সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯ Monday 4th July 2022

সোমবার ২০শে আষাঢ় ১৪২৯

Monday 4th July 2022

আন্তর্জাতিক দক্ষিণ এশিয়া

শ্রীলঙ্কা: অন্ধ জাতীয়তাবাদ, দুর্নীতি আর পরিবারতন্ত্রের বলি

২০২২-০৫-২১

ইরফানুর রহমান রাফিন

সত্যিই কি চীনা ঋণের কারণে শ্রীলঙ্কা আজ বিপর্যস্ত, নাকি চীনা ঋণ অনেকগুলো কারণের মাঝে একটি মাত্র?  জাতীয়তাবাদ, তামিল ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, এবং সিংহলী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে হাতিয়ার ব্যবহার করে যেভাবে বিরোধীদের দমন করা হয়েছে, তারই ডামাডোলে দেশটি একদিকে পরিণত হয়েছিল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত জমিদারিতে, আরেকদিকে দুর্নীতি আর অপচয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল লাগামহীন; আর তারই পরিণতি ভোগ করছে শ্রীলঙ্কা।

 

২০২১ সালে হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দরে খুব কম জাহাজই ভিড়ছে। ছবি: দ্য মেরিটাইম স্ট্যান্ডার্ড

 

চীনা ঋণের অতিকথা ও ঋণসংকটের প্রকৃত বাস্তবতা

শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ প্রদেশের হাম্বানটোটা জেলার প্রধান শহর হাম্বানটোটা। এই হাম্বানটোটার বন্দরের কারণে হাম্বানটোটা শব্দটি সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বহু উচ্চারিত শব্দে পরিণত হয়েছে। হাম্বানটোটা নিয়ে সারা দুনিয়ার গণমাধ্যমে প্রচলিত কাহিনীটি এমন:

 

হাম্বানটোটা বন্দরের নির্মাণকাজের খরচ নির্বাহের জন্য বেইজিং শ্রীলঙ্কাকে চীনা ব্যাংকগুলোর কাজ থেকে ঋণ নিতে প্রলুদ্ধ করেছিল। ঋণের সাথে দেয়া কঠোর শর্ত আর বন্দর থেকে আসা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল রাজস্বের কারণে শ্রীলঙ্কা ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয়। তখন চীন বন্দরটাকে চীনের কাছে বন্ধক রাখার দাবি করে বসে, যে পর্যায়ে শ্রীলঙ্কা হাম্বানটোটা বন্দরকে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে সোপর্দ করতে বাধ্য হয়। আরও বলা হয় যে এভাবে চীন সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাম্বানটোটা বন্দরটি নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।

 

বাস্তবতা কি তাই?

বরং একটা চীনের পক্ষ-বিপক্ষ মুক্ত একটা অবস্থান থেকে দেখলে বোঝা যাবে পুরো ঘটনাটাই অন্যরকম। সেটা হলো ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ নামে হাল আমলে দুনিয়া জুড়ে একদিকে ভয়াবহ দুর্নীতি আর অন্যদিকে উগ্র জাতীয়তাবাদের যে রাজত্ব চলছে, শ্রীলঙ্কা তারই একটি উদাহরণ মাত্র। আর, উন্নয়ন প্রকল্প নামের এই বিপুল অপচয়মূলক, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় এবং মূলত দুর্নীতি প্রণোদিত আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির বাজারে চীন নবীন খেলোয়াড় মাত্র।

 

