রিকার বিষয়ে বলেন, “এই পত্রিকায় যারা কাজ করে তাদের তুলনায় অনলাইন বিভাগ অনেক দুর্বল। আমি যাচ্ছেতাই লোক নিয়োগ দিলাম, দিনের পর দিন তারা এসব কাজ করছে। আমার তো তদারকি করার দায়িত্ব আছে। দায় তো অবশ্যই কর্তৃপক্ষের।”  

 

 

“বাংলাদেশে সাংবাদিকতার মান অনেক নেমে গেছে, সেটা পত্রিকা বা টেলিভিশন উভয় ক্ষেত্রেই। কারণ যোগ্য, দক্ষ, নীতিবান সাংবাদিকদের সংখ্যা কমে গেছে। আশির দশকের শেষে আমাদের যে অগ্রজ ছিল তাদের মধ্যে অন্তত ১০ জন ছিলেন ভালো সাংবাদিক, ভালো মানুষ। যাদের অনুসরণ করা যায়, শ্রদ্ধা করা যায়। আমরা বলতাম তাদের মত হতে চাই। এর পরের যে প্রজন্ম আসছে এদেরকে প্রশ্ন করলে ৫ জন কিংবদন্তি সাংবাদিকের নামই বলতে পারবে না! আমরা অনেক পেছনে পড়ে গেছি,” বলে জানান এই সাংবাদিক। 

 

 

ড. গীতি আরা নাসরীনের আক্ষেপ, “এত বড় একটা সংবাদশিল্প তৈরি হয়ে গেছে, অথচ আমরা দক্ষতা তৈরির বিষয়ে কোনো গুরুত্বই দেই নাই। অদক্ষদের দিয়ে পুরো একটা ইন্ডাস্ট্রি চলছে। লিখতে জানলেই সাংবাদিকতার কাজ ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। বলতে জানলেই হাতে মাইক ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে।” এছাড়া সংবাদমাধ্যম যেখানে সকল ক্ষেত্রের অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার রাখে, সেখানে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া বাংলাদেশে অন্যতম অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বলেও মনে করেন এই অধ্যাপক।  

 

 

সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ক্ষমতার লেজুড়বৃত্তি 

 

সনাতন ধর্মাবলম্বীর অন্যতম উৎসব ‘শারদীয় দুর্গোৎসব’-এ সবশেষ হামলার ঘটনা ঘটে ২০২১ সালের অক্টোবরে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এমন সহিংসতার খবর বেশ কিছুদিন সংবাদমাধ্যমে আসেনি। ড. গীতি আরা এই সংকটটি বিশ্লেষণ করেন এভাবে, “সংবাদমাধ্যম তো আসলে সরকারের দোসর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে সচেতনভাবে মনে করেছেন, এই খবর তাদের ছাপানো উচিৎ না। ফলে যেটা হয়েছে যে সামাজিক মাধ্যমে অনেক বেশি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। এরকম সংকটে কী দায়িত্ব, ভূমিকা হওয়া উচিৎ সেই সচেতনতা সংবাদমাধ্যমের নীতি-নির্ধারকদের মাঝে নাই।”

 

জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিটিভিসহ সকল বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নিয়মিত সরাসরি সম্প্রচার হয়। তথ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “প্রধানমন্ত্রীর ১০টি বিশেষ উদ্যোগ ‘ব্র্যান্ডিং’-এর উদ্দেশ্যে বিটিভিতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে। বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোতেও প্রচারণা চালানো হয়েছে।” 

 

সরকারি প্রচারণার এই চিত্র উঠে এসেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্যে। তিনি বলেন, “টিভি খুললেই মনে হয় মিডিয়া তো সরকারের কাছে বিক্রি। যে ক্ষমতায় আছে তার কথাই বলে। জনগণের জন্য তো সরকার, এইজন্যেই জনগণ ভোট দেয়। কিন্তু এরা জনগণের কথা তো বলে না।”  

 

“দেশে গণমাধ্যম আর ‘ওয়াচডগ’ (নজরদারি) তো নয়ই, ‘ল্যাপডগ’ (পোষা) হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর ‘প্রেস কনফারেন্স’ দেখলে মনে হয় এগুলো ‘প্রেইজ কনফারেন্স’,”এমন প্রতিক্রিয়া অধ্যাপক ও গবেষক ড. গীতি আরার।

