• মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২১
Top Stories
কে বাঁচে, কে মরে, কে সিদ্ধান্ত নেয়? আজ প্রেস ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম Shahidul Alam’s exhibition opens at Rubin Museum in New York Photojournalist Shahidul Alam—who served time for his activism—gets retrospective at the Rubin Museum On Life in Prison সামরিক নজরদারিতে সাংবাদিকতা সাংবাদিকের বয়ানে সংবাদমাধ্যমের সরকার তোষণ জনস্বার্থে সাংবাদিকতার অতীত ঐতিহ্যকে পুনর্বহাল করতে হবে আইসিটি আইনে মামলা ও রিমান্ডের খোঁড়াযুক্তি! অভিনব সংকটে বাংলাদেশের গণমাধ্যম উন্নতিটা অসুস্থ, এড়ানোর উপায় কি করোনার নতুন ধরণ মোকাবিলা; কোন পথে বাংলাদেশ কোভিডে চড়া বাজারদর; টিসিবি এসব কী করছে! নদীর জন্য জীবন দিয়েছেন বাংলাদেশের কৃষকরা প্রচলিত আইনে ক্ষতিপূরণ সম্ভব না: পুলিশের গুলিতে পঙ্গু কাঞ্চন ইসরায়েল প্রসঙ্গ: বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র কি বদলে যাচ্ছে সিলেটের সাংবাদিক নিজামুল হক লিটনের আত্মহত্যার নেপথ্যে ইসরায়েল প্রসঙ্গ: বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র কি বদলে যাচ্ছে মহামারিতে স্বল্পমূল্যের চিকিত্সাসেবা বলতে চিকিৎসকরা কি এই বুঝিয়েছিলেন? ইসরায়েলে প্রদর্শনী: ছবি ফিরিয়ে নিলেন শহিদুল আলম ও গিডিয়ান মেন্ডেল কোনোভাবেই চুপ থাকতে রাজি নন সাংবাদিক জীবন ৬ দিনে ৯ মামলা: পুলিশি নির্যাতনের বিচার চান সাংবাদিক ইফতেখার বস্তুনিষ্ঠ স্বাধীন সাংবাদিকতার অধিকার গোটা সমাজের গণতান্ত্রিক মুক্তির জন্যও অপরিহার্য টিকাপ্রদানে বৈষম্যের শিকার শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী পেশী প্রদর্শনে আমলাতন্ত্র আগের চেয়েও বেপরোয়া, মনে করেন ৯২.৬% সাংবাদিক যেন কেটিএস ফিরে এসেছে সেজান গ্রুপের কারখানায় আগামীর কর্মসংস্থান: অচিরেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে নতুন যেসব পেশা আগামীর কর্মসংস্থান: জমজমাট যেসব পেশা অচিরেই যাবে বাতিলের খাতায় আগামীর কর্মসংস্থান: গার্মেন্টসে সংকটে নারী শ্রমিকের পেশাগত ভবিষ্যৎ ‘বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জরুরিভিত্তিতে আর্থিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন’ সেজান-সজীব গ্রুপের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড: লাশ হস্তান্তরে সমন্বয়হীনতা, স্বজনদের দুর্ভোগ মাল্টিমিডিয়া গ্যালারি অফ দ্রিক