হাম্বানটোটার উদাহরণেই তা আরও পরিস্কার হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ব্যাকরণের কারণেই অধিকাংশ পত্রিকা কখনোই উল্লেখ করে না যে হাম্বানটোটা আদতে ছিল একটি কানাডীয় প্রকল্প, তারপর আরও বহু পশ্চিমা দেশ এই প্রকল্পটি করতে চাইছিল। বন্দরটি অলাভজনক হয়েছে, কারণ আদতে এর যে সম্ভাব্যতা যাচাই, সেখানেই এর সঙ্কটটি নিহিত আছে। এই ধরনের অজস্র বন্দর, নদী শাসন, বিমানবন্দর এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত ‘উন্নয়ন’ দেশে দেশে চলছে, এমনকি বাণিজ্যিক ও কারিগরি ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’ ও একটি লাভজনক ব্যবসা ও দুর্নীতির খাত। এই প্রকল্পগুলোর একটা অংশ পরবর্তীতে পরিত্যক্ত হয়েছে কিংবা তা থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি।  দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও স্বার্থকে প্রাধান্য না দেয়া প্রকল্পগুলোতে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের চাইতে লগ্নি পুঁজির স্বার্থই যে প্রাধান্য পাবে, সেটাই স্বাভাবিক।

 

হাম্বানটোটায় ফেরা যাক।  শ্রীলঙ্কার বেলাতে বনেদী ও কায়েমী কলোম্বোর বনিকদের সাথে পশ্চাৎপদ এলাকাগুলোর একটা রেষারেষিও এই বন্দরের প্রকল্পকে রাজনীতিতে জনপ্রিয় রেখেছে।  দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত দেবোরাহ ব্রতিগাম ও মেগ রিথমিরের একটি নিবন্ধ পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে শ্রীলঙ্কার সরকার আসলে চীন নয়, কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ডেভলাপমেন্ট এজেন্সি কানাডার শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল ও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে একটা সম্ভাব্যতা পরীক্ষা চালানোর দায়িত্ব দেয়। ২০০৩ সালে এই সম্ভাব্যতা পরীক্ষা শেষ হয়, যেটাতে দেখানো হয়, হাম্বানটোটা এলাকায় একটি বন্দর নির্মাণ খুবই লাভজনক হবে।  তারা শ্রীলঙ্কা বন্দর কর্তৃপক্ষ (এসএলপিএ) আর একটি ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের’ (পড়ুন: বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান) মধ্যে যৌথ শরিকানার ভিত্তিতে এই বন্দর নির্মাণের সুপারিশ করে। দ্য আটলান্টিকের মন্তব্য অনুযায়ী এসময় কানাডীয়দের সব চাইতে বড় ভয় ছিল ইউরোপীয় প্রতিযোগীরা কাজটা বাগিয়ে নেবে!

 

শ্রীলঙ্কার তৎকালীন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কানাডা শেষ পর্যন্ত বন্দর নির্মাণের প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারেনি। ২০০৪ সালের সুনামির কারণে শ্রীলঙ্কার উপকূলীয় অঞ্চল আর স্থানীয় অর্থনীতির বিপুল ক্ষতি সাধিত হয়েছিল।  এর ফলে হাম্বানটোটায় একটি বন্দর নির্মাণের চিন্তাটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, যিনি হাম্বানটোটায় বেড়ে উঠেছেন, তিনি অঞ্চলটিতে বড় জাহাজ নিয়ে আসার জনপ্রিয় প্রতিশ্রুতি দেন। ২০০৬ সালে ড্যানিশ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান রাম্বোলের আরেকটি সম্ভাব্যতা পরীক্ষা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, হাম্বানটোটায় বন্দর নির্মাণ যৌক্তিক। সেই রাম্বোল প্রতিবেদন হাতে নিয়ে শ্রীলঙ্কা সরকার বন্দর নির্মাণে আর্থিক সহায়তার জন্য ভারতের কাছে ধর্না দেয়। কিন্তু উভয়েই শ্রীলঙ্কার এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ভারতের দিক থেকে কারণ ছিল কলোম্বো বন্দরের বাণিজ্যে তার ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ। কলোম্বো বন্দরেরই লাভজনক সম্প্রসারণ সম্ভব বলেই তারা মনে করেছিল, এবং সেই সম্প্রসারণ ঘটেছেও।

 

