রবিবার ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ Sunday 22nd May 2022

রবিবার ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

Sunday 22nd May 2022

আন্তর্জাতিক

মার্কিন মাতবরির ইচ্ছা ইউক্রেন সংকটে ইন্ধন যোগাচ্ছে

২০২২-০২-২৩

সি. জে. পোলিক্রোনিও
তর্জমা: ইরফানুর রহমান রাফিন

মার্কিন মাতবরির ইচ্ছা ইউক্রেন সংকটে ইন্ধন যোগাচ্ছে

ট্রুথআউটের জন্য নেয়া নোয়াম চমস্কির সাক্ষাৎকার। মূল লেখাটির প্রকাশকাল – ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২২

 

আপেল পাই যতোটা মার্কিনসুলভ, অযৌক্তিক রাজনৈতিক আতঙ্ক ততোটাই। প্রায়ই এটা অস্তিত্বশীল সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বার্থের প্রতি অথবা ভূকৌশলগত পরিস্থিতির বিদ্যমান বন্দোবস্তের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে, ঘটনাপ্রবাহের এমন সব ফল নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ক্ষমতাবানদের একটা সম্ভাব্য অসামর্থ্য থেকে উঠে আসে। স্নায়ুযুদ্ধের কাল থেকে এর বহু নজির মেলে। কিন্তু তার পূর্ববর্তী সময় থেকেও উদাহরণ দেয়া যায় – যেমন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে দেখা দেয়া প্রথম ‘রেড স্কার’। একটি বৈশ্বিক শক্তি হিশাবে চীনের উত্থান এবং ইউক্রেন পরিস্থিতির ব্যাপারে বর্তমানকালের প্রতিক্রিয়ায় সেই ব্যাপারটা পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

এই সাক্ষাৎকারটিতে, বিশ্ববিখ্যাত গণবুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অযৌক্তিক রাজনৈতিক আতঙ্কের বাস্তবতা খতিয়ে দেখেছেন। এ-ক্ষেত্রে তিনি দেশটির পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ওপর জোরারোপ করেছেন। সর্বোপরি, একটি বহুকেন্দ্রিক দুনিয়ায় বৈশ্বিক প্রভুত্ব বজায় রাখতে চাওয়ার বিপদের দিকটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন চমস্কি।

 

সি.জে. পলিক্রনিউ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আশঙ্কাবাদের একটা ঝোঁক আছে বলেই মনে হয়। বিশেষত সেসব ক্ষেত্রে, যখন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ক্ষমতাবানদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত স্বার্থ, আর মতাদর্শিক মনোবৃত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আসলেই, ১৮৯০ সালের শেষদিকের স্প্যানিশবিরোধী আতঙ্ক থেকে শুরু করে আজকে ইউক্রেন বিষয়ে রাশিয়ার নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা পর্যন্ত সবকিছুর ব্যাপারেই, মার্কিন স্বার্থ, মূল্যবোধ ও লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এমন সব ঘটনার ব্যাপারেই এই দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আর গণমাধ্যম বিরাট হাউকাউ শুরু করেছে। আজকের দিনে ইউক্রেনে আর চীনে যা ঘটছে, তার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়ে, আপনি কি এই আজব পরিস্থিতিটার ব্যাপারে মন্তব্য করতে পারেন?

 

নোয়াম চমস্কি: খুবই সত্য। যদিও কখনো কখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। এর সবচে তাৎপর্যপূর্ণ আর উন্মোচনকারী উদাহরণগুলোর একটি হল ১৯৫০ সালের এনএসসি-৬৮’য়ের আলঙ্করিক কাঠামো। এনএসসি-৬৮ স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর বছরগুলোর প্রধান অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা বিষয়ক দলিল। “চীনকে হারিয়ে ফেলার” কিছুকাল পরেই লেখা। দলিলটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উন্মত্ততা সৃষ্টি করে। সামরিক বাজেট বরাদ্দ ব্যাপকভাবে বাড়ানোর প্রেক্ষাপট তৈরি করে। আমরা এটা মনে রাখলে ভালো করব, এই উন্মাদনার রেশ হঠাৎ করে দেখা দেয়া কিছু নয় — বহুকাল ধরেই ছিল।