নদীর জন্য জীবন দিয়েছেন বাংলাদেশের কৃষকরা

জ্যৈষ্ঠ ৫, ২০২১ / Driknews

বাংলাদেশে কৃষক আন্দোলনের ধারা ১৯৭২-২০০০

আনিস রায়হান

বাংলাদেশে কৃষকরাই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রধান অংশ। তবে এর সঙ্গে রয়েছেন গ্রামে বসবাসকারী জেলে, কামার, কুমার, তাঁতি, ভ্যান ও রিকশাচালকসহ নানা পেশার লোকজন। ইতিহাস বলে, এ দেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে জনগণের চাহিদা তেমন একটা গুরুত্ব পায় না। ফলে যে কোনো ন্যায্য দাবি, যা এমনিতেই বিধি মোতাবেক হয়ে যাওয়ার কথা, তার জন্যেও সাধারণ মানুষকে কঠোর আন্দোলনে যেতে হয়। শহুরে জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো নিয়ে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মীরা কমবেশি সোচ্চার থাকলেও সেই তুলনায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো পড়ে থাকে আড়ালে। তাই সংকট চরমে উঠলে কৃষকসহ গ্রামের মানুষ নিজেরাই নেমে আসে এবং সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের ধারা ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত প্রধানত রাজনৈতিক সংগ্রামেরই অংশ ছিল। কারণ এ সময় প্রায় প্রতিটি পাড়ায়, মহল্লায় কোনো না কোনো বামপন্থী সংগঠনের সক্রিয় সংগঠনের উপস্থিতি ছিল। তারা রাজনৈতিক চেতনার আলোকে কৃষকের আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করত। কৃষকরা সেসব আন্দোলনে অংশ নিত এবং নেতৃত্বও দিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে কৃষকরা সংগ্রামের ঐতিহ্য স্থাপন করেছিল এবং তা একপ্রকার স্বতঃস্ফূর্তভাবেই।

বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জনপদে প্রবেশ করে এবং নদীর পলি আসার ফলে জমির উর্বরতা বাড়ে। এতে করে কৃষককে জমির পেছনে বাড়তি ব্যয় করতে হয় না। তাছাড়া বাঁধের ফলে ভেতরের এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তা মেলে না। তাই এ অঞ্চলের কৃষকরা বরাবরই বাঁধ দেয়ার বিরোধী। কিন্তু পাকিস্তান আমল থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশে উন্নয়ন তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ, বাঁধ ও সেতু নির্মাণ। এর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ জনতার আন্দোলন সংখ্যা অনেক

ব্রিটিশ আসার শুরুতেই তারা ফকির সন্ন্যাস বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৭৬৬ সালে মেদিনীপুরের বিদ্রোহ; ১৭৬৯ সালে সন্দ্বীপের বিদ্রোহ; ১৭৭৬ সালে চাকমা বিদ্রোহ; ১৭৮০ সালে রেশম চাষি, লবণ চাষি, আফিম চাষি ও মালঙ্গীদের সংগ্রাম, ১৭৮৩ সালে রংপুর বিদ্রোহ; ১৭৮৪ সালে যশোর-খুলনার বিদ্রোহ- এভাবে সংগ্রাম চলেছে প্রতিটি বছর। ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় তার গ্রন্থে এই সময়পর্বের শতাধিক কৃষক আন্দোলনের তথ্য উপস্থাপন করেছেন। (দেখুন, সুপ্রকাশ রায়। ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম। র‍্যাডিক্যাল, কলকাতা। জানুয়ারি ২০১২।)

কৃষক আন্দোলনের এই ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করেই রাজনৈতিক দলগুলো গ্রামাঞ্চলে ভিত্তি স্থাপন করে। এই রাজনৈতিক ধারাটি বহুলাংশেই ছিল সশস্ত্র। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর রণকৌশল নির্ধারণে ব্যর্থতা, সেনাশাসন ও ইসলামিকরণের চাপে বামপন্থি সংগঠনগুলো শক্তি হারায় এবং গ্রামাঞ্চল থেকে রাজনৈতিক সংগঠনের উপস্থিতি হ্রাস পেতে থাকে। কিছু সংগঠন সশস্ত্র উপস্থিতি বজায় রাখতে সমর্থ হলেও রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াইয়ে তারা এঁটে ওঠে না। এই পর্যায়ে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাসে ভাটা নেমে আসে। আমজাদ হোসেন তার ৪৮০ পৃষ্ঠার কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থটিতে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের বর্ণনা দিতে খরচ করেছেন ৪৪৩ পৃষ্ঠা। এ থেকে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের বহর টের পাওয়া যায়।