এসময় চীনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না হারবার গ্রুপ হাম্বানটোটা বন্দর নির্মাণের চুক্তির জন্য আবেদন করে, এবং চীনের এক্সিমব্যাংক এর তহবিল যোগাতে রাজি হয়; আখেরে চায়না হারবার গ্রুপকে এই দায়িত্ব দেয় শ্রীলঙ্কা।  চীন শ্রীলঙ্কাকে ১৫ বছরের জন্য ৩০৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়, ঋণ শোধের জন্য আরো চার বছর অতিরিক্ত সময় দিয়ে। সুদের হার নির্দিষ্ট করা হয় ৬.৩ শতাংশ।  বন্দর থেকে আয় বিশেষ না হলেও মাহিন্দা রাজাপাক্ষে ২০১২ সালেই দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরুর তাগিদ দেন এবং নিজের নামে বন্দরটির নামকরণ করেন। চীনের এক্সিমব্যাংকের কাছ থেকে আরো ৭৫৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ নেয় শ্রীলঙ্কা।

 

২০১৪ সালের মধ্যে হাম্বানটোটা লোকসান করতে শুরু করে। খুব কম জাহাজই এখানে ভিড়ছে। কলোম্বো বন্দর সম্প্রসারিত হয় এই সময়েই, এবং সেটি এই অঞ্চলের এখনও ব্যস্ততম বন্দর। ২০১৮ সালে ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয় হাম্বানটোটা চিনের শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে।

 

অবস্থা বেগতিক দেখে শ্রীলঙ্কা বন্দর কর্তৃপক্ষ (এসএলপিএ) চায়না হারবার গ্রুপ আর চায়না মার্চেন্টস গ্রুপের সাথে একটা চুক্তি সই করে, যেখানে বলা হয় উক্ত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ৩৫ বছর মেয়াদে নতুন বন্দরটি তৈরি করবে ও পরিচালনা করবে। ২০১৭ সালে হাম্বানটোটা বন্দরের বন্দরের ৭০ ভাগ অংশ ১.১২ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে চায়না মার্চেন্টসের কাছে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়। কিন্তু এই টাকাও এক্সিমব্যাংকের ঋণ শোধ করার কাজে ব্যবহার করা হয়নি, ব্যবহার করা হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণে।

 

 

শ্রীলঙ্কার কাছে কে কত টাকা পায়?

চীন শ্রীলঙ্কার কাছে টাকা পায় এটা সত্য। তবে চীনা ঋণই শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী এটা একটা অতিকথা। তথ্যউপাত্ত খুবই ভিন্ন এক বাস্তবতার সন্ধান দিচ্ছে

 

২০১৫ সালে মৈত্রীপালা সিরিসেনা যখন প্রেসিডেন্ট হন, তখনো চীনের চেয়ে জাপান, বিশ্বব্যাংক, আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছে শ্রীলঙ্কার ঋণ অনেক বেশি ছিল। ২০১৭ সালের শেষদিকে শ্রীলঙ্কার অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত থেকেও দেখা যাচ্ছে, দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণের ১০ শতাংশ চীনের কাছে। জাপান, বিশ্বব্যাংক, আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রত্যেকেই শ্রীলঙ্কার কাছে এর চেয়ে বেশি হারে টাকা পায়।

 

শ্রীলঙ্কার কাছে কে কত টাকা পায়? উৎস: দ্য ডিপ্লোমেট

 

শ্রীলঙ্কার ঋণের এই চিত্রটাই এখনো অব্যাহত আছে। শ্রীলঙ্কা সরকারের দেয়া ২০২১ সালের এপ্রিলের তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, ঋণ পরিস্থিতি কাছাকাছিই রয়েছে। নিচে সেটি দেখা যাচ্ছে:

 

DebtStock2019

শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণ। উৎস: শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক সম্পদ বিভাগের ওয়েবসাইট

 

ফলে চীনা ঋণ যে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের জন্য একমাত্র বা প্রধান নিয়ামক নয়, একটি অতিকথা মাত্র, তা তথ্যউপাত্তের ভিত্তিতে সহজেই বলা চলে। শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী উন্নয়নের নামে অতিমাত্রায় বিদেশ নির্ভরতা ও স্থানীয় শাসকদের দুর্নীতিপরায়ণতা। বিদেশিরা কথিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে লাভজনক হিসেবে দেখায়। আসলে যে এগুলো তেমন লাভজনক কিছু নয়, তা তো হাম্বানটোটার এই উদাহরণ থেকেই পরিষ্কার।  দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকরা তারপরও এইসব প্রকল্প নির্মাণে উৎসাহ দেখায়, কারণ এসব প্রকল্পে দুর্নীতির সুযোগ বেশি।  বিদেশিরা সেটারই সুযোগ নেয়।