 

এনএসসি-৬৮’র নীতিগত সুপারিশগুলো নিয়ে বুদ্ধিজীবীরা ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছেন, যদিও সেই আলোচনায় তারা এর উন্মত্ত বাগাড়ম্বরের অংশটুকু এড়িয়ে গেছেন। এটা পড়লে মনে হয় যেন রূপকথার গল্প: চূড়ান্ত অশুভের সাথে পরম শুদ্ধতা ও মহৎ আদর্শবাদের সংঘাত। একদিকে আছে “দাস রাষ্ট্র”, যার “মৌলিক নকশা” ও “সারা দুনিয়ার ওপর পূর্ণ প্রভুত্ব কায়েম করার অন্তর্নিহিত অন্ধ তাড়না” দুনিয়ার সর্বত্র সব সরকার ও “সামাজিক কাঠামো” ধবংস করে চলেছে। এর ঠিক বিপরীত ব্যাপার আমাদের বিশুদ্ধ পরিপূর্ণতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “মৌলিক উদ্দেশ্য” হল সর্বত্র “ব্যক্তির মর্যাদা ও মূল্যের” নিশ্চয়তা দেয়া। দেশটির নেতারা “দয়াশীল ও গঠনমূলক প্রবৃত্তি” দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকেন, এবং তাদের “আন্তর্জাতিক সম্পর্কে লালসার কোনো অস্তিত্বই নেই।” মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত প্রভাববলয়ে এটা তো বিশেষভাবেই চোখে পড়ে। মার্কিনীরা কত দয়ালু আর গঠনমূলক আর লালসাহীন; ওয়াশিংটনের কোমল ব্যাকুলতার সুদীর্ঘ সুবিধাভোগী হিশাবে পশ্চিম গোলার্ধের বাসিন্দারা তার সাক্ষ্য দিতে পারবেন।

 

স্টেট ডিপার্টমেন্টের যে-কর্তারা এটা লিখেছেন, তাঁদের নিজেদের পক্ষেও বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে তাঁরা আসলে কী লিখেছেন। সে-সময় আসলে কী ঘটছিল, পরবর্তীতে তাঁদের কেউ কেউ তার একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। ... অত্যন্ত প্রভাবশালী সিনেটর আর্থার ভ্যান্ডেনবার্গ এটা নিশ্চিতভাবেই বুঝেছিলেন, যখন [১৯৪৭ সালে] তিনি এই পরামর্শ দিচ্ছিলেন যে, আমেরিকান জনগণকে তাদের শান্তিবাদী পশ্চাৎপদতা থেকে বের করে আনার জন্য “তাদের মধ্যে অপরিসীম আতঙ্ক তৈরি করতে হবে।”

 

এরকম মেলা উদাহরণ আছে। পাগলা কুকুর পুতিনের আরেক “মহা শয়তান” শি জিনপিং’য়ের সাথে মিলে সর্বত্র গণতন্ত্রকে ধবংস করে চলা আর দুনিয়াটাকে তার ইচ্ছাধীন করার দুরভিসন্ধির ব্যাপারে মার্কিন আত্মপ্রসাদ ও সারল্য নিয়ে ঠিক এই মুহূর্তেও ঢোল পেটানো হচ্ছে।

 