১৯৭৮ সালের পর থেকে দেখা দেয় নতুন পরিস্থিতি। নিজেদের সামর্থ্যরে ওপর দাঁড়িয়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন পরিচালনা করাটা আবারও কৃষকদের দাবি আদায়ের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলো ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন, চিংড়ি ঘের না করা, নদীতে বাঁধ না দেয়া, ভূমিহীনদের জন্য ভূমির ব্যবস্থা করা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা, চাষাবাদের উপকরণের সহজলভ্যতা, সারের দাম কমানো ইত্যাদি। জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের হলেও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে এর সপক্ষে আন্দোলনে নামতে হয়েছে।

১৯৬১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় খুলনা ও যশোরের সীমান্তবর্তী ভবানীপুরে ৪৫ ভেল্টবিশিষ্ট পাঁচটি স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। এর অংশ হিসেবে ১৯৬৯ সালের মধ্যে ৯২টি পোল্ডার, ৭৮০টি স্লুইস গেট এবং চার হাজার কিলোমিটার বাঁধ নির্মিত হয়। কিন্তু এর ফলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে জলাবদ্ধতা বাড়তে থাকে। ’৭০-এর দশকের শেষ দিকে ও ৮০-দশকের প্রথম দিকে কেশবপুর, অভয়নগর, মনিরামপুর, ডুমুরিয়া, ফুলতলা-দৌলতপুরসহ ৮টি থানার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে প্রায় ২০০ বর্গমাইল এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২০ লাখ লোক। ধানক্ষেত, ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। (দেখুন, আমজাদ হোসেন। বাংলাদেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস। পড়ুয়া, ঢাকা। অক্টোবর ২০০৩, পৃ ৪৪৪-৪৫।) এরপর থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণ এবং খুলনা ও যশোর জেলার সচেতন মহল ভবদহ জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে।

’৮০-র দশকের প্রথম দিকে ‘ভবদহ সংস্কার আন্দোলন কমিটি’ গঠিত হয়। এই আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করলে এবং ১৯৯৪ সালে আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল জলাবদ্ধতার শিকার হলে সরকার ভবদহ পানি নিষ্কাশন প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পদক্ষেপ না নিয়ে তাৎক্ষণিক সমাধার জন্য কিছু কাজ করার নীতি দ্বারা চালিত হওয়া এবং দুর্নীতির কারণে এ প্রকল্প সফলতার মুখ দেখেনি। (দেখুন, তারিম আহমেদ ইমন। ভবদহের অভিশাপ জলাবদ্ধতা। দৈনিক যুগান্তর। ১৯ আগস্ট ২০১৯।) ভবদহকে এখন ‘দক্ষিণাঞ্চলের দুঃখ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ‘ভবদহ জলাবদ্ধতা নিরসন আন্দোলন কমিটি’ সক্রিয় কিছু ভূমিকা রাখার চেষ্টা এখনো করে যাচ্ছে। মিছিল, সমাবেশ, প্রচারপত্র বিলি, স্মারকলিপি পেশ তাদের নিয়মিত কাজের অংশ।

দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজীবী জনগণ শুধু সরকারকে বিরোধিতা করেছে, এমন নয়। নদী বাঁচানোর জন্য সরকারের পদক্ষেপের সপক্ষেও তারা আন্দোলন করেছে। যশোরের ভৈরব নদী পুনর্খননের কর্মসূচি গ্রহণ করলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড অবৈধ দখলদারদের কারণে তা বাস্তবায়ন করতে পারছিল না। নদীর দু’পাশে দোকানপাট, ঘরবাড়ি তৈরি করে ক্ষমতাধররা দখলি স্বত্ব কায়েম করে বসে। অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নদী উদ্ধারের জন্য ২০০০ সালে সর্বস্তরের জনতার অংশগ্রহণে গঠিত হয় ‘ভৈরব নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ সংগ্রাম কমিটি