 

সার কেলেঙ্কারি: দুর্নীতিপরায়ন সরকারের নতজানু নীতি

২০১৯ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় গোতাবায়া রাজাপাক্ষে ১০ বছরের মধ্যে দেশটিকে জৈব কৃষির দিকে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য এই জৈব কৃষির দিকে ঝুঁকে পড়াকে দায়ী করার একটা ঝোঁক পশ্চিমা গণমাধ্যমে দেখা যায়। কিন্তু সত্যিই জৈব সার কি আসলেই শ্রীলঙ্কা সংকটের জন্য দায়ী?

 

২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষে ঘোষণা করেন, শ্রীলঙ্কা হবে দুনিয়ার প্রথম রাষ্ট্র, যারা কৃষির জন্য পুরোপুরি জৈব সারের ওপর নির্ভর করবে।  গণমাধ্যম থেকে যতটুকু জানা গিয়েছে সেটা অনুযায়ী, রাজাপাক্ষের ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বিদেশ থেকে রাসায়নিক সার আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সমস্যা হল, শ্রীলঙ্কা যেহেতু নিজে জৈব সার উৎপাদন করে না, তাই দ্রুত জৈব সার আমদানি করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।  চীনের কিংদাও সিউইন বায়োটেক গ্রুপ শ্রীলঙ্কাকে ৯৯ হাজার টন জৈব সার সরবরাহ করার টেন্ডার লাভ করে।  কিন্তু বিষয়টা ভয়াবহ মোড় নেয়।  শ্রীলঙ্কার মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা সারের নমুনায় এরউইনিয়া নামে উদ্ভিদের জন্য একটি মারাত্মক ক্ষতিকর জীবাণু আবিষ্কার করেন যা শ্রীলঙ্কার মাটি ও জৈবনিরাপত্তার জন্য ক্ষতির কারণ হবে।  শ্রীলঙ্কার আদালত এই সার আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। ফলে জাহাজটিকে তখন কলোম্বো বন্দরে ভিড়তে দেয়া হয়নি।

 

এই পুরো ঘটনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বেশ উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।  শ্রীলঙ্কার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা শেষে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কিংদাও সিউইন সংকট নিরসনের জন্য একটা শর্ত দেয়। আর সেটা হল, মূল টেন্ডার চুক্তিতে যে দাম ধরা হয়েছে শ্রীলঙ্কাকে তার ৭০ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে।  ভয়াবহ যে বিষয়টি শ্রীলঙ্কার অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা উদ্‌ঘাটন করেন, সেটা হলো জাহাজটি  সিঙ্গাপুর থেকে নাম বদলে আবারও শ্রীলঙ্কাতেই চলে আসে।  চমকপ্রদ উদঘাটনের এই কাহিনীটি পড়া যাবে এখানে

 

শ্রীলঙ্কার জৈব কৃষি নিয়ে এই বিতর্ক প্রসঙ্গে ভারতের পরিবেশবাদী লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট বন্দনা শিবা দেশটির কৃষিনীতি বিষয়ক স্বাধীন গবেষক ইন্দ্র শেখর সিং-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পুরো প্রক্রিয়ার সমস্যাটি পরিষ্কার করে বলেছেন। শিবার মতে, শ্রীলঙ্কার মূল সমস্যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। উন্নয়ন প্রশ্নে কী ধরণের নীতি গৃহীত হবে সে বিষয়ে জনগণের মতামত দেয়ার কোনো সুযোগ না থাকা। জৈব কৃষির সাথে বর্তমান সংকটের সম্পর্ক নেই।  বন্দনা শিবা সেই সাক্ষাতকারে বলেন, জৈব কৃষি একটা ব্যবস্থা।  এর জন্য মাটিকে জাগিয়ে তোলার প্রয়োজন হয়।  জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় কমিউনিটিগুলোকে নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন হয়।  শ্রীলঙ্কা সরকারের উচিত ছিল এসব বিষয় মাথায় রাখা।  তাড়াহুড়ো না করা।  জৈব কৃষিতে রূপান্তরের কাজটা ধীর গতিতে করা।