৪ ফেব্রুয়ারির পুতিন-শি সম্মেলনটা অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনের সাথে একই দিনে পড়ে গেছিল। এটাকে আজকের বিশ্বের একটা প্রধান ঘটনা বলেই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধে এই সম্মেলনের ব্যাপারে যে-পর্যালোচনা করা হয়েছে, তার শিরোনাম ছিল “নয়া অক্ষশক্তি।” তুলনাটা এতই স্পষ্ট যে ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। পর্যালোচনাটা অক্ষশক্তির পুনর্জন্মের অভিপ্রায়ের কথা জানিয়েছে: ডেভিড লিওনহার্ডটের ভাষায়, “চীন আর রাশিয়া অন্যান্য দেশে যে-বার্তাটা পাঠিয়েছে সেটা পরিষ্কার। তারা অন্য কোনো দেশের সরকারকে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে চাপ দেবে না।” আর ওয়াশিংটন এই ব্যাপারটা দেখে হতাশ হয়ে পড়েছে যে, অক্ষশক্তি “মার্কিন শিবিরের” দুটি দেশকে আকর্ষণ করছে। দেশ দুটি হল মিসর আর সৌদি আরব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার প্রভাববলয়ে যে-ভাবে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে এবং নির্বাচন আয়োজন করে – এই বর্বর একনায়কতন্ত্রগুলোকে বিপুলহারে অস্ত্র সরবরাহ করে এবং তাদের অন্যায়গুলোতে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়ে – মিসর আর সৌদি আরব তার দুর্দান্ত উদাহরণ। নয়া অক্ষশক্তি আরো মনে করে, একটি শক্তিশালী দেশের তার নিজ প্রভাববলয়ে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়া উচিৎ। নিকটবর্তী কোনো দুর্বল দেশের সরকার উৎখাত করার অধিকারও শক্তিশালী দেশটির থাকা উচিত। এ-ব্যাপারে বাকি দুনিয়ার হস্তক্ষেপ করার কিছু নেই।” — এটা এমন একটা ধারণা যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই ঘৃণা করে এসেছে। ইতিহাসে তার অনেক নজির রয়েছে।

 

আড়াইহাজার বছর আগে, ডেলফির ওরাকল বলেছিল, নিজেকে জানো। মনে রাখা ভালো, হয়তো।

 

এনএসসি-৬৮’তে যেমনটা ছিল, পাগলামিরও একটা পদ্ধতিগত দিক আছে। চীন আর রাশিয়া বাস্তবিকই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিভিন্ন হুমকি হাজির করছে। বিশ্ব মাতবর তাদেরকে হালকাভাবে নেয় না। মার্কিন মতামত আর নীতি কীভাবে এসব হুমকির প্রতি সাড়া দিচ্ছে, তার কিছু চিত্তাকর্ষক সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। এসব নিয়ে চিন্তাভাবনার সুযোগ আছে।

 

আটলান্টিক কাউন্সিল নতুন অক্ষশক্তির গঠনকে সত্যিই “মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মত” সব পরিকল্পনাসমেত “আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটি টেকটোনিক শিফট” হিশাবে বর্ণনা করেছে: “সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো চীনের বেল্ড অ্যান্ড রোড উদ্যোগ আর পুতিনের ইউরেশীয় ইকোনমিক ইউনিয়নের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতিগুলোকে আরো ঘনিষ্ঠ করতে সম্মত হয়েছে। আর্কটিকের উন্নয়নে তারা একসাথে কাজ করবে। বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিত করার কাজটাকে জোরদার করবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়বে।”

 

ন্যাশনাল এনডোমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির সভাপতি ডামন উইলসব বলেছেন, ইউক্রেন সংকটের মহা তাৎপর্যটাকে খাটো করে দেখা উচিৎ হবে না। আজকের সংকট শুধু ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডামনের মতে, এটা স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ বিষয়ক সংকট।

 

সিনেট সংখ্যালঘুদের নেতা মিচ ম্যাককননেল বলেন, খুব দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁর মতে, “প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে তার পক্ষে যা যা করা সম্ভব তার সবই করতে হবে। রাশিয়ার ওপর কঠোর অবরোধ দিলে সেটা ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের আগেই দিতে হবে, ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে নয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাখোঁ যেমনটা করছেন, বাবা সোনা ডেকে ভাল্লুকটাকে শান্ত করার একটা প্রচেষ্টা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের তেমনটা করার সুযোগ নেই।

