মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯ Tuesday 4th October 2022

মঙ্গলবার ১৯শে আশ্বিন ১৪২৯

Tuesday 4th October 2022

আন্তর্জাতিক মধ্যপ্রাচ্য

সৈন্যরাই শিরীনকে খুন করতে পারে এমন সম্ভাবনা স্বীকার করেছে ইসরায়েল

২০২২-০৯-০৬

আল জাজিরার প্রতিবেদন

ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলিতে শিরিন আবু আকলেহ্ নিহত হবার সম্ভাবনা স্বীকার করে প্রতিবেদন প্রকাশ

 

 

শিরিন আবু আকলেহকে ১১ মে জেনিনে ইসরায়েলি সেনারা গুলি করে হত্যা করা হয়। ছবি: এপি

 

 

রামাল্লাহ অধ্যুষিত পশ্চিম তীর - আল জাজিরার নিহত সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ 'দুর্ঘটনাক্রমে' ইসরায়েলি সৈন্যের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন- এমনটা ঘটার 'ব্যাপক সম্ভাবনা' রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল । কিন্তু সেই সাথে আরো জানিয়েছে যে, দেশটি এই অপরাধের তদন্ত করবে না।

 

ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ সোমবার বিকালে এই হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত তাঁদের তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। শিরিনের নিহত হবার জায়গাটিতে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী, আল জাজিরা এবং জাতিসংঘের অসংখ্য তদন্ত, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের বরাতে তখনই জানা গিয়েছিল যে আবু আকলেহকে একজন ইসরায়েলি সৈন্যই গুলি করেছিল।

 

 

ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ সোমবার বিকালে এই হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত তাঁদের তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। শিরিনের নিহত হবার জায়গাটিতে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী, আল জাজিরা এবং জাতিসংঘের অসংখ্য তদন্ত, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের বরাতে তখনই জানা গিয়েছিল যে আবু আকলেহকে একজন ইসরায়েলি সৈন্যই গুলি করেছিল।

 

 

ইসরায়েলি তদন্ত অনুযায়ী, সৈন্যরা সেই সময় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের গুলির মুখে পড়ে, যদিও ঘটনার ভিডিও ফুটেজ থেকে গোলাগুলির দাবির কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

 

ইসরায়েলি এই প্রতিবেদনে এরপরও দাবি করা হয়েছে, “আবু আকলেহকে আঘাত করা গুলিটি ঠিক কোন জায়গা থেকে এসেছে তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।” প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, এখানে এই “সম্ভাবনা” থেকেই যায় যে “তিনি ফিলিস্তিনের বন্দুকধারীদের ছোঁড়া গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।”

 

অন্যদিকে ফলাফল প্রকাশের আগে এক আলোচনায় ইসরায়েলের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেন যে তাঁরা ওই অভিযুক্ত সৈন্যের সাথে দেখা করেছেন এবং “যদি সে এটা করে থাকে, তাহলে ভুলক্রমে করেছে”।

 

প্রতিবেদনটি আরো উল্লেখ করে, “ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত তদন্তের পরে, এবং প্রাপ্ত সকল ফলাফলের ভিত্তিতে, সামরিক বাহিনীর আইনবিষয়ক কর্মকর্তা বলেন যে ঘটনার সামগ্রিক পরিস্থিতিতে, এখানে অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে সামরিক পুলিশের তদন্ত শুরু করার প্রয়োজন নেই।”




ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বারবার এটিও বলেন যে তাঁরা “তাঁদের সৈন্যদের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত” এবং “তাঁরা নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করেছেন”।

 

 

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বারবার এটিও বলেন যে তাঁরা “তাঁদের সৈন্যদের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত গর্বিত” এবং “তাঁরা নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করেছেন”

 

 

৫১ বছর বয়েসি ফিলিস্তিনি আমেরিকান সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহ আল জাজিরার সাংবাদিক ছিলেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় গত ১১ মে উত্তরাঞ্চল অধ্যুষিত পশ্চিম তীরের জেনিনে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আক্রমণের খবর সংগ্রহের সময় ইসরায়েলি সৈন্যের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন।