 

কিন্তু শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে জৈব সারের ভূমিকা সামান্যই নেই। ভূমিকা আছে নীতি প্রণয়নে জনগণের অংশ নেয়ার ন্যূনতম কোন সুযোগ না থাকার। আর ভূমিকা আছে রাজাপাক্ষে সরকারের নতজানু নীতির, জাতীয়তাবাদের আওয়াজ দিয়ে বিদেশের কাছে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়ার রাজনীতির। শ্রীলঙ্কার রাজনীতি নিয়েই তাই আলাপটা হওয়া বেশি জরুরি।

 

উগ্রজাতীয়তাবাদী ব্যাধি: তামিল নিপীড়ন দিয়ে শুরু, মুসলমান বিদ্বেষে পরিণতি

১৯৮৩ সালে শ্রীলঙ্কা দেশটির তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল। ২০০৯ সালে বিদ্রোহীদের চূড়ান্ত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সেই যুদ্ধের অবসান ঘটে। পরের বছর শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন মাহিন্দা রাজাপাক্ষে। তামিলদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করার দায়ে অভিযুক্ত হলেও এ-সময় দেশটির সংখ্যাগুরু সিংহলীদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন রাজাপাক্ষে।  রাজাপক্ষের অন্যতম হাতিয়ারই ছিল তার তামিল দমনকারী ভাবমূর্তি।  নিজেকে তিনি উপস্থাপন করেন ‘টার্মিনেটর’ বা ‘সংহারকর্তা’ হিসেবে।

 

বেসামরিক কয়েকজন তামিলকে নিপীড়নের একটি মূহুর্ত, এদের অনেকেই নিহত হয়েছেন। ছবি: এপি

 

২০০৫ সালে প্রথমবারের মত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর রাজাপাক্ষে ক্ষমতা নিজ পরিবারের হাতে সংহত করতে শুরু করেছিলেন। পরের এক দশকে সেই ধারা অব্যাহত থাকে। যুদ্ধজয়ের আবেগ ফিকে হয়ে উঠতে শুরু করলে এবং নাগরিক অধিকার ও অর্থনীতির মত ইস্যুগুলো প্রধান হয়ে উঠতে থাকলে রাজাপাক্ষে পরিবারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। ২০১৫ সালে মাহিন্দা রাজাপাক্ষেকে নির্বাচনে পরাস্ত করে মৈত্রীপালা সিরিসেনা দেশটির প্রেসিডেন্ট হলে সাময়িকভাবে মনে হচ্ছিল শ্রীলঙ্কায় রাজাপাক্ষেদের ভাগ্য সূর্য বুঝি অস্ত গেল।

 

কিন্তু ২০১৯ সালে পাশার দান উল্টে যায়।  সেবছরের ইস্টার সানডেতে দেশটির বেশ কয়েকটি চার্চ ও হোটেলে একযোগে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালায় একটি মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠী। ২৭০ জন মানুষ এতে নিহত হন। এই হামলা রুখতে না পারার জন্য দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর গাফেলতি দায়ী হলেও দ্রুত হামলাটিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর উপলক্ষ্য বানানো হয়।

 

শ্রীলঙ্কায় মুসলমান বিদ্বেষী রাজনীতির সূচনা অবশ্য ২০১৯ সালে হয়নি, বড় আকারেই তা হয়েছে আরো এক দশক আগেই। ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পর বদু বালা সেনা (বিবিএস) নামের একটি বৌদ্ধ পরিচয়বাদী সংগঠন দেশটিতে একটি মুসলমান বিরোধী আন্দোলন শুরু করে। এরা মুসলমানদেরকে ‘চরমপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং দেশটির এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতাবাদের’ অভিযোগ আনে।