 

তো, এই ব্যাপারে গৃহীত মতবাদ হল, আমাদেরকে অবশ্যই চীনের ছুঁড়ে দেয়া ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন হতে হবে এবং ইউক্রেনের ব্যাপারে একটা শক্ত অবস্থান নিতে হবে। যদিও এসব করার ব্যাপারে ইওরোপের আগ্রহ সামান্যই আর খোদ ইউক্রেন দাবি করছে, আমরা যেন আমাদের বাগাড়ম্বরপূর্ণ স্বরটা মৃদু করে আনি এবং কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধা করার চেষ্টা চালাই। ‘সৌভাগ্যবশত’, ওয়াশিংটন যা কিছুকে সঠিক ও ন্যায্য মনে করে তা করার ব্যাপারে সে বদ্ধপরিকর। প্রায় ব্যতিক্রমবিহীন প্রতিবাদের মুখে ইরাক আক্রমণ করা আর কিউবার শ্বাসরোধ করা স্রেফ দুটো উদাহরণ মাত্র। ইতিহাসে এ-রকম আরো অনেক নজির আছে।

 

সত্যি বলতে, এই মতবাদের প্রতি আনুগত্য সার্বজনীন নয়। মূলত উগ্র ডানপন্থীদের দিক থেকে অনেকেই ভিন্নভাবে ভাবেন। উদাহরণস্বরূপ, টাকার কার্লসনের কথা বলা যেতে পারে। যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচে প্রভাবশালী টেলিভিশন বক্তাদের একজন। তিনি বলেছেন যে, রাশিয়ার হাত থেকে ইউক্রেনকে বাঁচানো আমাদের কাজ না। এর কারণ হল, চীনের অপেক্ষাকৃত অধিকতর ভয়াবহ হুমকি মোকাবেলায় আমাদেরকে আমাদের সবকিছু উৎসর্গ করতে হবে। অক্ষশক্তির সাথে লড়াইয়ে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।

 

২০১৪ সালের পর থেকে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালাতে রওনা করেছে এমনটা দাবি করাটা একটা বাৎসরিক গণমাধ্যম অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শত শত বা হাজার হাজার রুশ সৈন্য ইউক্রেন আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, নিয়মিতই এমন প্রতিবেদন গণমাধ্যমে আসে। যা-হোক, বর্তমানে এই সতর্কবাণীগুলো অনেক বেশি তীব্র। এসব সতর্কবাণীতে কথিত পাগলা ভ্লাদের ব্যাপারে ভীতি আর শ্লেষ উভয়ই মিশে থাকে। ... মিন্টপ্রেসের এক বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, তিনটি প্রধান জাতীয় দৈনিকের ৯০ শতাংশ মতামতমূলক লেখা একটা আক্রমণাত্মক জঙ্গি অবস্থান নিয়েছে। ... ঘটনাক্রম বেশ পরিচিত। ইরাক আগ্রাসনের আগেও রাষ্ট্রীয় প্রচারণার সাথে এভাবে সুর মিলিয়েছিল গণমাধ্যম।

 

১৯৫০-এর দশকে “বাকি দুনিয়ার ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় চীনা-সোভিয়েত ষড়যন্ত্রের” কথা বলা হত। ঠিক একইভাবে, “নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থার” প্রতি নয়া অক্ষশক্তি যে-হুমকি ছুঁড়ে দিচ্ছে তা মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রটা দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে এমনটা বলা হচ্ছে। মার্কিন ভাষ্যকাররা এই বক্তব্যকে স্বাগত জানাচ্ছেন। 

 