জাতিসংঘ, দ্য ফিলিস্তিন অথরিটি (পিএ) সহ একাধিক বিস্তারিত তদন্ত, এবং সিএনএন, দ্য এসোসিয়েট প্রেস সংবাদ সংস্থা সহ বেশ কিছু প্রচারমাধ্যম অনুযায়ী, আবু আকলেহ নিশ্চিতভাবে একজন ইসরায়েলি সৈন্যের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন এবং তিনি যখন নিহত হন, সেখানে কোনো ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ছিলেন না।



তাঁর সাথে থাকা অন্যান্য সাংবাদিকরাও এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। তাঁরাও জানান যে, কোনো ফিলিস্তিনি সৈন্যের উপস্থিতি সেখানে ছিলো না।



ফিলিস্তিনি প্রত্যক্ষদর্শীরা আল জাজিরার দ্য টেইক পোডকাস্টকে বলেন, ইসরায়েলি তদন্তের অংশ হিসাবে কখনোই তাঁদের সাথে যোগাযোগ করা হয়নি।

 

 

স্বজনদের প্রতিক্রিয়া: ইসরায়েল ‘সত্য গোপন’ করতে চেয়েছিলো

সোমবার এক বিবৃতিতে আবু আকলেহ’র পরিবার বলেন যে ইসরায়েল “সত্য গোপন করে শিরিন আবু আকলেহর মৃত্যুর দায়ভার অস্বীকার করার” চেষ্টা করেছে।



পরিবারের সদস্যদের বিবৃতি অনুযায়ী, “যথারীতি ইসরায়েল শিরিন হত্যার দায় অস্বীকার করেছে। আমাদের পরিবার এই ফলাফলে আসলে অবাক হয়নি, যেহেতু যে কারো কাছেই এটি পরিষ্কার যে ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধীরা নিজেদের অপরাধের তদন্ত করতে পারবে না”।

 

 

“যথারীতি ইসরায়েল শিরিন হত্যার দায় অস্বীকার করেছে। আমাদের পরিবার এই ফলাফলে আসলে অবাক হয়নি, যেহেতু যে কারো কাছেই এটি পরিষ্কার যে ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধীরা নিজেদের অপরাধের তদন্ত করতে পারবে না”।



“আমরা আমাদের দাবি অব্যাহত রাখবো যেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তাঁদের দেয়া প্রতিশ্রুতি এবং দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে এর তদন্ত করে।”


 

ইসরায়েল দখলদারী বাহিনী (আইওএফ) এর আবু আকলেহকে হত্যার দায় এড়ানোর চেষ্টার নিন্দা জানিয়েছে আল জাজিরা।



কাতার ভিত্তিক টিভি নেটওয়ার্কটি সোমবার এক বিবৃতিতে বলে যে, “আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক এই তদন্তের ফলাফলের তীব্র নিন্দা করে। সেই সাথে এই বিষয়টির ওপর জোর দেয় যে, এই বিভ্রান্তিকর ফলাফল আইওএফ কর্তৃক শিরিন হত্যার অপরাধের দায়ভার এড়ানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই না, যা এর মধ্যেই অসংখ্য নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক তদন্ত দ্বারা প্রমাণিত”।



“এই নেটওয়ার্কটি একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক দল দ্বারা শিরিন আবু আকলেহ এর হত্যাকান্ডের বিচার দাবি করে, যা শিরিন, তাঁর পরিবার এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের জন্য সুবিচার বয়ে আনবে”।



আবু আকলেহ ছিলেন আল জাজিরা আরব টিভির বহু পুরানো একজন সংবাদদাতা এবং আরব বিশ্বে খুবই পরিচিত একটি নাম। তিনি এই নেটওয়ার্কের সাথে ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলের আক্রমণ নিয়ে কাজ করেছেন।



তাঁর মৃত্যু বিশ্বব্যাপী ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং সব জায়গা থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি ওঠে। যা প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েল নিজের মতো করে তদন্ত করে।

 

শিরিন আবু আকলেহকে যখন হত্যা করা হয়, তিনি স্পষ্টত দৃশ্যমান একটি প্রেসের পোশাক এবং হেলমেট পরা ছিলেন, এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের সাথেই দাঁড়ানো ছিলেন। তাঁরাও প্রেস এর পোশাকেই ছিলেন। ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলিতে শিরিনের সাথে আল জাজিরার আরেকজন সাংবাদিক আলি আল-সামুদিও গুলিবিদ্ধ হন, কিন্তু পরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