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে পানিবাহিত অঞ্চল। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জনপদে প্রবেশ করে এবং নদীর পলি আসার ফলে জমির উর্বরতা বাড়ে। এতে করে কৃষককে জমির পেছনে বাড়তি ব্যয় করতে হয় না। তাছাড়া বাঁধের ফলে ভেতরের এলাকায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার রাস্তা মেলে না। তাই এ অঞ্চলের কৃষকরা বরাবরই বাঁধ দেয়ার বিরোধী। কিন্তু পাকিস্তান আমল থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশে উন্নয়ন তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সড়ক যোগাযোগ, বাঁধ ও সেতু নির্মাণ। এর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ জনতার আন্দোলন সংখ্যা অনেক, সে রকম কিছু আন্দোলনের ঘটনা এখানে তুলে ধরা হলো। ২২ জুলাই ১৯৮৮ খুলনা-যশোর সীমান্তের কেশবপুর উপজেলায় বাঁধের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কয়েকটি গ্রামের অধিবাসী। ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (ওয়াপদা) একটি বাঁধ ছিল ওই এলাকায়। এটিকে ডহুরি বাঁধ বলে ডাকা হতো। এই বাঁধের ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ২২ জুলাই গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওয়াপদা বাঁধ কেটে দেয়। এই বাঁধ উচ্ছেদ করতে গিয়ে সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হন শহীদ গোবিন্দ দত্ত, পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন সরোয়ার মাস্টার ও গোবিন্দ সরকার। এ ছাড়াও স্থানীয় সরকার সমর্থকদের হামলায় অনেকে আহত হন।

ডহুরি গ্রামের অদূরেই খুলনা ও যশোর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত অবস্থিত বিল ডাকাতিয়া। এখানকার বাঁধ কেটে দেয়ার দাবিতে ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট কৃষক জনতা ১৫ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে এসে খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে। কিন্তু সরকার তাতে নমনীয় হয় না। এ সময় ‘বিল ডাকাতিয়া সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয়। এই কমিটি বাঁধ কাটার জন্য জনমত সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। ১৭ আগস্ট তারা একটি মহাসমাবেশ আহ্বান করলে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আন্দোলন সংগ্রামের এক পর্যায়ে ১৮ সেপ্টেম্বর কৃষক, জনতা ও আন্দোলনের সমর্থকরা একযোগে অংশ নিয়ে বাঁধ কেটে দেয়। বিল ডাকাতিয়ার বাঁধবিরোধী আন্দোলন চলে সাত বছর ধরে। ১৯৮৮ সালে গ্রামের আন্দোলনকারীদের থামাতে সরকার ওই অঞ্চলে কারফিউ জারি করেছিল।

যশোরের কেশবপুর উপজেলার হরি নদীর নাব্যতা হারিয়ে ফেলার পেছনে দায়ী করা হতো ভরতভায়না বিলে বাঁধ দেয়াকে। এর ফলে বাঁধের বাইরে নদীতে পলি পড়ে নদী নাব্যতা হারানোর পাশাপাশি বাঁধের ভেতরে ছয়টি গ্রাম জলমগ্ন হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেড় হাজার পরিবার। স্থানীয় কৃষকরা একমত হন যে, বাঁধ কেটে দিলে বিলে জোয়ার-ভাটা খেলানো যাবে। এতে করে পলি পড়ে জমি উঁচু হয়ে জলমগ্ন গ্রামগুলোকে বাঁচাবে, অন্যদিকে ২-৩ বছরের মধ্যে নদীও নাব্যতা ফিরে পাবে। স্থানীয়দের উদ্যোগে সেখানে ‘বাঁধ কাটা কমিটি’ গঠিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ কাটার বিরোধিতা করলে পুলিশ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু আন্দোলন চলতে থাকে। ১৯৯৭ সালের ২৮ অক্টোবর জনতা ভরতভায়না বাঁধ কেটে দেয়।