 

২০১৪, ২০১৭, ও ২০১৮ সালে বিবিএস মুসলমানদের ওপর হামলা চালায়। এছাড়াও প্রাত্যহিকভাবে মুসলমানদেরকে হয়রানি করা আর সামাজিক মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উগড়ে দিতে থাকে। ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে হামলা বিবিএসকে আরও বেশি করে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ এনে দেয়।

 

দেশটির উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক হামলা শুরু হয়ে যায়। শ্রীলঙ্কা সরকার বিবিএসের ভাষায় কথা বলতে থাকে। মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষরা ক্রমবর্ধমান হারে জেলজুলুমের শিকার হতে থাকেন।

 

২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার জননিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী শরৎ বীরশেখর জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বোরকা নিষিদ্ধ করা আর মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সমালোচনার মুখে পড়ে তিন দিন পর সরকার বীরশেখরের অবস্থান থেকে পিছু হটে। তবে সরকারের মন্ত্রীসভা পর্যায় থেকে এই ইঙ্গিত দেয়া হয় আপাতত পিছু হটলেও খোদ নীতিটিকেই বিসর্জন দেয়া হয়নি। এই মুসলমানবিদ্বেষী নীতির একটা রাজনৈতিক ব্যাকরণ আছে।

 

সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর ভেতর দিয়ে এবং তাদেরকে জাতীয় নিরাপত্তার শত্রু  হিসেবে চিত্রিত করে উগ্র জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেয়া রাজনৈতিকভাবে লাভজনক।  প্রায় তিন দশক ধরে তামিলদের বিরুদ্ধে এই কৌশল কাজে লাগিয়ে সিংহলী রাজনৈতিক অভিজাতরা নিজেদের ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করেছে। গৃহযুদ্ধের পরে যেহেতু পর্যুদস্ত তামিলদেরকে আর শত্রু  হিসেবে দেখিয়ে আর সুবিধা করার সুযোগ তেমন ছিল না, তাই তাদের নতুন শত্রুর দরকার ছিল।

 

এভাবে একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে শত্রু হিসেবে নির্মাণ করতে পারলে অর্থনীতি, নাগরিক অধিকার, নগর-গ্রাম বৈষম্য, প্রতিবেশ সুরক্ষার মত ইস্যুগুলো ধামাচাপা দেয়াটা সুবিধাজনক হয়। তাই মুসলমানদেরকে সিংহলী জাতীয়তাবাদ আর বৌদ্ধ পরিচয়বাদের নতুন শত্রু হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।

 

তামিল নিপীড়ন দিয়ে যেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা এভাবেই মুসলমান বিদ্বেষে শেষ হল!

 

 

বৌদ্ধ পরিচয়বাদের সাম্প্রতিক উত্থান

শ্রীলঙ্কার জনগণের প্রায় ৭৫ শতাংশ সিংহলী। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠই বৌদ্ধ।  তাই দেশটিতে সবসময় সিংহলী বৌদ্ধরা প্রভাবশালী ছিলেন।  তবে অতীতে বৌদ্ধধর্ম সিংহলী জাতীয়তাবাদের একটি উপাদান হিসেবে থাকলেও তা প্রধান উপাদান হয়ে উঠতে পারেনি।  কিন্তু সাম্প্রতিককালে এই বাস্তবতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। 

 

২০১৪ সালের জুন মাসে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ প্রদেশের উপকূলীয় শহর আলুতগামা আর বেরুওয়ালাতে মুসলমান সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এই সহিংসতা সংঘটিত করেছিল বদু বালা সেনা (বিবিএস)। এতে মুসলমানদের সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয় এবং ৩ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। 

 