যে “টেকটোনিক শিফটের” কথা বলা হচ্ছে তা অতিকথা নয়। এটা আসলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে গড়ন দেয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রাধান্য রয়েছে এটা তাকে হুমকিতে ফেলে। এটা সংকটের দুটি এলাকার ক্ষেত্রেই সত্য। এলাকা দুটি হচ্ছে রাশিয়া আর চীনের সীমান্ত। উভয় ক্ষেত্রেই, আলাপ আলোচনা করে আঞ্চলিকভাবে একটা মীমাংসায় পৌঁছানোর সুযোগ আছে। কিন্তু তেমন মীমাংসায় পৌঁছালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্রেফ একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করার থাকবে, যা মার্কিনীরা মেনে নিতে রাজি নয়। 

 

ইউক্রেনে, মীমাংসার মূল রূপরেখাটা সকলেরই জানা আছে। ... ইউক্রেন ও বাকি বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ যেটা করা যেতে পারে, সেটা হল একপ্রকার অস্ট্রীয়/নর্ডিক নিরপেক্ষতা। স্নায়ুযুদ্ধের কালে যা বজায় ছিল। এটা ইউক্রেনের সামনে তারা পশ্চিম ইওরোপের অংশ যে-পর্যন্ত হতে চায় সে-পর্যন্ত হবার সুযোগ রেখেছিল। কিন্তু সেখানে দেশটিতে মার্কিন ঘাঁটি বসানোর কোনো প্রশ্নই ছিল না। কেননা তেমনটা হলে তা ইউক্রেন আর রাশিয়া উভয়ের জন্যই হুমকি খাঁড়া করবে। 

 

বহু বিশ্লেষক যেমনটা পর্যবেক্ষণ করেছেন, নিকট ভবিষ্যতে ন্যাটোতে যোগ দিতে যাচ্ছে না ইউক্রেন। জর্জ ডব্লিউ বুশ তাড়াহুড়া করে একটা যোগদানের নিমন্ত্রণ-বিষয়ক ফরমান জারি করেছিলেন বটে, কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই ফ্রান্স আর জার্মানি ভেটো প্রদান করায় তা ভেস্তে যায়। মার্কিন চাপের কারণে ইস্যুটা বিবেচনাধীন থাকলেও এটা যে কোন উপায় না সে-ব্যাপারে সকলেই একমত। 

 

ওয়াশিংটনের জন্য আরো গুরুতর একটা ইস্যু আছে। ইউক্রেন বিষয়ে একটা আঞ্চলিক মীমাংসায় পৌঁছানো গেলে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করবে। স্নায়ুযুদ্ধের পুরো কালপর্ব জুড়েই এই উদ্বেগটা ছিল। ইওরোপ কি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা স্বাধীন ভূমিকা নেবে? ফ্রান্সের শার্ল দ্য গলের ‘আটলান্টিক থেকে উরাল পর্যন্ত অখণ্ড ইওরোপের’ ধারণার অনুসরণে যেমনটা সে নিতেই পারে? 

 

ইউক্রেন সংকটের আরেকটা বিশেষ দিকের কথা আমাদেরকে সফলভাবেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন গাই ল্যারোন, জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক। সেটা হচ্ছে ইওরোপের জ্বালানি সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার সুদীর্ঘ লড়াই। এই বিষয়টাও আজকাল সংবাদ শিরোনামে উঠে আসছে। রাশিয়া বিশ্ব রাজনীতিতে একটা খেলোয়াড় হয়ে ওঠারও অনেক আগে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইওরোপ ও জাপানকে একটা তেল-ভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিল, যার লাগামটা থাকবে মার্কিনীদের হাতে। মার্শাল পরিকল্পনার অর্থ সহায়তার অনেকটাই এই উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়। জর্জ কেনান থেকে ব্রিউনিউ ব্রেজেনস্কি পর্যন্ত ... পরিকল্পনাকারীরা এই ব্যাপারটা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, জ্বালানি সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা একইসাথে মিত্রদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেও সহায়তা করে। 