তবে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজীবী জনগণ শুধু সরকারকে বিরোধিতা করেছে, এমন নয়। নদী বাঁচানোর জন্য সরকারের পদক্ষেপের সপক্ষেও তারা আন্দোলন করেছে। যশোরের ভৈরব নদী পুনর্খননের কর্মসূচি গ্রহণ করলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড অবৈধ দখলদারদের কারণে তা বাস্তবায়ন করতে পারছিল না। নদীর দু’পাশে দোকানপাট, ঘরবাড়ি তৈরি করে ক্ষমতাধররা দখলি স্বত্ব কায়েম করে বসে। অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে নদী উদ্ধারের জন্য ২০০০ সালে সর্বস্তরের জনতার অংশগ্রহণে গঠিত হয় ‘ভৈরব নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ সংগ্রাম কমিটি। এই কমিটি পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। এর মধ্যে একটি দাবি ছিল নদীর কোনো অংশ কাউকে ইজারা দেয়া যাবে না। ক্ষমতাসীনরা এতে ক্ষিপ্ত হয়। এ কারণে সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে আন্দোলনে নামলেও নদী দখলকারি স্থানীয় ক্ষমতাসীনদের প্রভাবে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং কমিটির মিছিলে লাঠিচার্জ, নেতাদের গ্রেপ্তার করাসহ আন্দোলন পণ্ড করার জন্য সবই করে। নদী তীরের সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে কমিটি স্মারকলিপি প্রদান, মিছিল, সমাবেশ ও লাঠি মিছিলসহ সরকারি কর্মকর্তাদের কার্যালয় ঘেরাওসহ নানামুখী কর্মসূচি পালন করে। যার সুবাদে ১৭ জুন সরকার দাবি মেনে নেয় এবং নদী দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য পুলিশ অভিযানে নামে।

বাংলাদেশে ভূমি সংস্কারের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের আইন, নির্দেশনা জারি হলেও ভূমি সংস্কার কখনো কার্যক্রম খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি। এ কারণে বিপুল ভূমিহীন জনগণের আবাসন ও জীবন ধারণের সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। তাই কৃষিজীবী ভূমিহীন জনগণ খাস জমিতে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে আসছে। সমাজের সচতেন অংশটিও এসব সংগ্রামের অংশীদার। ভূমিহীন গরিব কৃষকরা নদীতে জেগে ওঠা চর, পতিত জমি কিংবা সরকারি মালিকানাধীন খাসজমিতে কুঁড়েঘর তুলে বসবাস করতে গেলে প্রায়ই ক্ষমতাধররা তাদের উচ্ছেদ করে ওসব জমির দখল নেয়ার চেষ্টা চালায় কিংবা পুলিশ এসে তাদের উচ্ছেদ করে। মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে ভূমিহীনরা এদেশে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। তার মধ্যে কয়েকটি আন্দোলনের বিবরণ এখানে তুলে ধরা হলো। রংপুরে ২০০০ সালে হাজীপাড়ার চরে ১৫০টি পবিার আশ্রয় নিলে স্থানীয় ক্ষমতাধররা তাদের উচ্ছেদের চেষ্টা চালায়। ১৮ এপ্রিল ভূমিহীনদের ঘরে আগুন দেয়া হয়। এতে ১০৪টি ঘর আগুনে পুড়ে যায়। স্থানীয় গ্রামীণ ভূমিহীন জনগোষ্ঠী তখন তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। এতে সমর্থন দেয় রংপুর জেলার সর্বস্তরের মানুষ। আন্দোলনের চাপে ভূমিহীনদের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা নিতে বাধ্য হয় পুলিশ। আদালত হামলাকারীদের ১১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। ভূমিহীনরাও চরের ওপর নিজেদের দখল ধরে রাখতে সমর্থ হয়।