 

 

শিরিন আবু আকলেহকে যখন হত্যা করা হয়, তিনি স্পষ্টত দৃশ্যমান একটি প্রেসের পোশাক এবং হেলমেট পরা ছিলেন, এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের সাথেই দাঁড়ানো ছিলেন। তাঁরাও প্রেস এর পোশাকেই ছিলেন। ইসরায়েলি সৈন্যদের গুলিতে শিরিনের সাথে আল জাজিরার আরেকজন সাংবাদিক আলি আল-সামুদিও গুলিবিদ্ধ হন, কিন্তু পরে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

 

 

কেন এই হামলা?


আল জাজিরা এবং আবু আকলেহ এর পরিবার তাঁর হত্যার তদন্তের দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এর কাছে হস্তান্তর করেছে।



২০০৩ থেকে ২০১২ পর্যন্ত আইসিসি এর আইনজীবীর দায়িত্বে থাকা লুইস মরেনো ওকাম্পো ইসরায়েলের তদন্ত নিয়ে আল জাজিরাকে বলেন যে, “ইসরায়েলের সৈন্যের কাছ থেকে গুলিটি আসতে পারে, এই ব্যাপারটি বোঝা এবং স্বীকার করা ইসরায়েলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ”।



ওকাম্পো আরো বলেন, “এখন পরবর্তী ধাপ হলো এটি বোঝা যে ইসরায়েলি সৈন্যরা কেন গুলি চালালো। এমনকি, ‘কেউই তাঁকে হত্যা করতে চায়নি’ - ইসরায়েলের এই দাবি যদি মানাও হয়, কেউ কেন তাঁকে গুলি করলো? এটি বোঝার জন্য সে সময়ে সৈন্যরা কী বলছিলেন তা ইসরায়েলকে ব্যাখ্যা করতে হবে”।



“সেই সাথে আমি ফরেনসিক আর্কিটেকচারের বিষয়েও সচেতন, লন্ডনের একটি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান, যারা গুলিটির গতিপথ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করছে। এই জায়গাটিকেও আমাদের প্রশ্ন করতে থাকতে হবে।”



আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক এর আগে এক বিবৃতিতে এই ঘটনাকে “ভয়ংকর হত্যা” হিসেবে উল্লেখ করে বলে যে আবু আকলেহকে “ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে”।



নেটওয়ার্কটি বলে, “শিরিন হত্যায় আল জাজিরা ইসরায়েলি সরকার এবং দখলদার বাহিনীকে দায়ী করে। এটি একইসাথে শিরিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য তৈরি করা এবং হত্যা করায় ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীকে দায়ী করতে আন্তর্জাতিক মহলকে আহবান জানায়।

 

 

শিরিন আবু আকলেহ ছিলেন আল জাজিরা আরব টিভির বহু পুরানো একজন সংবাদদাতা এবং আরব বিশ্বে খুবই পরিচিত একটি নাম। ছবি: এএফপি

 

 

যুক্তরাষ্ট্র প্রথমদিকে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করে, কিন্তু পরবর্তীতে বলে যে, ইসরায়েলের একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত তদন্ত করার মতো তথ্য ও সামর্থ্য আছে।



জুলাই এর ৪ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের ফলাফলের ভিত্তিতে এক বিবৃতি প্রকাশ করে বলে যে, আবু আকলেহ হয়তো ইসরায়েলের দিক থেকে আসা “অনিচ্ছাকৃত” গুলিবর্ষণে নিহত হন। এই বিবৃতি অনুযায়ী যেই গুলিতে তিনি বিদ্ধ হন, তার উৎস অজানাই থেকে যায়। এই বিষয়টিই তাঁর পরিবার এবং অন্যান্যদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে।



ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সিন্ডিকেট (পিজেএস) অনুযায়ী ২০০০ সাল থেকে পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি সৈন্যদের দ্বারা অন্তত ৪৬ জন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।

 



সূত্র: আল জাজিরা


ভাষান্তরঃ জয়ন্তী রায়না

 

আরো পড়ুন

ইসরায়েল কেন আল জাজিরাকে স্তব্ধ করতে চায়?