 

এতে কোনো সন্দেহই নাই যে চীন একটা উত্থানশীল পরাশক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে দাঁড়িয়ে গেছে দেশটি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলফোর সেন্টার অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের গ্রাহাম অ্যালিসন তো এও দাবি করেছেন যে, কথিত থুকিডাইডিস ফাঁদ একটা মার্কিন-চীন যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

 

আর সেটা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। মার্কিন-চীন যুদ্ধের মানেটা খুব সরল – খেল খতম। এমন অনেক ক্রিটিকাল বৈশ্বিক ইস্যু রয়েছে যেগুলোর ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর চীনকে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। হয় তারা একসাথে কাজ করবে, আর না হয় একসাথে পতন ঘটবে তাদের, নিজেদের সাথে দুনিয়াটাকেও রসাতলে নিয়ে যাবে তারা।

 

আজকের দিনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সবচে চমকপ্রদ পরিবর্তনগুলোর একটি হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজেকে মধ্যপ্রাচ্য ও অন্য সব জায়গা থেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, এগিয়ে আসছে চীন। তবে একটা ভিন্ন কৌশল ও সার্বিক এজেন্ডা নিয়ে। বোমা, মিসাইল ও দমনমূলক কূটনীতির আশ্রয় নেয়ার পরিবর্তে “সফট পাওয়ার” ব্যবহার করার মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে চীন। আদতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সম্প্রসারণ সবসময়ই হার্ড পাওয়ার ব্যবহারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিল। যার ফলে যখন সে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে, পেছনে ফেলে এসেছে অনেক কৃষ্ণগহ্বর। অনেকে যেমনটা বলেন, আপনিও কি তেমনি মনে করেন যে এটা অনেকটাই একটা ইতিহাসের ব্যাপারে অজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ নবীন জাতির অর্বাচীনতা? যদি আপনার জবাব হ্যাঁ হয়, কেন? (অবশ্য ইতিহাসের পাতায় মহৎ সাম্রাজ্যবাদের কোনো নজির খুঁজে পাওয়াও মুশকিল হবে)

 

পশ্চিমের সাম্রাজ্যিক বর্বরতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনো নতুন পথ তৈরি করতে পেরেছে এমনটা আমি মনে করি না। বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে আমেরিকার পূর্বসূরীদের কথা একটু ভাবেন। স্যার ফ্রান্সিস ড্রেকের মত নায়কোচিত ব্যক্তিদের জলদস্যুতা, ছলনা ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে ভারতকে ধবংস করে দেয়া, জঘন্য দাসপ্রথা, দুনিয়ার সবচে বড় মাদক পাচার ব্যবসা, এবং এমন সব আশীর্বাদপূর্ণ কর্মকাণ্ডই ব্রিটিশদের ধনসম্পত্তি আর বৈশ্বিক ক্ষমতার উৎস। ফ্রান্সও ব্যতিক্রম কিছু নয়। বেলজিয়াম তো বীভৎস অন্যায়ের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। আজকের চীনও এর অপেক্ষাকৃত সীমিত গণ্ডির ভেতরে করুণাময় কেউ নয়। ব্যতিক্রম কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। 

 

আজকে চীনের সবচে বড় আকারের প্রকল্পটি হল সুবিশাল বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ। সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের কাঠামোর ভেতর যা গড়ন পাচ্ছে। মধ্য এশিয়ার দেশসমূহ, ভারত, পাকিস্তান, রাশিয়া, ও বর্তমানে ইরান হয়ে তুরস্ক পর্যন্ত অনেকগুলো দেশ এই উদ্যোগের অন্তর্গত। মধ্য ইওরোপের ওপরও চোখ আছে চীনের। আফগানিস্তান যদি বর্তমান বিপর্যয়টুকু সামলে উঠতে পারে, তাহলে হয়তো আফগানিস্তানকেও এই উদ্যোগের শরিক করে নেয়া হবে। মার্কিন দখলদারিত্বের পুরোটা সময় আফগান অর্থনীতির ভিত্তি ছিল ইওরোপের জন্য হেরোইন উৎপাদন করা। চীনা অর্থ সহায়তা ও উন্নয়ন দেশটির অর্থনীতিকে সেই মাদককেন্দ্রিকতা থেকে তুলে আনতে পারে। এবং একইসাথে, চীনা শোষণের জন্য তার সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদকে উন্মুক্ত করতে পারে।