নোয়াখালী জেলার বড় একটি অংশই চরাঞ্চল। নবগ্রাম হচ্ছে এরকমই একটি চর, যা ১৯৭০ সালে সমুদ্র উপকূলে জেগে ওঠে। ১৯৯০ সাল নাগাদ এখানে প্রায় তিন হাজার মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। সংলগ্ন মূল ভূখণ্ডের জোতদারশ্রেণি এই জমি দখলের জন্য ১৯৯২ সালের ৪ নভেম্বর লাঠিয়াল বাহিনী পাঠায়। ভাড়াটে এই সন্ত্রাসীরা ভূমিহীনদের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়ার পাশাপাশি তাদের ফসল লুট করে এবং কৃষক ও জেলেদের মারপিট করে। এই ঘটনার পর আশেপাশের আরও এরকম প্রায় ৮টি চর মিলিয়ে প্রায় ১৬ হাজার ভূমিহীন মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয় এবং নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলে। ‘নিজেরা করি’ নামক একটি এনজিও তাদের সংঘবদ্ধ হতে সহযোগিতা করে। (দেখুন, আমজাদ হোসেন। পূর্বোক্ত, পৃ ৪৬০)

বিল কুড়ালিয়া অবস্থিত পাবনার মধ্যেকার চলনবিল অংশে। এখানকার খাস জমির পরিমাণ প্রায় ১৪৬০ বিঘা। ১৯৬১ সালে স্থানীয় জোতদারদের সঙ্গে কৃষকদের সংঘর্ষ হয় এই বিলের দখলকে কেন্দ্র করে। ওই ঘটনায় ভূমিহীন কৃষক ওদুদ নিহত হন। এরপর ওই জমি সরকার তার দখলে নেয়। কিছুদিন না যেতেই জমির একাংশ ক্ষমতাসীনদের ইজারা দেয়া হয়। তারা একাংশের ইজারা বলে বাকি অংশ ভোগ করতে থাকে। ১৯৮৭ সালে প্রণীত এক অধ্যাদেশের মারফত খাস জমিতে ভূমিহীনদের অধিকার স্বীকৃতি পেলে ভূমিহীন কৃষক, জেলে ও অন্য পেশাজীবীরা এই জমি তাদের নামে বণ্টন করে দেয়ার দাবিতে ১৯৯২ সালে আবার নতুন করে সংগঠিত হন। তারা ক্ষমতাধরদের ভাড়াটে বাহিনীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ মারপিটে অংশ নিয়ে এই জমি নিজেদের দখলে নেয়। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন স্থানীয় স্কুল মাস্টার আতাউর রহমান রানা। ১০ ডিসেম্বর ভূমিহীনরা জমির ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন।

বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও প্রযুক্তির যেসব পরিবর্তন এসেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলও তার বাইরে থাকেনি। ফলে কৃষকদের দারিদ্র্য বা সংকটগুলো সব আগের মতো আছে, এমনটা বলা যাবে না। উন্নতির নানা চিহ্ন এখানেও দৃশ্যমান। তবে বৈষম্য বিচার করলে এই একুশ শতকে এসে কৃষকদের অবস্থান আরও পেছনেই সরেছে। পাশাপাশি উৎপাদনের উপকরণ যেমন জমি, সার, বীজ, নদী, পানি ইত্যাদির ওপর কৃষকের দখল আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃষকরা সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। তাদের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্গা চাষের ন্যায্য হিস্যাবিষয়ক আন্দোলন। বরিশালে ৭০-এর দশকের শেষ দিকে এরকম একটি আন্দোলন সংঘটিত হয়। জমির মালিক উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ মাঠ থেকে কেটে নিত, এর বিপরীতে বর্গাচাষিদের দাবি ছিল আধাভাগ। বরিশাল সদর থানার অদূরে অবস্থিত চরকাউয়া ইউনিয়নের বর্গাচাষিরা অধিক সংখ্যায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় কিছু মালিক তাদের দাবি মেনে নেয়। এর ফলে আশেপাশের ইউনিয়নগুলোতেও একই রকম আন্দোলন দানা বাঁধে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একজোট হয় মালিকরা। তারা জেলা প্রশাসকের কাছে কৃষকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ উত্থাপন করে। অন্যদিকে কৃষকদের পক্ষে দাঁড়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। সরকারপক্ষ উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করে আপসের চেষ্টা চালালেও তা ব্যর্থ হয়। আন্দোলনকারীদের নেতৃত্ব অংশের কয়েকজন পরে মালিকদের দিকে হেলে পড়লে এই আন্দোলন কিছু সুবিধা আদায়ের মধ্যেই সীমিত হয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে শেষ হয়ে যায়।