এই বিবিএসের সাথে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাক্ষের ও তৎকালীন প্রতিরক্ষা সচিব (বর্তমান প্রেসিডেন্ট) গোতাবায়া রাজাপাক্ষের সুসম্পর্ক ছিল ও আছে। মুসলিমবিরোধী সহিংসতা সংঘটিত করার জন্য বিবিএসের সাধারণ সম্পাদক গালাগোদা আথথে নানাসারাকে কোনোরূপ বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি। পরবর্তীতে তিনি দেশটির প্রেসিডেনশিয়াল টাস্ক ফোর্সের সভাপতি হন।

 

বদু বালা সেনা (বিবিএস) গঠন করা হয়েছিল ২০১২ সালে। এই সংগঠন গঠনের উদ্দেশ্য ছিল ১) শ্রীলঙ্কান বৌদ্ধদেরকে সব ধরণের ‘বহিরাগত প্রভাব’ থেকে রক্ষা করা, এবং ২) বৌদ্ধ ‘জীবন ব্যবস্থাকে’ ধারণ করা। খুব দৃশ্যমানভাবেই বিবিএসের একটি এজেন্ডা রয়েছে, আর তা হল, সংখ্যাগুরুত্বের ধোঁয়া তুলে দেশটির বাকি সব সম্প্রদায়ের মানুষজনকে সিংহলী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আপত্যের অধীনস্ত করা।  

 

২০১৯ সালে গোতাবায়া রাজাপাক্ষে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হলে বিবিএস এটিকে তাদের বিজয় বলে উদযাপন করে। গালাগোদা আথথে নানাসারা বলেন, বিবিএস এমন একটি আদর্শ তৈরি করেছে যাতে মনে করা হয়, শ্রীলঙ্কার এমন একজন নেতা দরকার যে সংখ্যালঘুদের সামনে মাথা নোয়াবে না।  তিনি দাবি করেন, গোতাবায়া রাজাপাক্ষের বিজয় শুধু রাজাপাক্ষেরই বিজয় নয়, খোদ সেই আদর্শটার বিজয়। 

 

পরবর্তীতে নানাসারাকে প্রেসিডেনশিয়াল টাস্ক ফোর্সের সভাপতি বানানোর মধ্য দিয়ে গোতাবায়া প্রমাণ করে দেন তাদের সম্পর্কটা একপাক্ষিক নয়। সিংহলী বৌদ্ধ পরিচয়বাদের এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ একটি সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষভাবেই উৎকণ্ঠার বিষয়, আর সেই সম্প্রদায়টি হল দেশটির মুসলমান সম্প্রদায়।

 

শুধু ২০১৩ সালেই শ্রীলঙ্কার ২০টি মসজিদে আক্রমণ চালায় সিংহলী বৌদ্ধ পরিচয়বাদীরা।  মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, সেই বছর থেকেই  দেশটিতে মুসলমানরা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় নানাপ্রকার বৈষম্য, হয়রাণি, ও সহিংসতার শিকার হয়ে আসছে।  সবচে বড় আঘাতটি আসে ২০১৯ সালের মে মাসে ইস্টার সানডে আক্রমণের প্রেক্ষিতে, এই আক্রমণকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দেশটির উত্তর পশ্চিম প্রদেশে সিংহলী বৌদ্ধ পরিচয়বাদীরা হামলা চালিয়ে ১০০ জনেরও বেশি মুসলমানকে জখম করে, এবং মুসলমানদের মালিকানাধীন সম্পত্তি ধবংস করে।

 

শ্রীলঙ্কায় মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ছবি: লঙ্কা লিডার

 

এই ডামাডোলে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন গোতাবায়া রাজাপাক্ষে, যিনি অতীতে তার ভাই ও দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাক্ষের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

২০২২ সালের মার্চ নাগাদ রাজাপাক্ষে পরিবারের ৫ জন সদস্য শ্রীলঙ্কা সরকারের উচ্চ পদে আসীন হন।  শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্রটিকে রাজাপাক্ষে পরিবার ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে হতে শুরু করে।  কিন্তু ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক সংকটে পর্যুদস্ত শ্রীলঙ্কার জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে এবছরের মার্চে রাজাপাক্ষেদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।

 