 

বেল্ড অ্যান্ড রোড উদ্যোগের শরিক মধ্যপ্রাচ্যেও আছে, ইসরায়েল যার অন্তর্গত। আফ্রিকা ও বর্তমানে এমনকি লাতিন আমেরিকাতেও এই উদ্যোগের সাথে সামঞ্চস্যপূর্ণ কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুমুল আপত্তির মুখেই এমনটি ঘটছে।

 

এসব উদ্যোগ মোকাবেলা করার সাধ্য আমেরিকার নেই। বোমা মেরে, মিসাইল ছুঁড়ে, কিংবা বিশেষ বাহিনী পাঠিয়ে আঞ্চলিক কমিউনিটিগুলোতে কোনো কাজ হয় না।

 

এই ক্রমবর্ধমান চীনা হুমকির মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঠিক সেই জায়গাটাতেই সাড়া দিচ্ছে যেখানে সে সবচে ক্ষমতাশালী। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সারা দুনিয়াতে সামরিক আধিপত্যের জায়গাটাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এমনকি চীনের উপকূলেও। কিন্তু এমনটা সেটাকেও আরো বাড়িয়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে, সামরিক বিশ্লেষক মাইকেল ক্লেয়ার আমাদেরকে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট বাইডেন ন্যাশনাল ডিফেন্স অথোরাইজেশন অ্যাক্ট সই করেছেন। এটা “প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উত্তরে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে দক্ষিণে অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর এবং চীনের পুবদিকে ভারত পর্যন্ত” একগুচ্ছ মার্কিন অস্ত্রে সজ্জিত প্রহরী রাষ্ট্রের অবিচ্ছিন্ন শেকল তৈরি করার ডাক দিচ্ছে। এক কথায়, চীনকে ঘিরে ফেলার আহবান জানাচ্ছে।

 

চীনা হুমকির হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এটা তার একটা উপাদান মাত্র। আরেকটি পরিপূরক উপাদান চীনা অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। এটা নিয়ে এত কথা বলা হয়েছে যে নতুন করা আর কিছু বলার আবশ্যকতা নেই। তারপরেও সংক্ষেপে একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, চীন যেসব ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তি এগিয়ে নিচ্ছে, তাকে সেগুলো করা থেকে বাধা দিতে হবে। এসবের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ পরিবহনীকরণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেসব ক্ষেত্রে চীন আসলে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। যেসব প্রযুক্তি হয়তো আমাদেরকে সেই পরিবেশটাকে ধবংস করা থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে যা সকল প্রাণের ধারক।

 

এসব ক্ষেত্রে চিনের অগ্রগতিকে খাটো করা উদ্যোগগুলোর একটা দিক হল, অন্যান্য দেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করা, যেন তারা চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার না করে। চীন এসব উদ্যোগকে ফাঁকি দেয়ার একটা উপায় খুঁজে পেয়েছে। তাঁরা বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন দেশে কারিগরি স্কুল খোলার পরিকল্পনা করছে, যেগুলো অগ্রসর চীনা প্রযুক্তি শিক্ষা দেয়া হবে, যা এসব স্কুলের স্নাতকরা পরবর্তীতে ব্যবহার করতে পারবে। আবারও, এই ধরণের আগ্রাসনের মোকাবেলা করা কঠিন।