 

সংবাদমাধ্যম থেকে সাধারণ মানুষের যে বিচ্ছিন্নতা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা যে ঘটনাগুলো রেখেছে এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একেকটি সংবাদ সম্মেলন। তবে এ দায় প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের নয়। যে সম্পাদক ও সাংবাদিকরা সেখানে যান এবং তারা যেসব প্রশ্ন করেন, স্তুতি করেন, এই দায় তাদের।

 

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ক্ষেত্রে ‘প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন’ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা। তিনি বলেন, “সংবাদমাধ্যম থেকে সাধারণ মানুষের যে বিচ্ছিন্নতা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা যে ঘটনাগুলো রেখেছে এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একেকটি সংবাদ সম্মেলন। তবে এ দায় প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের নয়। যে সম্পাদক ও সাংবাদিকরা সেখানে যান এবং তারা যেসব প্রশ্ন করেন, স্তুতি (তোষামোদ) করেন, এই দায় তাদের।”

 

 

গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, এই শাসনামলে সংবাদমাধ্যমের গোটা দৃশ্যপটই বদলে গেছে। বাজারের ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা ও অনলাইন রয়েছে। ফলে  বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ব্যবসায়ী আর রাজনীতিকদের প্রচারমাধ্যম হয়ে উঠেছে এবং অনেক সংবাদকর্মীই আসলে প্রচারকর্মী বলে মত দিয়েছেন অধ্যাপক ও গবেষক ড. ফাহমিদুল হক। 

 

 

“সংবাদ তো দূরের কথা, প্রায়ই মনে হয় কোনো ব্যক্তির জনসংযোগের কাজ করছি। শুধু আমরাই নয়, প্রোগ্রামে গিয়ে আরও ১০টা চ্যানেলকেও নিয়মিত দেখি। এসব থেকে দূরে থাকার জন্য যখন একটি বিশেষ প্রতিবেদন বা ভালো কিছু করতে চাই, তাও করতে দেয়া হয় না। মাঝে মাঝে ক্যামেরা ও বুম (মাইক্রোফোন) নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহকর্মীদেরও চাঁদাবাজির খবর পাই। সরাসরি না বললেও নানা প্রক্রিয়ায় এসব কর্মকাণ্ড যুক্ত হতে অফিস উৎসাহিত করে,” বলেন বেসরকারি টেলিভিশনে প্রায় ৫ বছর ধরে কর্মরত একজন প্রতিবেদক। 

 

 

তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্যমতে, করোনা পরিস্থিতিতে কয়েক দফায় বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রায় হাজেরখানেক সংবাদকর্মীকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল। চিকিৎসা ও পারিবারিক অসচ্ছলতা বিবেচনায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৩শ সংবাদকর্মীর জন্য ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট। এসব আবেদনে সুপারিশ করেছেন প্রেস ক্লাব সভাপতি, ডিইউজে একাংশ বা আওয়ামী পন্থী সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। 

 


  

সংবাদ সাময়িকী সাপ্তাহিক- এর সাবেক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা বলেন, “সামরিক আমলে সংবাদমাধ্যমের যে নেতৃবৃন্দ তাদের একটি অংশের সাথে সামরিক সরকারের একটা যোগাযোগ ছিল, সুবিধা পাওয়ার বিষয়ও ছিল আর এ সবই ছিল পর্দার আড়ালে। এই সুযোগ-সুবিধার বাইরে একটি বড় প্রতিবাদী অংশ ছিল, তাদের হাতে নেতৃত্ব থাকায় সংবাদমাধ্যম একচেটিয়াভাবে সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়নি। গণমাধ্যমের এক ধরনের গণমুখী অবস্থানের কারণে সামরিক শাসকরাও খুব একটা স্বস্তিতে থাকত না। এখন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা হলে বাড়ি-গাড়ি হয়, প্লট হয়। তার নিজের অবস্থানের পরিবর্তন হয়। ফলে সাধারণ মানুষ সাংবাদিকদের দালাল বলে যে বিষোদগার করে তা আগে কখনো করত না।”