বৌদ্ধ পরিচয়বাদীদের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কাতে রাজনীতির সামরিকায়নও বৃদ্ধি পেয়েছে।  অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তাদের লাভজনক ও আকর্ষণীয় পদে নিয়োগ করে সরকারের সাথে সামরিক বাহিনীর যোগসূত্র শক্তিশালী করা এর একটি উপায়। এর ফলে চাকরিরত কর্মকর্তারাও ভবিষ্যতের লোভনীয় পদের আশায় সরকারের প্রতি অনুগত থাকবেন, এমনটাও আশা করা হয়। ২০২০ সালে শ্রীলঙ্কা সরকার দেশটির নৌবাহিনীর সাবেক কমাণ্ডার জয়নাথ কলম্বাগে-কে পররাষ্ট্র সচিব পদে নিয়োগ দেয়। দ্বীপরাষ্ট্রটির ইতিহাসে প্রথমবারের মত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পর্কহীন কোন ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ দেয়ার ঘটনা ছিল এটি। কলম্বাগে ছিলেন সেই চারজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার একজন যাদেরকে সেবছর আমলাতন্ত্রের উচ্চ পদে বসানো হয়েছিল।  রাজাপাক্ষে পরিবার এভাবে রাজনীতির ব্যাপক সামরিকায়ন ঘটায় এবং সামরিক বাহিনীকে নিজেদের পরিবারের অনুকূলে রাখার প্রয়াস নেয়। F

 

দুর্নীতির প্রতীক রাজাপাক্ষে জাদুঘর

৯ মে শ্রীলঙ্কার আন্দোলনকারীরা শুধু রাজাপাক্ষেদের ওপর হামলা চালাননি, একইসাথে তারা হাম্বানটোটার একটি জাদুঘরেও আক্রমণ চালিয়েছেন। এই জাদুঘরটিতে হামলার বিশাল প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। মেদা মুলানা গ্রামের এই জাদুঘর যেন রাজাপাক্ষে পরিবারের দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত রাষ্ট্রটির রূপক!  

 

২০১৪ সালে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় রাজাপাক্ষে জাদুঘর। বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাক্ষে তখন দেশটির প্রতিরক্ষা সচিব ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবহার করে ব্যক্তিগত জমির ওপর এটি নির্মাণ করেন। জাদুঘরটি মাহিন্দা-গোতাবায়ার পরলোকগত পিতা ডন আলউইন রাজাপাক্ষে ও মাতা দান্দিনা সমরসিংহেকে উৎসর্গ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের নির্বাচনে গোতাবায়ার ভাই মাহিন্দা প্রেসিডেন্ট হলে জাদুঘর ব্যক্তিগত কাজের জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল ব্যবহার করার অভিযোগে গোতাবায়ার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে গোতাবায়া রাজাপাক্ষে দেশটির প্রেসিডেন্ট হলে তার বিরুদ্ধে থাকা সব অভিযোগ সরিয়ে নেয়া হয়। শ্রীলঙ্কার শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর দুর্বলতাটা এই ঘটনা থেকে টের পাওয়া যায়, যে-দুর্বলতা ব্যবহার করে, যে-কোন শাসককে আইনীভাবেই দায়মুক্তি দেয়া সম্ভব।

 

শ্রীলঙ্কার বর্তমান গণ আন্দোলনের সব চাইতে বড় ইতিবাচক দিক হলো এই যে সেখানে নিপীড়িত তামিল ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর যেমন প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, তেমনি সেখানে পথে নেমেছেন বৌদ্ধ ধর্মগুরুদেরও একাংশ। রাজাপাক্ষের সহযোগী উগ্র সিংহলী জাতিয়তাবাদী এবং চরমপন্থী বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা আপাতত কোনঠাসা রয়েছেন। এই জনআন্দোলন থেকে যদি শ্রীলঙ্কার রাজনীতি বিদ্বেষ মুক্ত হতে সক্ষম হয়, সেটাই হবে শ্রীলঙ্কার জন্য সব চাইতে বড় অর্জন, হয়তো তা দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সব নিপীড়ক শাসকদের জন্যও একটা বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।