কৃষক আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো সারের দাবিতে আন্দোলন। ৫০-এর দশকে ‘সবুজ বিপ্লব’ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশে কৃষকদের উচ্চফলনশীল জাতের শস্য চাষাবাদে উৎসাহিত করা হয়। ফসলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ধীরে ধীরে এর ওপর নির্ভরশীল হতে থাকে। কিন্তু এই ফসলের জন্য প্রয়োজন হতো প্রচুর পরিমাণ সার। কৃষকরা আগেকার দিনে যে জৈব সার ব্যবহার করেতন, এসব ক্ষেত্রে তা ব্যবহারের বদলে প্রধানত ইউরিয়া সারের প্রচলন ঘটানো হয়। ইউরিয়ার জন্য কৃষকরা সরকারের ওপর র্নিভর করত। ১৯৯৫ সালের মার্চে সার সংকটের ফলে এ নিয়ে আন্দোলন চরমে ওঠে। ১২ মার্চ টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইলে সারের দাবিতে আন্দোলনরতদের একজন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। ১৮ মার্চ পুলিশ ময়মনসিংহে কৃষকদের ওপর গুলি চালায়। ২১ মার্চ গাইবান্ধায় পুলিশের গুলিতে তিন কৃষক নিহত হয়। সরকার প্রধানত দমন নিপীড়নের প্রক্রিয়ায় এই আন্দোলন দমন করে। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয় সরকারি দলের দুর্নীতিবাজরাই সার সংকট সৃষ্টি করে। শহরাঞ্চলের মধ্যবিত্তদের সমর্থন ছিল এই আন্দোলনের প্রতি। শহরের বুদ্ধিজীবীরা এই আন্দোলনকে ‘সার বিদ্রোহ’ আখ্যা দেয়। (দেখুন, মুনতাসীর মামুন। বাংলাদেশের রাজনীতি : একদশক (১৯৮৮-১৯৯৮)। অনন্যা, ঢাকা। ডিসেম্বর ১৯৯৯, পৃ ৪৫২-৫৬।)

কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এসব আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি ধারাই এখনো চলমান। কোনো সরকারই কৃষকদের উদ্বেগের বিষয়গুলোর আন্তরিক সমাধানের পথে হাঁটেনি। ১৯৭৮ পরবর্তী ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে, রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কৃষকের মেলবন্ধন আগের চেয়ে আরও খারাপ হয়েছে। পরিবেশ, প্রতিবশগত সংকট দিনে দিনে ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। তাই প্রায়শই কৃষক জনতা প্রতিবাদে শামিল হয় এবং নিকট অতীতে কৃষক পরিবার থেকে আসা শহরের দুর্বল মধ্যবিত্তরা তাতে সমর্থনও জোগায়।

উল্লেখ করার মতো আরেকটি বিষয় হলো, যুগের ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও প্রযুক্তির যেসব পরিবর্তন এসেছে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলও তার বাইরে থাকেনি। ফলে কৃষকদের দারিদ্র্য বা সংকটগুলো সব আগের মতো আছে, এমনটা বলা যাবে না। উন্নতির নানা চিহ্ন এখানেও দৃশ্যমান। তবে বৈষম্য বিচার করলে এই একুশ শতকে এসে কৃষকদের অবস্থান আরও পেছনেই সরেছে। পাশাপাশি উৎপাদনের উপকরণ যেমন জমি, সার, বীজ, নদী, পানি ইত্যাদির ওপর কৃষকের দখল আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।

মুন্নী রহমান

সরকার তো স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন করল, গ্রামে সমানে মিছিল মিটিং হচ্ছে , কিছুইতো বুঝতে পারছি না একদিকে লক-ডাউন অন্যদিকে নিরবাচন ?

এভাবেই আমাদের পাশে থাকুন